T3 || কালির আঁচড় পাতা ভরে, কালী মেয়ে এলো ঘরে || লিখেছেন ছন্দা চট্টোপাধ্যায়

মাতৃরূপেন সংস্থিতা

নরেনবাবুর নাতনি শ‍্যামলাঙ্গী চারুদর্শনা ষোড়শী শিবানী দাদুর পাশে এসে বসে।-“আচ্ছা দাদুভাই বল তো, মা কালী কেন কালো?দুগ্গা, লক্ষ্মী সরস্বতী, শেতলা, মনসা এমনকি বনবিবি সবাই তো ফর্সা কিংবা হলদে রঙের? মা কালী কেন আমার মতো?- দাদু নরেন ঘোষাল শাস্ত্রজ্ঞ বলে পরিচিত। শান্তিপুরের আদি বাসিন্দা। আজ তাঁর বাড়ি কালী পূজো। কিশোরী নাতনির কথায় ঠাকুরদালানে বিরাজমানা মাতৃপ্রতিমার উদ্দেশ‍্যে প্রণাম জানিয়ে তিনি শুরু করলেন- “জানি দিদিভাই, এই একটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে তুমি ক্ষান্ত হবে না। এরপর বলবে এলোকেশী কেন? চারটে হাত কেন? জিভ বার করে আছে কেন?”- শিবানী বলে ওঠে- “না না, এটা জানি স্বামীর বুকে পা দিলে তো লজ্জা হবেই। আমি জানি দাদুভাই, তুমি একটু অন‍্যরকম ভাবে ব‍্যাখ‍্যা করো। আমি সেগুলোই শুনতে চাই।”- কিশোরী নাতনির জ্ঞানের আগ্রহ নরেন ঘোষালকে সন্তুষ্ট করে। তিনি শুরু করেন- “শোন, মা কালীর রং রূপ সবটাই প্রতীকী। এই মূর্তির সন্ধান পেয়েছিলেন সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ মহাশয়। স্বপ্নে। আগে ডাকাতেরা খড়্গ ও মুণ্ডধারী দ্বিভূজা কালী পুজো করতো। মা বলেছিলেন – “আমার চতুর্ভুজা মূর্তির প্রতিষ্ঠা করো। ভোরে উঠে যাকে প্রথম দেখবে তার দুই হাতের মুদ্রাই হবে আমার কল্যাণী স্বরূপ।”- আগমবাগীশ মহাশয় ভোরে উঠে দেখলেন গয়লাবৌ ঘুঁটে দিচ্ছে। সদ্যস্নাতা কৃষ্ণা রমণী, এলোকেশী। মাথায় ঘোমটা নেই। কৃষ্ণানন্দের পদশব্দে চকিতে ফিরে দাঁড়িয়ে লজ্জায় জিভ কাটলো। পরপুরুষের সামনে ঘোমটাহীনা! সাধক কিন্তু মায়ের দুই হাতের অন্তর্নিহিত অর্থ পেয়ে গেলেন। গোবরধৃত বাম হস্ত দেবীর বরদান মুদ্রা, দেওয়ালে ঘুঁটে দেওয়ার জন্য উদ্যত দক্ষিণ হস্ত আশীর্বাদ, অভয়। মা বরাভয়দায়িনী। কালো রং কালের প্রতীক। তা ছাড়া সব রংকেই ধারণ করে কালো রং। আবার আঁধারকালোর মধ‍্যেই লুকিয়ে আছে আলোর ভবিষ‍্যৎ। মা সেই কালোকে নিজের অঙ্গে ভূষণ করে নিয়েছেন। মা ত্রিনয়না।কপালের নয়ন দিব‍্যদৃষ্টি বা ভবিষ্যৎ দর্শনের প্রতীক। মুক্তকেশী মায়ের এলো চুল স্বাধীনতার প্রতীক।”- হঠাৎ শিবানী প্রশ্ন করে- “দাদুভাই,আমাদের ঠাকুর তো কালো নয়, নীল।কেন?”- নরেনবাবু বলেন- “ভালো প্রশ্ন। শোন দিদিভাই, সমুদ্র মন্থনে যে গরল উঠেছিল তা মহাদেব নিজের কন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হন। তবু কিছু বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল দ্বেষ, হিংসা, সমাজে হানাহানি ইত‍্যাদি রূপে। মা সন্তানের কল‍্যাণের জন‍্য সেই সব বিষ নিজ অঙ্গে মেখে নেন। বিষের রং যে নীল তা তো তুমি জানো।অবশ‍্য এটা আমার ধারণা।আজকাল তো গুগলের যুগ। খুঁজে দেখতে পারো।”- শিবানী বলে-“ঠিক বলেছ দাদুভাই। আমি দেখব। তবে মনে হয় তোমার ধারণার সঙ্গে মিলে যাবে। এবার আরো কিছু বলো।”-

