গল্পেসল্পে বেদশ্রুতি মুখার্জী

অ্যাসাইসিনেশন
“নৈনং ছিন্দস্তি শস্ত্রাণী নৈনং দহতি পাবকং।
না চৈনং ক্লেদয়োন্ত্যাপো, ন শোষয়তি মারুতঃ।।”
(দ্বিতীয় অধ্যায়, শ্লোক ২৩)
অর্থটা সবাই জানেন, সত্যিই কিছু কিছু হত্যা শুধুই দৈহিক, বলিষ্ঠতার, মূল্যবোধের বা কর্মকাণ্ডের তো নয়ই বরংচ সেসবের বিস্তৃতি আরো গভীর তাৎপর্যমণ্ডিত হয় নশ্বর শরীরের আপাত বিনাশ থেকেই। 16th US প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দিয়ে শুরুটা হোক, দারিদ্র্য কে নিত্যসঙ্গী করে উঠে আসা লিংকন শৈশবেই বুঝেছিলেন শিক্ষাই কেবলমাত্র সমর্থ বৈষম্য দূরীকরণে, কাঠ দিয়ে তাঁর তৈরি নৌকায় মাল বহন করে নিজের স্কুলের খরচাপাতি চালানো থেকে শুরু তাঁর সংগ্রাম, আইজবার্জে ভরা বরফশীতল নদীতে মাঝরাতে নৌকা চালিয়ে এবং নৌকা ভাঙার পর সেই ভয়ানক ঠাণ্ডায় সাঁতরে নদী পার হয়ে পাশের গ্রামের উকিলের কাছে শুধুমাত্র বইপড়ার নেশায় ছুটে যাওয়া ছেলেটি বা হাজার হাজার গরিব মানুষের কেস বিনা পয়সায় লড়া সৎ সাহসী অ্যাডভোকেটটি জন বুথের কাছে ঠিক কতটা খারাপ রাষ্ট্রনেতা হতে পারে যে তাঁর একটা স্পিচ শুনেই তাঁকে গুলিতে বিদ্ধ করা হলো ১৫ এপ্রিল, ১৮৬৫তে ওয়াশিংটন ডিসির ফোর্ড থিয়েটারে স্ত্রী মেরির চোখের সামনেই, তাঁর অপরাধ কৃষ্ণাঙ্গ দের পক্ষে সাওয়াল এটুকুই তো? আমেরিকান সিভিল ওয়ার থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্রে এই মানুষটির অবদান অস্বীকার করা সমীচীন কী? জাস্ট বুলেটেই আর সব শেষ হয়ে যায় কী?
মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ যার ২৮ আগস্ট, ১৯৬৩ রক্তে বারুদ ধরানো জ্বালাময়ী বক্তব্য “I have a dream” আপামর মানুষকে স্বপ্ন দেখতে ও তার জন্য লড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল, ৬৪তে সিভিল রাইটস অ্যাক্ট পাসের মাত্র চার বছরের মাথাতেই কিং ব্রুটালি অ্যাসাইসিনেটেড হন জেমস রের হাতে। তাতে আদৌ কী লাভ হলো, জয় গোস্বামী আউড়ে বলি-” অস্ত্র ফ্যালো, অস্ত্র রাখো পায়ে, আমি এখন হাজার হাতে পায়ে” এঁরা হয়তোবা হাত নাড়িয়ে বুলেট তাড়াতে পারেননি তবে বারুদ ছিটিয়ে গেছেন।
ডলাসের বুলেটে প্রকাশ্য ভীড়ে হুডখোলা গাড়িতে 35th US প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নৃশংস পরিণতি কেইবা না জানে।
সবচেয়ে উঁচু বিল্ডিং জর্জ কালিফার মতোই মাথা উঁচিয়ে থাকা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উন্নতির পেছনের কাণ্ডারী কিং ফায়সাল কিন্তু এই মর্ডানাইজেশন আর ইকোনমিক ডেভলপমেন্ট এর জন্যই ঝাঁঝরা হয়েছেন বাড়িতেই, বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ছেলে আরেক ফায়সাল মানে ফায়সাল বিন মুস্তাদের হাতেই। কে কতটা ভুল ঠিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সেই বিতর্কে বিন্দুমাত্র না জড়িয়ে বলছি, সত্যিই কী হত্যাই একমাত্র সমাধান? রক্তেই ইতিহাস খতম হলে তো পড়তেই হতো না রাজা-বাদশাহদের কাহিনি।
বিট্রিশ কলোনিয়াল রুলের শিকার হচ্ছিলেন যখন অসহায় কেনিয়ানরা, কিমাথী না এগিয়ে এলে এবং দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে ডিফেন্স কাউন্সিল গঠন না করলে কী হতো? তবুও তাঁর ঠাঁই হলো ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭ সেই ফাঁসীর দড়িতেই তাইনা? খুব দরকার হয় কেন এত রক্ত?
