T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় বাসুদেব দাস

মুক্তি
কুল শইকীয়া
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ
বন্দুক থেকে নির্গত একটা গুলির মতো সে বেরিয়ে গেল–
আর তার পেছন পেছন অন্য একটি গুলির গতিতে বিমল ভূঞা ঘরের গেটের
উন্মুক্ত দরজা দিয়ে অন্তর্ধান হল–
এই দুটো প্রক্রিয়া এভাবে সংঘটিত হল যে ঘরের বারান্দায় বজ্রাহত কবুতরের
মতো নীতা কয়েকটি মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল।
এই ধরনের একটি ঘটনা ভূঞার কাছে অকল্পনীয় ছিল, যার ফলে তিনি প্রথম
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কোনো কিছুই বুঝতে পারলেন না, হাতের ব্যাগটা ছুঁড়ে দিলেন
এবং পাশে থাকা চেয়ারটিতে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণের জন্য এক্সন রিপ্লের মতো
একটা বোতাম টিপে দিয়ে কথাগুলি মেপে দেখলেন– তিনি ঠিক বারান্দায় উঠেছেন,
ড্রাইভার গাড়িটা ঘুরিয়ে পুনরায় অফিসে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, কারণ
সেটাই তাঁর সাধারণভাবে চলা দৈনন্দিন ঘটনার নিয়মিত অংশবিশেষ এবং সেই সময়
ভূঞার মনে পড়ছে তার পাশ দিয়ে ছোঁ করে পার হয়ে গেছে তপন– ঘটনাক্রমের
এতটুকু পর্যন্ত তাঁর কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে না, এটাই কেবল চোখে
পড়ে যে তাঁর পেছনদিকে মুখ করে বাড়ির ছোটো গেটটা খুলে রেখে যাওয়া ছেলের
প্যান্টের উপরে বের করে নেওয়া নীল শার্টটার নিচে যেন ঝুলিয়ে রাখা ছিল ভূঞার
যা চামড়ার হলস্টারে সুন্দর করে ঢুকিয়ে রাখা ছিল। পিস্তলটা বহন করে নিয়ে
বেড়ানোর জন্য হলস্টারটা ভূঞার বড়ো পরিচিত, কারণ মাঝেমধ্যে তিনি পিস্তলটা
পরিষ্কার করার সময় সেটাও ঘষে-মেজে রাখেন যাতে চামড়ার কেসটিতে এক ধরনের
উজ্জ্বলতা ফুটে উঠে ।
ভূঞা সমস্ত দৃশ্যটা দৃষ্টিভ্রম হিসেবে ভাবলেও মুহূর্তে মুহূর্তে তার মনের মধ্যে একটা
ঝাঁকুনি আসতে লাগল যে বাস্তবিকই তার ভুল হয়নি, অর্থাৎ তিনি যে দৃশ্যটি কিছু
সময় আগে ঘটে নাই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চাইছেন, জবরদস্তি এক মানসিক
অস্থিরতার ইল্যুয়েশন বা ভ্রম বলে ভাবার প্রয়াস আসলে সেটা সত্যিই ঘটে গেছে,
কেবল তিনি বাস্তবিকতা থেকে পলায়ন করার প্রবণতায় সেটা ভার্চুয়াল বা কাল্পনিক
বলে মেনে নিয়েছেন!
