মিউজিয়াম হল না, কিশোরদের গাঙ্গুলী হাউস প্রমোটারগ্রাসে
মেজাজি অথচ রসিক মানুষ ছিলেন আভাসকুমার ওরফে কিশোরকুমার গাঙ্গুলী। তাঁর দিলখোলা পাগলামি অনেকটাই ছিল প্রকৃত রূপ গোপনের পদ্ধতি। প্রীতিশ নন্দীর সঙ্গে সাক্ষাতকারে স্বীকারও করেছেন সে কথা। কিশোর চেয়েছিলেন তাঁর তৃতীয় স্ত্রী যোগিতা বালি বলিউডের পাট চুকিয়ে থাকবেন বোম্বে বাজারের গাঙ্গুলী হাউসে, গৃহবধূ হয়ে। গীতা বালির অভিনেত্রী ভাইঝি শাম্মি কাপুরের প্রথম স্ত্রী যোগিতা সেই শর্ত মানেননি বলে দু বছরের মধ্যেই বিবাহ বিচ্ছেদ। কিশোরের ‘স্বপনো কি রাণি’ যোগিতা ‘খোয়াব’-এর সেটে খোয়াব পূর্ণ করে হলেন মিঠুন-ঘরণী। ক্ষোভে মিঠুনের কোনও সিনেমায় প্লেব্যাক না করার সিদ্ধান্ত জানান কিশোর। পথ খুলে গেল বাপী লাহিড়ীর। কিশোর বলেছেন, যোগিতার সঙ্গে বিয়ে একটা রসিকতা, ‘জোক’।
মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডোয়ার বোম্বে বাজারের গাঙ্গুলী হাউস ছিল কিশোরের ধ্যানজ্ঞান। বাবা কুঞ্জলাল, মা গৌরীদেবীর নামে ৭২০০ বর্গফুট জমিতে তৈরি এই বাংলো বাড়ির নাম ‘গৌরীকুঞ্জ’। এখন গৌরীকুঞ্জ বললে এই বাড়ির জমিতেই তৈরি প্রেক্ষাগৃহকে বোঝায়। কিশোরের মৃত্যুর পর যার ভিত্তি স্থাপন করেন অশোককুমার, ১৯৯৮-তে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজেশ খান্না। প্রেক্ষাগৃহটি পরিচালক মধ্যপ্রদেশ সরকার ও স্থানীয় পুরসভা। নাম ‘গৌরীকুঞ্জ’ রেখেছিলেন অ্যাডভোকেট কুঞ্জলাল ওরফে কেলাল গাঙ্গুলী। এই বাড়িতেই জন্ম, লেখাপড়া অশোক কুমার, আভাস কুমার, অনুপ কুমারের। অশোক কুমার বোম্বেতে, অনুপ কলকাতায়। কিশোর বোম্বে কলকাতার মাঝামাঝি খাণ্ডোয়াতেই নিরিবিলিতে গাছ, পাখিদের নিয়ে কাটাতে চেয়েছিলেন। অদ্ভূত টান ছিল গাছের প্রতি। গৌরীকুঞ্জের গাছগুলিকে বন্ধু ভাবতেন, একান্তে কথা বলতেন।
প্রথম স্ত্রী রুমা গুহঠাকুরতাকেও বিয়ে করে এই বাড়িতেই আনেন কিশোর। চেয়েছিলেন, রুমা গান গাওয়া ছেড়ে নিপাট গৃহবধূ হবেন। সত্যজিতের ভাগ্নী রুমার স্বপ্ন ছিল একটা কোরাস গানের দল খুলবেন, প্রাণ ভরে গাইবেন মানুষের জন্য গান। কিশোর তাতে অরাজি। খাণ্ডোয়ার বাড়িতে আটকে থাকতেন রুমা। এই নিয়ে মনোমালিন্য বাড়তে বাড়তে আট বছরের মাথায় বিচ্ছেদ। ছেলে অমিত বাবার কাছে থাকলেও মা ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। প্রায়ই আসতেন। গেয়েছেন মায়ের ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যারেও।
বোম্বের চলচ্চিত্র জগতে কিশোর নিজেকে মানাতে পারতেন না। পরিচালকদের প্রতি তীব্র ঊষ্মা ছিল মনে। অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছেও ছিল না। দাদা অশোককুমারের পাল্লায় পড়ে বলিউডে পা দেওয়ার পর বলিউডই তাঁকে আঁকড়ে ধরে। কিশোর চাইতেন খাণ্ডোয়ার গাঙ্গুলী হাউসে গ্রামীণ পরিবেশে বসবাস। নানা স্বপ্ন ছিল এই বাড়ি নিয়ে। একসময় পুরসভার অনুমতি ছাড়াই বাড়ির চারপাশে পরিখা কেটে গণ্ডোলা-বিহারের ব্যবস্থা করছিলেন। মাটি কাটা শুরুও হয়। হঠাৎ একদিন মাটির নিচে থেকে মানুষের হাত আর পায়ের কঙ্কাল উঠতেই মজুররা ‘ভুত ভুত’ বলে পালালো। অনুপ কুমার এসে পৈতে নাড়িয়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে মন্ত্রটন্ত্র পাঠ করলেন। কিশোর মনে মনে ভাইকে অনেক গালমন্দ করলেন, গাঙ্গুলী হাউস আর পরিখায় পেল না।
