।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় বন্দনা পাল রায়

মিংকির ভাইবোনেরা
মিংকি খুব ভালো মেয়ে । তার মন খুব উদার। গুণেরও শেষ নেই। সে ঠাকুমার সেবা করে, ভালো রান্না করে।
তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও সত্যবাদিতাও প্রশংসনীয় ।
কিন্তু তেইশ বছর বয়স হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও বাড়ির লোকেরা তার বিয়ের কথা ভাবে না। তার একটি বিশেষ কারণ আছে । মিংকি অনেকটা কল্পনার জগতে বাস করে।তার চিন্তার বাইরেও যে বাস্তব আছে, সেটা হয় সে বুঝতে পারে না, নইলে বুঝতে চায় না। তাই তাকে পরের ঘরে পাঠাতে তার বাবা মা যথেষ্ট ভয়ই পান।
মিংকিদের পরিবারে মেয়েদের চাকরি করার চল নেই, আর ছেলেরা সবাই ব্যবসায়ী । তাই মিংকি ঘরেই থাকে আর সাধ্যমতো সকলের সেবা করে বেড়ায়।
তিনপুরুষ আগে তৈরি তাদের বাড়িটা বর্তমানে জ্যাঠা -বাবা-কাকাদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু এবাড়ি-ওবাড়িতে যাতায়াতের কোন অসুবিধা নেই। ঠাকুমা বছরে তিনমাস করে তিনছেলে ও একমেয়ের কাছে থাকেন।
এই তো, মাস ছয়েক আগে, তার জ্যাঠতুতো ছোড়দিকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল। মিংকি যথারীতি সকাল থেকেই ওবাড়িতে।
পাত্রপক্ষকে আপ্যায়ন করার পরে যখন মেয়েদেখা পর্ব চলছে, তখন মিংকি দুম করে পাত্রকে বলে বসল, ” নীলিদির আগের বয়ফ্রেন্ডের চাইতে আপনি অনেক বেশী হাইফাই”।
ব্যস, কথাবার্তা ওখানেই শেষ ।
ওই যে, সে সব কিছুই জেনে ফেলে, আর সত্য চেপে রাখতে পারে না!
তার ছোট কাকিমা থেকে শুরু করে জ্যাঠতুতো দাদাদের বউয়েরা যে প্রায়ই উপোসের দিনগুলিতে লুকিয়ে খাবার খায়, সেটাও মিংকির সৌজন্যে পাড়ার লোকেদের জানতে বাকি নেই।
পরে অবশ্য নীলির বিয়ে ঠিক হয়ে যায়, তবে দেখাদেখির সময়টাতে মিংকিকে তার পিসির বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।
একদিন বিকেলে মিংকি তার খুড়তুতো ভাইকে নিয়ে ফুচকা খেতে বেরিয়েছিল।
পাড়ার মোড়ের ফুচকাওয়ালা না বসায় তাদেরকে একটু দূরে যেতে হয়েছিল। সেখানেই এক ছোটখাটো রেস্টুরেন্টে নীলি আর তার হবু বর বসে ডেট করছিল। মিংকির তো চক্ষু চড়কগাছ!
পুকাই পরল আতান্তরে। তাকে বাড়ি থেকে পইপই করে বারণ করে দেওয়া হয়েছে মিংকিকে বিয়ের ব্যাপারে কিছু না জানাতে।
সে তাড়াতাড়ি বলল, ” চ’ মিংকিদি, বাড়ি চ’,ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে না “।
ততক্ষণে মিংকি রেস্টুরেন্টে ঢুকে পরেছে। পিছনে পুকাই। ঢুকেই সোওওজা নীলির সামনে।
” নীলিদি, তুই এখানে বসে এই ছেলেটার সাথে কি করছিস রে”?
