লাজবন্তীর কথা মূলরচনা রাজিন্দর সিং বেদী রূপান্তর বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
দেশ ভাগ হয়ে গেল। দুটুকরো মানচিত্রের ভেতর অজস্র রক্তমাখা মানুষের ছবি।আহত মানুষেরা টলতে টলতে বেরিয়ে আসছে পথে। মুছে ফেলছে শরীরে লেগে থাকা রক্তের দাগ।হয়তো একদিন মুছে যাবে সেই দাগগুলি।কিন্তু তাদের ঘোলাটে চোখ তাদের ক্ষতবিক্ষত মন থেকে এই ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত স্মৃতি ধুয়ে দেওয়া যাবে না কোনদিন।
লুধিয়ানা শহরের পাড়ায় পাড়ায় উদ্বাস্তু শিবির। অসহায় মুখগুলোর দিকে তাকানো যায় না। সর্বহারা বিপন্ন মানুষদের সাহায্য দেওয়া, ছোটখাটো কাজে,চাকরিতে, জমিতে তাদের মাথা গুঁজে থাকার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে।এই কাজের জন্য একটা কমিটি তৈরি হয়েছে কিছুদিন আগে। বাবু সুন্দরলাল ভোটে জিতে এই কমিটির সেক্রেটারি হয়েছে। তার চেয়ে যোগ্য লোক আর কেউ ছিল না। দেশভাগের ফলে তার নিজের স্ত্রী লাজবন্তী অপহৃতা হয়েছিল। সে এখন কোথায় সুন্দরলাল জানে না। লাজবন্তীকে লাজো নামেই সে ডাকত। লাজোর কথা প্রতিমুহূর্তে তাকে অস্থির করে তোলে।সে ভাবে হাজার হাজার লাজবন্তীর কথা ,যারা লুঠ হয়ে গেছে। তাদের ঘরে ফিরিয়ে দিতে হবে। এই ভাবনা তার জেদ বাড়িয়ে দেয়। চুপিসাড়ে নীরবে তার মনকে আচ্ছন করে থাকে দুর্বিষহ অতীত। লজ্জাবতী লতার মতো লাজোকে বেলাগাম লাম্পট্য শুধু খুবলেই নিস্তার দেয়নি তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে । সে এখন কোথায়? কেমন আছে? কিছুই জানে না সুন্দরলাল । এই চিন্তা সুতীব্র চাবুকের মতো তার শরীরে অনবরত পাক খায়। আঘাত করে। তার পা দুটো রাগে যন্ত্রনায় অসহায়তায় ঠকঠক করে কাঁপে।
এই যন্ত্রণা ভুলতেই সে সারাদিন কাজ করে যায় । সমস্ত মানুষের দুঃখের সাথে একাকার হয়ে যায় তার ব্যক্তিগত হৃদয়। তবু কখনও কখনও ভোরের নরম হাওয়ায় ঝমঝমিয়ে উঠে শূন্যতার গান।তার গলা বুজে আসে । মনে হয় মানুষের মন কত নরম অরক্ষিত আর প্রজাপতির ডানার মতো কোমল।
সে নিজে একসময় কী নির্মম দুর্ব্যবহার করেছে লাজবন্তীর সাথে। অকারণে কত বার তার গায়ে হাত তুলেছে। অপমানে জর্জরিত হয়ে গেছে লজ্জাবতী হৃদয় ।
লাজবন্তী তো গাঁয়ের মেয়ে। সাতপাঁচ কিছুই বুঝত না সে। বেড়াহীন আনন্দে আর প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ ছিল তার মন। সুন্দরলালের অনাদর তাকে পীড়িত করলে সে কাঁদত। ভাবত এই তো মেয়েদের জীবন। এই ভার বইতে বইতে সে যে ক্লান্ত হয়ে হয়ে উঠতে পারে। মানুষের সহ্যের একটা সীমারেখা আছে তাও ভুলে গিয়েছিল সুন্দরলাল । এর জন্য লাজো নিজেও কি দায়ী নয়? সব মনখারাপ মুছে সে আবার মন দিত ঘরের কাজে। হেসে উঠত আমোদে। বেশিক্ষণ মুখ গোমড়া করে বসে থাকা তার ধাতে ছিল না। শুধু হাসতে হাসতে বলত এই শেষবার এরপর তুমি যদি আমাকে মারো আর কথাই বলব না কখনও । তার সন্ধির শর্ত সে নিজেই ভুলে যেত পরে। গাঁয়ের অন্যান্যদের মতো সেও বিশ্বাস করত যে সব স্ত্রীদের সাথেই স্বামীরা অমন করে। কেউ কেউ একটু স্বাধীনচেতা বা স্বাবলম্বী হয়ে অবাধ্যতার ভাব দেখালে সেও বলত মাগীর ঢং দেখে বাঁচি না। তার আর স্বামীকে কথায় কথায় নাস্তানাবুদ করে ছাড়ত তারা কী মরদ তুমি একটা আওরাতকে সামলাতে পারো না। জুতো যতই লাখ টাকার হোক তাকে মাথায় তোলা উচিত নয়। নিজেকে কি জুতোর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারেনি কোনদিন ?
