সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিজয়া দেব (পর্ব – ৩)

অতিমারী
-এখানেই ভালো। আমার কেমন যেন জ্বরটা অন্যরকম লাগছে অগ্নি।
-কেন? তুমি কি করোনা ভাইরাস বলে সন্দেহ করছ?
-হ্যাঁ, তোমাদের এ ঘরে না আসাই ভালো।
-কিছু খেয়েছ?
-না, মাসি আমাকে গরম চা দিও আর গরমজল দিও ফ্লাক্স ভরে।
অগ্নির মনে হল সেবিকা বেশ ভয় পেয়েছে। ডাক্তারদের ভয় পেতে নেই। তবে এই ভাইরাসটি নতুন এবং ইতালিতে তুলকালাম ঘটিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। ভয় যে অগ্নির হচ্ছে না তা নয়। সেবিকা ও অগ্নির একমাত্র মেয়ে সেঁজুতি আমেরিকায় ডাক্তারি পড়ছে, ওখানে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দিনরাত ভয়। তবু সে যখন সেবিকার কাছে যেতে চাইল সেবিকা দু’পা পিছিয়ে গেল।
বলল – চিন্তা করো না, আমি ঠিক আছি। সামলে নিতে পারব। তুমি নিজের খেয়াল রেখো।
তবু ভেতরে ঢোকার জন্যে অগ্নি পা বাড়াতেই প্রায় চিৎকার করে উঠল সেবিকা – না। একদম নয়।
দরজাটা প্রায় মুখের ওপর লাগিয়ে দিল সেবিকা।
বিমূঢ় অগ্নি দাঁড়িয়ে রইল দরজায়। সেঁজুতিকে জানাবে? কথাটা ভাবছে, পকেটে ফোন বেজে উঠল। সেবিকা।
-তুমি সেঁজুতিকে কিচ্ছু জানাবে না। আর হ্যাঁ, আমার হসপিটালাইজড্ হয়ে যাওয়া ভালো।
-আমি এইমাত্র ভাবছিলাম সেঁজুতিকে জানা। কিন্তু জানাটা ওর দরকার।
-তাতে কী হবে? ওকে মনোকষ্টে ফেলা ছাড়া? ইচ্ছে করলেও তো আসতে পারবে না, তাই না?
-তোমার জ্বর কত? আমাকে ঘরে ঢুকতে দাও সেবিকা। প্লিজ।
-একদম নয়। তুমি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করো।
অগ্নির মনে হচ্ছে তাকে কেউ যেন টেনে এক অন্ধ গহ্বরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, চারদিকে কিলবিল করছে কিছু অণুজীব, পরিত্রাণহীন অন্ধকার। আস্তে আস্তে সে শোবার ঘরে এল। অন্যমনস্ক, কলের পুতুল যেন। অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। সেবিকা কি করোনাক্রান্ত? এখন খবর দিলেও সেঁজুতি আসতে পারবে না। লকডাউন।
-দাদাবাবু, তোমার ব্রেকফাস্ট তৈরি। হাতমুখ ধুয়ে নাও।
দরজায় রান্নার মাসি। অগ্নি তাকে হাত তুলে থামতে বলল। অগ্নি ফোন করছে অ্যাম্বুলেন্সের জন্যে।
৩
মারণ ভাইরাসটি যেন হঠাৎ করেই হামলে পড়ল পৃথিবীর ওপর। এমনটি কি আর কখনও হয়েছে? হ্যাঁ, মহামারী হয়েছে-কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, কলেরা, প্লেগ.. তবে তা ছিল অঞ্চলভিত্তিক। ইবোলা নামে এক মারাত্মক ভাইরাসও মানুষকে কব্জায় নেবার চেষ্টায় ছিল, কিন্তু এই করোনা ভাইরাস? এমনভাবে হামলে পড়েছে গোটা বিশ্বে… এমনভাবে আক্রান্ত হয়েছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলো যে সত্যিই এবার মনে হচ্ছে মানুষ বড় অসহায়, খেলার পুতুল মাত্র। কথাকলি এ পরিস্থিতিতে দিল্লি চলেই এসেছিল। টিকিট তো আগাম করাই ছিল। স্বপ্নিল বারবার তাকে বারণ করছিল, বাড়িতেও। কিন্তু পথশিশুদের নিয়ে ইস্কুলবাড়ি তৈরি করার যে পরিকল্পনাটি আছে সেটি পিছিয়ে গেলে আর সূত্র ধরা মুশকিল হবে।
এটা একটা স্বপ্ন, পথশিশুদের জন্যে একটা নিজস্ব ইস্কুলবাড়ি হবে, আর তা হবে স্বপ্নিলদের বাড়ির ভেতর দেড় কাঠা জমিতে। ঐ জমিটা এন জি ও কে বিক্রি করবেন স্বপ্নিলের বাবা স্বল্পমূল্যে। অতীশমামু তাকে জানিয়েছিল টাকা স্যাংসন হয়েছে, তোকে আসতে হবে। কতদিন থেকে এরজন্যে ছোটাছুটি, রাত জেগে প্ল্যানিং। এই সুযোগ আর আসে!