আর এই ধরনের ভাবের চাপে তিনি বাড়িটির প্রতিটি রুমে পায়চারি করে
বেড়ালেন, মনের ভেতরে অনুভব করলেন এক প্রচন্ড কোলাহল, তিনি
অনিচ্ছাকৃতভাবেই ভাবতে চেষ্টা করলেন যে হয়তো তাঁর অজ্ঞাতেই তপন ক্রমশ এই
মারনাস্ত্রটির প্রতি এক আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করেছিল, তার মনের মধ্যে
এরকম একটি ধারণা গড়ে উঠেছিল যে পিস্তলটিতে এক মারাত্মক শক্তি নিহিত হয়ে
রয়েছে, সেই শক্তি ভান্ডার থেকে সে ধার করে নিতে পারে এরকম কিছু ক্ষমতা যা
তাকে করে তুলতে পারে বলীয়ান, সর্বশক্তিমান– কারণ, আজ কিছুদিন থেকে তপনের
চোখে মুখে যেন এসে পড়েছিল কিছু বিষাদ কিছু হতাশা এবং ভূঞার এই মুহূর্তে
ভাবামতে ঠিক এই ধরনের হতাশা গ্রস্থতাই তাকে আজ এই মুহূর্তে পিস্তলটার প্রতি
আকর্ষিত করে তুলেছে,কিন্তু এরকম এক ধারণার সম্পর্কে বিমান ভূঞা নিশ্চিত হলেন
না। হয়তো এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্গে মেলামেশা করার জন্য তিনি উদ্ভাবন
করে নিয়েছেন এরকম ধরনের কিছু চিন্তা- চর্চা , যার দ্বারা তিনি খুঁজে পান তপনের
এরকম এক ব্যবহারের আদ্যোপান্ত । কিন্তু, তিনি পরের মুহূর্তেই ভেবে নিলেন যে
হয়তো কোনো বন্ধু- বান্ধবের প্রভাবে তপন পিস্তলটা বাড়ি থেকে সবার অজান্তে নিয়ে
গেছে, আর তার এই যাত্রার মুখ্য উদ্দেশ্য এই ধরনের হওয়াটাও অস্বাভাবিক না হতে
পারে যে সে সঙ্গের ছেলেদের সঙ্গে একটি ভয়াবহ তালিকা বানিয়ে নিয়েছে,সেই নাম
গুলির সঙ্গে বেঁধে রাখা আছে কয়েকটি মুহূর্ত, কিছু তারিখ এবং সেটাই নির্ধারণ করে
রেখেছে সেই সব মানুষের জীবনের শেষ ক্ষণ–
ছোঁ করে পার হয়ে যাওয়া অত্যাধুনিক মডেলের গাড়িটির ধাক্কা থেকে ভূঞা
বেঁচে গেলেন,তার মনে আসতে থাকা বিভিন্ন চিন্তাগুলি থেকে তিনি ক্ষনিকের জন্য মুক্ত
হয়ে পড়লেন। তিনি ইতিমধ্যে তাঁর বাড়ি থেকে দুই নম্বর ট্রাফিক লাইটটা অতিক্রম
করে এসেছেন, তিনি বাঁদিকে ঘুরে গেলেন, কিন্তু সেদিকে ঘুরে যাবার কোনো কারণ
তার মনে পড়ল না, হঠাৎ এরকম মনে হল যে তিনি গাড়িতে অফিসে আসা যাওয়ার
নিয়মমাফিক জীবন ধারণের ফলে বহুদিন এদিকে আসাটা বাদ পড়েছিল,তাঁর পরিচিত
দোকান-পাট গুলি আগের মতই নিজস্ব চেহারায় বর্তে থাকতে তিনি দেখতে পেলেন ।
অবশ্য এটা হতে পারে না যে ভূঞা বহু বছর পরে এই পথ দিয়ে হেঁটে চলেছেন।
তিনি মাঝেমধ্যে বন্ধের দিন এই অঞ্চলের দোকানপাটে ঢুকেছেন, কখনও সময় বুঝে
পরিচিত দোকানগুলি থেকে এক পদ- দুপদ সামগ্রী কিনে নিয়েছেন, কোনো পরিচিত
মানুষের সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথাও বলেছেন, কারও বিয়ে, জন্মদিন, নাতি-পুত্রের
খবরা-খবরও সেই সুযোগে তিনি নিয়েছেন– মোটকথা এক সাধারণ নাগরিকের
রোমাঞ্চকর জীবনের মুহূর্ত থেকে তিনি বাদ পড়ে যাননি যদিও অফিসের দীর্ঘ সময়
এবং ব্যস্ততা তার কাছ থেকে সেরকম সুযোগগুলি কেড়ে নেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কোনো সিরিয়াস ম্যাটার?
ওহো! না,না সেরকম কোনো কথা নয়! মনে হল, কিছু বাজারের সামগ্রী,
ছোটো–খাটো,এটা‐ওটা ‐- হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে‐-ওয়াকিং ব্যায়াম, হাঁটা
নাকি যখন তখন হেঁটে নিলেই হল, প্রাতঃভ্রমণ বা সান্ধ্য ভ্রমণ বলে তো আর
কথা নেই‐-!
