ক্যাফে সাক্ষাৎকারে বিতস্তা ঘোষালের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

সাক্ষাৎকার

আলোকবিন্দু, যার হদিশ এখনো পাইনি, আমার লেখায় আমি তাকেই ছুঁতে চাইছিঃ বিতস্তা ঘোষাল
কবি সাহিত্যিক অনুবাদক বিতস্তা ঘোষালের সঙ্গে আলাপচারিতায় বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

১| তোমার ছোটবেলাটা আরও পাঁচজনের চেয়ে আলাদা। তীব্র লড়াইয়ের। আজ তুমি একজন সুপরিচিত শব্দশিল্পী। কেমন ছিল শব্দ অনুসন্ধানের সেই প্রাথমিক দিনগুনি।
উঃ আসলে আমি খুব একটা লড়াই ছোটোবেলায় অনুভব করিনি। কথা বলতে সমস্যা ছিল, কিন্তু আমি খুব মিশুকে ছিলাম।তাই সেগুলোকে খুব একটা পাত্তা দিতাম না। মা- বাবা অনেক বেশি লড়াই করেছেন আমাকে নিয়ে। তবে অনেক সময় বড়রা ভ্যাঙাতেন গলার স্বর নকল করে। স্কুলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাদ দিয়ে দিতেন উচ্চারণের কারণে।কিন্তু বাবা আমাকে এসব মন খারাপ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছোটো থেকেই রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, সারদা মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে যদি কখনো কেউ আঘাত দিত, আমি এসে এদের কাছে বলতাম। বলা যেতে পারে এরাই ছিলেন আমার পরম বন্ধু।তাই বাইরের ঘটনা অতটা প্রভাব ফেলত না। তাছাড়া আমার দুই বোন ,তারাও আমাকে সব সময় সামলে রাখত। এই প্রসঙ্গে একটা মজার কথা মনে পড়ল।আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি।একজন টিচারের কাছে পড়তে যাই। রাস্তায় রোজই কতগুলো ছেলে আমার স্বর নকল করে নানা কথা বলে।আমি যে খুব কষ্ট পাই তা নয়। তবে রোজ বললে একটু মন খারাপ হয়। তো একদিন আমি পড়তে যাচ্ছি। যাবার সময় তারা যথারীতি একই কান্ড করেছে। ফেরার সময় দেখি সব চুপ। কেমন একটা অবাক লাগল। খানিকটা এগিয়ে এসেছি।হঠাৎ পিছন থেকে শুনলাম কেউ বলল, আর ভুলেও পেছনে লাগিস না। জুতোর দাগ, চড় থাপ্পড়গুলো মনে রাখিস।
বাড়ি এলাম। দেখলাম ছোটো বোন আমার দিকে তাকিয়ে।বলল, ফেরার পথে কোনও সমস্যা হয়নি তো! আমার একটা কি মনে হল।পরে জানতে পারলাম বোন কদিন আমাকে অনুসরণ করে এগুলো লক্ষ করেছিল। ওকে ওর কোনও বন্ধু খবর দিয়েছিল যে ছেলেগুলো এভাবে আমাকে ভ্যাঙায়। সেদিন সে গিয়ে জুতো খুলে তাদের বেদম মেরে এসেছিল। তখন সে ক্লাস ফোরে পড়ত।
মা বাবা সব সময় আমাকে এটাই বুঝিয়েছিলেন, আমার থেকেও অনেক বেশি প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মানুষ বেঁচে আছে। কাজেই এ নিয়ে মন খারাপ না করে আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই আনন্দ নিয়ে বাঁচা উচিত।আমি নিজেও তাই মনে করি। কলেজে হায়ার স্টাডিতে, চাকরির ক্ষেত্রে তাই প্রতিবন্ধী কোঠায় সুযোগ থাকলেও আমার বাবা মা কখনোই সেই সুযোগ নিতে দেননি। এটাই আমার আত্ম বিশ্বাসকে তুঙ্গে রাখতে সাহায্য করেছে। তবে হ্যাঁ, বিভিন্ন জায়গায় এর কারনে বাদ পড়ি। সর্বভারতীয় এক চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেখাতে চায়নি রেকর্ডিং-এর পরেও। অনেক পরে দেখালেও আর যে ডাকবে না এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তাই নিজের কাজে জোর দিই। জানি ভালো কাজ হলে ডাকতে বাধ্য হবে।
২| লেখালেখি তোমার রক্তে। লেখার টেবিল তোমাকে ডাকবে এটাই স্বাভাবিক।তবু অন্য কোন কিছু নয় লেখাই কেন হয়ে উঠল তোমার আশ্রয়।
উঃ লেখক হব এমন কোনো পরিকল্পনা আমার ছিল না।এটা ঠিক যবে থেকে লিখতে শিখেছি তবে থেকে মা রোজ কিছু না কিছু লিখতে বলতেন।সারাদিন যা যা ঘটেছে, যা দেখেছি, শুনেছি সব রুল টানা খাতায় লিখে রাখতে হত মায়ের জন্য। মা বি এড পড়তে যেতেন।ফিরে এসে সেই খাতা দেখে যা যা ভুল ঠিক করে দিতেন। ভালো হলে একটা গল্পের বই উপহার পেতাম। ফলে লেখার একটা চর্চা তৈরি হয়েছিল সেই তিন চার বছর থেকেই।এটা যে শুধু আমার তা নয়, তিন বোনেরই হয়েছিল এভাবেই। এরপর এল তুলসীদি। আমাদের দেখার জন্য। সে নিজেও ছোটো। আমার থেকে খুব বেশি হলে বছর তিনেকের বড়। সে আমাদের নানা গল্প শোনাত। সবটাই ছিল তার বানানো। বলা শেষ হলে আমরা আবার নিজেদের মত করে সেটা লিখে তাকে শোনাতাম।এটা একটা মজার খেলা ছিল আমাদের।