দিল্লিতে বরাবরের মত মামার বাড়িতেই উঠেছিল কথাকলি। পাঁচতলায় ফ্ল্যাট। মামা অতীশ চৌধুরী কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা। এই মামার সাহায্য সহযোগিতায় ও কিছু ডোনেশনের ওপর ভিত্তি করেই তারা এন জি ও “প্রত্যয়” চালায়।
পৌঁছনোর পর মামী বলল – তুই যে কাজে এসেছিস মনে হয় না সেটা হবে বলে। তোর মামা তোকে কিছু বলে নি? কী দ্রুত পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে। একের পর এক লকডাউন দিচ্ছে প্রথম বিশ্বের দেশগুলো। কী ভয়! কী আতঙ্ক। এখন তোর বেরোনো বোধহয় ঠিক হল না। যদিও এখানে তোর অসুবিধে নেই। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে থাকতে ভারি অস্বস্তি হবে দেখিস।
সত্যিই এভাবে আসা ঠিক হয়নি। আচমকাই লকডাউন ঘোষিত হয়ে গেল। কথাকলি যেদিন দিল্লিতে পৌঁছোল তার পরদিনই। তবে এভাবে যে লকডাউন হতে পারে সবাই তো বলাবলি করছিল, সে-ই কারো নিষেধ শোনেনি। মাথার ভেতর পথশিশুদের জন্যে স্বপ্নের ইস্কুলবাড়ি। এখন অতীশমামার অসহায় চেহারা দেখে খারাপ লাগছিল কথাকলির। সত্যি এভাবে এই অসময়ে আসাটা একদম ঠিক হয়নি। তবে মামা মামী তাকে আশ্বস্ত করছে – তুই কি জলে পড়েছিস নাকি? স্যাংসনের টাকাটা তোর হাতে যদি তুলেও দিতে পারতাম তাহলে কাজ কী করে হত! এসব কিছুর জন্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে হবে।
কিন্তু সেটা কবে হবে কেউ তো জানে না। কেউ না।
অদ্ভুত অভাবনীয় এ সময়। কথাকলি কবে ফিরবে? কতদিন তাকে মামার বাড়িতে থাকতে হবে? সে-ও তো আক্রান্ত হতে পারে। তার মৃত্যুও হতে পারে। ঠাম্মা, বাবা, মা-কে যদি আর দেখতে না পায়! আতঙ্ক আর ভয়।এই অচেনা সময়ে মানুষ কী অনিশ্চিতির ভেতর ক্রমেই সেঁদিয়ে যাচ্ছে সে বুঝতে পারছে। শুধু কি কথাকলি? কত লোক কতদিকে কত কাজে গেছে, কেউ বা চিকিৎসার জন্যে ভিনরাজ্যে, পাশের দেশ থেকে এসেছে। এদের কী হবে? ঠাম্মা বাবা মা বারবার ফোন করছে। শুধু অতীনমামা আশ্বস্ত করে যাচ্ছে-আরে এসেছিস তো মামার বাড়িতেই। মামার বাড়িতে আগে আমরা ছুটি কাটাতে যেতাম মনে নেই? মাসখানেক থাকতাম আমকাঁঠালের ছুটি হত যখন, গরমের ছুটি..আহা কী আনন্দই না হত! ফোনে অতীশমামু মাকে বোঝায়। মা রেগে যায় – কী বলছিস অতীশ? দুটো এক হল?