সুন্দরলালের সাথে তার বিয়ে হওয়াটা ছিল একটা গল্পের মতো। বন্ধুর বিয়েতে বরযাত্রী গিয়ে লাজবন্তীকে দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছিল সুন্দরের। বরের কানে কানে বলেছিল দোস্ত তোর ওই শালিটিকেই আমার চাই। সুন্দরকে পছন্দ হয়নি লাজবন্তীর । বেঢপ ভুড়ি। বিদখুটে চেহারা। সেই তুলনায় ছিপছিপে গড়নের লাজবন্তী ছিল দুধে আলতায় গোলা রঙ। তবু বিয়েটা হয়েছিল। যেমন অনেক অপছন্দের ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে। বিয়ের পর কিন্তু কোন অসুবিধা হয়নি।
প্রভাতফেরি করতে করতে মানুষের মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে সুন্দরলাল সেই দিনগুলোকে দেখতে পায়। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে সারা জীবন ধরে সে যা ভুল করেছে তার প্রতিকার সে করবেই। একবার লাজোকে যদি সে ফিরে পায় তাহলে অতীতের সমস্ত বেদনা মুছিয়ে তকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে।
নারীদের পুনর্বাসনের কাজ আরও জোরদার হয়েছে ইতিমধ্যে । সুন্দরলাল এখন অনেক ব্যস্ত। কিছু মহিলা ফিরে এসেছে লুধিয়ানায়। তাদের সসম্মানে নিজের ঘরে পৌছে দিতে হবে। তাই মাইকের সামনে মুখ রেখে এখন জোরদার প্রচার করতে হয় সুন্দরলালকে। এই হতভাগী মেয়েরা ফুলের মতো পবিত্র। তাদের কোন দোষ নেই। এই অপহরণ দাঙ্গাবাজ কামুক মানুষের লালসার ফসল। তাই নিরীহ মেয়েগুলিকে এর জন্য দায়ী করা যায় না। যে সমাজ এদের গ্রহণ করতে কুন্ঠিত সেই সমাজ গলিত স্থবির এবং পচনশীল । তাকে ভেঙে চৌচির করে দিতে হবে। তৈরি করতে নতুন সমাজ। যে সমাজ মানুষের পাশে দাঁড়াবে। মানুষের কাঁধে হাত রাখবে।
শহরের মানুষগুলো সুন্দরলালের বক্তব্য শোনে। পাশ ফিরে শোয়। কেউ কেউ জানলাটা বন্ধ করে দেয় শুনতে শুনতে। কেউ বলে এত চিৎকার এখন আর ভালো লাগে না। সুন্দরলাল তার কাজ থামায় না। কিছু কথা মানুষের মনে গেঁথে যায় কিছু হারিয়ে যায় হাওয়ায়।
মৃদুলা সারাভাইয়ের ভারত পাকিস্তান পারস্পরিক বিনিময় চুক্তির মধ্য দিয়ে কিছু মেয়ে ফিরে এল লুধিয়ানায়। কিন্তু সবার ঠাঁই হল না ঘরে। কোন কোন বাপ দাঁতমুখ খিঁচিয়ে রাগে চিৎকার করে উঠল – কেন ফিরে এলি হারামজাদী । গলায় কি একটা দড়িও জুটলো না তোর ? কেন বিষ খেলি না ? মানসম্মান বাঁচাতে কুয়োতেও কি ঝাঁপ দিতে পারলি না তুই ? দেশে ফিরে আসা মেয়েদের বাপ ভাই স্বামীরা তাদের কন্যা বোন স্ত্রীদের চিনেও যেন চিনতে চাইল না । গালমন্দ করতে লাগল। অভিশাপ দিতে লাগল। পাশবিক প্রবৃত্তির