ক্যাফে ধারাবাহিকে বিতস্তা ঘোষাল (পর্ব – ৩৭)

কু ঝিক ঝিক দিন

৩৭

আমার দিদার নাম গৌরী দেবী। গায়ের রঙ দুধ সাদা না হলেও সব অর্থেই দিদা ছিল গৌরী। সেকালে বিয়ের বয়স অনুযায়ী দিদার বিয়ে দেরিতেই হয়েছিল। তখন দিদা ষোলো বছরের। অনেক গুলো ভাই বোনের মধ্যে দিদাই ছিল বড়।দিদার মা বড়দিদা চেয়েছিলেন দিদারা পড়াশোনা শিখুক।তাই দিদার বিয়ে দেরিতে।এ কথা দিদা বারবার বলত,মা চাইতেন আমরা পড়াশোনা শিখি,শ্বশুর বাড়ি কেমন হবে সে বিষয়ে তো আগে থেকে জানা সম্ভব নয়,তাই লেখাপড়াটা জরুরী।
বড়দিদাকে যত দেখতাম অবাক হয়ে যেতাম। নাম তাঁর মহালক্ষ্মী দেবী।কিন্তু নিজেকে বলেন মহাশক্তি দেবী।দেখতে অসাধারণ সুন্দরী। গায়ের রং এতটাই গৌরবর্ণা যে টোকা দিলে মনে হয় রক্ত পড়বে।বড়দিদার বাবা ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ এক চা বাগানের ম্যানেজার।বার্মাতে থাকতেন তারা,পরে চট্টগ্রাম ও শেষে কলকাতায়।
বড়দিদার মুখে গল্প শুনেছি,ঘুম থেকে ওঠা মাত্র তারা ফলের রস দিয়ে দিন শুরু করত।আখরোট,কাজু বাদাম আর পেস্তার সরবত তারপর।
বড় দিদা বলত,তখন তো বুঝতাম না মানুষের জীবনে খাওয়ার প্রাচুর্য এত বেশি হলে পরবর্তী জীবনে সেটা না পেলে সংসারে অসুবিধা হতে পারে।আমরা তো ওতেই অভ্যস্ত। বাঙালি খাবার খুব একটা খাইনি বিয়ের আগে।বাবুর্চি রান্না করত বাড়িতে।সে তো এসব ঘরোয়া রান্না রাঁধতে জানতো না।এদিকে আমার মা’ও তেমন রান্না শেখেনি,হয়তো শিখলেও প্রয়োগ করার সুযোগ হয়নি।মায়ের বিয়ে হয়েছিল সাত বছর বয়সে।আর প্রথম থেকেই বাড়িতে বাবুর্চি। আমরা খুব একটা মা ঘেঁষা ছিলামও না।মা দিনরাত বই মুখে নিজের ঘরে। তাকে পাওয়া যেত স্টাডি রুমেই। আমরা তখন খেলায় মত্ত।আমাদের দেখাশোনার জন্য গভর্নস ছিল।
গভর্নস কথাটা তখন কেবল বাংলা সিনেমায় শুনেছি।উত্তম সুচিত্রার হারানো সুরে সুচিত্রা এলো গভর্নস হতে,কিংবা জয়জয়ন্তী ছবিতে অপর্ণা সেন।এর বাইরে বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য যারা থাকেন তাদেরকে গভর্নস বলে তা জানতাম না।আমাদের ছোটোবেলায় তুলসীদি ছিল, তার গল্প বলার ভঙ্গি ক্রমশ মনের মধ্যে বুনন বুনছে গল্পের।আর বড়দিদা বলছেন, তার গভর্নস ছিল,যার কাছে তিনি ইংরেজিতে কথা বলা,পিওনো বাজানো শিখতেন।কেমন রূপকথার গল্প মনে হত সেগুলো।
বড়দিদা বলত,আমারই এখন মনে হয় রূপকথা।সেই কবে বিয়ে হয়ে সংসারে এলাম।বর দেখতে ভালো আর সৎ -আমার বাবা শুধু এটুকু দেখেই বিয়ে দিয়ে দিলেন।একবারও তখন ভাবেননি যে মেয়ে এত আদরে মানুষ হল সে কিভাবে অভাব অনটনের সংসারে থাকবে!
আমি বিষন্ন মুখে জিজ্ঞেস করতাম,তোমার খুব কষ্ট হত তাই না?
প্রথম প্রথম মনে হত বাড়ি থেকে পালাই।এমনি কোনও ভাব নেই, অথচ এতগুলো বাচ্চা। তার ওপর আমার বই পড়ার দারুণ নেশা।অথচ এ বাড়িতে মেয়ে মানুষের বই পড়া নিষিদ্ধ। লুকিয়ে কয়লা দিতে আসত যারা তাদের দিয়ে বই আনাতাম,আবার মেথররা যে দরজা দিয়ে আসত খাটা পায়খানা পরিস্কার করতে সেই পথ দিয়ে ঘোমটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে খবরের কাগজ নিয়ে আসতাম।এভাবেই পড়তে পারতাম।এভাবেই সেলাই শিখলাম।তারপর একটু একটু করে সংসারের ভার নিয়ে নিলাম।