দেখতে এরকম মনে হচ্ছে যেন ঠিক আপনি নয়, অন্য এক দুনিয়ায় সম্প্রতি‐
তপনকে দেখেছ নাকি? সে তোমার সামনে দিয়ে দ্রুত পার হয়ে গেল, তুমি
ভালো করে লক্ষ্য না করলেও বুঝতে পারলে যে পেছনে তার জামার নিচে কিছু
একটা জিনিস ঝুলছিল, সে কথাটা তোমাকে বলা যায় যে সে বাড়ি থেকে পিস্তলটা
নিয়ে বেরিয়ে এসেছে, পিস্তলটার ম্যাগাজিনে কয়েকটি গুলি ভরা আছে, যদিও তুমি
একটা পিস্তল দেখে বুঝতে পারবে না বা আভাস পাবে না যে সেটি লোডেড বা গুলি
ভর্তি রয়েছে না নেই বা এটাও বুঝতে পারবে না যে কতগুলি গুলি তাতে রয়েছে,
কেবল জানে পিস্তলের মালিক, কারণ তিনি সাধারণত তাঁর শত্রুর ভয়াবহতার ওপরে
নির্ভর করে মারনাস্ত্রে গুলি ভরিয়ে রাখে‐-কিন্তু, তুমি তপনকে ঠিক সেভাবে না
দেখলেও হয়তো চট করে তোমার পাশ দিয়ে পার হয়ে যেতে দেখেছ, তার অজান্তে
তুমি বুঝতে পেরেছ যে তার চোখে‐ মুখে কিছু ক্রোধ ,রাগ ,অস্থিরতা ,অশান্তি
আক্ষেপ বা তেমন ধরনের কিছু শব্দ বহন করা আবেগ অনুভূতির খন্ডচিত্র, হয়তো
সেসবের মধ্যে সে তোমাকে সব সময় দেখলে হাসির মতো এক রহস্যময় হাসিতে
আওয়াজ দিয়ে সরে গেছে, আর সেটা তপনের স্বাভাবিক চাল‐-চলন বলেই তুমি
বিশ্বাস করেছ , যার ফলে কোনো ধরনের সন্দেহ‐- সংশয় তোমার মনে আসেনি বা
তুমি কল্পনাও কর নাই যে ডানা ভাঙ্গা পাখি দেখে কেঁদে উঠা তপন কিভাবে নিয়ে
যেতে পারে একটি মারনাস্ত্র , যার থেকে নির্গত গুলি ‐-
এতগুলি কথা একই নিঃশ্বাসে দিবাকরকে বলে ফেলার ইচ্ছা হলেও ভূঞা
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নিল, এবং এই কথাগুলি মনের গহ্বরে দুটো শব্দ এভাবে বলে
রাখল, ভালোই আছি!
বিমল ভূঞা ভালো আছে?
ভূঞা পুনরায় নিজেকে এভাবে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারতেন, পৃথিবী এমন
কোনো ধরনের ইঙ্গিত দিতে চাইছেন না যে তিনি সম্প্রতি এক কঠিন দুর্যোগের
সম্মুখীন হয়েছেন, আর সেরকমই এক অভাবনীয় পরিস্থিতির ছবি তাঁর মুখমণ্ডলে
স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
ভালোই আছি–
নিজের অজান্তে নির্গত হল শব্দ দুটি ভূঞা থেকে।
আমি ভাবি নি যে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বা এরকমও নয়
যে তখন হিংসা, ঈর্ষা, অসূয়া পছন্দ করা একটি যুবক ছেলে, সে শৈশবে প্রজাপতির
পেছন পেছন দৌড়াত, কখনও উড়তে থাকা ফড়িং তাকে আকর্ষণ করত, হেমন্তের
সন্ধ্যাবেলা সে খুঁজে বেড়াত জোনাকির সান্নিধ্য– সে সঙ্গের ছেলেদের সঙ্গে শৈশবে
খেলনা পিস্তল দিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলত, তার মধ্যে কোনো হিংসা- বৈরিতা ছিল না,
একটি শিশুর অনুসন্ধিৎসু মন ছিল, যার ফলে প্রায়ই সে খুলে ফেলত সেই পুতুলটির
নাট বল্টু এবং খুঁজে বেড়াত, বারুদের বিস্ফোরণের কারণ–! মনে করুন, সেসব তার