ঠাম্মা ক্ষেপে গিয়ে রাগারাগি করে কথাকলির ওপর।
বলে – এবার ভালোয় ভালোয় ফিরে আয়, তোর এন জি ও করা বের করছি।
অতীশ টিভি চালিয়ে কথাকলিকে ডাকে, ডাকে স্ত্রী বিপাশাকে। বলে – তোমরা শুধু নিজেদের অসুবিধের কথা ভাবছ। এদিকে দ্যাখ, ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকরা বাড়ি ফিরছে পায়ে হেঁটে।
তাই তো! টিভির স্ক্রিনজুড়ে মানুষের মিছিল। মানুষ হাঁটছে হাঁটছে হাঁটছে… কোথাকার মানুষ কোথায় যাবে! গুজরাত থেকে পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা থেকে পাঞ্জাব, দিল্লি থেকে মধ্যপ্রদেশ। সাথে ছোট শিশু, ট্রলি সুটকেসের ওপর বসেছে শিশু অথবা সে কাঁধে চড়ে যাচ্ছে, হাঁটতে হাঁটতে প্রৌঢ়ার পায়ের নিচের চামড়া ফেটে… ওহ চোখে দেখা যায় না।
এত এত মানুষ ভিনরাজ্যে কাজ করতে যায়? নিজের রাজ্যে তাদের কাজ নেই? এমন অদ্ভুত ভয়ানক দৃশ্য.. উফ সংখ্যায় এরা কত? এ যে শেষ নেই। এরা বাড়ি ফিরছে। যানবাহন বন্ধ, সুতরাং পা দুটোই ভরসা। এছাড়া উপায় কি! কাজ নেই কাজের জায়গায়, তারা থাকবে কোথায়? খাবেই বা কী! হাঁটতে হাঁটতে পথেই মারা গেল কেউ, পথদুর্ঘটনায় মারা গেল কেউ কেউ মারা গেল অনাহারে। মৃত্যু যেন কিছুই নয়, ওৎ পেতে বসে আছে পথের কোণে কোণে, পথের বাঁকে বাঁকে, দোকান-বাজারে। মানুষ মরছে অনাহারে, পথদুর্ঘটনায়, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। অথচ কিছুদিন আগেই তো এমন পরিস্থিতি আসবে তা ভাবা যায়নি। লকডাউন শব্দটি আগে কখনও শুনেনি কেউ। এভাবে সব বন্ধ হয়ে যায় হঠাৎ সেটাই বা কে জানত! এমন দুঃসময় কথাকলি কখনোই দেখেনি। মন্বন্তরের কথা শুনেছে, কিংবা বন্যা ভূমিকম্প এগুলোর কিছু কিছু অভিজ্ঞতা আছে। মহামারীর গল্প শুনেছে ঠাকুমার কাছে। উপন্যাসে পড়েছে কিশোরীবেলায়। শরৎসাহিত্যে। যদিও অত পড়ুয়া নয় সে।
এইসব শ্রমিকদের পথচলা দেখতে দেখতে মনে পড়ছিল দেশভাগের কথা। হাজারে হাজারে মানুষ নাকি ছিন্নমূল হয়ে এসেছিল রাতের অন্ধকারে, পথে মারা গিয়েছিল অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়েছিল ধর্ষিতা হয়েছিল। রাজনৈতিক খেলায় একই দেশের মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া বিভাজিত করে দিল মানুষকে। দেশ দুটুকরো হল। পুনর্বাসিত হওয়ার যন্ত্রণা দীর্ঘকাল জুড়ে ভোগ করল।
মানুষের জীবনটা আদৌ সুখকর নয়, ভেবে মনটা নিদারুণ বিষণ্ণ হল কথাকলির। মামাবাড়িতে কাজ করে মুন্নি বলে – ম্যাডামজি, সবলোগ শায়েদ মর জায়েঙ্গে, সারে লোগ মরনে কে বাদ দুনিয়া মে ক্যয়া রহেঙ্গে? ইয়ে সমুন্দর পেরপৌধে পনছি আউর কুছ নেহি। সারে দুনিয়া সুনসান…. ইয়ে সব শোচতে হী রহতি হু। উপরআলা রুঠ গ্যয়া…. ফির দো চার লোগ জিন্দা রহে গ্যয়া তো উনলোগোকা ক্যয়া হোগা?
মুন্নির ধারণা কি সত্যি হতে পারে? কে জানে! এই মুন্নিকে পরদিন লম্বা ছুটি দেওয়া হল। আবাসনে একটা ভার্চুয়াল সভা হল। সিদ্ধান্ত হল বাইরে থেকে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। হোম ডেলিভারির ক্ষেত্রে বাইরে গার্ডের কাছে সব রেখে যাবে। ফ্ল্যাটের মালিক সেই বস্তু স্যানিটাইজ করে ঘরে তুলবেন।
কথাকলির মামী বিপাশা যখন মুন্নিকে ফোন করে যখন আসতে বারণ করল তখন মুন্নি হাউহাউ করে কাঁদছিল…
মামা তাকে বুঝিয়ে বলল – তোর মাইনে কাটা হবে না। তুই সাবধানে থাকিস। বিপদ কি সবসময় থাকে? বিপদ ঠিক কেটে যাবে।