সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ৫)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

সুধাময় সেদিন শুয়ে আছেন। রবিবার দুপুর। সপ্তাহের এই একটা দিন বিশ্রাম হয় খানিকটা। নাহলে তো ইশকুল থেকে ফিরতে ফিরতে সেই বিকেল চারটা। ছুটিও শুয়ে। দাদা দিদি সবাই বিছানায় শুয়ে। সবার হাতে গল্পের বই। ছুটির চোখ শুধু পেয়ারা গাছটাতে। দুটো কাঠবেড়ালি ছুটোছুটি করছে। পেয়ারার ছোট ছোট গুটি এসেছে। একটাতে ঠোকরাচ্ছে কাঠবেড়ালিটা,আর একটা কাঠবেড়ালি ডালে ডালে ছুটছে। এই পেয়ারাগুলো ভারি মিষ্টি। ভারি দুষ্টু তো কাঠবেড়ালিগুলো! কুঁড়িতেই নষ্ট করছে পেয়ারাগুলো। এক্ষুনি  তাড়াতে হবে। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল ছুটি। দিদিরা অখণ্ড মনোযোগে বই পড়ছে। মা-র চোখ ঘুমে জড়িয়ে এসেছে। বাইরে বেরিয়ে বড্ড ভালো লাগল ছুটির। শুধু দুপুর- ভূতের কিছু ভয়। ঠিক,  শুনশান লম্বা উঠোনটাও যেন রোদের ভেতর গা এলিয়ে শুয়ে আছে। দুপুর- ভূতের আরেক নাম সোনালি ভূত, রোদের গায়ের রঙ তার গায়ের রঙের সঙ্গে মিশে যায় নাকি, সে নাকি ছায়ার ভেতর শুয়ে থাকে, একটা বইয়ে পড়েছে ছুটি।পেয়ারা গাছের ঝিলমিলি ছায়া দোল খায়। ছুটির ভয় ভয় করে। চারপাশটা কী চুপচাপ। ঝিম ধরে আছে। তাহলে ঐ রোদের ভেতর, ঝিলিমিলি ছায়ার ভেতর কি সোনালি ভূত… কাঠবেড়ালিকে তাড়া দেওয়ার কথা ভুলে গিয়ে ছুটি ছায়া দেখে। ভয়ের সাথে সাথে  গায়ে কাঁটা দেয়। আবার সেটা কেমন জানি তাকে কাছেও  টানেও। পা টিপে টিপে সে একপা এগোয় এক পা পিছোয়।
৷ ঠিক এমনি সময়ে সমস্ত রহস্যের আবছায়াকে খান খান করে “মাস্টারবাবু মাস্টারবাবু” চিৎকার করতে করতে হরিমতি ছুটতে ছুটতে এসে ঢুকল। চিৎকারে সবাই সজাগ হয়ে উঠেছে।  তাড়াহুড়ো করে কিছু একটা বলতে চাইছে হরিমতি যে কেউ -ই কিছু বুঝতে পারছে না। শুধু বলছে – মাস্টারবাবু তুমি লগালগ যাও। “লগালগ” মানে এক্ষুণি। শেষ পর্যন্ত যা বোঝা গেল তা এই, হরিমতি ক্ষেতে কাজ করছিল। আজ রবিবার, পূরণ ঘরে আছে। কেউ ছুটে এসে খবর দিয়েছে পূরণের এক্সিডেস্ট হয়েছে। তো মাস্টারবাবুকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। হরিমতির সব ভরসা মাস্টারবাবুর ওপর। কিসের এক্সিডেন্ট?  জিজ্ঞেস করতেই হরিমতি তালগোল পাকানো কিছু একটা বলে পাগলের মত ছুটে বেরিয়ে গেল।