কেবল জানার আগ্রহ ছিল, আজকেও সে মারনাস্ত্র পছন্দ করে না। অন্তত আমার
ধারণা সেরকমই বলতে পার, কারণ, আমার পিস্তল থাকা বাক্সটা তাকে আজ পর্যন্ত
কৌতুহলী করে তোলেনি বা আমাকে কখনও সে বলেনি যে এরকম একটি লৌহ যন্ত্রের
প্রতি আকর্ষণ অনুভব করছে ! কিন্তু হঠাৎ আজ কি হল – যে তপন পিস্তলের –
ইতিমধ্যে পাশ থেকে সরে যাওয়া দিবাকরকে এতগুলি কথা বলার তার
আবশ্যক হল না।
পিস্তলের নলের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া গুলির মতোই ত্বরান্বিত গতিতে
বিমল ভূঞা এগিয়ে গেল–
ভূঞার পাশ দিয়ে পার হয়ে যাওয়া ব্যস্ত মানুষগুলির পরিচিত মুখ গুলি
ক্ষণিকের জন্য অপরিচিতের মতো হয়ে পড়ল। নিজের অজান্তেই তাঁর মস্তিষ্ক সেই সব
মানুষের পরিচিত চেহারাগুলি শনাক্তকরণ করল না, দুই একটি দোকানের সামনে দিয়ে
পার হয়ে যাবার সময় তিনি হঠাৎ হয়তো সেই সবের নাম ফলক পড়ে গেলেন, সেই
কয়েকটিতে তিনি মাঝেমধ্যে একটি দুটি ঘরোয়া সামগ্রী কেনার কথাও ভাবলেন, কিন্তু
সেগুলিতে এই মুহূর্তে প্রবেশ করে পরিচিত দোকানির সঙ্গে কথা বলার কোনো তাড়না
অনুভব করলেন না, তার প্রতিমুহূর্তে মনে হল যে তপন তার প্যান্টের পেছনদিকে
পিস্তলটা গুজে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে, তার উন্মাদ গতি ভূঞার মনে বিভিন্ন
সম্ভাবনীয়তার সম্ভার মেলে দিয়েছে– তপন এই মুহূর্তে মানুষটির সঙ্গে তর্কা-তর্কিতে
অবতীর্ণ হল, প্রথম অবস্থায় কোনো ধরনের ক্রোধ- রাগের সূচনা না হলেও একটা
সময়ে তপন বের করে নিল তার পিস্তলটা, ডানহাতের মুঠোতে শক্ত করে ধরল সেটা,
তপনের মুখমন্ডলের ছবিটা ক্রমশ একটা ক্রোধান্বিত বাঘের চেহারা নিয়ে কেঁপে উঠল,
সে কিছু একটা বলার ভঙ্গিতে ঠোঁট দুটি নাড়াচাড়া করল, তার চোখ দিয়ে ছিটকে
বের হল আগুনের স্ফুলিঙ্গ এবং যেন সে বলতে চাইল, দেখ, তোমাকে আমি এভাবেই
নিঃশেষ করার অঙ্গীকার নিয়েছি, কারণ, বিভিন্ন সময়ে এরকম মনে হয়েছে যে
তোমার স্মৃতি সবদিক বিষময় করে তুলেছে, আর ভূঞা মনে করছেন যে তপনের
উদ্যত হাতের পিস্তলটার দিকে তাকিয়ে নিথর হয়ে থাকা মানুষটার মুখটির চেহারা
ক্রমশ বিমল ভূঞা নামের মানুষটার রূপে রূপান্তরিত হচ্ছে, এক প্রচন্ড শব্দ–
পাশ দিয়ে যেতে থাকা একটি ছোটো ছেলের হাতের ফেটে যাওয়া বেলুনের
শব্দে ভার্চুয়াল পৃথিবী থেকে ভূঞা পুনরায় বাস্তব জগতে ফিরে এলেনন। মনে হল যে
ইতিমধ্যে তিনি রাম ভগতের চুল কাটা সেলুনের সামনে দিয়ে পার হয়ে আসছেন।
এটাই পুরোনো স্মৃতি বহন করে আগের মতোই চলতে থাকা হেয়ার কাটিং সেলুন–
সামনের বারান্দাটা এখন খালি রয়েছে, আগে ভূঞা সেখানে বসে থাকতেন, সেলুনের
ভেতরে উঁচু চেয়ারটায় উঠে নিয়ে তপন নিজের চুল রাম ভগতের দ্বারা ছোটো করে
কাটানোর মুহূর্ত পর্যন্ত – জানি যে সে কখনও ইচ্ছা হলে আজকালও তোমার এই
