গত দিন দশেকের মধ্যে রাজপুত্রের এটা তিন নম্বর জ্ঞান হারানো এবং ফিরে পাওয়া। তবে এইবার চেতনা ফিরতে রাজপুত্রকে বেশ বেগ পেতে হল। চোখ খুলতেই রাজপুত্র যে প্রাণীকে নিজের মুখের সামনে দেখতে পেল, তাকে এক ঝলকে বেড়াল বলা যেতেই পারে তবে এই বেড়ালের তিন খানা চোখ। রাজপুত্রের ধারণা হচ্ছিল সে ভুল দেখছে কিন্তু সে ধারণা বেশীক্ষণ টিকলো না যখন তেচোখা বেড়ালটা রাজপুত্রের দিকে তাকিয়ে একটা হাই তুলল । রাজপুত্র দিব্যি দেখতে পেলো, হাই তোলার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ালের তিনটে চোখ একসাথে বন্ধ হয়ে আবার খুলে গেল। ভয়ের চোটে রাজপুত্র পরিত্রাহি চিৎকার করবার জন্য একবার মুখ খুলেই বুঝতে পারলো, তার গলা আওয়াজ বার করবার জায়গায় নেই বরং শোয়া অবস্থা থেকে হাচোর পাঁচোর করে বসতে গিয়ে রাজপুত্র মাথায় জোরে একখানা গুঁতো খেলো কিছুর সঙ্গে। রাজপুত্রের এই আচমকা নড়া চড়ায় বোধহয় কিছুটা বিরক্ত হয়েই তেচোখা বেড়াল রাজপুত্রের থেকে কিছুটা দূরে সরে গেল তবে পালালো না। রাজপুত্রকে যেন দেখেও দেখতে পাচ্ছে না এইরকম হাব ভাব নিয়ে সে নিজের সামনের পায়ের থাবা চাটতে শুরু করে দিল। কিছুক্ষণ স্ট্যাচু হয়ে থাকবার পর রাজপুত্র যখন আশ্বস্ত হতে পারলো তেচোখা বেড়ালের কাছ থেকেআপাতত অ্যাটাকের কোন সম্ভাবনা নেই, তখন রাজপুত্র নিজের চারপাশ দেখে বোঝবার চেষ্টা করল সে কোথায় আছে।
রাজপুত্র এতক্ষণে খেয়াল করলো সে টেবিলের মতন কিছুতে বসে আর টেবিলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টেবিল ল্যাম্পের মতন জিনিসপত্র টেবিলের ওপর ঝুঁকিয়ে রাখা। বেড়ালটার আতঙ্কে আচমকা উঠে বসতে গিয়ে রাজপুত্র এই কারণেই গুঁতো খেয়েছিল। চারিদিকে বেশ ধবধবে সাদা আলো। দু হাত দিয়ে রাজপুত্র কিছুক্ষণ নিজের চোখ ঢাকলো। চোখ খুলে রাজপুত্র আবার বেড়ালটার দিকে তাকালো। বেড়াল নিজের তিনটে চোখ নিয়ে রাজপুত্রের দিকে একবার তাকিয়েই নিজের থাবাতে মন দিলো। বুকের ভেতর একটা বড় রকম নিঃশ্বাস জমিয়ে রাজপুত্র সন্তর্পণে টেবিল থেকে মাটিতে নেমে দাঁড়ালো। চারিদিকে যন্ত্রপাতি গিজ গিজ করছে। কিন্তু বেশ গোছানো চারপাশ। যন্ত্র পাতির জঙ্গল ভেদ করে ঘরের দেওয়াল বা ছাদের দিকে রাজপুত্র তাকাতেই খেয়াল করলো গোটা জায়গাটা গুহা কেটে তৈরি করা। খুব বেশী মন দিয়ে দেখবার অবস্থায় রাজপুত্র নেই। প্রচণ্ড রকম গলা শুকিয়ে রয়েছে রাজপুত্রের। একটু জল না পেলে আর দু মিনিটের মধ্যেই রাজপুত্র নির্ঘাত পটল তুলবে।
এমন সময়, রাজপুত্রের কানের কাছে কে যেন বলে উঠলো
“ টাকুন্ডায় স্বাগত উটকো মানুষ!”
এই কয়েক দিনের ভেতর তিন তিনবার জ্ঞান হারিয়ে রাজপুত্রের নার্ভ বেশ শক্তপোক্ত হয়ে গেছে তাই জ্ঞান হারাতে গিয়েও রাজপুত্র সামলে নিলো কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে রাজপুত্রের সব ধরণের চুল আতঙ্কের চোটে সেকেন্ডের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেল। কোথা থেকে সাক্ষাৎ বিভীষিকা এসে রাজপুত্রের সামনে আবির্ভূত হয়েছে। রাজপুত্রের সামনে যেটা বা যে দাঁড়িয়ে আছে দৃশ্যগত তুলনা করলে বলা যেতে পারে, একটা পাহাড় প্রমান শকুন। মাথায় ছোট হেলমেটের মতন টুপি , একদিকের চোখে কালো লেন্স লাগানো। গায়ে বর্মের মতন কিছু পরা। হাতে আঙ্গুল নেই ভয়ানক রকম ধারালো নখ।
“ হা… হামায় হলছেন?” রাজপুত্রের গলা থেকে ফ্যাস ফ্যাস করে এই কটা শব্দ নিজের থেকেই বেরিয়ে গেল।
শকুন ঠোঁট নাড়িয়ে রাজপুত্রের দিকে তাকিয়ে শিস জাতীয় একটা শব্দ করে উঠল । রাজপুত্র পরে জানতে পেরেছিল ওটা আসলে হাসার একটা ভঙ্গিমা। ইতিমধ্যে তেচোখা বেড়াল শকুনটার পায়ের কাছে এসে ঘুর ঘুর শুরু করলো।
“উটকো মানুষ। আমার খারাপ লাগছে এভাবে তোমাকে এখানে নিয়ে আসবার জন্য। কিন্তু আর কোনো উপায় –ও ছিলো না। নাও, এখন এটা খেয়ে নাও” শকুন নিজের সামনের পায়ের নখে ধরে থাকা একটা রঙিন বোতল রাজপুত্রের দিকে এগিয়ে দিলো।
কাঁপা হাতে রাজপুত্র শকুনের নখ থেকে বোতল টা আস্তে করে ছাড়িয়ে নিলো। ছিপির মতন ঢাকনা খুলে রাজপুত্র দেখল ভেতরে তুঁতে রঙের তরল। সাত পাঁচ না ভেবেই রাজপুত্র চোঁচো করে গোটাটা গলার ভেতর চালান করে দিল। বিজাতীয় স্বাদ গন্ধ রয়েছে। কিন্তু কষ্টকর নয়। এতটা একবারে ঘটঘট করে খেতে গিয়ে রাজপুত্রের একটু কেশেও ফেললো। শকুন বাবাজী রাজপুত্রের দিকে ঠায় তাকিয়ে। একটু সামলে নিয়ে রাজপুত্র চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। কিছু প্রশ্ন করবার আগেই শকুন নিজের কাঁধের দুপাশের বিশাল ডানা ঝাপটে, রাজপুত্রের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
“ তুমি এখানে নিরাপদ উটকো মানুষ। তোমার সব প্রশ্নের উত্তর তুমি পেয়ে যাবে। আমার নাম দ্রেওটিন। আমি তোমার মতই একজন বাকুদের বন্দী। গোটা ব্রহ্মাণ্ডে আমিই সম্ভবত শেষ টানুকা।“