৪১
তেলিপাড়া লেনের এই বাড়িটার লাগোয়া বাড়িটায় আমাদের অবাধ যাতায়াত। এই বাড়িটাও বড়দিদার বাড়ির মতোই চারকোনা। মাঝখানে বড় উঠোন।চারদিকে ঘর।দোতলা। উঠোন দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়।দুটো বাড়িতেই আরেকটি মিল ছিল।দোতলার অংশটা সবুজ কাঠের নকশার মতো জাল দিয়ে আটকানো।রাজপ্রাসাদের বারান্দাগুলো যেমন অদ্ভুত রহস্যময় এক পর্দার মতো ঘেরাটোপে থাকত তেমনি।
এই বাড়িটায় আমরা খুবই প্রাধান্য পেতাম দুটো দিক দিয়ে।
বাড়ির বাসিন্দাদের মা কাউকে মাসি,কাউকে মামী, মামা বলতেন, আবার কেউ ছিলেন দিদি।ফলে সেদিক দিয়ে আমরাও তাদের নানারকম সম্বোধন করতাম।
অন্যদিকে এই বাড়িটাই ছিল আমার বাবার কলেজের অধ্যাপকের। তাঁর মেয়ে ছিলেন বাবার বান্ধবী। ফলে তিনি মায়ের সূত্রে মাসি,বাবার সূত্রে পিসি।যদিও তিনি পিসি সম্বোধন পছন্দ করতেন।ফলে শেষ অবধি আমারও তাঁকে পিসি বলেই ডাকি।পিসি সাউথ ক্যালকাটা কলেজের ইংরেজির হেড ডিপ ছিলেন।
এই বাড়িটায় আবার দুর্গা পুজো হত।আমার তখন পাঁচ বছর। আমি কুমারী দেবী হলাম।আবছা মনে পড়ে লাল বেনারসী, গহনা,সারা শরীর ফুলে ঢাকা।লাল আলতা পরা পায়ে একটা মল পরানো।সকলে সেই পা ছোঁয়ার জন্য ব্যস্ত।
আমি খুব হেসে হেসে সকলকে নাকি আশির্বাদ করেছিলাম।পরে মনে হয়েছিল, সেই ছোট্ট থেকে যারাই একটু বড় বাবা তাদেরকে প্রণাম করতে শিখিয়েছিলেন।কিন্তু আমাকে কেউ করত না।এই সময়টা আমি তাই খুব আনন্দ পেয়েছিলাম।
এই পিসি বিয়ে করেননি।শুনেছিলাম, বিয়ের আশির্বাদ হয়ে গেছিল।গহনা,জিনিসপত্র সব কেনা,এমনকি নিমন্ত্রণও সারা।যার সঙ্গে বিয়ে সেই ছেলেটি বিয়ের আগের দিন মারা যায় কোনও দূর্ঘটনায়।ফলে পিসি আর বিয়ে করেননি।
আমরা তিনবোন ক্রমশ হয়ে উঠলাম তাঁর কন্যা।যেকোন নতুন ধরনের সোয়েটার, পঞ্চু,ব্যাগিস সোয়েটার,নানা স্টাইলের মাফলার পিসি আমাদের বানিয়ে দিতেন।আর দিতেন তিনবোনের জন্য বড় একটা সিল্ক বা সুতির থান, যা দিয়ে মা তিনবোনের একই রকম জামা বানিয়ে দিতেন।
আমার নিজের পিসি আনন্দ বাজারে চাকরী করতেন এবং প্রায়ই বাইরে বাইরে থাকতেন। বিখ্যাত ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেবার জন্য তাঁকে দিল্লী,মুম্বাই, দক্ষিণ ভারত এইসব জায়গায় যেতে হত।ফলে ছোটো বেলায় খুব বেশি পিসির সান্নিধ্য পাইনি।এই জায়গাটা পুরোটাই পূরণ করেছিলেন এই পিসি ও আমাদের ইজ্জত কলোনীর বাড়ির পাশের ঘরের পিসিরা।
পিসির নাম কি বললে তাই পরপর এই পিসি ও তাঁদের কথা বলে তারপর বাবার বোনের কথা বলতাম।
বাবার বন্ধু, আমাদের এই পিসিকে দেখতে ছিল বিখ্যাত নায়িকা মালা সিনহার মত।একবার তিনি আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যার দিকে এসেছিলেন।আমাদের পাড়ায় রটে গেল মালা সিনহা এসেছেন ঘোষালবাবুর বাড়িতে।
পিসি এই বিষয়টায় খুব রেগে গেলেও মা ও বাবা দুজনেই বেশ মজা পেলেন।মা পিসির শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা থেকে মুখের সামান্য অংশ ঢেকে দিয়ে বাইরে এনে গাড়িতে তুলে দিলেন।যেন সত্যি নায়িকাই এসেছিলেন,চলে গেলেন।আমাদের বাড়িতে যেহেতু বিখ্যাত মানুষদের ভিড় লেগেই থাকত,তাই পাড়ার বাসিন্দাদের এ রকম উৎসাহ খুবই স্বাভাবিক।
পরদিন বিকেলে যখন খেলতে গেলাম বন্ধুরা জানতে চাইল, মালা সিনহা কি করছিলেন আমাদের বাড়িতে?বাবা বা সেজকা কি কোনও সিনেমার নায়ক বা গল্প লিখছেন?কিংবা পরিচালনা করছেন?
বাবা ও সেজকা দেখতে অসাধারণ।শুনেছিলাম ঝিন্দের বন্দী বলে এক সিনেমায় নায়ক হবার ডাক পেয়েছিলেন আমার সেজকা।কিন্তু শেষ অবধি দুজনের কেউই সিনেমায় যাননি।সেজকা তখন ল পাশ করে হাইকোর্টে ঢুকেছেন।আর বাবা তো এসব বিষয় নিয়ে মাথাই ঘামাতেন না।
যা হোক এই মালা সিনহা কোন সিনেমার অভিনেত্রী জানতাম না তখনো।কাজেই এসব প্রশ্নের কি উত্তর দেব সেটাও অজানা ছিল।
তবে বহুদিন পর্যন্ত নামটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তখন প্রেম ভালোবাসা আর সিনেমা এই শব্দগুলো সবই ছিল নিষিদ্ধ। সেই নিষিদ্ধ জগতের কেউ একজন মালা সিনহা..এই বোধে বুঝতে পেরেছিলাম মালা সিনহাকেও লুকিয়েই দেখতে হবে।
তারপর একদিন বাড়িতে যখন সাদা কালো টিভি এলো,তখন কিশোর কুমারের বিপরীতে লুকোচুরি সিনেমায় সম্ভবত নায়িকাকে দেখে মনে হল পিসিকেই দেখলাম।সেদিনই জেনেছিলাম তিনিই সেই পিসির মতো দেখতে নায়িকা। শুধু পিসি নাচ জানতেন কিনা জানি হয়নি কখনো।