সেলুনে আসে, তার প্রিয় ছোটো চুলের স্টাইল নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যায়,
তোমাকে নিশ্চয় বলে যায় যে সময়ের সঙ্গে দোকানের চেহারা বদলানো উচিত, না
হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায় না– তথাপি, তার এই সেলুনটাই প্রিয়, হয়তো
এদিক দিয়ে যাবার সময় আজও বারান্দার টেবিলে বসে থাকা তোমাকে দেখে সে
হেসে কিছু একটা বলে গেছে, কিন্তু আমি ধরে নিতে পারি যে সে তোমাকে নিশ্চয়
বলেনি তার প্যান্টের পিছন দিকে লুকিয়ে রাখা পিস্তলটার কথা, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক,
কারণ সে বন্দুক- বারুদ- গুলি- গোলা এসব কোনোদিন ভালোবাসত না, হয়তো
হঠাৎ তার মনে এল যে তার বাবার হাতে একটা মারনাস্ত্র আছে, যে মারনাস্ত্রের
একটি বৈধ লাইসেন্স আছে, যে মারনাস্ত্র দিয়ে–
রাম ভগতের সঙ্গে কোনো কথার অবতারণা না করে মনের ভেতরের
অপ্রকাশিত বাক্য গুলি হজম করে ভূঞা ভাবলেন যে তাঁর হাঁটার গতি আরও
ত্বরান্বিত হয়েছে, আর তিনি নিজের অজান্তে ফুটপাত দিয়ে দৌড়াতে শুরু করেছেন।
তাঁর মনের মধ্যে আসা ভাবটা হল তপন ঠিক আছে তো? ভালো আছে তো?
কারণ, একটা মারণাস্ত্র, অনেকগুলো গুলি, তার অশান্ত মন–আঃ!
কিছু ক্লান্ত হলেও তাঁর গতিতে যতি পড়ল না এবং একটা সময়ে তিনি শহরের
পশ্চিম প্রান্তের নদীটার পরিচিত ঘাটটাতে উপস্থিত হলেন। নদীর ঘাটের পাকা সিঁড়িতে
বসে দুজনেই বহুদিন সন্ধ্যা তারার ঝলমলানি দেখেছিলেন, আর তপন সেরকম একটি
অভ্যাস এখনও মাঝে মাঝে বজায় রেখেছে।
নদীর ঘাটের সিঁড়ির ওপরে বসে থাকা তপনের হাতের উদ্যত পিস্তলটার দিকে
তাকিয়ে ভূঞার গতি স্তব্ধ হয়ে পড়ল। তিনি বুঝতে পারলেন না তার এখন কি করা
উচিত? তপন কাকে গুলি করতে চাইছে?
ভূঁঞা নাতিদূর থেকে হিসেবপত্র করে দেখতে চাইলেন। কাকে?ভূঞাকে, তপন
নিজেকে না অন্য কারুকে নদীর পারে টার্গেট করে নিয়েছে?
ভূঞা সন্তর্পণে এগিয়ে গেলেন। দুই একটা শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি তাঁকে
সচকিত করল।
তিনি মনে করছেন যে একটা সময়ে তাঁর দিকে পিস্তলের নল ঘুরিয়েছে–
তেমনই কয়েকটি মুহূর্ত–
একটি শব্দ তিনি শুনছেন। সেই শব্দের উৎসের খোঁজে তিনি নদীর বুকের দিকে
তাকালেন। ভূঞা বুঝতে পারলেন যে তপনের হাতের পিস্তলটা এখন নদীর গর্ভে
নিমজ্জিত হল। তিনি তপনের কাছে গেলেন।
তোমার হাতে কখনও পিস্তলটা দেখলে ভয় হয়!
তপন কথাগুলির দ্বারা কী বোঝাতে চাইছে?ভূঞা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে
গেলেন। ভূঞা কেবল বললেন; পিস্তল রাখার হলস্টারটাও ফেলে দিই দে–; জল থেকে
ছিটকে এল আরও একটি শব্দ।ভূঞা তপনের ছোটো চুলের মাথাটা টিপে দিল, ঠিক
রাম ভগতের সেলুনে তপনের মাথাটা ছুঁয়ে আদর করার মতো–