কিন্তু সক্রিয় ভাবে লিখব ভাবিনি। আমি স্ক্রিপ্ট লিখতাম নাচের, নৃত্যনাট্য, নাটকের। এটা ভালো লাগত। তাছাড়া ভেবেই রেখেছিলাম নৃত্যশিল্পী হব।তাই এগুলো মন দিয়ে করতাম। স্কুলে অবশ্য ম্যাগাজিনে দু’বার লিখেছি।তবে কবিতা বাবা লিখে দিয়েছিলেন। স্মৃতি কথা আমি নিজে লিখেছিলাম। তাছাড়া রচনা আমি কখনো মুখস্থ করে লিখতাম না। যেগুলো অফবিট যেমন পোড়ো বাড়ির আত্ম কথা, একটি রাস্তার আত্ম কথা, ঝড়ের রাত এসবগুলো লিখতাম।দিদিরা খুব প্রশংসা করতেন। ভাব সম্প্রসারণে আমার নাম্বার সবচেয়ে বেশি হত। কিন্তু সেগুলোর সঙ্গে সাহিত্যের অনেক তফাত। সে অর্থে প্রথম গল্প লিখি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট অসম্পূর্ণ এলে। সেটা আমাকে খুব লজ্জায় ফেলেছিল। বন্ধুরা মনে করেছিল আমি ফেল করেছি। কলেজে সে বছর ভর্তি হতে পারলাম না রেজাল্ট পুরো না আসায়।মামলা করে জিতে যখন প্রথম ডিভিসন পেলাম ততদিনে আরেকবার পরীক্ষা দেওয়া হয়ে গেছে। সেই রেজাল্ট অবশ্য ফার্স্ট ডিভিসনই হয়েছিল। তো এই পুরো পিরিয়ডটায় মনের ওপর যে চাপ পড়েছিল, তাই নিয়েই গল্প লিখেছিলাম।সেটা তার পর আনন্দ মেলায় ছাপা হয়েছিল। অবশ্য সেটা আমার পিসির কারসাজি।এর আগেও পিসি নিজে গল্প লিখে আমার নামে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন এবং বাবা এটা ভীষণ অপছন্দ করেছিলেন।
যাহোক, কলেজে পড়তে পড়তে বিয়ে, তারপর বাচ্চা, সংসার সব মিলিয়ে প্রচন্ড ডিপ্রেসন শুরু হল। নাচ ছাড়া থাকতে পারতাম না, তাও প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।একটা তীব্র অভিমান তৈরি হচ্ছিল নিজের মধ্যে। চাকরি পেলাম। সেটাও ভালো লাগছিল না। পড়তে চেয়েছিলাম সাংবাদিকতা। কিন্তু ইতিহাসে এম এ করে পড়লাম লাইব্রেরি সায়েন্স। এইসব নিয়ে মন খারাপ হচ্ছিল। তখন দেখলাম খাতা পেন ছাড়া আমার মনকে সুস্থ রাখার উপায় নেই। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, আমার জন্মের আগে বাবা ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন আমার সম্পর্কে।আমি খুঁত নিয়ে জন্মাবো আর যে কথা বলতে পারব না সেগুলো লিখব। লেখার জন্যই আমার জন্ম হচ্ছে। যদিও এগুলো তখন ভাবিনি।কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝেছি এটা ছাড়া আমি আর কিছুই পারি না।
৩| সাহিত্যিক বৈশম্পায়ন ঘোষাল এক কিংবদন্তি মানুষ । আনন্দ পুরস্কার আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত লেখক। এই উত্তরাধিকার তোমার ক্রোমোজোমে। কৃতি বাবার সুযোগ্যা কন্যা হয়ে ওঠার যে যাত্রাপথ তোমার জীবনে।  সেখানে প্রত্যাশার চাপ এবং তার ভেতর  নিজস্ব প্রকরণ তুলে ধরার ক্ষেত্রে তোমার ভূমিকা এই দুইয়ের সমীকরণ নিয়ে কিছু বলো।
উঃ কিংবদন্তী মানুষের সন্তান হবার চাপ থাকে।এটা অস্বীকার করার কোনও কারন নেই। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু অন্য রকম ছিল। যখন প্রথম আমি লিখতে শুরু করলাম তখন কেউ জানতেন না আমি বৈশম্পায়ন ঘোষালের মেয়ে। আমি যখন অনুবাদ পত্রিকা দপ্তরে যোগ দিলাম তখন বাবা বলে দিয়েছিলেন যে তুমি আমার পরিচয় কোথাও দিতে পারবে না। নিজের পরিচয় নিজেই। তো আমি তাই সবসময় এটাই মাথায় রেখেছি। পত্রিকায় যোগ দেবার পর আমি বেশি জোর দিয়েছিলাম বিজ্ঞাপন ও বিপননে। ফলে সেখানে বাবার পরিচয় দিতে হয়নি। লেখক হিসেবে প্রথম থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক কাগজে লেখা পাঠিয়েছি।সেখানেও পিতৃপরিচয় দরকার হয়নি। কিন্তু একেবারে গোঁড়ায় যে দুটি পত্রিকা আমাকে লেখক হিসাবে পরিচয় ঘটালো- মালিনী ও কেতকী- দুটো পত্রিকার সম্পাদকই বাবার কথা জানতেন এবং বাবার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল।এক্ষেত্রে মালিনীর সম্পাদক মায়া সিদ্ধান্ত আমাকে গল্প লেখার স্বাধীনতা দিলেন, আর কেতকীর সম্পাদক মোহিনী মোহন গঙ্গোপাধ্যায় মনে করলেন বৈশম্পায়নবাবুর মেয়ে, কাজেই কবিতা তার রক্তে থাকবেই।