কাছে সতীত্ব খোয়ানোর আগে কত মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। কেন তারা পারেনি ? এই অপরাধে তাদের কোন আশ্রয় নেই ঘরে । এরা কেউ নয় তাদের । আজ থেকে তারা বাতিল। অথচ এত অত্যাচার অবিচার এবং যন্ত্রণার মাঝেও যারা মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায় তাদের সাহসকে তারিফ করল না কেউ। এদের মধ্যে একটি বউ খুব বেশি বয়স নয় তার। নাম সোহাগবন্তী। স্বামী তাকে ঘরে নিল না। মেয়েটি কাঁদছিল। তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলছিল – তুইও কি আমাকে চিনতে পারছিস না ভাই ? তোকে কোলে-পিঠে করে আমি বড় করেছি। না খেয়ে খাইয়েছি…।।ভাই অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকাল। মা বাবার দিকে। বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে যাকে খুঁজল সে শূন্যে বিলীন হয়ে আছে তাই কোন উত্তর দিল না। সুন্দরলালের লাজবন্তীর কথা মনে পড়ছিল। সে অনেক কথা বলবে বলে এখানে এসেছিল। দলা পাকানো কান্নার চাপে তা সে আর বলতে পারল না। শুধু বলল – কী দোষ করেছে মেয়েটা যে তোমরা তাকে ঘরে নেবে না ?
স্বামীটি চিৎকার করে উঠল কী দোষ করেছিল সীতা যে রাম তার অন্তসত্তা স্ত্রীকে ঘরে নেয়নি ? তাড়িয়ে দিয়েছিল। আগুনে ঠেলে দিয়েছিল। মন্দির সমিতির লোকেরা সমর্থন করল তার কথাকে।
সুন্দরলাল বলল তিনি মহাপুরুষ হতে পারেন অবতার হতে পারেন মানুষ নন নির্দয় শয়তান ।
তুমি অনেককিছু বুঝবে না সুন্দরলাল । তুমি বুঝতে পারবে না তার মহত্বের কথা।
সুন্দরলাল বলল সত্যিই আমি অনেককিছু বুঝি না। রাবনের পাশবিকতার দায় কেন বহন করবে আমাদের মেয়েরা ? তার দশটা মাথা বলে যা খুশি করবে আর আমাদের গোবরভরা মাথা বলে নীরবে মেনে নিতে হবে সবকিছু ।
রাস্তায় সেদিন অনেক কমবয়সী ছেলে মেয়ে এসে দাঁড়াল । কাগজ কেটে কেটে ওরা লাল শালুতে আঁটা দিয়ে লিখল- সুন্দরলাল দীর্ঘজীবী হোক। তার ভাবনা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক। দেখতে দেখতে চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল সুন্দরলালের মুখ। তখনই লালচাঁদের সাথে ওর দেখা হল। লালচাঁদ তার ফেলে আসা গাঁয়ের লোক। হাঁফাতে হাঁফাতে এসে লালচাঁদ জানাল- লাজো ভাবির সাথে আজ দেখা হয়েছে ভাইয়া।
কোথায় ? এক বুক আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করল সুন্দরলাল ।
ওয়াগা সীমান্তে।
কেমন চুপ মেরে গেল সুন্দরলাল – অন্য কেউ হবে। তুই চিনতে পারিসনি।
আমি ঠিক চিনেছি।
কী করে চিনলি ?
