ক্যাফে ধারাবাহিকে বিতস্তা ঘোষাল (পর্ব – ৩৩)

কু ঝিক ঝিক দিন

৩৩.

তখন ক্লাস সিক্স। অংকতে ভীষণ খারাপ।একমাত্র লাইফ সায়েন্স ছাড়া সায়েন্সের সব বিভাগেই নম্বর কম।কারণ এগুলো পড়তামই না।এই সময় মায়ের কাছে একজন খবর দিলেন,একজন দিদিমনি আছেন,খুব ভালো পড়ান।তার কাছে পড়লে আর কোনও চিন্তা নেই। তবে একটাই মুশকিল না পড়লে মারেন কিংবা হঠাৎ করে ছাড়িয়ে দিলে প্রচন্ড রেগে যান।
তা মার খাওয়া নিয়ে মায়ের কোনও সমস্যা ছিল না।পড়া না পারলে বা না করলে অবাধ্য ছাত্রীদের কানমুলে দেওয়া বা বকার অধিকার শিক্ষকদের আছে।
মা নিজে কিন্তু কোনওদিন শিক্ষকতার জীবনে কোনো ছাত্র ছাত্রীর গায়ে হাত তোলেননি।ভালোবেসে বকে আদর করে পড়িয়েছেন।
দ্বিতীয় যে বিষয়টা ছিল সেটা বেশ মারাত্মক। ছাড়িয়ে দিলে তিনি নাকি সাংঘাতিক সব অভিশাপ দেন।এবং সেগুলো ফলেও যায়।
এইসব শর্ত মঞ্জুর করেই রাখা হল তাঁকে।
ছোটো খাটো চেহারা, মুখে ভরতি পক্সের দাগ, গোলগাল, কিন্তু চেহারা দিয়ে কি যায় আসে!
মায়ের বক্তব্য তোমরা পড়তে যাচ্ছ,চেহারা দেখতে নয়।
অগত্যা। তিনি আসতে শুরু করলেন।সন্ধ্যা ছটায় তিনি আসতেন।এক ঘন্টা পড়াবার কথা।তা তিনি পাড় করে দিতেন।
মুশকিল হল তাঁর একটি কথাও বুঝতে পারতাম না।চিবিয়ে চিবিয়ে কি যে বলতেন!আর চোখগুলো সবসময়ই রক্তবর্ণ।
তিনি সারাক্ষণ কিছু একটা চিবিয়ে যেতেন।গন্ধটা একদম অচেনা।কিন্তু মাথাটা ঝিম ঝিম করত সেই গন্ধে।গা গোলাতো।
ওনার ঠোঁট বেয়ে মাঝে মাঝে সেই অচেনা দ্রব্যের রস গড়িয়ে পড়ত।তিনি তা আবার জিভ দিয়ে চেটে নিতেন।
দেখলেই ওয়াক আসত।অথচ কিচ্ছু করার নেই।
এই সময়টা মা বাড়ি থাকতেন না।তিনি তখন রবীন্দ্রভারতীতে এম এ করছেন দ্বিতীয় বার।কাজেই মা কিছুই দেখতে পেতেন না।
এদিকে আমি আর ঝুম কিছুতেই আর পড়ব না ওনার কাছে।অবশেষে দুজনে ভেবে ভেবে একটা পরিকল্পনা করলাম।
উনি এসে কলিং বেল বাজালেই ওপর থেকে বলা শুরু করলাম,মা ভুল করে চাবি নিয়ে চলে গেছে দিদি।
আবার কখনো- দিদি আজ আমি একা,তুমি কি আরেকদিন পড়িয়ে দেবে?
উনি নিচ থেকেই জিজ্ঞেস করতেন-একা কেন?বিপাশা কোথায়?
বোনের শরীর ঠিক নেই। মা ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছে।ছোট বোন আমার কাছে।ওকে একা রেখে পড়ব কি করে!