কিন্তু এই দুটি ক্ষেত্রে আমি লেখক হিসেবে কোনও চাপ অনুভব করিনি। বরং কি লিখব সেটাই চাপ সৃষ্টি করেছিল।তবে বাবা লেখক হিসেবে সে অর্থে জনপ্রিয় নন। তিনি সম্পাদক ও ভিন্ন ভাবনার জন্য বেশি আলোচিত। তাই আমি সম্পাদনার ক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তে সেই তুলনাটা অনুভব করি। বুঝতে পারি বাবার নিরিখে আমাকে বিচার করা হচ্ছে। এটা কিন্তু আমি খুব উপভোগ করি। কারন তুলনা তখনই কেউ করেন যখন জিনিসটা টিকে থাকে, কিছুটা হলেও একটা পর্যায়ে পৌঁছায়। যদি সেটা না হত আমার দুঃখ হত। বাবা মা বেঁচে থাকেন সন্তানের মধ্যে দিয়েই। যতদিন অনুবাদ পত্রিকা বেঁচে থাকবে ততদিন বাবাও থাকবেন। এর থেকে বড় প্রাপ্তি কী হতে পারে! তাছাড়া একথা তো অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই আমি কোনদিনই বাবার মত পন্ডিত, গুনী হতে পারব না। তাই এই নিয়ে চাপ নেই।
৪| একটু সহজ করে বলি তুমি খুব ভালো লিখলেও লোকে বলবে  বৈশম্পায়নবাবুর মেয়ে সে তো ভালো লিখবেই। আবার খুব সাদামাঠা লিখলে বলবে বৈশম্পায়নবাবুর মেয়ে হয়ে এত সাধারণ লেখে যে পাঠযোগ্য নয়।এই  দ্বিমুখী ভাবনার বলয়ে তোমার নিজস্ব ভাবনা কি কখনও বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে? কখনও কি প্রভাবিত মনে করেছো বা কোন আইডেনটিটি ক্রাইসিস অনুভব করেছো ?
উঃ লেখক হিসাবে হয়নি। কারন আমার যে সব উপন্যাস , তার প্রায় সব কটাতেই ভীষনভাবে কোথাও না কোথাও বাবা জড়িয়ে।বাবার দর্শন, আদর্শ, ভাবনা এসব উঠে আসে আমার লেখার মধ্যে। ফলে তুলনাটা আমার নিজের সঙ্গে নিজের। আমি বাবাকে কতটা তুলে ধরতে পারছি, বাবা সারাজীবন যেগুলো বলতে চেয়েছেন আমি সেগুলো ঠিক মত বলতে পারছি তো!এটা একটা কি বলব! যদি বলো নিজস্বতার অভাব তাহলে তাই। কিন্তু তা আমার ভাবনাকে বাধা দেয় না। বরং সমৃদ্ধ করে তোলে। আসলে এই যে আইডেনটিটি ক্রাইসিস এটা আমি কখনোই অনুভব করিনি। তবে কিছু ঘটনা ঘটেছে বাবার মেয়ে হবার জন্য। যেমন প্রথমবার যখন বাংলা আকাদেমি পুরস্কার দেওয়ার কথা শুনলাম, অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে আমাকে ওখান থেকে জানালেন সচিব এবং দেখা করতে বললেন, আমি গেলাম। ওনারা তখন বাবার কথা বলে বললেন যে এমন ভাবনা আজ অবধি কেউ ভাবেননি। আমার তখন মনে হল পুরস্কারটা বাবারই পাওয়া উচিত।আমি সঙ্গে সঙ্গে জানালাম, আমি একেবারেই নবীশ, পুরস্কারটা বাবারই পাওয়া উচিত। যদিও বাবা রিফিউজ করলেন, কিন্তু আমার খুব আনন্দ হল যে বাবার কথা এভাবে সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হল।
একটা জিনিস আমি মনে করি, তুলনা না থাকলে, প্রতিযোগীতা না থাকলে নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন, ভালো কাজের জন্য সেই তাগিদ থাকে না। আমি নিজেকে প্রতিমুহূর্তে চ্যালেঞ্জ করি, আগেরটার থেকে বেটার করতে হবে, একটা লেখাও লেখা হচ্ছে না… এসব ভেবে। এই ক্রাইসিসটাই আমার এত মারাত্মক, নিজের মনের মত লেখার জন্য এতটাই পাগলামি আছে যে অন্য বাইরে থেকে আসা তুলনা আমাকে প্রভাবিত করে না।
৫| ফেসবুকে খুঁজে নেব। তোমার কাব্যগ্রন্থ। সনাতনী রিক্সার উৎস সন্ধানে তোমার গবেষণাধর্মী বই। একদিকে প্রযুক্তির বিপ্লব অন্যদিকে সাবেকিয়ানা। এই দুই  ভিন স্রোত  কীভাবে ইন্টারসেক্ট করেছে তোমার সাহিত্যে?