অন্যান্য টেবিলে বসে থাকা মাথাগুলি সাঁ করে নীলিদের টেবিলের দিকে ঘুরে গেল। নীলির তখন ‘ হে ধরণী দ্বিধা হও’ দশা।
বিজন অবাক হয়ে একবার নীলি আর একবার পুকাইয়ের দিকে তাকিয়ে নিয়ে পুকাই কে উদ্দেশ্য করে বলল, ” পুকাই বাবু, তোমার সাথে এই গার্জিয়ানটি কে”?
পুকাই ঢোঁকগিলে বলল, ” সেজজ্যাঠার মেয়ে, মিংকিদি”।
” তোমাদের বাড়িতে গিয়ে একে তো দেখিনি”!
” ও, তুমি আমাদের বাড়িতেও….. “? মিংকি কথা শেষ করতে পারে না, নীলি টেবিল থেকে উঠে দুহাতে মিংকি আর পুকাইয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বেরিয়ে যায়।
সেজজ্যাঠার বাড়িতে ঢুকে মিংকিকে প্রায় ছুঁড়ে ফেলে নীলি। ” সেজমা, তোমার এই কালনাগিনী মেয়েকে সামলে রাখো। এবার যদি এর জন্য আমার বিয়ে ভাঙে, আমার থেকে খারাপ কিন্তু কেউ হবে না”।
তাকে অনেক বোঝানো হল নীলির ব্যাপারে না পরতে। কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। সে কিছুতেই বিশ্বাস করল না যে বিজনের সাথে নীলির বিয়ে ঠিক হয়েছে। তাকে না জানিয়ে তার দিদির বিয়ে ঠিক হতে পারে এটা তার ধারণার বাইরে। সে গোঁ ধরে বসে রইল, নিশ্চয় ওই ছেলেটা নীলিদির নতুন বয়ফ্রেন্ড।
রাতে বিজন নীলিকে ফোন করে একথা সেকথার পর মিংকির প্রসঙ্গ তুলল।
নীলির মা, কাকিমা, বউদিরা তাকে আগেই শিখিয়ে দিয়েছিল, সেইমত সে ইনিয়েবিনিয়ে শুনিয়ে দিল, ক’বছর আগে টাইফয়েড হবার পর থেকে মিংকির মাথাটা একটু খারাপ মত হয়ে গেছে।
বিজন বিশ্বাস করল কিনা কে জানে, পরদিন তার মা ও পিসিকে হবু শ্বশুর বাড়ি পাঠালো সরজমিনে খোঁজ খবর নিতে।
বাড়িতে সকাল থেকে হুলুস্থুল । হঠাৎ বিনা কারণে কুটুমবাড়ি থেকে লোক আসছে কেন?
নীলির মা সেজজায়ের হাত ধরে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করে গেলেন যাতে মিংকিকে আজ তাঁর বাড়িতে যেতে দেওয়া না হয়।
এগারোটা নাগাদ বিজনের মা, পিসি ও পিসেমশাই নীলিদের বাড়িতে এসে হাজির হলেন।
মিংকি সব বাধা ডিঙিয়ে , মায়ের চোখ এড়িয়ে , চুপিচুপি বাড়ির তিনতলার ছাদে উঠে নিচু পাঁচিল টপকে বড় জ্যাঠার বাড়িতে ঢুকে পরল।
ঢুকেই রান্নাঘরে। হতভম্ব বৌদি ও রান্নার মাসীর চোখের সামনে থেকে চায়ের ট্রে তুলে নিয়ে বৈঠকখানায় গিয়ে হাজির হল। নীলির বাবা মা সবে জিজ্ঞাসা করতেই যাচ্ছিলেন যে আচমকা কুটুমরা কেন এলেন, এমন সময় মিংকিকে দেখে তাঁরা স্তম্ভিত। কিন্তু তার ওসব খেয়াল নেই।
সে টেবিলের উপর চায়ের ট্রে নামিয়ে রেখে, ” নমস্কার আন্টি, আঙ্কেল , আমি মিংকি, নীলিদি, যাকে আপনারা দেখতে এসেছেন, তার খুড়তুতো বোন”।
এই খবরটা মিংকিকে পুকাই দিয়েছিল যে নীলির শ্বশুর বাড়ি থেকে লোক আসছে।
মিংকি স্বভাববশত ধরে নিয়েছিল যে ওরা নীলিকে দেখতে আসছে।
” আপনারা আমার দিদিকে দেখতে এসেছেন, খুব ভালো কথা। নীলিদি খুব ভালো মেয়ে। তাই ওর পিছনে বয়ফ্রেন্ড লেগেই থাকে । ব্যস, ওর বিয়ে হয়ে গেলে জ্যাঠা জেঠি নিশ্চিন্ত হয়ে যায়”।
আসলে নীলি যখন কলেজে পড়াকালীন প্রেমে পড়েছিল, তখন বাড়িতে জানাজানি হবার পর ওদের ঠাকুমা খুব রাগ করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল স্কুল শেষ হতেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। একথা শুনে মিংকি তো উচ্চমাধ্যমিকের পর আর পড়লই না!