সত্যি এটা একটা জটিল সমস্যা। আমার তখন দশ- এগারো আর বোন আমার থেকে চার বছরের ছোটো। টু তে পড়ে।আমি বড় দিদি। তাকে দেখার জন্য আমার পড়াশোনা না করলেও হবে।আর আমার ছোট বোন হল আমার সন্তানের মতো।সে অর্থে আমি মাতৃপ্রতিম বড় দিদি।তাকে অবহেলা ধর্মে সইবে না।
নিরুপায় হয়ে দিদি চলে যেতেন আরেকদিন আসবেন জানিয়ে।
কিন্তু রোজ তো এক পদ্ধতি চলে না।যেদিন আসতেন মানে ওপরে আসতেন সেদিন আমি আর ঝুম খুব খাতির করতাম।আসা মাত্র জল আর ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করে প্লেটে গুছিয়ে দিতাম।আমাদের ফ্রিজে সবসময়ই কিছু না কিছু মিষ্টি, কাবাব, কেক থাকত।কোনোটা মায়ের বানানো,কোনোটা বা বাবার কোনও বন্ধুর স্ত্রীর দেওয়া।আমার আরেক মা অর্থাৎ সেন কাকিমা বেশিরভাগ সময় কাবাব পাঠাতেন।আর তখন সদ্য মা কেক করার গোল এ্যালুমিনিয়ামের একটা জিনিস কিনেছেন।তার ওপরটা কাচ দেওয়া।একটা উলের কাটা দিয়ে পরীক্ষা করা হত কেক হয়েছে কিনা।অদ্ভুত সুন্দর এক গন্ধ বেরতো যখন কেকটা হত।
তা এই কেক প্রায় দিনই নয় মা কিংবা ঝুম বানাতো।পরিপাটি করে তাও দেওয়া হত দিদিকে।কখনো আবার মাংসের সুস্বাদু কাবাব।হয়তো মাত্র দুটোই আছে,তবু তাড়াতাড়ি করে দিয়ে দিতাম।যতই হোক অতিথি নারায়ণ, তাছাড়া শিক্ষক মাত্র স্বয়ং ভগবানের সমগোত্রীয়। মা বাবা দুজনেই এটা আমাদের বলতেন।
তাই বহু সময় তাঁরা জঘন্য ব্যবহার করলেও মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে।
যাহোক,দিদি খাবার পাওয়া মাত্র আমাদের আগের দিনের ঢুকতে না দেওয়া ভুলে যেতেন।এবং খুব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতেন।যদিও তার গলার স্বর ছিল খুবই কর্কশ।
মায়ের সঙ্গে তার দেখা হত রবিবারে। সেদিন মা জানতে চাইতেন,পড়াতে তাঁর কোনও অসুবিধা হচ্ছে কিনা?মেয়েরা পড়ছে কিনা!
তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলতেন,আপনার বাচ্চারা বৌদি খুব ভালো।এত ছাত্রী পড়াই,ওদের মতো ব্যবহার কারোর থেকে পাই না।আপনাদের মেয়ে মানুষ করার মধ্যে কোনো ক্রুটি নেই। এত ভালো মানুষ করেছেন,যেমন ভদ্র তেমনি নম্র।
মা দিদির এত ভালো ভালো কথা শুনে আমার আর ঝুমের মুখের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতেন।যদিও গুরুজনদের সঙ্গে কোনও অসভ্যতা করব না মা নিশ্চিত ছিলেন, তবুও পড়াশোনা করছি ঠিক মতো এ মায়ের কাছে অবিশ্বাস্য। আমি যদিও বা খাতায় কিছু লিখি,ঝুম ক্লাস টেন অবধি এক লাইনও লেখেনি।পরীক্ষা হলে পাশ মার্ক তুলে আর লিখত না।ছবি আঁকত।বললে বলত,বেশি লিখে কি হবে,ফার্স্ট হয়ে কি হবে!ফেল করলে মা কষ্ট পাবে,তাই পাশ মার্ক তুলে নিয়েছি।
ভাবটা এমন মায়ের জন্যই ওর এই কষ্ট স্বীকার। তবে সত্যি ও যতটুকু লিখত,তাতে এক মার্কসও কাটতে পারতেন না দিদিরা।আর এই সবটাই ও খালি শুনে লিখত।কোনও দিন বইয়ের পাতা ওল্টায় নি।অনেক বড় অবধি ওর এই অভ্যাসটাই ছিল।এমনকি যখন গ্রাজুয়েশন করছে তখনো ওকে আমি রিডিং করে পড়া শোনাতাম।
এহেন ঝুম কিছু পড়ছে বা লিখছে তা নিয়ে মায়ের সন্দেহ তীব্র।
দিদিকে কিছু বললেন না মা।কিন্তু এরপর থেকে খাতা চেক করতে শুরু করলেন।সে খাতা রোজই প্রায় সাদা।আমি অবশ্য একটা বিকল্প পন্থা আবিষ্কার করেছিলাম।দিদির কাছে না পড়লেও নিজে নিজে যতটুকু বুঝতে পারতাম লিখে ফেলতাম।
বোন সেটুকুও করত না।
মাস তিনেক এভাবেই চলল। কোনও দিন দিদি আজ নাচ করতে গিয়ে হাত মুচকে গেছে,ব্যথা ভীষণ, কোনোদিন দিদি আজ খুব জ্বর,ভাইরাল বলেছে ডাক্তার, তুমি কি আসবে?
কখনো বা পড়ে গিয়ে চোট এসব গল্প চলতে লাগলো।
আবার কখনো দিদি আসার খানিক আগে বাড়ি অন্ধকার করে লোডশেডিং বা ফিউজ উড়ে গেছে বলতাম।
দিদি নিরস মুখে ফিরে যেতেন।অথচ কিছু বলতেও পারতেন না।সত্যি আমাদের পুরো বাড়ি অন্ধকার।এদিকে আশেপাশের আলো জ্বলছে।সে সময় একটাই ভালো ছিল,রাস্তার আলো প্রায়ই জ্বলত না।আর এটা বলে দেওয়া সহজ ছিল, অন্য বাড়িগুলোর লাইন আলাদা কিংবা আমাদেরই শুধু মাত্র গেছে। খবর তো মা না এলে দেওয়া যাবে না।
অবশেষে একদিন মা ধরে ফেলল।শান্ত মাথায় জানতে চাইল,কেন এমন করছি?
আমরাও শান্ত মাথায় উত্তর দিলাম,এসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পড়ান,মুখের মধ্যে কি যেন একটা চেবান,যার গন্ধে মাথা ঘোরে,গা গোলায়।
মা মন দিয়ে সব শুনল।কিন্তু হুট করে ছাড়ানো যাবে না।অভিশাপের ভয়।মায়ের অসাধারণ বুদ্ধি ও কথার পারদর্শিতা ছিল।সচরাচর মা কখনো মিথ্যে বলতেন না।শুধু তাই নয়,মা ছিলেন খুব সহজ সরল মাটির মানুষ। খুব কষ্ট বা অপমানিত না হলে চুপ থাকতেই ভালোবাসত।কিন্তু যখন প্রতিবাদ করত তখন এতটাই স্ট্রং হত তার বক্তব্য যে তা নস্যাৎ করা অসম্ভব ছিল কারোর পক্ষে। অথচ একটাও কটূক্তি বা অপমানজনক কিছু বলত না।
আমার মেজকাকু সেই সময় আমাদের বাড়ি এল।তিনি ছিলেন ফিজিক্সের অধ্যাপক। জিয়াগঞ্জ শ্রীপৎ সিং কলেজে পড়াতেন।তখন তিনি কিছুদিনের জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে এলেন।মা সেই সুযোগটা নিল।
দিদিকে এক রবিবারের সন্ধ্যায় সাম্মানিক দেওয়ার পর চা বিস্কুট দিয়ে গল্প করতে বসল।
আমাদের পড়াশোনার খোঁজ নিল,তারপর এ কথা ও কথার পর বলল,তোমার ছাত্রীরাও তোমার পড়ানোতে খুব ইমপ্রুভ করছে।আর ভালোও বাসে তোমাকে। কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে।কি যে করি!