উঃ ফেসবুকে খুঁজে নেব আমার তৃতীয় কাব্য গ্রন্থ।এর আগে দুটো অপ্রেমের প্রবেশপথ আর বৃষ্টিভেজা শব্দেরা।আমি কবিতা লিখি ঠিকই, কিন্তু আদৌ সেগুলো কবিতা হয় কিনা জানি না। অন্য দিকে অনেকেই মনে করেন আমি কবি। তা তাদের উৎসাহে এবং অনেক সময় নিতান্ত মন খারাপ থেকে কবিতার মত কিছু লিখি।আসলে আমাদের চারপাশে অনেক ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে যার প্রতিবাদ করতে ভীষন ইচ্ছে করে, কিন্তু যেহেতু পত্রিকা ও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত, তার ওপর বাবার একটা ঐতিহ্য জড়িয়ে তাই সবসময় সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করতে গেলে ভাবি অনেক কিছু। তখন বিকল্প হিসেবে কলম তুলে নিই। এখানে বাবার একটা কথা প্রভাবিত করেছে। সব প্রতিবাদ চেঁচিয়ে, রাস্তায় নেমে হয় না। পৃথিবীর যাবতীয় প্রতিবাদ উঠে এসেছে সবার প্রথম লেখকের কলমে।কলমকেই তাই সবচেয়ে বেশি ভয় পায় বিরুদ্ধ শক্তি। তো আমার এটাই মনে হয়, হয়তো সে কবিতা কেউ পড়লেন না, কোথাও পোস্ট বা ছাপাও হল না।কিন্তু মন শান্ত হল।
অন্য দিকে গবেষণা আমার একটা প্রিয় বিষয়। যেকোনও লেখার ক্ষেত্রেই আমি চাই যাতে এমন কিছু সূত্র থাক যা আরেকজনকে উৎসাহিত করবে সেটা নিয়ে আরও কাজ করতে। রিকশা নিয়ে যখন কাজ করতে বসলাম, আমার ধারণাতেও ছিল না এই নিয়ে এমন কাজ হতে পারে।আত্মজার কর্নধার অরুনাভ যখন বললেন এটা করতে, সত্যি আমি আকাশ থেকে পড়লাম।এমন বিষয় যার কোনও বাংলা বই নেই, এমনকি সারা পৃথিবীর রিকশা নিয়েও কোনো পূর্নাঙ্গ বই নেই। প্রথমে ভাবলাম পারব না। কিন্তু পরমুহূর্তে মনে হল পারব না মানে পারব।না আছে বলে হ্যাঁ আছে।আর ছোটো থেকে একটা জিনিস আমাকে চালায়। না বলে কোনও শব্দ আমার অভিধানে নেই।চেষ্টা তো করি, তারপর দেখা যাবে।
এটার ক্ষেত্রেও তাই হল।শুরুটা অবশ্য খুব শক্ত ছিল। কোথা থেকে আরম্ভ করব বুঝতে পারছিলাম না।তারপর দেখলাম হয়ে গেল। আমি হয়তো দ্বিতীয়বার আর এই কাজটা করতে পারব না। তখন একটা ঘোর বলো, একটা ঐশ্বরিক আলো বলো কাজটা করিয়ে নিয়েছিল।
এই ঘটনা অবশ্য বাঙালি নারীর সার্কাস অভিযান, মহাশ্বেতা ভগিনী নিবেদিতা লিখতে গিয়েও অনুভব করেছি।আসলে যে কাজ যত কঠিন আমি তত বেশি আনন্দ পাই সেটা করে।এটাই আমার নেচার। তাই হয়তো কাজগুলো করতে গিয়ে আলাদা উৎসাহ কাজ করে।
৬| তোমার গল্পে বা উপন্যাসে  ইতিহাস এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। যেমন দশম শ্রেণির অকথিত কথামালা।ব্যক্তিগত পরিসর পেরিয়ে সত্তরের উত্তাল সময় ছাপ রেখেছে এই উপন্যাসে। এ কি  ইতিহাসের ছাত্রী বলে নাকি আরও গভীর কোন অনুচিন্তা লুকিয়ে আছে?
উঃ ইতিহাসের ছাত্রী বলে হয়তো বাড়তি একটা উৎসাহ আছে। তবে যেখানে ইতিহাসের কোনও দরকার নেই সেখানে তো এনে লাভ নেই। কিন্তু একটা জিনিস ঠিক, প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে কিছু না কিছু ঘটনা থাকে, সেটা ইতিহাস বল, সোসিওলজি, সাইকোলজি, পলিটিক্যাল সায়েন্স যাই বলো না কেন থাকবেই। একটা লেখা নেহাত গতানুগতিক লেখা হলে আমি নিজে খুব একটা উৎসাহ পাই না। সেইজন্য এমন লেখা লিখতে চাই যাতে অল্প হলেও ইতিহাস আসে। তাছাড়া আমরা ক্রমশ অতীত থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছি।নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ভুলতে বসেছি। একটা দায় থাকে যদি লেখার মধ্যে কিছুটা সেসব দিনের কথা ফিরে আসে।