কপালে উল্কি দেখে।
অস্পষ্ট আশঙ্কায় কেঁপে উঠল সুন্দরলাল তবু তার মুখে ঝিলমিল করে উঠল আলোর রেখা -লাজো বেঁচে আছে।
ষোলজন মেয়েকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল পাকিস্তান । তার মধ্যে লাজবন্তী ছিল। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিবাদ জানিয়েছিল – আমরা পাকিস্তানকে ছুড়ি দেব আর ওরা আমাদের বেছে বেছে বুড়িগুলো দেবে। এ কি মগের মুলুক নাকি । এ চুক্তি আমরা মানি না। লাজবন্তীর মুখ থেকে পর্দা সরিয়ে একজন বলল- দেখ দেখ ভালো করে টিপে টিপে দেখ। এ কি বুড়ি ? তখনই কপালে উল্কির দাগগুলো দেখেছিল লালচাঁদ । লাজবন্তী আর দেশে ফেরেনি। তাকে আবার চালান করে দিয়েছিল পাকিস্তানে।
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল লালচাঁদ ।
কোন কথাই কানে যাচ্ছিল না সুন্দরলালের। দেশভাগ মানে একটা মানচিত্রে মাঝে কয়েকটা দাগ নয়। বুকের গভীরে হাজার হাজার দাগ যে কত জীবন্ত দগদগে আর তাজা সে আজ নিজে বুঝতে পারছে । নারীযৌবনকে পশরা করে হাটেবাজারে নিলাম হচ্ছে তার শরীর । কখনও একটা পর্দার ভেতর আঙুল দিয়ে টিপে যাচাই করা হচ্ছে পন্যের সতেজতা। এ যেন সেই ক্রীতদাসের বাজার। সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে নগ্ন মেয়েরা। তাদের শরীরের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ক্রেতাদের লোভী চোখের মিছিল। নেড়ে চেড়ে দেখছে যৌবন। আর বাতিল হওয়ার লজ্জা নিয়ে শিথিল অন্তর্বাস আঁকড়ে কাঁপছে মেয়েগুলো।
লাজবন্তীকে ঠিক এভাবেই নিয়ে এসেছিল তারা। সুন্দরলাল লাজোর দিকে তাকিয়ে দেখল বোরখায় ঢাকা আছে শরীর। ওই দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার জন্য তাকে এরকম সাজতে হয়েছে। পথে আসতে আসতে স্বামীর কথা ভাবছিল সে। সারা রাস্তা কান্নায় ভিজিয়ে দিয়েছে তার অবকাশ হয়নি পোশাক বদলানোর । আশঙ্কায় থর থরথর করে কাঁপছিল লাজবন্তী ।
এই কী সেই লাজবন্তী ! ছিপছিপে পাতলা গড়নের সেই লাজোর শরীরে জমেছে মেদ। রঙ আরও উজ্জ্বল খরস্রোতা । এ তো সুখের চিহ্ন। তাহলে কি খুব সুখেই ছিল সে ? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে সে কেন ফিরে এল স্বেচ্ছায়? লাজবন্তীর মুখের দিকে তাকাতেই এসব চিন্তা বিদ্যুৎ চমকের মতো এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে দৌড়ে মিলিয়ে গেল। আরও কয়েকজন মেয়ে সেখানে ছিল। তাদের স্বামীরা বলল – বিধর্মীর উচ্ছিষ্ট আমরা নেব না। তাদের চিৎকার চাপা পড়ে গেল স্লোগানে এবং কাশির আওয়াজে । এর মধ্যেই সীতা লাজোকে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরল সুন্দরলাল । তাদের আনন্দে ঢাকা পড়ে গেল বেদনার্ত মুখগুলি। সত্যিই কি ঢাকা পড়ে গেল? না ।লাজবন্তী ফিরে আসার পরও মানুষের স্বার্থে তার কাজ চলতেই থাকল। মন্দির সমিতির লোকেরা তার বিরুদ্ধে আরও জোরদার হয়ে উঠল তবু তার ভ্রুক্ষেপ নেই।
