T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

পিকলুর ঘুড়ি
পিকলু একটা দশ বছরের ছেলে । দুরন্ত আবার শান্তও । পিকলুর যখন পাঁচ বছর বয়েস তখন পিকলুর বাবা মা পিকলুকে নিয়ে কলকাতার একটা আবাসনে ফ্ল্যাট কিনে চলে আসে । আবাসনে অনেক মানুষ । অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়েও আছে । তারা সবাই পিকলুর বন্ধু । যদিও কেউ কেউ ওর থেকে বড়ো আবার কেউ কেউ ওর থেকে ছোট । আবাসনের ঠিক মাঝখানে একটা খেলার মাঠ আছে । আর সেই মাঠের চারপাশে কংক্রিটের রাস্তা । রোজ স্কুল থেকে ফিরে পিকলু সাইকেল নিয়ে মাঠের চারপাশে কয়েকবার ঘুরে এসে তারপর সব বন্ধুদের সঙ্গে মাঠেই খেলতে থাকে । পিকলুর ঘুড়ি ওড়ানোর খুব শখ । ওর থেকে বড়োরা এমনকি ওর বয়সীরাও সবাই ঘুড়ি ওড়াতে পারে । শুধু ওই পারে না । প্রত্যেক বছর বিশ্বকর্মা পুজোর ঠিক আগে থেকে দূর্গাপুজো পর্যন্ত আবাসনের অনেকেই মাঠে দাঁড়িয়ে বা ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ায় । পিকলু যতবার তার বাবাকে বলে ঘুড়ি কিনে এনে দিতে । বাবা কিছুতেই ঘুড়ি কিনে এনে দেয় না ।বাবা খালি নানা রকমের বাহানা করে । ছাদ থেকে পরে যেতে পারিস । সুতোর মাঞ্জা হাতে লেগে হাত কেটে যেতে পারে । আরো নানান রকমের বাহানা । নিজে তো ঘুড়ি ওড়াতে পারে না । শুধু শুধু পিকলুকে ভয় দেখায় । পিকলু বাবার ওপর রেগে যায় । মা কে বললেও মা কিনে দেয় না । একদিন দুপুরে পিকলু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছে সে ইয়াব্বড় একটা ঘুড়ির ওপর চড়ে আবাসনের মাঝে হাওয়ায় উড়ছে । আর ছোট চড়ুই পাখি গুলো এসে ওর ঘুড়িটাকে ঠুকরে দিচ্ছে । মায়ের ডাকে পিকলুর ঘুম ভেঙে যায় । পিকলুর ঘুড়ি ওড়ানো আর হয় না । একদিন পিকলু মন খারাপ করে বারান্দায় বসে ছিল । এমন সময় দূর থেকে একটা ঘুড়ি মাথা হেলতে দুলতে ঠিক বারান্দার গ্রিলের গায়ে এসে আটকে গেলো । পিকলু অমনি খপ করে ঘুড়িটাকে ধরে ফেললো । ঘুড়িটার সাথে অনেকটা সুতোও ছিল । পিকলু ঘুড়িটাকে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ভিতরে আনার অনেক চেষ্টা করলো কিন্ত পারলো না । টানাটানি করতে করতে ছিঁড়েই গেল । অমনি পিকলুর কান্না পেয়ে গেল ।
ঘরের ভিতর থেকে চন্দ্রিল সবটাই দেখছিল আর নিজের ছোটবেলার কথা বারবার মনে পড়ছিল। চন্দ্রিল পিকলুর বাবা । চন্দ্রিল যখন খুব ছোট। ওরা তখন গ্রামের বাড়িতে থাকতো । চন্দ্রিলেরও ঘুড়ি ওড়ানোর শখ ছিল। শখটা এমন যে নেশার মত হয়ে গিয়েছিল। হাতে একটা সুতোভর্তি লাটাই আর দুতিনটে ঘুড়ি নিয়ে খোলা মাঠে টো টো করে ঘুরে বেড়ানো । সারাদিন খাওয়া দাওয়া ভুলে শুধুই ঘুড়ি ওড়ানো । মাঝে মাঝে শরীর খারাপের বাহানা করে স্কুলও কামাই করেছে । এত ঘুড়ি ছিঁড়ে যায় বলে নিজেই আটপেপার কেটে কেটে ঘুড়ি বানাত। বিভিন্ন রকমের ঘুড়ি । আর ঘুড়ির নিচের দিকে সরু কাগজ কেটে ল্যাজও বানিয়ে দিত ।