দশম শ্রেণির কথকতায় নকশাল আন্দোলন বা সত্তর দশক এসেছে নিজের মতো করেই। কারন আমার জন্মের আগে কলকাতা এভাবেই উত্তাল ছিল। আমি যেখানে বড় হয়েছি সেখানে চারপাশের বাড়িতেই কেউ না কেউ কোনো না কোনো ভাবে জড়িত ছিলেন এই আন্দোলনের সঙ্গে। মা বাবা আত্মীয় পাড়া প্রতিবেশি সবার মুখেই এদের গল্প শুনতাম। তুমি দেখবে দেশ ভাগের কথাও এসেছে আমার লেখায়। এটাও শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছিল। কাজেই যখন লিখতে বসলাম সেগুলোকে অস্বীকার করব কী করে! তাছাড়া আমার লেখায় শুধু ইতিহাস নয়, পুরাণ, মহাকাব্য, বেদ, কোরান,বাইবেল- এগুলোও বারবার উঠে আসে। ছোটো থেকে এগুলো পড়া বা শোনার কারনে মাথায় এমন ভাবে বসে গেছে যে এসে যায় নিজের মতো করেই।
আমি যখন কোনও নতুন বিষয় নিয়ে লিখব ভাবি তখন সেই জায়গা নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করি, যাতে আরোপিত মনে না হয়। কালাপানির নির্জনতা যখন লিখেছি আন্দামান ও তার আশেপাশের সমস্ত জায়গা নিয়ে পুরো রিসার্চ করেছি, ওটা যদি উপন্যাস না হতো যে কেউ ওটা থেকে তার রিসার্চ পেপার বানাতে পারতেন। আলোর উপাখ্যানে দুটো উপন্যাস। একটা বেজিং হয়ে কানাডা যাওয়ার যাত্রাপথ আরেকটা ঢাকার প্রেক্ষাপটে। প্রথমটা পড়ে বহু মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন আমি চিনে কবে গেলাম, এত নিঁখুত খুটিনাটি কিভাবে দিলাম ইত্যাদি। ঢাকার প্রেক্ষিতে যেটা লেখা সেটাও তাই। আসলে আমার নিজের মধ্যে একটা অনুসন্ধিৎসা চলে, সেটাই হয়তো কাজ করে।
একটা লেখা মানে নিছকই তো কতগুলো ঘটনার ঘনঘটা নয়, তার সঙ্গে মানুষের মনের যে সম্পর্ক তাকে স্পেশ দেওয়ার জন্য এই ঐতিহাসিক বিষয় বা সময় খুব ভালো কাজ করে।এটা অবশ্য আমার বিশ্বাস।
৭| রূপকথার রাজকন্যা গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্পে মাটি থেকে উঠে আসা প্রতিটি মেয়ের লড়াই ও সংগ্রাম যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তা চমৎকৃত করে পাঠকদের। এই চরিত্রগুলি কীভাবে এল তোমার চিন্তায় ও কথাভূবনে।
উঃ রূপকথার রাজকন্যার প্রতিটি গল্পই আমার নিজের চোখে দেখা। হ্যাঁ তাতে নিশ্চয়ই প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রং মেশাতে হয়েছে, কিন্তু সব চরিত্রগুলোই আমার দেখা। চেনা। পথ চলতে গিয়ে এসব নারী পুরুষ বাচ্চা তুমি রোজ দেখবে। তাদের সঙ্গে রোজ দেখা হবার ফলে একটা আত্মীয়তাও গড়ে ওঠে নিজের অজান্তেই। মেয়েদের একটা আলাদা সংগ্রাম থাকে।শুধু মেয়েদের কথা বলব কেন পুরুষেরও নিজস্ব সংগ্রাম থাকে।এখন আমি নিজে মেয়ে বলে হয়তো মেয়েদের সমস্যাগুলো, তাদের অনুভূতি বেশি চোখে পড়ে বা বুঝতে পারি।এখানে একটা গল্প আছে ‘ভগবান ও ফুটপাত’। মেয়েটিকে আমি দেখি রাস্তায় একটা হোটেলের সামনের ফুটপাতে। এই গল্পের একটা লাইনও আমার বানানো নয়। ‘কড়িবর্গা’ও তাই। এই যে চরিত্রগুলো আমাকে বরাবর টানে। একটা সময় পালাবার নেশা ছিল,একটা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, রাতের পর রাত বাসে ট্রেনে জার্নি করেছি, গন্ডগ্রামের মধ্যে থেকেছি, তাদের জীবন যাত্রা লক্ষ করেছি, আমি শহরে মানুষ, জন্ম, বড় হওয়া সবটাই শহরে। তাই এই ভিন্ন জীবন আমাকে সবসময় টেনেছে। ছোটো বেলা মামার বাড়ি, পৈত্রিক বাড়ি দুটোই মফস্বলে হওয়ায় প্রান্তিক জীবনটাকে সামনে থেকে দেখেছি। যখন লিখতে বসি তখন তাই ওই চরিত্রগুলো, যেগুলো হয়তো খুবই সাদা-মাটা, তেমন ভাবে আলোচিত হবার কোনও কারন নেই, সেগুলোই আমার শহুরে দৃষ্টিতে অন্য মাত্রা পেয়েছে। লেখাতে সেগুলোই ব্যক্ত হয়েছে। এখন সেটা কতটা প্রাণ পেয়েছে তা পাঠক বলতে পারবেন।আমি চেষ্টা করেছি যোগসূত্র বাঁধতে। এইটুকুই আমার কাজ।
৮| তোমার উপন্যাসে এবং গল্পে ডায়েরি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাত্রিরাগ অথবা গল্প তৈরির কোলাজ উপন্যাসে আমরা তা দেখেছি। কিছুটা নবম শ্রেণির অকথিত কথামালাতেও।কেন ডায়েরিই বারবার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ?