কেন বড়দাদু?
সে চাকরি করত গ্লোব নার্সারিতে। তারপর একটা দূর্ঘটনায় পা টা গেল।তারপর এখানে সেখানে অল্পবিস্তর কাজ।চলেও গেল দুম করে।
তারপরেই কথা বদলে বড়দিদা বলল,জানতো আমার শাশুড়ি মা বলেছিলেন, বাড়িতে কোনও পুরুষ এলে সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঘোমটা দেবে।আমার তো পাঁচ বছরে বিয়ে হয়েছে।তারপর বাপের বাড়িতেই ছিলাম।তো যখন বিয়ে হল তখন তো শাড়িও ভালো করে পরতে পারি না।আর ছোট থেকে ফ্রক পরতাম।বিয়ের পরেও ফ্রক পরে।এদিকে কেউ একজন গুরুজন এসেছেন। আমি তখন খেলছি।তিনি এসে দাঁড়াতেই মনে পড়ে গেল মা বলেছেন ঘোমটা দিতে হবে।তো কি করি!জামাটাই তুলে মাথায় দিয়ে দিলাম।এদিকে যে নিচে কিছু নেই সে তো আর মনে নেই। তিনি তখন চেঁচিয়ে আমার শাশুড়ি মাকে বলছেন-এ যে মায়ের উলঙ্গ সাজ দেখলাম।এ মা তো মহালক্ষ্মী নয়,মহাশক্তি।
আমি তখন লজ্জায় এক দৌড়।
বড়দিদার মুখে এসব গল্প শুনে ভাবতাম,আগেকার দিনের বাচ্চারা খুব পাকা ছিল,কিংবা বোকা।
যাহোক বইপাগল বড়দিদা যখনই আসতেন বাবা প্রচুর বই দিতেন তাঁকে পড়ার জন্য। সারা দিন তিনি পা মেলে বসে বই পড়তেন।যেগুলো ভালো লাগত আমাদেরও পড়ে শোনাতেন। বড়দিদা বলতেন,জীবন আমাকে শিখিয়েছে হার না মানতে।আর অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ না করতে।মেয়েরা পড়াশোনা তখন শিখতে পারেনি,কারন তাদের শিখতে দেওয়া হয়নি।কিন্তু দেওয়া হয়নি বলে ইচ্ছেটাও হবে না!আমি অতগুলো বাচ্চা নিয়ে কি করতাম যদি সেলাই না জানতাম?ধীরে ধীরে আশেপাশের মেয়েদেরও শেখাতে শুরু করলাম সেলাই।আর তার সঙ্গে নিজে যতটুকু জানি সেইটুকু পড়া লেখা। অক্ষর শেখাবার জন্য বিদ্যাসাগর মশাই এত কিছু করলেন,তাঁর সম্মান দেব না?
আমি অবাক হয়ে শুনতাম শ্বেত লক্ষ্মী, সাদা চুলের অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী এক নারীর কথা।ভাবতাম,এক বিংশ শতকের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও অনেক মেয়ে পড়াশোনা শেখে না,শেখার সুযোগ পায় না, বাবা বিভিন্ন জায়গায় ওয়ার্কশপ করেন সমাজের নিম্নস্তরের মহিলাদের স্বনির্ভর করার জন্য, আর এই মহিলা সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় অক্ষর শিখে সেলাই শিখছেন,স্বপ্ন দেখছেন সন্তানদের দ্রুত স্বাবলম্বী করার।এও তো এক রূপকথার রাজকন্যার গল্প।
শুধু এসবের মাঝে একটা কথাই মনে উঁকি দিত।আমার মা আর পাশের ঘরের কাকিমা কেন সেলাই শিখত,আমাদের জামা বানিয়ে দিত,সেই জামাই আমাদের অনেক দিন অবধি পরতে হত বাধ্যতামূলক ভাবে।আমরাও কি খুব গরীব ছিলাম,নিম্নমধ্যবিত্ত? আর মা কি এভাবেই নিজের পায়ে দাঁড়াবার কথা ভেবেছিলেন,পরে তাহলে শিক্ষিকা হয়েছেন! এর উত্তর অনেক দিন অবধি খুঁজেছি যতদিন না জেনেছি,কাকিমাকে সেলাই শেখাতে উৎসাহ দেবার জন্যেই মায়ের সেলাই শেখা।অথচ দুজনেই স্কুলে পড়াতেন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।