সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিতস্তা ঘোষাল (পর্ব – ২০)

কু ঝিক ঝিক দিন

২০.

“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে ,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই ।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয় – মাঝে যদি স্থান পাই ।
ধরায় প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত ,
বিরহ মিলন কত হাসি – অশ্রু – ময় ,
মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত
যদি গো রচিতে পারি অমর – আলয় ।
তা যদি না পারি তবে বাঁচি যত কাল
তোমাদেরি মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই ,তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল
নব নব সংগীতের কুসুম ফুটাই ।
হাসিমুখে নিয়ো ফুল , তার পরে হায়
ফেলে দিয়ো ফুল , যদি সে ফুল শুকায় ।”
রবীন্দ্রনাথের এই প্রাণ কবিতাটি মা আমাকে মুখস্থ করিয়েছিলেন অন্যান্য বহু কবিতার সঙ্গে। তখন আমার বয়স কত!ছয় সাত হবে। মা রোজই শিশু ভোলানাথ, আবোলতাবোল,সঞ্চয়িতা ও রবীন্দ্ররচনাবলী থেকে কোনো না কবিতা মুখস্থ করাতেন।এবং সেগুলো কোনোটাই পাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।কিন্তু জিভের জড়তা ভাঙানোর জন্য এটাই মায়ের কাজ ছিল।
এই কবিতাটা আমি খুব ভালো মুখস্থ করেছিলাম আর মা ঠিক যেভাবে শিখিয়েছিল সেভাবেই বলার চেষ্টা করতাম।
তখনো আমি কেন মরতে চাই না বা মৃত্যু কি এগুলো জানার বা বোঝার মত বয়স হয়নি।কেউ মারা গেলে বাড়িতে যখন তা নিয়ে কোনো কথা হত তখন ভাবতাম, মরে গেছে তো কি হয়েছে,কদিনের তো ব্যাপার। আবার ফিরে এলেই দেখতে পাওয়া যাবে।এত মন খারাপের কী আছে!
এইসময় “মৃতেরা এ-পৃথিবীতে ফেরে না কখনো। মৃতেরা কোথাও নেই; ” এই বোধ বা উপলব্ধি কোনোটাই হবার মত কিছু ঘটেনি।তাই মরে গেলে সোনার গৌড় আর তো ফিরে পাব না শুনে প্রশ্ন করেছিলাম,মরে গেলে যখন পাওয়া যায় না তখন মরার দরকার কি!
আসলে “জনমিলে মরিতে হবে অমর কে কোথা কবে? চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে? “- (মাইকেল মধুসূদন দত্ত )এটাও তখন জানতাম না।
মৃত্যু কি এবং সেটা যে একটা স্থায়ী বিচ্ছেদ, যেখান থেকে হাজার চেষ্টা করলেও আর ফিরে আসা যায় না এই উপলব্ধি প্রথম হল ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়।আমার ঠাকুরদা ৩১ডিসেম্বরের রাতে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।কেমন ভাবে গেলেন কিংবা কিভাবে মানুষ মারা যায় এই প্রশ্নগুলো তখন প্রথম মাথায় এল।ঠাকুরদার মৃতদেহ আমরা দেখিনি।আজিমগঞ্জের বাড়িতে ঠাকুরদার শরীর খারাপ শুনে আমাদের তিন বোনকে দিদা দাদুর জিম্মায় রেখে মা বাবা আগেই চলে গেছিল সেখানে। ৩১তারিখ ফেরার কথা ছিল। কারন ঠাকুরদা তখন সুস্থ। মায়ের মুখে শুনেছি, রেডি হয়ে বেরবার মুহূর্তে ঠাকুর দা মাকে বলেছিলেন,বৌমা একটু জল দাও আর বারোটা দশ বাজা অবধি অপেক্ষা করো।মা খুব অবাক হলেও দাঁড়িয়ে গেছিল।কারণ ট্রেন ধরার তাড়া ছিল না।ঠাকুরদা বারোটা দশে মায়ের হাতে জলটুকু খেয়ে চোখ বুজলেন।আমরা তিনবোন তখন কলকাতায়। এ খবর জানি না।আমাদের নিতে এলো বাবার প্রাণের বন্ধু মন্টু কাকু।ছোট থেকেই তাকে নিজের কাকু বলেই জানি।অনেক পরে জেনেছি, আসলে তিনি বাবার বন্ধু। যাহোক তিনি আমাদের বাসে করে নিয়ে চললেন বহরমপুর।সেদিন রাতে তার বাড়িতে থাকব।পরদিন সকালে আজিমগঞ্জ।মানুষ চলে গেলে যে অশৌচ হয়,আর শুধু সেদ্ধ চাল,আলু কাঁচকলা,ডাল, সেদ্ধ আর ঘি খেতে হয় একপাকে রান্না করে এসব জানা তো বহুদূর,শুনিওনি কখনো।কাকুর বাড়িতে আমাদের রাতে তাই দেওয়া হল।আলাদা ঘরে বসিয়ে।তখনো জানি না গিয়ে আর ঠাকুরদার সঙ্গে দেখা হবে না।আর এই না দেখাটা আজীবন কাল থেকে যাবে।
সেই প্রথম বুঝতে পারলাম, যারা চলে যায় ফেরে নাতো হায় পিছুপানে…।