নরেনবাবু বলতে থাকেন- “মা দিগ্বসনা। দিদিভাই, দশ দিকই যার ভূষণ তার আর বসনের কী দরকার? লজ্জা তো ঢেকে দিয়েছে নরকর মেখলা।আচ্ছা, বল তো দিদিভাই, হাত কিসের প্রতীক? শিবানী বলে ওঠে- “শক্তির।”- নরেনবাবু খুশি হয়ে বলেন- “সাবাশ। এর আর একটা অর্থও তো হতে পারে? কোমর ঘিরে নরকরমেখলা। অর্থাৎ কোমরের জোর। কন্ঠে নর মুণ্ডমালা, হস্তে ধৃত নরমুণ্ড। কিসের প্রতীক দিদিভাই?বুদ্ধি– মুণ্ড বুদ্ধির প্রতীক। বক্ষে দোদুল্যমান বুদ্ধি সাহসের ইঙ্গিত দেয়। দেবী চতুর্ভূজা। এক হাতে বর, অর্থাৎ আশীর্বাদ আর এক হাতে অভয়। এক হাতে খড়্গ, যা অশুভকে বিনাশ করার জন‍্য উদ্ধত, অন‍্য করোদ্ধৃত মুণ্ড অসুরের। মহাশক্তির হাতে বিনষ্ট দুষ্টবুদ্ধির মুণ্ড। মা লোলজিহ্বা। এখানেই অনেকে ভুল করেন। মা শিবানী তো! শিবের বুকে চরণ রেখে তিনি লজ্জ্বায় জিভ কাটেননি। জিভ কিসের প্রতীক?লোভের। মা দন্ত দ্বারা জিহ্বাকে চেপে রেখেছেন। দন্ত কিসের প্রতীক? সংযমের, শুভ্রতার। মা বলতে চাইছেন, এই ভাবে লোভকে সংযত করো। মা শিবের বুকে চরণ রেখেছেন। ওই যে বলেছি দিদিভাই, শিব মহাকাল। মহাকালের হিসেবের খাতায় সব লেখা থাকে। পাপের হিসেব, পূণ‍্যের হিসেব। সেই মহাকালের বুকে চরণ রেখে মা মহাকালকে জয় করেছেন, মহাশক্তির চরণ স্পর্শ ব্যতীত শিব অর্থাৎ মহাকাল জাগ্রত হন না। মায়ের মূর্তি পরিকল্পনায় কত বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে ভাবতে পারছো দিদিভাই? আর সবচেয়ে বড় কথা মাতৃশক্তির আরাধনায় নারীশক্তিকে সম্মান দেওয়া। আমাদের সমাজকাঠামোয় মেয়েদের বড় অসম্মান করা হয়, তাই মায়ের রুদ্ররূপের কাছে মহাদেবের ভালোবাসার আত্মসমর্পণ। মাতৃমূর্তির নিগুঢ় অর্থ না জেনে পূজা মানে মাকেই অমর্যাদা করা।”–

শেষের দিকে আবেগকম্পিত কন্ঠে উদাত্ত স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করে উঠলেন নরেনবাবু–
-“মহা মেঘপ্রভাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভূজাং
কালিকাং দক্ষিনাং মুণ্ডমালা বিভূষিতাং”–

দু চোখ ভরা জল নিয়ে দাদুর দিকে তাকিয়ে রইল ষোড়শী কিশোরী। যে মেয়েটি কাউকেই বলতে পারেনি তার গোপন প্রেম আর অপমানিত নারীত্বের কথা।সে যে কালো, যতই কালো হরিণ চোখ থাক, তবু তো কালো, বড্ড কালো!!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।