৷৷  ধেয়ানি বস্তি ছুটিদের কোয়ার্টার থেকে মাইল দুয়েকের পথ। সুধাময় রওনা দিলেন তড়িঘড়ি। পাকা রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে নেমে গেছে কাঁচা পথ,  দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। সুধাময় তড়িতগতিতে প্রায় ছুটছেন। ধেয়ানিবস্তির কাছাকাছি বিশাল জলাধার রয়েছে। এখান থেকেই পুরো চাবাগানে জল সরবরাহ হয়। সুধাময় দেখলেন পাম্প ঘরের পাশেই ছোটখাটো ভিড় জমে আছে। একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে। জমাট ভিড়ের অস্পষ্ট গুঞ্জন। ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকে চমকে উঠলেন সুধাময়। রক্তাপ্লুত পূরণ পড়ে আছে নিথর। হরিমতি পাথর। অদ্ভুত দৃষ্টিতে সে সুধাময়কে দেখল।
এই ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে সেই ট্রাকের পেছনে অদ্ভুত কায়দায় ঝুলে পড়া থেকেই। জলের পাম্প সারাইয়ের কাজে এসেছিল একটি ফোর্ড ট্রাক কিছু মালপত্র নিয়ে। ট্রাক দেখে হৈহৈ করতে করতে ধেয়ানিদের কিছু বাচ্চা ছেলে ছুটে এসে ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়ে। তাদের মধ্যে ছিল ছটফটে পূরণ। ট্রাক যখন থামাবার আগে ব্যাক করছে তার কাছাকাছি ছিল ইলেকট্রিক তারের লোহার খুঁটি, তাতেই মাথা জোরসে ঠুকে যায় পূরণের।
সুধাময় যখন বাড়ি ফিরলেন তখন বেশ রাত। কোয়ার্টারে কারেন্টের আলো নেইসেখানে  । টেবিলের ওপর রাখা কেরোসিনের টেবিল ল্যাম্পের আলোয় অদ্ভুত স্তব্ধতা।  তারাগুলো বড্ড বেশি ঝিকমিক করছে, বিশাল কাঁঠাল গাছটা অন্ধকারের স্তুপ জমাট করে দাঁড়িয়ে, শুধু ফ্যাক্টরির একটানা ঘর্ঘর শব্দের ভেতর বারবার ভাঙচুর হচ্ছে পূরণের দুষ্টুমি মাখা মুখ।
৷  বেশ রাতের দিকে ঘুমোবার আগে ছুটি দেখল বাবা একটা খাতায় কী যেন লিখছেন।
হরিমতি আর আসে না ছুটিদের কোয়ার্টারে। কাজ করে, চাষবাসের কাজ ছাড়েনি। একা একা নাকি কথা বলে। সাঁঝের বেলায় নাকি নিশ্চুপ হয়ে দূরদিগন্তে তাকিয়ে থাকে। এসব ছুটির মা, চাল এনে দেয় রূপচাঁদকে জিজ্ঞেস করে করে জানলেন।
সারা দুপুর ছুটির কাটে মা-র আঁচলে আঁচলে। মা-র রান্না দেখা, মা-র মিষ্টি সুরের গান শোনা, দাদা দিদি সবাই ইশকুলে, মাঝে সাঝে কৌতূহলী হয়ে তাদের পড়ার টেবিলে একটু খোঁজখবর করা, মানে একটুখানি পরশমণির সন্ধান করা। কিম্বা ঝাঁকড়া মাথা বাতাবিলেবু গাছে হরেক পাখির কিচিরমিচির, ওদের দেখার জন্যে নিরন্তর ঘন গাছের পাতার ভেতর তাদের খুঁজে বেড়ানো। গোটা দুপুরবেলাটাই  কেমন যেন অন্যরকম।  দুপুরবেলা গোয়াল সাফ করতে সরকারি কামলা রাসমণি ঝাড়ুওয়ালি আসে। হাতে একটা বেতের ঝুড়ি ও বাঁশের শলার ঝাড়ু। ছুটি তখন উঠোনে লম্বা আমগাছটার ছায়ায়  দাঁড়িয়ে রাসমণির কাজ দেখে।রাসমণি একা একা বিড়বিড় করে। কাকে যেন রাগ করে কিছু বলে। এভাবে একা একা বিড়বিড় করতে করতে  প্রথমে গোয়ালের গোবর সব টুকরিতে তুলে সব্জিক্ষেতের এককোণে ফেলে, তারপর পুরো উঠোন ঝাড়ু দেয়। ঝাড়ু দিতে দিতে মাঝেমাঝেই উঠোনে ঝাড়ুর বাড়ি মেরে বলে – হাঠাও!