উঃ ডায়েরি বিষয়টা আমার খুব প্রিয় একটা জিনিস।এর পিছনে আমার মায়ের অবদান।ছোটো বেলায় প্রতিদিনের দিনলিপি লিখে রাখতে হত।প্রথমে স্লেট, তারপর রুল টানা খাতায়,আর একটু বড় হয়ে ডায়েরি।সেখানে প্রত্যেক দিন তারিখ অনুযায়ী সকাল থেকে রাত অবধি যা যা ঘটেছে, সে ধরো বোনকে কিভাবে দুধ খাওয়ালাম থেকে পুতুল খেলা, বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি থেকে ব্রতচারী, কোনো বই পড়লে তার সাম আপ, মানে খুঁটিনাটি সব লিখে রাখতে হত। এবার সপ্তাহের শেষে সেগুলো থেকে সারা সপ্তাহ কি করিনি সেটা বের করতে হত। মা কিন্তু প্রতিদিন ডায়েরিটা দেখতেন।বাক্য গঠন, বানান ভুল থাকলে সেগুলো ঠিক করে দিতেন। তখন হয়তো রোজ লিখতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু এটা লিখলে ভালো বাচ্চা হয়ে মা’র কথা শোনার পুরস্কার পেতাম অমর চিত্র কথা, বাঁটুল দ্য গ্রেট, ভূতের গল্প মানে ওই বয়সে যেগুলো পড়া যেত। সব একটা একটা করে রোজ নিয়ে আসতেন আমার আর বোনের জন্য। বোন আবার নিজে কিছুতেই রিডিং পড়ত না। ফলে সে বই আমাকেই পড়ে শোনাতে হত অন্য দুজনকে। তাই ডায়েরি লেখা চলতেই থাকত।
একটা জিনিস দেখতাম সাতদিন পর বা মাস খানেক পর অনেক কিছু ভুলে গেছি, যেমন বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া, ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে পাঁচিল টপকানো , কুয়োয় লাফ দিতে গিয়ে ধরা পড়া … কিন্তু ডায়েরি দেখে আবার সেগুলো মনে পড়ে গেল।ব্যাস নতুন উদ্যমে আবার সেগুলো শুরু করলাম।
একটা জিনিস মনে হয় ডায়েরি হচ্ছে একটা সময়ের দলিল। প্রতিটি মানুষের রোজ নামচার গল্প সেখানে লুকিয়ে। তুমি যদি কারোর লেখা ডায়েরি পাও দেখো একটা মানুষকে চিনতে তোমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। তার সমস্ত ভাবনা, অনুভূতি, তোমার কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি যখন লিখতে এলাম জানতাম না কি লিখব, সেটা গদ্য না গল্প না অন্য কিছু। কিন্তু কিছু একটা লিখতে চাইছিলাম। সেই বিবর্ণ ডায়েরির পাতাগুলো আমাকে অনেক স্মৃতি ফিরিয়ে দিল।সেটাই উপন্যাস বা বড় গল্পের প্রেক্ষাপট হল। আমি অবশ্য চিঠির আকারেও অনেক গল্প লিখেছি।আমি নিজে প্রচুর চিঠি লিখতাম, এবং এমন ভাবে লিখতাম যাতে অন্য প্রান্তের ব্যক্তি কি উত্তর দিতে পারেন তার প্রতিফলন থাকত পরের লাইনে। এটা হচ্ছে অল্প বয়সে প্রচুর বই পড়ার ফসল। এদিক থেকে বলা যেতে পারে আমি পাকা বাচ্চা ছিলাম।
৯| অনেক দুঃসাহসী সম্পর্কের কথাও তুমি নির্ভয়ে উপন্যাসে তুলে আনতে পারো। যেমন ঘেরাটোপের নীল অতলেতে শ্রী ও তার কাকুর সম্পর্ক।এই উপন্যাস পাঠক কীভাবে দেখে? সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতার বিভেদরেখা বিষয়েই বা তোমার অবস্থান কী ?
উঃ নাহ! আমি এটা এভাবে ভাবি না। নর নারীর জীবনে অনেক কিছুই থাকে যা আমরা চট করে দেখতে পাই না। আগেকার দিনে দেখবে যৌথ পরিবারে পারিবারিক যৌনতার ঘটনা অনেক ঘটত। এবং এটা একধরনের জানা অথচ গোপন বিষয় ছিল।সেসব অনেকের লেখাতেই উঠে এসেছে। আর একটা বিষয় দেখেছি, আশ্রিতা মেয়ের ওপর পরিবারের পুরুষদের যেন একটা অধিকার বোধ থাকে। দক্ষিণ ভারতে বা মুসলিম সমাজে নিজের আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে খুব কমন। অনেক ছোটতে একটা বই পড়েছিলাম, তাতে ভাই বোনের মধ্যে প্রেম, তাদের সম্পর্ক এসব নিয়ে লেখা ছিল। আমি যখন শ্রী ও কাকুর সম্পর্ক নিয়ে লিখতে বসলাম তখন এইসব ঘটনাগুলো মনে এল। বাকিটার উপর আমার নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
এবার আসি দ্বিতীয় ভাগের উত্তরে।শ্লীলতা অশ্লীলতা শব্দগুলো আপেক্ষিক ও মুহুর্তের ওপর নির্ভর করে। আমার কাছে যেটা শ্লীল তুমি সেটা অশ্লীল ভাবতে পারো। প্রজাপতি ও বিবর পড়ে এক সময় লোকে মামলা করেছিলেন অশ্লীল বলে। ইসমত চুগতাইয়ের লিহাফ গল্পকেও অশ্লীল বলা হয়েছে। কমলা দাসের মাই স্টোরিকেও একই ভাবে ব্যান করা হয়েছিল।কিন্তু আমার এগুলোর একটাকেও অশ্লীল বলে মনে হয়নি। একজন যখন লিখতে বসছেন তখন তিনি সেই লেখার চরিত্রের উপর নির্ভর করে ঘটনা তৈরি করছেন। সেখানে যৌনতা, দাঙ্গা, নিষ্ঠুরতা বা অন্য অনুষঙ্গ কিভাবে আসবে সেটা অনেক সময় লেখক নিজেও জানেন না। তবে হ্যাঁ যদি জোর করে আরোপ করা হয়, খালি বইটা বিক্রি হবে বলে,তবে জানি না তাতে সাহিত্যগুণ কতটা বজায় থাকবে।
১০| একজন লেখক যখন লেখার টেবিলে বসেন তখন তাঁর কোন জেন্ডার পরিচয়  নেই। তবু তোমার লেখায় নারী চরিত্রের প্রাধান্য কেন ?

