ধূমোট ধূমোট এক গুমোট সন্ধ্যায়
দর্শকের অনুধ্যান নিয়ে পৌঁছলাম লাল কেল্লায় ,
লাহোর দরজা দিয়ে ভিতরে গেলাম,
একটি মিনিবাজার পার হ’য়ে প্রধান ফটকে ঢুকলাম।
লাল কেল্লার ভিতর দেখছি দুর্ভেদ্য আবাস
দেওয়ান-ই-আম লাল পাথরের , সফেদ দেওয়ান-ই-খাস—
শ্বেতপাথরের ভিতর খচিত নক্সার কারুকাজ
রঙ-বেরঙের পাথর বসানো, ছিঁটে ফোঁটা আছে আজ
প্রধান কক্ষে রয়েছে শূণ্য শুভ্র নিরাভরণ
মর্মর বেদী, নাই তার শোভা ময়ূর সিংহাসন;
রঙমহলের খোল-নলচে’য় নাই রঙ-বিন্যাস
সমস্ত শুনি নাদির শাহের লুঠতরাজের গ্রাস,
মোতি মসজিদ বিষণ্ণ বড়ো,নাই সেই হেফাজত
আজান সুরায় মুসল্লিদের সুললিত তেলাওত,
জৌলস আজ জবুথবু, তবু যতো দেখি মনে হয়–
স্থাপত্যগুলি কীর্তির এক ভৌতিক বিস্ময়,
একদা জাঁকালো জবরদস্ত্ বাদশাহী লীলাক্ষেত
চষছি হালের বল্গাবিহীন ভ্রামনিক ভূতপ্রেত
ক্ষণিক অতিথি, এবং করছি হিস্ট্রি রোমন্থন
আর চাক্ষুস করছি উদাস তার ক্রোড়ে বিচরণ,
দেখার খেয়াল ক’রে দ্যায় যেন সময়কে সংক্ষেপ
চারিধারে ঘুরে সান্ধ্য সজাগ ভূতুড়ে পদক্ষেপ,
পরিহাস-প্রিয় মোহনায় মৃত শতাব্দী স্থবির,
রোমাঞ্চ-বিহ্বল বিস্মিত শ্লথ স্নায়ুর নিবিড়
অনুভূতিগুলো থেমে যায় এসে কালের সমাধি পাশে’—
বোঝা যায়না এ কীর্তির রূপ কীর্তির ইতিহাসে ।।
২| অভিনব শো-য়ে
অভিনবত্ব-মাতাল আমি ধ্বনি-আলোকের শো-য়ে
বসেছি সন্ধ্যায় লাল কেল্লার অন্দরে, ইতিহাসের শুঁড়িপথ ব’য়ে
উঠে এলো টগবগে ছুটন্ত অশ্বের হ্রেষা, সংগীত -নৃত্য-মহলের ঝংকার
চুড়ি ও নূপুর-ধ্বনির টুংটাং অনুরণ থেকে ঝলসিত অস্ত্রের টংকার
ঘটনা-পরম্পরা ইমারতগুলো থেকে, এক ঘন্টার অনুপুঙ্খ মহড়ায়
উচ্চকিত হলো স্নায়ুতন্ত্র আবিষ্ট বিহ্বল , যেন চোখ রগড়ায়
আঁধারে শ্বাপদকুল, পুষ্পিত রমণীকুল হামাম-মহলে
যমুনা-বিলাস করে সোহাগে আদরে , ইশারায় ফিসফাস কথা বলে ।
মুঘলশাহীর আলেখ্য ঘটনাক্রম শেষ হলো, সময়ের গ্রন্থিগুলো থেকে
কতো কিছু ঝ’রে পড়লো পলকে পলকে, প্রত্নলোকে নিয়ে – গেলো ডেকে
রুদ্ধশ্বাস শো-য়ের ব্যঞ্জনা, আনমনা কখন্ হয়েছি মনে নাই
মোহাবিষ্ট ব’সে আছি অতীত-রচনাকারী শিল্পিত সভায়
শ্রোতারা সবাই উঠে গেছে একে একে , আমি ব’সে আছি —
‘চলিয়ে বাবুজী’ — মার্শাল ডাকলো এসে স্নায়ুচর বিস্ময়ের কাছাকাছি
৩| রাজপথে উদ্বাস্তুর গোধুলি-স্বপ্ন
ঝকঝকে তকতকে রাজপথে হাঁটছি এখন আমি, হাঃ হাঃ !
ঘোলা ময়লা পুকুরের পাতিহাঁস ঠিক যেন সরোবরে
কাটছি সাঁতার আমি , হাঃ হাঃ !
