T3 || ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস || এ চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

বাঙালীর মাতৃভাষা , আ মরি বাংলা ভাষা
অতীতে বাংলাকে মাতৃভাষা করার উদ্দেশ্যে আন্দোলন এবং বীর শহিদদের আত্মবলিদান আমরা সবাই জানি । বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষা দিবসের প্রাক্যালে বাঙালীরা বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য একদিকে যেমন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কসরত করছেন অন্যদিকে আবার কিছু বাঙালী বাংলা ভাষাকে নিয়ে অতিমাত্রায় আদিখ্যেতা করা হচ্ছে বলে ঘ্যান ঘ্যান করছে ।রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুল ইসলাম থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা জয় গোস্বামী শ্রীজাত এইসব বিশ্ববরেণ্য বাঙালীরা নিজেদের লেখনীর মাধ্যমে যেমন বাংলা ভাষাকে বিশ্বের উচ্চস্তরে পৌঁছে দিয়েছেন তাদের কথা যদি বাদ রাখি, বাঙালীদের মধ্যে এমন কিছু বাঙালিও আছেন যারা নিজেরা লেখেন না কিন্তু অন্যও বাঙালীরা যাহাতে সহজে নিজের মাতৃভাষায় নিজেদের সাহিত্য প্রতিভাকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়া যায় সেই ব্যবস্থা করে চলেছেন অহরহ । প্রথমে যখন প্রিন্ট মিডিয়া ছিল তখন এইসব বাঙালীরা আধুনিক থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্র এবং কালি তৈরি করে বা বিদেশ থেকে আমদানি করে লেখা পরিবেশনের মান আরও কত উন্নত করা যায় সেই চেষ্টা করতেন আবার বর্তমানে যখন ইন্টারনেট পরিষেবা শুরু হল এবং তার উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটল আর কোটি কোটি মানুষের হাতে যখন মোবাইল নামক সব পেয়েছির যন্ত্র এসে পৌঁছে গেল তখন এইসব বাঙালীরাই ইউনিকোড বর্ণমালা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভিন্ন রকম ডিজাইনিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে লেখাকে আরও ঝকঝকে ও সহজলভ্য করে হাতের মুঠোয় এনে দিলেন । ভাষা দিবসের প্রাক্যালে তাই সেইসব বাঙালীদের ও প্রণাম জানাই ।
বাঙ্গালিরা স্বভাবগত ভাবে নিজের সবকিছু থেকে অন্যের সবকিছুকে বেশি প্রাধান্য দেয় । নিজের খাদ্য, বস্ত্র , বাসস্থান ও ভাষা সবকিছুকে । যেমন ধরুন নিজেরা কি খাবে কিভাবে খাবে কেন খাবে কোথায় খাবে সেগুলো ভুলে গিয়ে কোনও অবাঙ্গালির সাথে খেতে বসলে দেখবেন তার ভালোলাগা খাবার গুলো নিয়েই চর্চা করছে। ঠিক একই রকম ভাবে বস্ত্র পরিধানের ব্যপারেও বাঙালীরা শাড়ি – পাঞ্জাবি ছেরে কোট- প্যান্ট কিমবা অতি আধুনিক অর্ধ উন্মুক্ত পোশাক পরে নিজেকে সাহসিকতার মোড়কে উপস্থাপন করতে চায় । আবার দেখবেন কিছু বাঙালি যখন কোনও অবাঙালীর সাথে প্রথম দেখা হয় প্রথম দেখাতেই অন্যের ভাষাতেই কথা বলতে বেশি আগ্রহী । উল্টোদিকে সেই অবাঙালীরা কিন্তু তার নিজের ভাষাতেই কথা বলতে বেশি স্বচ্ছন্দ । অন্যেরা তার ছেলে মেয়েদের ইংরাজি মাধ্যমে লেখা পরা শেখাচ্ছেন বলে নিজের বাচ্চাদের ও নিজেদের মাতৃভাষা ভুলিয়ে দিয়ে ইংরাজি মাধ্যমে ভরতি করাচ্ছেন । আসলে নিজের সবকিছুকে জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যের মত হওয়ার ইচ্ছা । আবার এইসব বাঙ্গালিরা ২১শে ফেব্রুয়ারী এলে প্রতি বছর বাংলা ভাষাকে নিয়ে বিগলিত হয়ে পরে এবং টিশার্টে “আ মরি বাংলা ভাষা লিখে” গ্রুপ ফটো তুলে ফেসবুক ইন্সট্রাগ্রামে বাঙালী হওয়ার প্রমাণ দেয় । আসলে আমরা বাঙালীরা নিজেদেরকে যতটা দেশীয় বাঙালি ভাবি তার চেয়েও বেশি আন্তর্জাতিক বাঙালি ভাবি ।
তবুও এই দুধরনের বাঙালীদের বাইরে যে কোটি কোটি বাঙালী আছেন যারা বাংলায় এবং বাংলার বাইরে থেকেও বাংলা ভাষার জন্য প্রাণপাত করে এবং বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষার মর্যাদা দেয় । যারা এই বাংলা ভাষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, তার প্রসার ঘটাতে এবং তাকে বাঁচিয়ে রাখতে সহযোগিতা করছেন তাঁদের জন্যও আজ আমাদের মাতৃভাষা আন্তর্জাতিক ভাষাতে উন্নীত হয়ে চলেছে এবং আগামীতেও চলতেই থাকবে তাই আসুন আমরা সকলে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে অঙ্গীকারবদ্ধ হই এবং গলা ছেরে গাই “আ মরি বাংলা ভাষা” ।