মাথায় উষ্ণীষ, তাতে হীরে ঝলমল করছে,কোমড় থেকে ঝুলছে তরোয়াল,পায়ে নাগড়া,পোশাক রাজার মতো।লম্বায় সাড়ে ছ ফুট, গৌরবর্ণ, পেটানো চেহারা,অসাধারণ সুন্দর মানুষটিকে দেখে মনে হল তিনি বোধহয় কোনও সিনেমায় রাজার পার্ট করবেন বলে তৈরি হয়েছেন।
চারদিকে তাকালাম সেই বিশাল রাজপ্রাসাদের।ভাবলাম শুটিং চলছে নির্ঘাত। নইলে এত জমায়েত। এত সিকিউরিটি, এবং যেদিকেই চোখ যাচ্ছে সোনা হীরে জহরতে মোড়া নারী পুরুষের দল।পুরুষদের সকলেরই প্রায় একই পোশাক, উষ্ণীষের হীরের সাইজ আর কোমড়ের বেল্টের রং খালি পাত্র অনুযায়ী পরিবর্তন।
মহিলাদের পরণে ঘাঘড়া,ওড়নায় সোনার সুতোর কারুকাজ, পায়েও সোনার মল,আর মাথা থেকে কোমড় অবধি হীরের জমকালো অলংকার।
সত্যি বলতে কি এত গহনা যে হতে পারে তাও জানি না।নাচের জন্য মা অনেক ইমিটেসন গহনা কিনে দিয়েছে,কিন্তু সেগুলো কোনটাই এত সুন্দর ও ভারী নয়।হয়তো অভিনয় করতে গেলে আরও নিঁখুত পরতে হয়।
আমাদের তিনবোনের পরণে কালো লাল ছোপ দেওয়া সিল্কের জামা।এই থানটা এনে দিয়েছিলেন বাবার এক পরিচিত মহিলা,তিনি আমেরিকার বাসিন্দা।মা সেই থান কেটে তিনবোনের জন্যে একই রকম জামা বানিয়েছেন মেশিনে। আমারটায় বুকের কাছে একটু বেশি ঝালর।তিনবোনের পায়েই লাল রঙের ভেলভেটের চটি।এগুলো কেনা হয়েছে দমদম নিউমার্কেটের একটা দোকান থেকে।
মায়ের পরণে হালকা পেঁয়াজের রঙের একটা বেনারসী,মাথায় খোঁপা,খুবই সামান্য গহনা,যেগুলো সবসময়ই পরে থাকতেন,আর বাবার পরণেও সিল্কের ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবি আর ধুতি।বাবা সবসময়ই বাইরে ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন।শুধু আন্তর্জাতিক স্তরের কোনোও মিটিং বা ট্রাভেল করার সময় প্যান্ট শার্ট পরতেন।
বাবার হাতে যথারীতি চুরুট।সিগারেটের বদলে বাবা এটা খেতে শুরু করেছিলেন ঠিকই,কিন্তু দুটোই সমানতালে চলছিল।
যাহোক,আমরা গাড়ি থেকে নামা মাত্র সেই রাজবাড়িতে শোরগোল পড়ে গেল।ঘোষাল বাবা এসে গেছেন।শুভ ক্ষণ শুরু।এবার আর চিন্তা নেই।কাজ শুরু করে দেওয়া যাবে।
ঢুকেই কানে এল বৈদিক মন্ত্র পাঠ চলছে, যজ্ঞের বেদীতে কতমন ঘি ঢালা হয়েছে কে জানে!চারদিকে ঘি,চন্দন কাঠ,বেলপাতার গন্ধ।
বাবাকে নিয়ে যাওয়া হল একটা ফুল দিয়ে সাজানো মন্ডপে। বাবার পা থেকে চটি খুলে জল দিয়ে ধুয়ে দিল ওরকম জমকালো সাজগোছ করা এক মহিলা।একজন এসে বাবার মাথায় পরিয়ে দিলেন উষ্ণীষ। দেখলাম সবচেয়ে বড় হীরে লাগানো সেটায়।পায়ে জুতো খুলে তার পরিবর্তে পরানো হল নাগড়া,তাতেও সোনার পাথর।
অবাক বিস্ময়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম কি ঘটতে চলেছে এখানে। বাবার সাজ শেষ হতেই নব বধূর সাজে যিনি এসে যেখানে যজ্ঞ চলছিল বসলেন তাঁকে খুব চেনা চেনা মনে হল।যদিও প্রায় মুখ ঢাকা আর ভারী ওড়নার ওপর এতই পাথরের ঝলমল যে বুঝতে পারছিলাম না তিনিই সে কিনা!