দিদি মায়ের কথা শুনে বলল,কি সমস্যা আমাকে বলতে পারেন বৌদি।আপনাদের সমস্যা তো আমারও সমস্যা।
মা বলল,আর বোলো না,আমার দেওর, তোমাকে বলেছিলাম না,ফিজিক্স পড়ান,সে জে ইউ তে পড়াতে এসেছে।আমাদের এখানেই থাকবে। তার বক্তব্য হচ্ছে, বৌদি আমি যখন তোমাদের বাড়িতেই থাকব,তখন মেয়েরা কেন বাইরের শিক্ষিকার কাছে পড়বে?এটুকু যদি আমি ওদের জন্য না করি তবে মন থেকে শান্তি পাব না।
এদিকে মেয়েরা তোমাকে ছাড়তে চাইছে না।আমার হয়েছে শাঁখের করাতের মত অবস্থা। কোন দিকে যে চাই!
ঘুমিয়ে পড়া,নেশায় আচ্ছন্ন দিদি মায়ের কথা শুনে আমাদের দুই বোনকে ডাকল।
-শোনো তোমাদের উচিত কাকুর কাছেই পড়া।এত বড় শিক্ষক ঘরে থাকতে আমার কাছে পড়লে ভালো দেখায় না,তিনিও কষ্ট পাবেন।
আমরা দুই বোন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।যেন খুব কষ্ট হচ্ছে আমাদের।
তিনি আবার বললেন,মন খারাপ কোরো না,আমি তো রইলাম।যখন অসুবিধা হবে,আমাকে খবর দিলেই চলে আসব।
মা বলল,না না,তুমিই পড়াও।আমি বরং দেওরকে বুঝিয়ে বলব।
দিদি তখন বলল,বৌদি, আপনার মেয়েরা আমাকে এত ভালোবাসে,যে ছাড়তে আমার খুব খারাপ লাগছে।কিন্তু সত্যি ওদের কাকুর থেকে ভালো শিক্ষক হতে পারে না।জানি তো প্রতি বছর মুর্শিদাবাদ থেকে যারাই জয়েন্ট পায়,তারাই ওনার ছাত্র। আমার মামাতো ভাইয়ের মুখে শুনি তো।
আমরা দুই বোন তাড়াতাড়ি করে প্রণাম করলাম।
তিনি কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করলেন,অনেক বড় হও,মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাবা মার মুখ উজ্জ্বল করো।আমি জানি তোমরা ঠিক ভালো রেজাল্ট করবে।
মা তাকে আরও একমাসের সাম্মানিক দিয়ে দিল।বলল,এভাবে ছাড়তে হচ্ছে, তোমারও তো অসুবিধা হবে।
সেই দিদির সঙ্গে তার পরও দেখা হয়েছে বেশ ক’বার।এমনকি আমাদের তার বিয়েতেও নিমন্ত্রণ করেছেন।
বন্ধুরা যারা তাঁর কাছে পড়ত,তারা অবাক হয়েছে, কোনও শাপ তো দূরের কথা,উল্টে বিয়েতে গিয়েছি শুনে।
এমনকি তিনি বিয়ে বাড়িতে আমাদের দুই বোনকে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেরা দুই ছাত্রী বলে।
আর এর পুরো কৃতিত্বটা ছিল মায়ের,শান্ত মাথায় কিভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় আমার মায়ের কাছে তা শেখার।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।