সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ৩৪)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

উইলসন ইশকুলে ইন্সপেকশন হবে। পড়ানোর জোর বেড়েছে। চারদিকে ইশকুলগুলিতে ইন্সপেকশন চলছে। জগবন্ধু স্যার ক্লাসে পড়ালেন “অচিনপুরে ইতিহাস”। ছুটির মন আজ অন্য কোথাও ঘুরছে। ইভান ও হীরা তার মন জুড়ে আছে। মুশকিল হচ্ছে হীরা এখন একটু ভালো। বিকেল হলেই তাদের সাথে খেলতে চায়। কিন্তু ইভানের হীরার ঢিমেতালে খেলা মোটেই পছন্দ নয়। ইভান তো আসলে সত্যিটা জানে না। হীরা বাঁচবে না। দাদিমা জানে। দাদিমার মনের ভেতরটা কেমন থাকে? যে সবসময় তাঁর আঁচল ধরে থাকে, হীরা মারা গেলে দাদিমা কি করবে? কী করে সহ্য করবে? ইভানকে কিছু বলাও যায় না। নাহ আজ ইভানের সাথে ঝগড়া হলে হোক আজ সে হীরার সাথে বসেই খেলবে। সেকেন্ড পিরিয়ড শেষের ঘন্টা পড়ল। জগবন্ধু স্যার বললেন -সবাই কাল লিখে নিয়ে আসবে। – বলে কড়া চোখে ছুটির দিকে তাকিয়ে গেলেন।
ছুটি বসে একেবারে ফার্স্ট বেঞ্চের প্রথমে। ওর হাবভাব স্যারদের চোখে পড়ে। সে স্যারের পড়ানো কিছুই শোনেনি। কি লিখে আনতে হবে কাল? সে যে শোনেনি জগবন্ধু স্যার বুঝতে পেরেছেন।
সে মণিকে জিজ্ঞেস করে – হ্যাঁ রে, স্যার কি লিখে আনতে বললেন?
-সে কি! তুই শুনিসনি? কি ভাবছিলি?
– কী জানি! – সত্যিটা বলল না ছুটি।
-আচ্ছা রে, কি লিখে আনতে বলল?
– অচিনপুরের ইতিহাস।
– বইয়ে আছে কোনও?
-সে আমি জানি না। স্যার বলল ইন্সপেক্টর নাকি ইশকুলগুলোতে এই নিয়ে প্রশ্ন করছে। তুই কিচ্ছুটি শুনিসনি? সে কি রে?
ছুটির মন পড়ে আছে বিকেলের খেলায়। কখন বাড়ি ফিরবে আর কখন খেলা শুরু হবে।
চারটে বাজতে না বাজতেই ইভান এসে হাজির। আজ পেছনে পেছনে দাদিমা ও হীরা। দাদিমা বললেন – আজ তোমরা এখানেই খেলো ছুটি। হীরা কো থোড়া খেলনে কা মন হ্যায়।
মা হীরার ব্যাপারটা জানেন। মা বললেন – এখানেই খেলো আজ। চওড়া বারান্দায় মাদুর পেতে দিয়ে মা বললেন -একটা খাতা আর পেন্সিল নিয়ে আয়। হীরা খুব ভালো ছবি আঁকে। ইভান বলে ওঠে – নেহি।
হীরা ছলছল চোখে ইভানের দিকে তাকিয়ে রইল। মা বুঝিয়ে বললেন -ভাইটা খেলতে চাইছে। কেন ওর সাথে খেলবে না ইভান?
ইভান রাগত মুখে বলে – ও দৌড়াতে পারে না। ইয়ে সব খেল মুঝে আচ্ছা নেহি লগতা।
ছুটি কাগজ ও পেন্সিল এনে হীরাকে দিল।
হীরার মুখে হাসি। চোখে সেই দৃষ্টি। এমন করে তাকাল যেন কাছের মানুষ পেরিয়ে অনেক দূরে অন্যকিছু দেখছে, যা অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না।
বলল- ছুটি ইধর ব্যয়ঠো। হমারে পাস। তুম বহোত আচ্ছে হো। তুমকো গুসসা নেহি আতা। ইভানকো বহোত গুসসা হ্যায়। উও মুঝে পসন্দ নেহি করতা।
হীরা আঁকছে খুব মন দিয়ে। একটা খোলা জায়গায় মাদুরের ওপর তিনজন বসে, তিনটি শিশু। একজন আঁকছে, একজন বসে আছে। চোখেমুখে রাগ উপছে পড়ছে, আর একটি মেয়ে মন দিয়ে ছবি আঁকা দেখছে। এভাবে ছবি আঁকতে পারে হীরা কে জানত। এবার সে আঁকল দূরে লাল সূর্য অস্তে যাচ্ছে।
ছবি আঁকা শেষ হতে হতে চারদিকে সন্ধে গাঢ় হয়ে এলো। দাদিমা মা-র সাথে গল্প করছেন। ছবিটা ছুটির হাতে তুলে দিয়ে হীরা বলে – ইয়ে তুমহারে লিয়ে। ইয়ে তুমহারে পাস রহেগি।
-কী সুন্দর ছবি আঁকিস তুই হীরা। কাগজটা হাতে নিয়ে সে ছুটে গিয়ে মা-কে দেখাল। মা তো দেখে অবাক। এত সুন্দর ফুটেছে ইভানের রাগ রাগ মুখের ছবি। এটা ঠিক যে ইভান, ছুটি কিম্বা হীরার চেহারা সেরকম ফুটে উঠতে পারেনি, কিন্তু রাগ করে বসে থাকা ইভানের ছবি এসেছে দারুণ।
