গদ্যানুশীলনে ব্রততী সেন দাস

কাকতাড়ুয়া
গাড়ি হু হু করে চলছে।রাস্তার দু পাশে বিস্তীর্ণ গমের ক্ষেত।নীচু দো আঁশলা মাটিতে মাইলের পর মাইল জমি জুড়ে শুধু গম গাছ।গর্ভবতী নারীর মত ভরভরন্ত ফসল,আর পনেরো দিনের মধ্যে ফসল কাটা শুরু হবে।এর মধ্যে মেহুলরা ঘুরতে এসেছে ।গোয়ালিয়রে শর্বরীর মাসি থাকেন,ওখানে কিছুদিন কাটিয়ে এখন চলেছে সাহারানপুরের দিকে।
বহুদিন পরে শর্বরীরা ঘুরতে বেড়োল।চাকরি সূত্রে শর্বরী এবং অমিত খুব ব্যস্ত থাকে।অমিত কার্ডিওলজিস্ট আর শর্বরী ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।মেহুল মোটামুটি ওর ঠাকুমা সুছন্দার কাছে সারাদিন থাকে।আসার আগে ব্যাগপত্তর গোছানোর সময় মেহুল জিজ্ঞাসা করল-মা,ঠাম্মি যাবে না?
-না,
-কেন?
-সবাই গেলে কি করে চলবে?বাড়ি ফাঁকা রাখা যায় না,চোরের উপদ্রব খুব বেড়েছে ।আর তাছাড়া ঠাম্মির শরীরও তো ভাল নয়,অতদূর পথ বাই-কারে যেতেও পারবে না।
অমিত পেপার পড়তে পড়তে সব শুনল, কিছু বলল না।
গোয়ালিয়রের এক অপূর্ব জায়গা, স্থাপত্য,শিল্প এবং ইতিহাসের এক অনবদ্য মিশ্রণ জায়গা জুড়ে।ছয়দিন ধরে ঘুরে ঘুরে ওরা গোয়ালিয়র দুর্গ,জয়বিলাস প্রাসাদ,গুজারি মহল,তানসেন মেমোরিয়াল ইত্যাদি দেখল। তাও কত কী বাকি রয়ে গেল।কিন্তু মেহুল এইসব মন্দির,প্রসাদ, দুর্গ দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে-মাম্মান ,অল আর জাস্ট হিস্ট্রি অ্যান্ড হিস্ট্রি,হোয়াই নট সামথিং এক্সাইটিং?
-আহা! কেন রে ভাল ম্যুভি দেখালাম,দিম্মার আদর খেলি আর কী চাস ?শর্বরী হেসে উত্তর দিল।
আমিত বলল-আচ্ছা,আমি তোকে নতুন জিনিস দেখাব যা কখনো দেখিসনি।
সাহারানপুর যাওয়ার পথে মেহুল প্রশ্ন করল-সাহারানপুরে কী আছে বাবা?
-নও গাজা পীর আছে,শ্রীবাবা লাল দাস,শিবধান মন্দির কত কী আছে!
-উফফ!…আমার ভাল লাগছে না!
অমিত ছেলের ম্যুডের বেকায়দা দেখে বলে উঠল-এই যে দুপাশের জমিতে মাথা দোলাচ্ছে যে ফসল তার নাম কী বল তো?
-হুইট!
-গুড…ভাল লাগছে না এরকম ফসলের জমি দেখতে?
-হুম…আর মাঝখানে ওই যে হাঁড়িতে চোখ-নাক আঁকা,ঢোলা কাপড় পড়া লতপত করছে ওগুলো কী?
-কাকতাড়ুয়া!ওরা ফসল পাহারা দেয়।-এদের দেখলে টিয়াপাখি,কাক,শালিকের মত পাখিরা ভয়ে আর ফসল ক্ষেতে চুরি করতে আসে না।
-হুম…
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে মেহুল যেন কী ভাবল ।তারপর বলল- এতদিনে বুঝলাম মাম্মাম,ঠাম্মি তাহলে আমাদের বাড়ির কাকতাড়ুয়া,যাকে যত্ত চোর-ডাকাত ভয় পায়!আমরা না থাকলে বাড়ি সেফ থাকে,তাইনা?
দুজন নিরুত্তর!