“হাঠাও ” মানে তো “সরাও”। কী সরাতে চায় রাসমণি?
মা মাঝেসাঝে রাসমণিকে বসিয়ে চা খাওয়ান। এটা ওটা জিজ্ঞেস করেন। রাসমণি সব কথার উত্তর দেয় না। মা -ও জোর করেন না।
একদিন চা খাওয়ার পর রাসমণিকে গল্পে পেল, নাহলে সে বড় একটা কথা বলে না।  সেদিন ঝিম ধরা রোদের বন্যা। চা খেযে ঠক করে গ্লাসটা মাটিতে নামিয়ে রেখে বলে- হে ঠাকরান, হরিয়া বাগালকে চিনিস?
এরা ছুটির মা-কে ঠাকরান বলে। গরু রাখালকে বলে বাগাল।
ছুটির মা বললেন -হরিয়া বাগাল তো নেই রে। মরে গেছে না?  সরকারি বাগাল ছিল না?
রাসমণি বলে – হঁ। মইরেছে দু’তিন বছর হৈল। তবে ভূত হয়্যেছে।
ছুটির গায়ে কাঁটা দেয়।
-সেইদিন নম্বরে গেলম পাতি তুলতে।
মা বললেন – পাতি তুলতে তুই যাবি কেন? তোর তো ঝাড়ু দেওয়া কাজ।
রাসমণির চোখ প্রায় সবসময়ই লাল থাকে, দেখেছে ছুটি। সে চোখ লাল করে মার দিকে তাকাল। বলল – তুই নাই বুঝবি,  পার্বতীর বদলিওলা হয়্যে গেলম। চা পাতি তুলতে তুলতে একদম ভেতরে চল্যে গেলম। দেখলম হামি একলা হয়্যে গেছি। সঙ্গী সাথী কেউ নাইখে। গলা শুখায় গেছে। চা পানি খাবার ইচ্ছা হৈল। তাড়াতাড়ি ফিরছি তো দেখি হরিয়া বাগাল। বইলল – তোর গলা শুখাইল?  হামারো গলা শুখাই গেল। আয় আয একসাথে চা পানি খাই। বইলতে বইলতে হরিয়ার মাথা লম্বা হইল্য,বহোত লম্বা, একদম আকাশে ঠেইকে গেল মাথা। কী বইলব ঠাকরান, দিলম ছুট। ছুটতে ছুটতে ছুটতে ছুটতে ধম কইরে পড়লম। দম আইটকে গ্যেল। যখন চোক খুইলল দেখলম ভজন চা পানিওলা চা পানি দিছে। হামকেও দিল। তুই জানিস ঠাকরান,  হরিয়া বাগাল গরুর পাল লিয়ে দূরে গিয়েছিল আর গলা শুকায়্যে মরে গেল। তবেই তো হামকে বলছিল,  ওর গলা শুখাই গেল। তুই হামার বাত বিশ্বাস নাই করলি ঠাকরান? – বলে রাসমণি লালচোখে ছুটির মা-র দিকে তাকায়।
মা বলেন -তুই এসব গল্প করিস না রে। দেখছিস না খোঁকি ভয় পাইল।
খোঁকি মানে ছুটি।
রাসমণি লালচোখে ছুটিকে দেখে। তারপর চায়ের
 গ্লাস কলতলায় ধুয়ে এনে রান্নাঘরের দোরগোড়ায় ঠক করে রেখে চলে যায়।
ছুটির মা যেন নিজেকেই বলেন – চা খেতে খেতে ওর হরিয়া বাগালের কথা মনে পড়ল। রাসমণির আজ গলা শুকিয়েছে খুব।
মা যতই হালকাভাবে কথাটা বলুন না কেন, চাঁদনি রাতে কিম্বা ভরদুপুরে সেই হরিয়া বাগাল কতবার যে লম্বা হতে হতে আকাশে মাথা ঠেকিয়েছে তার কোন হিসেব ছুটি দিতে পারবে না নিজেকে।
(ক্রমশ)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।