কিন্তু নীলি কলেজ পাস করেছে। তার ব্রেক আপের কারণ অবশ্য ছেলেটির চাকরি নিয়ে বাইরের রাজ্যে চলে যাওয়া।
মিংকি বলে চলে, ” এর আগে যে ছেলেটা দিদিকে দেখতে এসেছিল, সে দারুণ দেখতে ছিল। নীলিদির আগের বয়ফ্রেন্ডের থেকে অনেক ভালো । কিন্তু ওরা নীলিদিকে পছন্দ করল না। তাই দি আবার একটা নতুন বয়ফ্রেন্ড জুটিয়েছে। কাল ভাগ্যিস আমি আর পুকাই ফুচকা খেতে বেরিয়েছিলাম, তাই চোখে পরল”।
” আপনাদের ছেলে আসেনি”?
নীলির বাবা মা ততক্ষণে ঘামতে শুরু করেছেন। বিজনের বাড়ির লোকেরা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ” এখন আমরা যাই, পরে আপনাদের ফোন করব”।
” কিন্তু আপনারা তো নীলিদিকে দেখলেনই না”…. মিংকির কথা শেষ হবার আগেই ওনারা বেরিয়ে গেলেন।
মিংকি জেঠির দিকে ফিরে বলল,” এ কেমন পাত্রপক্ষ ? মেয়ে না দেখেই চলে গেল?দেখো, চা টাও তো খে…..” তার মুখের কথা মুখেই থেকে গেল। কারণ ঠিক সেই মুহুর্তে তার শিরদাঁড়ার উপরে যে জোরালো আঘাত আছড়ে পরল, তারপর তার আর কথা বলার ক্ষমতা ছিল না।
নীলি বারান্দার উপর একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়েছিল, তার মন আগের দিনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আশঙ্কায় দুলছিল।
বিজনের মা ও পিসি-পিসে উঠে যেতে সে,আর নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। ঘরে ঢুকে ভারী পিতলের ফুলদানি তুলে মিংকিকে আঘাত করে বসল।
পুকাই অবাক হয়ে দেখল, তার বড় জ্যাঠা নীলিদিকে বকার বদলে চেঁচিয়ে উঠে বললেন, ” ওমা একি করলি রে! এই আপদটা মরলে যে তোকে পুলিশে ধরবে”!
এর মধ্যে গোলমাল শুনে মিংকির মা বাবা, তার নিজের দাদা মানু, বৌদি সবাই দৌড়ে এসেছে।
নীলির মা থাকতে না পেরে সবার সামনে সেজজায়ের গালে একটা চড় কষিয়ে দিয়ে বললেন, ” বলেছিলাম, আজকের দিনটা এই ডাইনিটাকে সামলে রাখতে। সেটুকুও পারলি না”?