ইভান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হঠাৎ ছুটে চলে গেল। ছুটির সাথে কোনও কথা বলল না। হীরা ছলছল চোখে ইভানের যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল।
দাদিমা আফসোসের ভঙ্গিতে অসহায়ের মত বলেন – বচ্ছেলোগ, সমঝতে নেহি।
দাদিমা ওরা যেতে যেতে রাত প্রায় আটটা। হীরা তার পড়ার টেবিলের পাশে বসে আরও ছবি আঁকল। খুব খুশি সে আজ। দাদিমা আরও খুশি।
ওরা চলে গেলে বিদ্যুৎ চমকের মত খেলে গেল জগবন্ধু স্যারের টাস্ক। সেরেছে, এখন সে কী করে! ভাবতে ভাবতে টেবিলে মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়ল। দিদি এসে ডেকে ঘুম ভাঙাল। ঘুম ভেঙে সে বুঝতে পারে না ঠিক কোথায় আছে! সে তো স্বপ্নে ছিল। জগবন্ধু স্যারের হাতে বেত, তার দিকে এগিয়ে আসছেন। সে থরথর করে কাঁপছে।
খেতে বসে বাবা বললেন – ছুটি, এত খেললে তো পড়া হবে না। খেলার দরকার আছে। কিন্তু পড়াশোনা তো ঠিক রাখতে হবে।

পরদিন জগবন্ধু স্যার এসেই হোমটাস্ক চাইলেন। রতন খাতা নিয়ে এগিয়ে গেল। মণিও এনেছে। আর বাকি কেউ আনেনি। স্যার রতনকে খুব উৎসাহ দিলেন, মণিকেও। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একদিক থেকে গালে একটি করে থাপ্পড় মারতে শুরু করলেন। ছুটির স্বপ্ন বোধহয় আজ বাস্তবে রূপ পেল। স্যারের কোনওদিকে তাকানো নয়, মুখে কথা নেই, হাত দিয়ে তর্জনী নির্দেশে দাঁড়াতে ইশারা করছেন আর সাথে সাথেই গালে একটি করে নিটোল থাপ্পড়। আগেকার দিন হলে ছুটি ইশকুল ছেড়ে পালিয়ে যেত। কিন্তু এই ইশকুলকে সে খুব ভালবাসে। একদিন ইশকুল কামাই করে না সে। তার সহপাঠীরা চমৎকার। এদের ছাড়া একদিনও সে থাকতে পারে না। নাহলে সে না এলেই তো পারতো।
৷ ছেলেদের সারি শেষ করে স্যার মেয়েদের সারির দিকে এগিয়ে আসছেন। ছুটির বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছে। তার শব্দ সে কান পেতে শুনছে। ঢিপ ঢিপ ঢিপ ঢিপ। স্যার কাছে এসে তার মুখের দিকে তাকালেন না। গালে চড়টি পড়ল। কেমন যেন মাথাটা ঘুরে উঠল ছুটির। সে রোগা পাতলা প্যাংলা চেহারা। গালে খুব জোর জ্বলছে। লজ্জায় অপমানে চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল। তাকে কেউ কখনও মারেনি। এই প্রথম একটি গোলগাল মোক্ষম চড়। মা তাকে সবসময় আগলে রাখেন। বলেন ছুটি খুব দুর্বল। কেউ একটু বকলেও মা রাগ করেন। চড় মারতে মারতেই ঢং করে ঘন্টা পড়ল। জগবন্ধু স্যারের শেষ বেঞ্চটা রয়ে গেল। ওরা বেঁচে গিয়ে হো হো করে হাসছে।
একটু পরেই মণি তার দিকে তাকিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল – ছুটি, তোর গালে স্যারের পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেছে রে। গাল ফুলে উঠেছে। তুই ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে যা।
রতন ঘন্টা পড়ার পর গর্বিত পায়ে হাঁটাচলা করছিল। কাছে এসে বলে – দেখি দেখি। হুম। বেশ লেগেছে। চলে যা, বাড়ি চলে যা।
– তাচ্ছিল্য? হয়তো বা। রাগে ভেতরটা জ্বলছে। সে কথা না বলে চুপচাপ বসে রইল।
পরের ক্লাশটা হেড স্যারের। ইংরেজি পড়ালেন। খুব মন দিয়ে ক্লাশ করল ছুটি। এরপর প্রতিটি ক্লাশ মন দিয়ে করল। আজ শনিবার। হাফ ডে। ছুটির পর কিছু খেলাধুলো হয়। সেটাতেও যোগ দিল। গালের দাগ রয়ে গেছে কিছুটা। এতসবে মনটা হাল্কা হয়েছে অনেকটা। তবে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবল মা-কে সে আজকের ব্যাপারটা বলবে।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।