তবে সামনাসামনি মৃত্যু কাকে বলে দেখলাম ন’দাদুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে।ন’দাদু আমার বাবার মামা।আর্মির ডাক্তার ছিলেন।বাবা গল্প করতেন,যখন ছুটি পেয়ে বাড়ি ফিরতেন বাবাকে ওজন মাপার ওজনদারিতে একদিকে বসিয়ে আরেকদিকে টাকা পয়সা রাখতেন।বাবার ওজন কখনো কম হত না তার সেই মাপায়।তিনি মনে করতেন পৃথিবীর যাবতীয় সম্পত্তি এক করলেও বাবার সমান হবে না।কারণ তার ভাগনে সাক্ষাৎ বিষ্ণু অবতার।
ন দাদু বিয়ে করেননি।তার ভাইয়ের স্ত্রী পেটে সন্তান নিয়ে বিধবা হয়েছিল।তাকে দেখার কেউ ছিল না।দাদু তাদের সব ভার সারা জীবন বহন করলেন।সেই মামী দিদা ঘোমটা যার সবসময় মুখের শেষ অবধি টানা থাকত, তিনি বলতেন,ন দাদু ভগবানের মতো তাকে আগলে রেখেছিলেন।দুজনে কথা বলত আপনি আপনি করে।আমার খুব মজা লাগত।
নদাদু বলত,বৌঠান,আর তিনি বলতেন,হ্যাঁ,ঠাকুর পো।
সে যাইহোক, ন দাদুর মুখে নানা গল্প শুনতে ভালো লাগত,আর তার সঙ্গে আর্মিতে থাকাকালীন তার নানা দুঃসাহসিক কান্ডকারখানা আমাদের মুগ্ধ করত।
জানো মুনাই,সেই সেবার যখন আফগানিস্তানের সঙ্গে ব্রিটিশদের যুদ্ধ হচ্ছে তখন জঙ্গলে তাঁবু পেতে রয়েছি।তোমাকে কি বলব যা বড়ো বড়ো ভালুক,শ্বেত ভালুক এসে হাজির।আহতদের চিকিৎসা করব নাকি ভাল্লুক সরাবো!তাও আবার এইরকম ভাল্লুক!
বাবাদের মামারা প্রত্যেকেই এত সুন্দর গল্প বলতেন যেন মানসচক্ষে দেখতে পেতাম সব কিছু।
আর তার ছিল একটা বন্দুক।এটা তাঁর পুরস্কার হিসাবে পাওয়া।কোন আর্মি অফিসারের প্রাণ বাঁচিয়ে ছিলেন, তিনি যাবার সময় এই বন্ধুক তাঁকে দিয়ে গেছিলেন।
বন্ধুকটা দেখার জন্য আমরা ছটপট করতাম।হাতে নিয়ে দেখতাম।ভাবতাম হাত দিলেই গুলি বেরিয়ে যাবে।কিন্তু তাতে যে গুলি ভরতে হয়,নইলে কিছু হবে না তা তিনি বলতেন না।সব সময় বলতেন,গুলি আছে।দেখো টিপে দিও না।ফলে সাবধানে তা পরখ করে আবার ফিরিয়ে দেওয়া।
এক ছুটির দিন তার বাড়িতে আমি আর বোন তার দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প শুনছি,তিনি বন্দুকের গুলি রাখার জায়গাটা পরিস্কার করছেন আর বলছেন,এমন সময় দেখি তিনি কাশতে শুরু করলেন।জল দিতে না দিতেই শুয়ে পড়লেন।নানু কাকু চিৎকার করে উঠল,জ্যাঠামশাই…।
ডাক শুনে পাশের বাড়ি থেকে আমার ছোটকা ছুটে এল।শুনলাম দাদু আর নেই।
মৃত্যু এত নিঃশব্দে আসে,বুঝতেও দেয় না,এখনি যে মানুষটা এত কথা বলছিল,এক নিমেষে মৃত!ন’দাদুকে দোতলা থেকে একতলায় নিয়ে আসা হল। চারটে বাঁশের মধ্যে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হল শশ্মানে।এর আগে বাবার সঙ্গে বহু রাত শ্মশানে থাকার সুবাদে মৃতদেহ পুড়তে দেখেছি,এই প্রথম নিজের কাউকে দেখলাম।
সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম মৃত্যু আসলে একটা মানুষের জীবনের সমাপ্তি। যেখান থেকে কখনো ফেরা যায় না।
এর পর বহু বছর কেটে গেছে। একদিন রঘুদা,যিনি রামকৃষ্ণ মিশনের পুরোহিত, একদিন গল্পচ্ছলে বললেন,আত্মা ফিরতে চায় নিজ শরীরে, তার প্রিয় লোকেদের কাঁদতে দেখে ব্যাকুল হয়,ফেরার জন্য আকুলিবিকুলি করে শেষ অবধি। কিন্তু শরীরের সব দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায় তখন।ঠিক যেমন বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলে বাইরের আর কেউ ঢুকতে পারেনা,তেমনি আত্মা তখন বাইরের লোক। সে আর ঢুকতে পারেনা শরীর রূপী বাড়িতে।
সেই প্রথম প্রশ্ন জেগেছিলে মাথায়,তবে যে বলে জীর্ণ বস্ত্র ছেড়ে নতুন জামা পড়ে আত্মা।সেই জামাটা হল শরীর।তাহলে যারা চলে গেল তারা কখন সেই জামাটা পড়বে,আবার ফিরে আসবে আর ফিরে এলে চিনতে পারব তো!সেও কি চিনবে আমায়!
নাকি আমরা পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বলব-
“মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নব প্রভাতের শিখর চুড়ায়;
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু বিদায়।”(শেষের কবিতা -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
ক্রমশ…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।