মিংকির বাবা, দাদা আর মেজজ্যাঠা মিলে যখন অচৈতন্য মেয়েটিকে তুলছে, তখন জ্যাঠতুতো বড়দা বলল, ” সেজকা, ওর যা লাগে সব আমি দেব, শুধু ওকে হাসপাতালে নিও না। তোমায় মানুর দিব্যি, নইলে নীলির জীবন নষ্ট হয়ে যাবে”!
নীলির মা বললেন, ” জীবন নষ্ট করতে কিছু বাকি রেখেছে? ডাইনি পেটে ধরেছিল সেজবৌ “।
মিংকিকে হাসপাতালে নেওয়া হয় নি। মিংকির জ্ঞান কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসেছিল, বাড়িতে ডাক্তারও এসেছিলেন।
নীলির হবু শ্বশুর বাড়ির লোকেরা সিদ্ধান্তে এলেন যে ঈর্ষা বশত মিংকি তার জ্যাঠতুতো দিদির বিয়ে ভাঙার চেষ্টা করছে। কারণ বিজনের মায়ের সম্পর্কিত বোনেরাও বার দুয়েক এভাবেই তাঁর সম্বন্ধ ভেঙেছিল।
বিয়েটা হয়ে গেছিল। নীলি জিদ ধরেছিল তার বিয়ের মন্ডপে যেন ওই ডাইনির ছায়া না পরে। মিংকির বাবা মাও বিয়েতে যান নি। পুকাইও যেতে চায় নি কিন্তু মায়ের সামনে তার জিদ চলে নি।
মানু আর তার বৌ সোমা বিয়েতে তাদের তরফের সকলের অভাব পূরণ করে দিয়েছিল, এত মজা করেছে। বাবার ব্যবসার টাকা গোপনে সরিয়ে বৌয়ের জন্য মানু যে গয়না কিনেছিল, যা মিংকির ভয়ে এতদিন সোমা পরতে পারেনি, এখন তা নিশ্চিন্তে পরে ‘ দিদিমা দিয়েছেন’ বলে সারা বিয়েবাড়িতে নজর কাড়ল।
মিংকির ঠাকুমা নাতনির দেখাশোনার জন্য এখন সেজছেলের কাছেই থাকেন। মাঝে মাঝে তিনি আক্ষেপ করেন তিনি না থাকলে মিংকিকে কে দেখবে। পুকাই দৃঢ়ভাবে জানায়, সে মিংকিদিকে দেখে রাখবে। সোমা আর তার জায়েরা মুখ বেঁকিয়ে হেসে বলে, ” ওই বিয়ে হওয়া অব্দিই “।
মিংকির পিঠের ব্যাথাটা আজও বোধহয় কমেনি। ডাক্তারবাবু নানারকম টেস্ট করে জানিয়েছেন যে তার শরীরে কোথাও কোন অস্বাভাবিকতা নেই, তবু কেউ পিঠে হাত দিলেই সে যন্ত্রণায় কেঁপে ওঠে । তার কথাও আস্তে আস্তে জড়িয়ে আসছে। তার মা বাবা, ঠাকুমা আর পুকাই ছাড়া কেউ বোঝে না।
সবাই বলে সে মানসিক আঘাত পেয়েছে। হতেও পারে। আসলে মিংকি তার সব ভাইবোনদেরই খুব ভালোবাসতো কিনা!
পুকাই একদিন মা আর বৌদিদের সাথে মোড়ের মাথায় গেছিল কিছু কেনাকাটা করতে। ফেরার পথে মহিলাদের ইচ্ছে হল ফুচকা খাবার।
প্রথম ফুচকাটা পাতে পরতেই পুকাই মনে হল তার পিঠের পেশীগুলি কেউ যেন খামচে ধরেছে। ফুচকাসুদ্ধ পাতাটা ফেলে দিয়ে সে বাড়ির দিকে দৌড়লো।