উঃ হয়তো নারী বলেই প্রাধান্য। জানতো নারী চরিত্র দেবঃ ন জন্তি।আসলে নারীকে আমাদের সমাজ অনেক সময়ই বিচার করে শরীর দিয়ে। মেধা বা মস্তিষ্ক, মন সেখানে খুব একটা পাত্তা পায় না। কিন্তু নারী চরিত্রের যত শেড আছে আমার মনে হয় পুরুষ চরিত্রের ততটা নেই। অনেকটা সহজ তাকে বোঝা।কিংবা বলতে পারো খুব কাছ থেকে আমি পুরুষ চরিত্র কম দেখেছি। যাদের দেখেছি তাদের নিয়ে লিখেছি।আসলে আমি নারী পরিবৃত হয়েই বড় হয়েছি। তাই অবচেতনে হয়তো চরিত্রগুলো প্রভাব ফেলেছে। তবে সেভাবে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভেবে লিখি না।

১১| আধ্যাত্মিকতা তোমার কাছে তার স্বরূপ কী ? একজন লেখক কীভাবে বিভিন্ন চরিত্রের অন্তরে প্রবেশ করে তাঁদের মনোজগতের  খুঁটিনাটি তুলে আনেন? এর জন্য কি আধ্যাত্মিক অনুশীলন জরুরি  বলে তোমার মনে হয় ?
উঃ আমি এমন একটা পরিবেশে বড় হয়েছি যেখানে অধ্যাত্মবাদ একটা বড় জায়গা জুড়ে।জন্ম থেকেই বাবাকে দেখছি সাধনা করতে।ঠাকুরদা সন্যাসী হয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন। আমাদের পূর্বপুরুষেরা সকলেই প্রায় তন্ত্রসাধনা করতেন। এখন আমি নিজে ছোটো থেকে জেনেছি রামকৃষ্ণ সারদা বিবেকানন্দ আমার বন্ধু। মানে ওভাবেই আমাকে বাবা বুঝিয়েছিলেন।বাবার সঙ্গে তিন সাড়ে তিন বছর থেকে শ্মশানে কাটিয়েছি।বাবা সারারাত ধ্যান করতেন, আমি পাশে বসে থাকতাম। কখনো ডোম, কখনো সাধকরা আমাকে গল্প শুনিয়ে চুপ রাখত। ধ্যান করা অভ্যাস হয়ে গেল। রামকৃষ্ণ সারদা মিশনে পড়ার ফলে সেখানকার একটা প্রভাবও পড়ল। ফলে আমার মধ্যে অজান্তেই অধ্যাত্মবাদ জন্মে গেছে।
আমি খুব জটিল, শয়তান, ক্যালকুলেটিভ হতে চাইলেও পারি না। ফলে লেখাতেও এমন কোনও চরিত্র আনতে আমি ব্যর্থ। এটা আমার লেখক হিসেবে মনে হয় নেগেটিভ পয়েন্ট। তবে আবার উল্টোটাও ঠিক।এটাই আমার প্লাস পয়েন্ট। আমার গল্প উপন্যাসে পজেটিভ ভাইব থাকে। এক তরফা খারাপ থাকে না। একটা আলোর পথ দেখাবার চেষ্টা, খারাপের পাশাপাশি কোন মনস্তাত্তিক কারনে একটা মানুষ খারাপ কথা বলছেন, বা ভিলেন হচ্ছে সেগুলো ছোঁবার চেষ্টা করি। সেটা হয়তো আমি লেখক না হলেও হত।আমি চট করে কেউ খারাপ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না। খুব কষ্ট পেলাম। বাড়ি ফিরে বা যেখানে আছি নিজের মত নিজের গভীরে তলিয়ে গেলাম। খানিকবাদে দেখলাম ভালো লাগছে।সেই যন্ত্রনা যা একটু আগেও ঘিরে রেখেছিল সেটা আর নেই। তবে মানুষ হিসেবে খুব বেশি আসক্তি, বন্ধন, লোভ এগুলো বুঝতে পারি না।সেটার একটা প্রভাব লেখাতে পড়ে। যারা আমার লেখা পড়েন তারা বলতে পারবেন এক্ষেত্রে আমি লেখায় কতটা প্রভাবিত।
১২| এক বিতস্তা পরেছে অনেক বিতস্তার একখানি মালা ।
কবি বিতস্তা। সম্পাদক বিতস্তা । অনুবাদক বিতস্তা । গল্পকার বিতস্তা। ঔপন্যাসিক বিতস্তা। প্রাবন্ধিক…নৃত্যশিল্পী…
এত কিছুর মাঝে কখনও কি মনে হয় না যে প্রকৃত বিতস্তা ঘোষাল আড়ালে রয়ে যাচ্ছে?