চন্দ্রিল গ্রামের স্কুলের পাশের মাঠে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে রোজ ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা করতো । শোঁ করে ঘুড়িটাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতো । একটু একটু করে সুতো ছাড়তো আর মাঝে মাঝে একবার করে হ্যাঁচকা টান দিতো আর তাতেই ঘুড়িটা তরতর করে ওপরের দিকে উঠে যেত । আর ঘুড়ির সামনে যার ঘুড়ি আসতো ঘ্যাচাং করে কেটে উড়িয়ে দিতো । এখন তো নাইলনের সুতো তাতে চাইনিজ মাঞ্জা আগে থেকেই দেওয়া থাকে । কিন্তু চন্দ্রিল বাড়িতেই সুতির সুতোয় মাঞ্জা বানাতো । কতকিছু মেশাতে হতো মাঞ্জা শক্ত আর ধারালো করার জন্য । কাঁচ ভেঙে গুঁড়ো করে তার সাথে আঠা মিশিয়ে । তার মধ্যে সুতো ডুবিয়ে সেটাকে একটা গাছ থেকে আরেকটা গাছে লম্বা করে বেঁধে রেখে শুকানো । তারপর সেই সুতো টানটান করে লাটাইয়ে জড়িয়ে রাখা । অনেক হ্যাপা ছিল কিন্তু মজারও ছিল । একদিন ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে প্রায় সন্ধে হয়ে এসেছিলো । সন্ধ্যার একটু আগে সেন্টু নামের একটা ছেলের সঙ্গে ঘুড়ি কেটে দেওয়া নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল । সেন্টু রেগে গিয়ে চন্দ্রিলের লাটাই পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো । চন্দ্রিলও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয় । চন্দ্রিল পাশেই পরে থাকা একটা অর্ধেক ভাঙা ইট দিয়ে সেন্টুর মাথায় আঘাত করে । আর সেন্টুর মাথা থেকে গলগল করে রক্ত বেরুতে থাকে । সেইসময় আরো অনেক বাচ্ছারা ছিল । সবাই ভয় পেয়ে গেলো । কান্নাকাটি আর চিৎকারের আওয়াজ শুনে বিমল কাকু ছুটে এসে সেন্টুর মাথায় গেঞ্জি ছিঁড়ে বেঁধে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে দৌড়ালো । সেইদিন সেন্টুর মাথায় কয়েকটা সেলাই পড়েছিল । আর বিশেষ কিছু হয়নি । কিন্তু সেইরাতে চন্দ্রিল তার বাবার কাছে যে মার্ খেয়েছিলো । সেই তার ঘুড়ি ওড়ানোর শেষ দিন হয়ে গেছিলো । যদিও শুধুমাত্র বাবার কাছে মার্ খাওয়ার জন্যই নয় । সেদিন সেন্টুর কথা ভেবেও চন্দ্রিলের খুব কষ্ট হচ্ছিলো । একটু আনন্দ করার জন্য সেন্টুর প্রাণটা চলে যেতে পারতো । তাই সে ঠিক করেছিল আর কোনোদিন ঘুড়ি ওড়াবে না ।
চন্দ্রিলের সেই শখ পিকলুর মধ্যেও একই রকম চেপে বসেছে । চন্দ্রিলের সঙ্গে এমন দুর্ঘটনা হয়েছে বলে পিকলুর আনন্দও তাই বলে নষ্ট হবে ! এ হতে পারে না । চন্দ্রিল পিকলুকে ডাকলো
– চল পিকলু বাজার থেকে ঘুরে আসি ।
– কেন ? বাজারে গিয়ে কি করবে ?
– আরে চলনা, তোকে আজ একটা সারপ্রাইজ দেব ।
– সারপ্রাইজ ! কি সারপ্রাইজ ?
– আগে চল তো ।
পিকলু বাবার সাথে নাচতে নাচতে বাজারে গেলো । এই সময় বাজার ভর্তি জামাকাপড় , ফল, সবজি , আর অনেক ঘুড়ির দোকান । পিকলু উদাস হয়ে দেখতে দেখতে যাচ্ছে । সে জানে তার বাবা কোনোদিন ঘুড়ি কিনে দেবে না । এমন সময় চন্দ্রিল একটা ঘুড়ির দোকানের সামনে দাঁড়ালো । পিকলুকে বললো
– তুই ঘুড়ি কিনবি বলছিলি না ? আজ তোর যতগুলো ইচ্ছা ঘুড়ি নে । আমি কিচ্ছু বলবো না ।এটাই তোর সারপ্রাইজ । কিন্তু হ্যাঁ সাবধানে ঘুড়ি ওড়াতে হবে ।
পিকলু খুশিতে লাফিয়ে উঠে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো ।
– থ্যাংক ইউ পাপা ! আই লাভ ইউ পাপা ।ইউ আর দি বেস্ট পাপা ইন দি ওয়ার্ল্ড ।
একটা পাতলা ফিনফিনে কাগজের তৈরী হাওয়ায় ওড়া খেলনা যে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাইকে এতটা আনন্দ দিতে পারে তা বোধহয় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে চাইনিজ দার্শনিক মোজি ও ভাবতে পারেননি ।