|| বাইশের বাইশে শ্রাবণ একটু অন্যরকম || বিশেষ সংখ্যায় বেদশ্রুতি মুখার্জী

আমি তোমারো সঙ্গে বেঁধেছি আমারো প্রাণ :-

আমি জীবনে যদি কারোর সঙ্গে যাপন পেতে থাকি, তবে তা তিনিই, প্রভু আমার, ঈশ্বর আমার। এই একক নিভৃত জীবনের একমাত্র আলো তিনিই, আঁধারে ও দেখি তিনিই মুখোমুখি এসে বসেন, চোখ মুছিয়ে দেন নীরবে। গীতবিতানে আমি মায়ের আঁচলের টুকরো খুঁজে পেয়েছি, গল্পগুচ্ছে আমি কখনো না পাওয়া ভালোবাসাকে দেখি আমাকেও ভালো বাসতে, রবীন্দ্র প্রবন্ধে আমি পিতৃ শাসন, পরিমিতিবোধ শিখি, আমি চোখের জলে রবীন্দ্র বিগ্রহ গড়ে পুজোর অর্ঘ্য দিই রোজ, আবার তাঁকেই ভাসাই আরো ঘনীভূত মেঘে। যত দোলাচল সব এক চরণেই সমর্পণ করে দিয়ে দেখি -“এ জগৎ মিথ্যে নয়”…
আমি মানি, জানি তোমরা ও মানো-
“কেউবা তোমায় ভালোবাসে, কেউবা বাসতে পারে না যে,
কেউবা বিকিয়ে আছে, কেউবা সিকি পয়সা ধারে না যে,
কতকটা যে স্বভাব তাদের,
কতকটা বা তোমারো ভাই,
কতকটা এ ভবের গতিক,
সবার তরে নহে সবাই…
সত্যেরে লও সহজে…”
যেদিন আমার সব স্বপ্নের বিসর্জন ছিল, অন্যত্র আলোর ঝকমকি বাসর ছিল, আমি হয়তোবা শেষ হয়ে যেতাম সেদিন যদি না তিনি লিখে যেতেন -” ভালোবেসে প্রেমে হও বলি, চেয়োনা তাহারে”। আমি এই ডাক শুনে চোখের জল মুছে শুনতে লাগলাম –
” আমি তোমারো বিরহে রহিব বিলীন,
তোমাতে করিব বাস, দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী দীর্ঘ বরষ মাস”… তিনি শাসন করে আমায় বললেন চোখ মুছে বরং সুখী হতে কেননা -“যদি আর কারে ভালোবাসো, যদি আর ফিরে নাহি আসো, তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো”… আমি বুঝলাম এটাই ত্যাগ, এটাই সর্বোচ্চ প্রকাশ, পেয়ে গেলেই তো বাজারের খুচরো পয়সা ফেরত দেওয়া, বেশি সিগারেট খাওয়া নিয়ে খুঁটিনাটি বিঁধতো, আমিও বিঁধতাম, বিষিয়ে যেত, থাক না কিছু অপ্রাপ্তি, থাক না অসমাপ্তি, তবে ই তো মনের পাটিগণিতে যোগ বাড়বে, হোক না – ‘শেষ হয়ে হইলো না শেষ ‘…
যেদিন চিতার সামনে ঠকঠক করে কাঁপছিলাম, ইকুইল্যাটেরাল ছন্দে সংজ্ঞা হারাচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না এবার? তিনি এসে হাতটি ধরলেন ধীরে ধীরে, বুঝলাম -” সব যে হয়ে গেল কালো… বুঝি নাই তুমি এলে আমার ঘরে”… সত্যিই বুঝিনি একাকীত্বের এই ঝাঁঝালো পরীক্ষায় আমি প্রতিদিন পাশ করতে সক্ষম, “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই”… আমি মিথ্যা অপবাদে দগ্ধ হয়ে যখন দেখি গীতবিতানকে ঠাকুর ঘরে পুড়তে, আমি অতিষ্ঠ হয়ে যখন শাড়িটা আঁকড়ে ধরি পরিত্রাণ পেতে, তখনই শুনি- একলা চলো রে… আপনি আছেন বলেই শত শত আমার মত অশ্রুতরা আজো জীবিত, মৃত্যু তো দেহের হয়, চেতনার মহাপ্রয়াণ সম্ভব নয়, কবি তাই অজড় অমর, তাই এই অশ্রুসিক্ত বাইশে শ্রাবণী সোমবারে সদর্পে বলি- “সদা রবীন্দ্রম্ ভজাম্যহম্, ওম্ নমঃ গুরুদেবায়”…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।