দু’ধারে দালান-বাড়ি । ফুল্ল লন বারান্দায় নামছি সটান আমি,হাঃ হাঃ !
সুখটান জীবনের ভোজবাজি ভাবছি হঠাৎ আমি ,হাঃ হাঃ!
কী ক’রে এমন হলো ? কী ক’রে হঠাৎ
নগরীটা হ’য়ে গেল যানহীন ? গোধুলির রাত
নৈঃশব্দ্যে পড়লো ঢাকা ? রাতচরা নাগরিক-কুলম
হারালো কি উত্তেজনা ? অহংকারী কামনার ফুল
ওড়ানো প্রতিমাগুলো হারালো কোথায় ?অবাঞ্ছিত
আগন্তুক খেদানো পুলিশ কই ? কই নিয়ন্ত্রিত
লাল নীল হলদে সবুজ ট্রাফিক সিগন্যাল ?নাকি ওরা
ব’নে গেছে হঠাৎ উদার ? অথবা নাকি চালাচ্ছে কোনো গোপন মহড়া ?
হ’তে পারে । যা ইচ্ছে করুক ।
দু’ধারের রকমারি রহস্যের তীব্র স্বপ্নভুক
হাঁটছি এখন আমি অবারিত রাজপথে ,হাঃ হাঃ !
ছাঁটছি এখন আমি দুরাশার বনবীথি,হাঃ হাঃ !
ধুকপুকে বুকে সুখ শুঁকছি এখন আমি হাঃ হাঃ !
খিঁচ-লাগা জীবনকে পিচঢালা রাজপথে টুকছি এখন আমি , হাঃ হাঃ!
অন্ততঃ পেতাম যদি একটা এমন তকতকে
করিডর রাত্তিরে নিশ্চিন্তে ঘুমোবার , জিরোবার
পেতাম প্রশ্রয় বৌ বাচ্চা নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে
পরিচ্ছন্ন পরিসরে দিন কাটানোর প্রসন্ন
সৌভাগ্যে ,জীবনটা ধন্য হ’য়ে যেত তবে ,
ঝুপড়ি-পট্টির পিলপিলে ঠাসাঠাসি যক্ষ্মাকাশিতে
ধুঁকে ধুঁকে অনর্থক মরতে হতো না ,একটি গোলাপ
অথবা যুঁই কি বেলী লাগাতাম করিডর ঘেষেঁ, প্রত্যহ দিতাম জল ,
ভোরে কি সন্ধ্যায়
ব’সে থাকতাম ঘাসের সবুজে প্রেয়সীর সাথে
মুখোমুখি পাশাপাশি কিংবা বাচ্চা নিয়ে
পাখি আর প্রজাপতি ফড়িং ফিঙের প্রাকৃতিক সাহচর্যে আহা ,জীবনের
ফুরফুরে উজানী নৌকায় ।
নগরীর উদ্বাস্তু বাসিন্দা ব’লে কেউ
তাড়িয়ে দিত না ঝুপড়ি ভাগাড়ে নিত্য ,সৌভ্রাতৃত্ত্ব ,মুক্ত চিত্ত ,
জন্মসূত্রহীন ঘটনা নিমিত্ত ইত্যাদি বিষয়
বাগ্মিতার পরিভাষা বলেই হতো না মনে ,
পৃথিবীটা হতো একান্তই মানুষের ,সব মানুষের ।
তবু ধ’রে নিচ্ছি এখন আমি —–এই রাজপথ নিজস্ব আমার,
যেহেতু আর কেউ নাই এই রাজপথে এখন
যেহেতু কোনো যান নাই এই রাজপথে এখন
যেহেতু পুলিশরা নাই এই রাজপথে এখন
যেহেতু সদিচ্ছার প্রতিদ্বন্দ্বী নাই এই রাজপথে এখন ,
তাই এই নিরঙ্কুশ এই
ছিমছাম রাজপথে ঝিমোচ্ছি এখন আমি হাঃ হাঃ!
আকাঙ্ক্ষার করিডরে ঘুমোচ্ছি এখন আমি হাঃ হাঃ !
বৌ বাচ্চা বাস্তুভিটা গুছোচ্ছি শহরে আমি হাঃ হাঃ !
স্বপ্নের মোহর দিয়ে সাজাচ্ছি প্রহর আমি হাঃ হাঃ !
হাঃ হাঃ ! হাঃ হাঃ! হাঃ হাঃ ! হাঃ হাঃ ! হাঃ হাঃ !