লাজোর উপস্থিতিতে বাড়িটি মন্দির হয়ে উঠল। সুন্দরলাল যেন রক্ষক। তার বুকের প্রাসাদে লাজবন্তীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে সে উন্মাদনায় মেতে থাকে। যে মেয়েটি একদিন সুন্দরলালের ক্রোধী আচরণে ভয় পেত সেও দেখতে লাগল মানুষটা কেমন বদলে গেছে। কত নরম মোলায়েম আর সুন্দর । সুন্দরলাল এখন আর লাজো বলে ডাকে না। মিষ্টি করে ডাকে – দেবী। এই ডাক লাজবন্তীকে আত্মহারা করে দেয়। তার ইচ্ছে করে অন্ধকার দিনগুলোর যে ছবি বুকের কোনে জমাট বেঁধে আছে তা স্বামীর কাছে খুলে দিতে। এই ভার একা একা বহন করা কত কষ্টকর সে জানে। বলতে গিয়েও সে থমকে যায়। আড়ষ্টতা ভাঙতে পারে না।
সুন্দরলাল শুধু একবারই জানতে চেয়েছিল সেই লোকটা কে যে তোমাকে নিয়ে গিয়েছিল ?
লাজবন্তী মুখ নামিয়ে ভয়ে ভয়ে বলেছিল- জুম্মা।
– ও তোমাকে মারধর করেনি ?
না। কখনও মারেনি। তবু আমি ভয় পেতাম। অথচ তুমি আমায় কত মারধর করেছো । বকেছো। তবু তোমাকে কখনও ভয় পাইনি। তুমি আর আমাকে মারবে না তো ? আমার গা ছুঁয়ে বলো।
সুন্দরলালের চোখে মেঘ জমে উঠেছিল। অনুতাপের আগুনে পুড়তে পুড়তে সে বলেছিল- না দেবী। আর কখনও এ ভুল করব না।
লাজবন্তী জানলার দিকে চেয়ে বলেছিল জানলাটা খুলি আমার খুব কষ্ট হচ্ছে তোমাকে সব কথা বলি। কী কী হয়েছে আমার সাথে।
অতীত অতীতের জায়গায় থাক দেবী। তাকে বর্তমানের আলোয় আনার দরকার নেই। আমি জানি তুমি পবিত্র। তুমি আমার দেবী ।
এক পাথরচাপা অসহায়তায় কেঁদে ফেলল লাজবন্তী । তার রক্তমাংসের শরীরে ঢেউ ওঠে। সে প্রতিমা নয়। হতে চায়নি কোনদিন। সে সুখী । সুন্দরলাল তাকে অসম্মান করে না। অবহেলা করে না। মারে না। রক্তাক্ত করে না। তবু প্রতিমুহূর্তে সে ক্ষতবিক্ষত হয় । একটি মূর্তির ভেতর হাঁফিয়ে যায় তার নিজস্ব সত্তা। সে দাসী হতে চায়নি। সে দেবী হতে চায়নি। শুধু নারী হতে চেয়েছিল। রক্তমাংসের নারী ।
( সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
রাজিন্দর সিংহ বেদীর জন্ম ১ নভেম্বর ১৯১৫ পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে। প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের সাথে যুক্ত একজন বিখ্যাত ভারতীয় উর্দু সাহিত্যিক। ছোটগল্প উপন্যাস ছাড়াও তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক চিত্রনাট্যকার।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ঃ গ্রহণ , গরম কোট, দস্তক, সাত খেল । ১৯৬৫ সালে এক চাদর মৈলি সী গ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার পান। চলচ্চিত্রে ও সাহিত্যে অজস্র পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। ১৯৮৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুম্বাইতে তাঁর মৃত্যু হয়।)