উঃ এই এটা ইন্টারেস্টিং।আমার এতগুলো পরিচয় তুমি আবিষ্কার করলে। হা হা। হ্যাঁ, এগুলো হয়তো আমার বাহ্যিক পরিচয়। কিন্তু আমার মনে এগুলো আসলে এক একটা মুখোশ।আমি পরে আছি।যেদিন ভার মনে হবে হয়তো খুলে ফেলব। যদিও জানি না সম্ভব কিনা! কবিতা না লিখলেও, সম্পাদক, অনুবাদক, গল্পকার,ঔপন্যাসিক বা আর যা যা বলেছ না হলেও পৃথিবী নিজের ছন্দেই চলবে। সেই ছন্দটা মাঝে মাঝে খুব মিস করি। আদতে আমি ভিতর থেকে ভীষন বোহেমিয়ান।কোনও ধরা বাধা জীবন পছন্দ নয়।এক জায়গায় আটকে থাকতে ভালো লাগে না। ওই যে শ্মশানে কাটানোর দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে নাথিং ইজ পার্মানেন্ট। কাজগুলো করি ঠিকই, অপেক্ষা করি পালাবার। ভীষন ইচ্ছে করে বাবার মত হতে। সারাজীবন প্রতিটি দায়িত্ব পালন করলেন, অথচ আদ্যপান্ত একজন সন্যাসী।সব তুচ্ছতার ঊর্ধে। যদি তাঁর পায়ের তলায় বসে সেই সর্বশক্তিমানের আরাধনা করতে পারি… তবে কি জানও দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করাটাও একটা আর্ট। সেই আর্টটা রপ্ত করার চেষ্টা করছি।
১৩| কোন স্বপ্ন তোমাকে তাড়া করেছে আজীবন ? এবং সেই স্বপ্নের দিকে কতদূর  এগিয়েছো তুমি?

উঃ স্বপ্ন ভীষন পরিবর্তনশীল। যখন ছোটো ছিলাম ভাবতাম সন্যাসী হব। কিছুতেই বাড়িতে আটকে থাকব না। একটু বড় হলাম। তখন শুরু হল নাচ। স্বপ্ন দেখতাম বিশ্ব জুড়ে নাচ করে বেড়াচ্ছি। খাজুরহে মন্দিরের মধ্যে নাচ করছি।যেকোনো বড় নৃত্য শিল্পীরই সেটাই স্বপ্ন থাকে। এক সময় মনে হত মডেলিং করব, অভিনয় যদি করা যেত।কিন্তু বাবা এসবে খুব রক্ষণশীল ছিলেন। তবে নাচ করার সূত্রে বার বার কাগজে নাম, ছবি আসায় মনে হল এমন কিছু করতে হবে যাতে মানুষ আমাকে চিনতে পারেন। তারপর সংসার, সন্তান … এই স্বপ্নগুলো গেল। তখন মনে হল পত্রিকাটাকে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। যখন সেটাও খানিকটা হয়ে গেল ভাবলাম এবার প্রকাশনাটাকে টেনে তুলতে হবে।
কিন্তু যদি বলো এই মুহূর্তে আমি কি স্বপ্ন দেখছি বা আজীবন কোন স্বপ্ন তাড়া করেছে, তবে বলব এমন কিছু করতে যা আমি যখন থাকব না তখনও মানুষকে স্বপ্ন দেখাবে। দেখ, অধিকাংশ মানুষই জানে না কিভাবে দিন কাটাবেন। বেঁচে থাকা আর সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। এই সৌন্দর্য নিজের ভেতর থেকে আয়ত্ত্ব করতে হয়। সেটাই আমি চেষ্টা করছি। বলতে পারো আলোকবিন্দু, যার হদিশ এখনো পাইনি, তাকে ছুঁতে চাইছি।

১৪| লিখতে এসে তোমার প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি।
উঃ আজকের আমি পুরোটাই দাঁড়িয়ে সাহিত্যকে কেন্দ্র করে। আমি তো ভাবিনি সাহিত্য সাধনা করব। কিন্তু যখন শুরু করলাম, এর একটা অংশ হলাম তখন দেখলাম ঈশ্বর আমাকে দু’হাত ভরে আশির্বাদ করছেন। যা আমার পাওয়ার ছিল না তাও পেয়েছি।তাই অপ্রাপ্তিগুলো আমাকে ভাবায় না। বরং পাইনি কেন ভাবলে মনে হয় বিতস্তা তুমি কি আদৌ এর যোগ্য? তখন সব অপ্রাপ্তি মুছে যায়। তবে বিশ্বাস কর যখন কোনও অচেনা পাঠক আমাকে চিহ্নিত করেন, বা আমাকে না চিনেই আমার লেখা নিয়ে আলোচনা করেন, তখন খুব ভালো লাগে। আমি তো আদতে একজন নির্জন মানুষ।একা একা একটা ঘরে বসে কাজ করি। আমার জন সংযোগ খুব খারাপ। তারপরেও এত কিছু পাচ্ছি, এটা তো একটা প্রাপ্তিই।
১৫| শেষ প্রশ্ন । এমন কোনো লেখা যা তুমি লিখতে চাও অথচ লেখা হয়ে ওঠেনি । কেমন সেই লেখার রূপ রঙ অনুভব।
উঃ একটা লেখাও লিখিনি যা লিখতে চেয়েছি। ইচ্ছে সারা বিশ্বে এত মানুষ যে টিকে আছেন নানা সমস্যা অতিক্রম করেও, কোন শক্তিতে টিকে আছেন তা নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে। বাবা বলতেন, অজস্র সাধকের পূণ্য স্থল এই পৃথিবী। তাদের সাধনার জন্যেই আমরা এত কিছুর পরেও টিকে আছি। আমার ইচ্ছে করে এমন একটা বিশ্বজনীন ক্যানভাস নিয়ে লিখতে, ধরো মহাভারতের মতো, যাতে অনেক শেড থাকবে, হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, মাইথোলজি, সভ্যতার উত্থান পতন,সম্পর্ক, ভালো মন্দ সব থাকবে। কিন্তু শেষে এসে বলতে হবে –‘সব পাবে বলো ওম শান্তি ওম’ ( বাবার লেখা একটা কবিতার শেষ লাইন)এমন লেখা লিখতে চাই। জানি না পারব কিনা, তবে এর আগের প্রশ্নে তুমি বলছিলে কোন স্বপ্ন ছুঁতে চাই, এটাই মনে হয় তেমনই একটা স্বপ্ন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।