কঙ্গোর ডেমোক্র্যাটিক রাইটস নিয়ে এত লড়াই করা অ্যাডভোকেট থেকে গণনেতা হওয়া প্যাট্রিস লুমাম্বার সেই বিয়োগান্তক পরিণতিই…
বুকরিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট থমাস সাংকারার করা এত আর্থিক সামাজিক সংস্কারও তাঁর ঢাল হলোনা কিছুতেই, সেই রক্তাক্ত হতেই হবে যে, ঘৃণার বিষবাষ্প মিশে আছে কারো কারো মজ্জায়, কী প্রচণ্ড অসহিষ্ণুতা, লুটিয়ে না পড়া পর্যন্ত তীব্র বিদ্বেষ-বিষে নীল হয়ে থাকে ঘাতকের অন্তর।
ফরাসী প্রেসিডেন্ট সাদি কার্নট থেকে আমাদের জাতির জনক গান্ধিজি রক্ষা পাননি এই বীভৎস ঘৃণার আক্রোশ থেকে, অথচ এই গান্ধিজিই শান্তির বাণী শুনিয়েছেন আজীবন, বৃটিশ থেকে নোয়াখালী অথচ শেষরক্ষা হলোনা…
ইন্দিরা গান্ধী??? দরকার ছিল খুব লুটিয়ে ফেলবার??? দুই শিখ আর পারলেন না কিছুতেই ভারতীয় হতে, শেষপর্যন্ত তার মাসুল দিতে হলো কত শত নিষ্পাপ শিখ পরিবারকে, ৩১ অক্টোবর থেকে দোসরা নভেম্বর দিল্লির শিখেদের মনে থাকবে আজীবন বোধহয়। ধর্ম যখন মানবতাকে শাসায় রাস্তা ছাড়ো, এভাবেই ছেড়ে দিতে হয় আর ক্ষতের মাসুল গুণতে হয় বোধহয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। ইসলামের নামে পথভ্রষ্টতা থেকে বজরংদল, আর এস এস একই কয়েনের এপিঠ ওপিঠমাত্র, গণ শব্দ নিহত হয় টুপিতে বা তিলকে।
আবার খন্দকার মুস্তাক, হুডারা তো তো সংখ্যায় একমাত্র নয়, যুগে যুগে ব্রুটাসেরা থাকেই সিজারদের প্রদীপের তলায় ঈর্ষার আগুনে মনের বিষাক্ত আঁধার লুকিয়ে। ভুগতে হয় তাঁর ফলই বঙ্গবন্ধুদের, বলি হতে হয় ঘৃণার, কতটা ঘৃণা হলে আঠারোটা গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া এতবড় মাপের মানুষটাকেই শুধু সেদিন তাঁর পিতৃপুরুষের ভিটা টুঙ্গিপাড়ায় শেষ গোসল করানো হলো না তাঁকে কাপড় কাচা ৫৭০ সাবান দিয়ে, বরং ধুয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো সেই সাবানের ফেনায় গণতন্ত্র ও বাঙালি স্বাধীনতার শেষরেখাটুকুও। কন্ট্রোলের রেশনের মালা শাড়িতে দাফন হলো বেশ কিছু বছরের জন্য জয় বাংলার মুক্তমনা স্বপ্নগুলো। যে তর্জনী স্পর্ধা ছিল বাংলাদেশের, নৃশংস ঘাতকেরা তাও কেটে দেয়। তবুও কি বঙ্গস্পর্ধা ক্ষুণ্ন করা গেছে? তবু কী পেরেছে বুলেটমালা রুখতে সেই ৭ই মার্চের রোমহর্ষক তাঁর সেই উক্তি-
“রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ”…
সারা শরীরের রক্তে তিনি ধুয়েছিলেন ঘাতকদের ক্ষমতা দখলের কালিমা, ১৫ই আগস্ট ৭৫ যখন আমরা স্বাধীনতা উৎযাপনে ব্যস্ত, তখনই বুলেট ঝাঁঝরা করে দেয় বহুবছর এর জন্য একটা গোটা দেশের গোটা বাঙালি জাতির প্রতিবাদী কন্ঠকে নির্মমভাবে। তবুও কী অ্যাসাইসিনেটেড হয় আদৌ এঁদের মতো সকল স্পর্ধাদের কণ্ঠ, গঠনমূলক সিদ্ধান্ত গুলো? নাকি সময়গুলো? হয় না, হতে পারে না কেননা “অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে, ন হন্যমান শরীরে”…