বাজারের ব্যাগটা রেখে কাঁচুমাচু মুখে ন’কাকু দাঁড়িয়ে থাকেন রান্নাঘরের দরজার পাশে।
হয় মাছ-সবজি নয়তো হিসেব নিয়ে দু’চারকথা শুনতেই হবে রোজ। সবজিওয়ালা যদি বলে দশ টাকা কিলো, তিনি বলেন বারো টাকা হলে নেবো! যা বলবার কথা, তার উল্টোটা বলে ফেলেন হামেশা। দরদামে ঠকে আসেন প্রায়ই।
বাবার চেয়ে এগারো বছরের ছোট এই কাকা। মাঝে আরেক কাকা ও পিসি। শৈশবে এক অজানা জ্বর থেকে বুদ্ধিনাশ হয়ে যায় মানুষটার। পড়ালেখা থেমে যায়।
ছোট থেকেই দেখেছি ন’কাকা বাড়ির দোকান-বাজার করেন।
নিত্য ফাই-ফরমাশ খাটেন সবার। কাজে ভুল হলেই জোটে গালমন্দ নয়তো হাসি-বিদ্রুপ। এতেই তিনি অভ্যস্ত। জল তোলা, রোদ্দুরে রাখা আচার পাহারা দেওয়া এসবই তার সারাদিনের কাজ।
বিজয়ার পর বাড়ির সব বড়োদের প্রণাম করতাম আমরা। ন’কাকা সামনে থাকলেও কেউ ভ্রুক্ষেপই করতো না। তিনিও কোনোদিন প্রত্যাশা করেননি প্রণামের।
একসময় যৌথ পরিবার ভেঙে যায়। ন’কাকার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চায় সব ভাই ও বৌ-রা। ভাইবোনদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ পিসি ‘ছোড়দার’ আজীবনের ভার নিতে রাজি হয়।
ভিন্ন হয়ে যাবার পর প্রথমদিকে যাতায়াত থাকলেও পরে যে যার সংসার, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, চাকরি বিয়ে ইত্যাদিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ন’কাকার অস্তিত্বই ভুলে যায় সবাই।
বড় হবার পর নিজস্ব অনুভূতি জাগ্রত হয়। একবার পুজোর আগে ইচ্ছে হলো ন’কাকাকে দেখতে যাবো, কেউ তো মানুষটার নামও করেনা আর।
পিসির জন্য শাড়ি ও ন’কাকার জন্য পায়জামা-পাঞ্জাবি নিয়ে গেলাম এক বিকেলে।
আমায় দেখে ন’কাকার চোখমুখ জুড়ে অকৃত্রিম আনন্দের ঢেউ। পিসির কথায় তড়িঘড়ি দোকান থেকে সিঙ্গারা-মিষ্টি নিয়ে এলেন। বড় মায়া হলো মানুষটাকে দেখে। বয়েসের রেখা মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চেহারা শীর্ণতর। জীবনভর পাওয়া উপেক্ষা আর তাচ্ছিল্যের গ্লানি মিশে আছে মুখাবয়বে, হাসিতে |
পাঞ্জাবির প্যাকেটটা হাতে দিয়ে প্রণাম করতে যেতে তড়িতাহতের মতো ছিটকে দুইহাত পিছিয়ে গেলেন।
–“কী হলো” ? জিজ্ঞেস করলাম।
ম্লান হেসে ন’কাকা বললেন, “আমার পায়ে হাত দিচ্ছিস কেন, আমায় তো কেউ কোনোদিন প্রণাম করেনি”!
চোখ ভিজে গেল এ কথায়।
বছর দু’য়েক পর এক সকালে খবর পেলাম ন’কাকা আর নেই।
শেষযাত্রায় পা ছুঁতে গিয়ে কেবলই কানে বাজছিলো, ম্লান হেসে বলা তাঁর সেদিনের কথাটা, “আমায় তো কেউ কোনোদিন প্রণাম করেনি”!