একটু পরেই সাদা ঘোড়া থেকে নেমে এলেন এক রাজপুত্র। তার পরণেও অলংকার খোচিত পোশাক। নেমে এসে নিচু হয়ে তরোয়াল খুলে উষ্ণীষ আর তরোয়াল রাখলেন বাবার পায়ের ওপর।বাবা মাথায় হাত দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করলেন।চারদিকে ক্যামেরার ঝলকানি।বাবা তারপর আবার সেই তরোয়াল আর উষ্ণীষ পরিয়ে দিলেন সেই সুপুরুষকে।
তিনি এবার মায়ের কাছে এসে হাতজোর করে প্রণাম করলেন।আমার মা মৃদু হাসলেন।
বুঝতেই পারছিলাম, আমরা যেমন অবাক,মাও ততটাই অবাক।কিন্তু মা তার অসম্ভব ব্যক্তিত্বের আড়ালে তা বুঝতে দিচ্ছেন না।
শুরু হল বেদ পাঠ। রাজকন্যা আর রাজপুত্র পাশাপাশি বসলেন।তাদের চারপাশে রাজারানীর দল।
আমরাও তিনবোন চেয়ার নিয়ে বসে দেখতে শুরু করলাম কিভাবে শুটিং চলছে।মাঝে মাঝেই যারা এসে মায়ের কাছে এসে প্রণাম করে যাচ্ছেন তাদের না চিনলেও যারা তাদেরকে নিয়ে আসছেন তাদের চেনা মনে হচ্ছে। যদিও আলোর রোশনাইয়ে পোশাকের চাকচিক্যের মাঝে সোনা হীরে জগরতের সমারোহে চেনা অচেনা সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
তারই মধ্যে চলছে বিভিন্ন খাওয়া দাওয়া।
একসময় বিয়ে সমাপ্ত হল।এবার আমাদের ফেরার পালা।সেই সময় দেখলাম, যিনি এসে আমাদেরকে গাল টিপে আদর করলেন তিনি হলেন ‘হ্যাঁ বাবা’।এই নাম তার নয়।আমরা তাকে ভালোবেসে এই নাম দিয়েছি।কারণ তিনি বাবা যা বলেন তাতেই বলেন- হাঁ বাবা।
তিনি হলেন ময়ূরভঞ্জের মহারাণী। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম এখানে যে দৃশ্যগুলো এতক্ষণ দেখছিলাম,তা রিয়েল শো।এই রাজপরিবারের দ্বিতীয় কন্যার বিবাহ হলো আজ, কনেও আমাদের খুবই পরিচিত প্রকৃতি দি।আজ সেই পাত্রী।আর এই রাজপরিবারের অলিখিত ঈশ্বর হলেন তাদের ঘোষাল বাবা।
সেই মুহূর্তে জন্য মনে হয়েছিল,রাজবাড়িতে জন্মেছিলাম বলেছিলাম,বলে ছোটোবেলায় বাবা ভাবতেন তার এই কন্যা জাতিস্মর।অবশ্য শীঘ্রই তার মোহ ভঙ্গ হয়েছিল,তিনবছরের মেয়েটি যখন বলেছিল,বিরক্তির সুরে,আমি বাসন মাজতাম।
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে সত্যি রাজবাড়িতে না জন্মে খুব ভালো হয়েছে।কেমন সোনার শিখলে বাঁধা পড়া এদের প্রাণ, সব আছে কিন্তু যেন বড়ই মেপে চলা জীবন।
তবু একটা জিনিস মন টেনেছিল সেই বয়সে,এক রাজপুত্র আসবে ঘোড়ায় চড়ে,তারপর তরোয়াল আর উষ্ণীষ খুলে রাখবে বাবার পায়ে,চাইবে বাবার রাজকন্যার হাত।