প্রবন্ধে চৈতালী চক্রবর্তী
মৃত্যুকিও কেন?
আসলে আমরা বড্ড বেশি শেষের ঠিকানায় জমে থাকি। জীবনটা নিয়ে যত না ভাবি মৃত্যুকে নিয়ে তার থেকে অনেক বেশি ভাবি আতঙ্কিত হই। কারণ মৃত্যুকে আমরা বর্ণনা করতে শিখিনি। পারিনি। একটা জীবন কোটি কোটি অণু পরমাণু নিয়ে তৈরি। আর তাদের প্রতিটির কিছু না কিছু অ্যাকটিভিটি থাকে। এই যে আমরা রাগ, অভিমান, দুঃখ, কষ্ট আনন্দ পাই সেটা সেই অণুপরমাণুদের খেলা বলেই মনে হয় আমার। আবার এও মনে হয় এক একটা শরীরে তাদের অ্যাকটিভিটি এক এক রকম। যেমন লিটমাস পেপার সে এক এক মিডিয়ামে এক এক রঙ ধারন করে। কখনো লালটা নীল হয়। কখনো নীলটা লাল হয়। তাই হয়তো একই ঘটনায় আমরা নানান জন নানান ভাবে রিঅ্যাক্ট করি।
কবিগুরু লিখছেন—-
“জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে
বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে”
আমি যদি বলি তিনি সেই বিদেহী আত্মার কথাই হয়তো বলতে চেয়েছেন। যেখানে সূক্ষ্ম দেহের বাইরে কিছু আছে। যেখানে এই অনুপরমাণু বিলিন হয়ে গিয়ে এক ঈশ্বরীয়
আত্মা যা একেবারে পোষাকহীন। পোষাক অর্থাৎ ষড়ঋপুর তাড়নার বাইরে। আমরা যা বুঝতে পারি না তাকে নিয়ে আতঙ্কিত হই কারণ ভয় পাই। আর সাধকরা জানেন আত্মার মৃত্যু নেই। সে কেবল শরীর বা খোলস বদলায় তারা কত নিশ্চিন্তে থাকেন।
রবীন্দ্রনাথ, শ্রীরামকৃষ্ণ আরো অনেকে যেন সংসারের মধ্যে সেই সাধনা করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সাধনা, আরাধনা করে গেছেন। ঠাকুর দেশের প্রদর্শক বিবেকানন্দকে সৃষ্টি করার যজ্ঞ করেছেন। আরো অনেকে অনেক কিছু করেছেন যা বলার শেষ নেই।
আসলে মৃত্যু মানে আমরা যে বলি মুক্তি তা নয়। আমার মতে একটা পোষাক বদলে আর একটা পোষাক গায়ে সেট করে নেবার প্রয়াস মাত্র। কারণ একটা নতুন জামা প্রথমেই পরলে আমরা কমফর্ট ফিল করি না। পরতে পরতে শেষে অভ্যেস হয়ে দাঁড়ায় ঠিক তেমন আত্মা ও অন্য শরীরে প্রবেশ করে নিজেকে সেখানে সেট হয়তো করে।
আবার আত্মা যে অবিনশ্বর তা তো আমরা সকলেই জানি কারণ তা না হলে লোকনাথ বাবা তাঁর পূর্বজন্মের কথা বলতে পারতেন না। এখন তাহলে কথা হলো আমরা পারি না কেন? আসলে আত্মা শরীর পরিবর্তন করার সাথে সাথে খুব কোটি সহস্রাংস স্মৃতি ধরে রাখতে পারে আর তা খুব কম সময় ধরে রাখতে পারে। সাধকদের ক্ষমতা অনেক তাঁরা
ধরে রাখতে পারেন। আমরা কোথাও কোথাও গিয়ে কোনো কোনো জিনিস খুব চেনা মনে করি কিন্তু সেখানে কখনো যাইইনি।এটা তার একটা প্রমাণ হয়তো ভাবতে পারি।
আসলে আমাদের ভেতর এক চালিকাশক্তি আমাদের জীবন মরণ আত্মার সঞ্চালনের কাজ করে। আর তাই আমরা জীবন মরণের মধ্যে দিয়ে পোষাক বদলাই। মৃত্যু যাকে আমরা বলি তা হলো নশ্বর দেহের। আত্মার মৃত্যু নেই। সে কেবল পরিবর্তনের জোয়ারে ভেসে যায়। জন্ম থেকে জন্মান্তরে।
আমি আমার মতো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। হয়তো আরো কিছু আছে। জানবো আপনাদের কাছ থেকে।