সেই বাড়ি এখন পরিত্যক্ত। মাত্র ১৪ কোটি টাকায় বিক্রি হয়ে গেছে গৌরীকুঞ্জ, মানুষ যাকে বলে গাঙ্গুলী হাউস। বাড়িটি ভেঙে ফেলে প্রমোটারি করার সাধ ছিল খাণ্ডোয়ার ভূমিপুত্র মুম্বাই নিবাসী বিল্ডার অভয় জৈনের। বাদ সেধেছেন কিশোর-ভক্তরা। তাঁরা এমন চাপ তৈরি করেন যে, পুরসভা কথা দেয়, এই বাড়িকে ভাঙা হবে না। ফলে, বিক্রির দু বছর পরেও বাড়িটি এখনও আছে। ভুতের বাড়ি। পরিত্যক্ত বাড়িতে অন্যায় কাজের সম্ভাবনা থাকেই। সেটাই হল লকডাউনের সময়। বোম্বে বাজার বন্ধ বলে এক বস্ত্র ব্যবসায়ী গৌরীকুঞ্জের গেটের ভিতরে গোপনে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। গেটের বাইরে লোকজন ভিড় করে কেনাকাটাও শুরু করে। কিশোরভক্তরা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে দোকানদারকে ধরে নিয়ে যায়।
বাড়িটাকে একটা নিউজিয়াম করার ইচ্ছে ছিল কিশোর-পুত্র অমিত কুমারের। বলেছেন, “গাঙ্গুলি হাউসের সঙ্গে বাবা ও কাকার শিকড়ের সম্পর্ক। অনেক স্মৃতি বহন করেছে এই বাড়ি। পরিকল্পনা ছিল বাড়িটি সংরক্ষণের। কিন্তু পেশার কারণে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছেন। বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো কেউ নেই। সরকার যদি সংরক্ষণ করতো, তাহলে হয়তো বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে হতো না। স্থানীয় পৌরসভা ‘বাড়ির জীর্ণ দশার’ অজুহাতে বাড়ি ভাঙার ঘোষণা করে, তখন বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে।”
স্থানীয় পৌরসভা ভেঙে গাঙ্গুলি হাউস ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিতেই ক্ষোভে ফেতে পড়েন স্থানীয় কিশোর-ভক্তরা। তাঁরা পুরসভাকে হুঁশিয়ারি দেন। উজ্জয়িনীর কিশোর-ভক্ত সুনীল বামনিয়া অনেক চেষ্টা করেছিলেন বাড়ির বিক্রি আটকাতে। সুনীল বামনিয়া উজ্জিয়িনীতে কিশোর কুমার মন্দির বানিয়েছেন। তিনি টাকাপয়সা সংগ্রহ করে এই বাড়িতে কিশোর সংগ্রহশালা করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত আশা করেছিলেন, গাঙ্গুলী পরিবার হয়তো আর্থিক মদত দেবে। সেটা আর হয়নি। বাড়ির মালিক তো একা কিশোর নন। তিন ভাই, তাঁদের ছেলেমেয়ে – অনেক ওয়ারিশ। ভাগের মা তাই তাই গঙ্গা পায়নি। ভক্তরা আটকাতে পারেননি গাঙ্গুলী হাউসের হাতদবল।
কিন্তু, সেই প্রচেষ্টার ফলে এই বাড়ি ভেঙে ফেলা যায়নি। বস্তুত বাড়িটির অবস্থা এত খারাপ ছিল না যে ভেঙে ফেলতে হবে। এক বর্ষার সময়ে মধ্য প্রদেশ সরকার বাড়ি ভাঙার চূড়ান্ত নীতিশ দিলে অনুপ কুমারের ছেলে অর্জুন কুমার বলেন, “মানছি, বাড়িটির অবস্থা ভালো না, কিন্তু সেটা কারও জন্যই বিপদের কারণ না। এখন বর্ষা কাল, ভাঙা সম্ভব না। আর, আমাদের সম্মতি ছাড়া সরকার বাড়ি ভাঙতে পারে নাকি!” এমন আবেগের বিস্ফোরণে রাজ্যের সংস্কৃতি মন্ত্রী লক্ষ্মীকান্ত শর্মা ২০১২ সালে কথাও দিয়েছিলেন যে, এই বাড়িটিকে একটি সংগ্রহশালা করা হবে। এই প্রতিশ্রুতি পছন্দ হয়নি মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং-এর। কিছুদিন পর লক্ষ্মীকান্ত মন্ত্রিত্ব হারান। কিশোরের জন্মদিনে ও মৃত্যুদিনে প্রতি বছর এখনও তাঁর ভক্তরা এই বাড়িতেই আসেন, শ্রদ্ধা জানান। গত বছর জন্মদিনে ভক্তজনেদের ক্ষোভের মুখে জেলা কালেক্টর অভিষেক সিং লিখিত নোটিশ দিয়েছেন, “গাঙ্গুলী হাউস ভাঙা হবে না।” বলেছেন, “এই বাড়ির সঙ্গে সঙ্গীতপ্রেমীদের আর স্থানীয় মানুষের বিরাট আবেগ জড়িত। আমি তাই ভাঙার আদেশ স্থগিত রেখেছি।”