সাহিত্য ভাষান্তরে বাসুদেব দাস

সুইসাইড নোটস

প্রণব কুমার বর্মন
মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ

মা,কেন লিখছি –জিজ্ঞেস করার হয়তো সুযোগ পাবে না
বাবা,কেন লিখছি –কোনোদিনই জিজ্ঞেস করতে পারবে না
আমার জন্মের দিনটিতেও তুমিই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলে
তবুও তুমি হেসেছিলে মা
নার্সিংহোমের বেডে যখন পাপা তোমার চুলে
আঙ্গুল বুলিয়ে দিচ্ছিল
তুমি বলেছিলে-আমার প্রেমের এটি শ্রেষ্ঠ উপহার
মা.তুমি আমার জন্য ছোট ছোট জামা সেলাই করেছিলে
কান ঢাকা টুপি বানিয়েছিলে
যাতে আমি শীতে কষ্ট না পাই
যাতে বাতাস কাবু করতে না পারে
কেউ কখনও যেন তোমার কাছ থেকে আমাকে কেড়ে নিতে না পারে
তুমি বুকের মধ্যে সেভাবে আমাকে বেঁধে রেখেছিলে মা
এমনকি পাপার প্রেমের প্রতিও তুমি অনাগ্রহী হয়ে উঠেছিলে
আমার জন্যই মা তোমার প্রেমিক
মেনে নিয়েছিল সেই দুরত্ব
যাকে ছাড়া তুমি বাঁচবে না বলেছিলে একসময়
আমার আগমন তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল তোমার কাছ থেকে
পাপা, ও আমার পাপা
বাজার থেকে তুমি পুতুলগুলি কিনে এনেছিলে
এনেছিলে হরলিক্স,কর্ণফ্লাওয়ার,হীরাবার্লি
তোমাদের হৃদয়ের উত্তাপে আমি বড় হচ্ছিলাম
পূর্ণচন্দ্র পূর্ণিমার ।

তুমি মেঝেতে হাতি হয়েছিলে পাপা
আমি পিঠে উঠেছিলাম
তুমি ঘোড়া হয়েছিলে,ভালুক হয়েছিলে,
বিড়াল হয়েছিলে,বাঘ হয়েছিলে
আমি হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম
আর মা,তুমি শিখিয়েছিলে ঈশ্বরে বিশ্বাস
নম কর,নম কর বাবা
অ মানে অমিতা,এ মানে আপেল
তোমার বুকে শুয়ে থাকার সময় খেলেছিলাম
চাঁদের সঙ্গে সুচ খোঁজার খেলা

তারপর নামী স্কুল, পিঠে বইয়ের বোঝা
স্কুটার স্টার্ট করে দাঁড়িয়ে থাকে পাপা
ওঠ ওঠ বাবা আমার ,চাঁদ আমার বাবা
দাঁত ব্রাশ কর ,ম্নান কর,জুতোর ফিতে বাঁধ
-টা টা মা টা টা টা টা
দেখতে পাওয়া পর্যন্ত তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাক
কিছুই ভুলে যাইনি মা

অংক কঠিন মা
তোমার দেওয়া টিফিন বাক্সটার কথা ঘন ঘন মনে পড়ে
রূপালী মিসকে মা এত রাগী বলে মনে হত
হেডমিস ছিলেন স্নেহময়ী
স্কুল ছুটির ঘন্টা অখণ্ড সুখের আহবান
মা তোমার ছায়ায় ফিরে এসেছিলাম
রাতে ভয় লাগছিল
জানালার খোপে খোপে অন্ধকার তাড়া করে এসেছিল
আমাকে যেন নিয়ে যাবে দিগান্তের ওপারে
বাঁচাও মা আমাকে বাঁচাও
ধর পাপা আমাকে ধর
তুমি আমাকে বুকে সজোরে জড়িয়ে ধরেছিলে মা
তোমার স্পর্শ আমার গলায় লেগে রয়েছে
তোমার চুলগুলি কপালে ঝুলছে
তোমার ভালোবাসা মেশানো ক্রোধ
আর পাপার স্নেহ মেশানো শাসন
যে উজ্জ্বলতার নিচে দিয়ে ঝুকে আসতে আসতে
আমি অতিক্রান্ত করে এলাম ষোলো বছর
মা আমাকে কেন বলেছিলে –ভালো করে পড়,বড় ডাক্তার হতে হবে
বাবা,কেন আমাকে বলেছিলে -পড় পড় কেবলই পড়
দিল্লি ,বাঙ্গালোব অক্সফোর্ড
আমাকে খেলা থেকে টেনে নিয়ে আসতে
টিভিতে কার্টুন দেখার সময়েও টিভি অফ করে দিতে
সাইকেল চালানোর সময়, দাবা খেলার সময়
সমবয়সীদের সঙ্গে ঝগড়া করার সময় –বলেছিলে
এখন নয়,এখন নয়
বই তোর ভবিষ্যৎ।
আমার মগজে ফিজিক্সের পোকা
আমার রক্তে ম্যাথামেটিক্সের উইপোকা

মাঝরাতে জেগে উঠে আমি একটা ছবি আঁকতে চাই
মাঝরাতে আমি গীটার বাজাতে চাই
ক্যামেরাটা নিয়ে জোনাকি পোকার ছবি তুলতে চাই
আমার স্বপ্নের পথরোধ করে দাঁড়ায় মা তোমার স্বপ্ন
বাবার স্বপ্ন
আমাকে মুক্ত করে দাও
আমাকে মুক্ত করে দাও
তোমাদের স্বপ্ন থেকে
কোথাও রঙ নেই-বৃষ্টি নেই,আকাশ নেই,ফুল নেই,চাঁদ নেই
কেবল কনসেপ্ট,থিয়োরি,অ্যাম্বিশন,
কেবল কেরিয়ার,কম্পিটিশন,
আমার ভালো লাগেনা মা
বাবার ঘাম আর রক্তের মুল্যে
আমি যেন বিক্রি হয়ে যাওয়া খাঁচার পাখি
আমাকে নিয়ে কেন মা তোমাদের এত দর কষাকষি
এই পৃথিবী আমার কাছে একটা মার্কশিট
কিছু নাম্বার, প্রেড,চাকরির পুর্ণ সম্ভাবনা
এই জীবন আমার কাছে উঁচু অট্টালিকা
ক্রীতদাস,বিলাতফেরৎ কোট টাই
মা আমার ভালো লাগা পৃথিবীটা খুঁজে পাই না
বাবা,আমার চাহিদার পৃথিবীটা আমি দেখতে পাই না
একটি ছবি,গীটারের সুর,অলেখ কবিতা
কিছু রোদ,কিছু নিরুদ্বেগ,মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভেজা
রোহনের চেয়ে আমার মেধা কম নয় বাবা
দীক্ষার চেয়ে আমার বোঝার সক্ষমতা অধিক
ওরা রিলেটিভিটি জানে,থিয়োরি অফ ইভ্যুলিউশন
আমি জানি আইনষ্টাইন এবং ডারউইনের
বিস্তৃত বিশাল জীবন
তবুও পরীক্ষায় আমার নাম্বার কম
শিক্ষকের ঠাট্টা এবং ভৎর্সনার লক্ষ্য আমি
চেষ্টা করতে হবে আরও চেষ্টা করতে হবে
আমি কোনদিক দিয়ে কম মা?
কেন তুমি আমাকে না বুঝে রাগ কর
কেন আমাকে বোঝার চেষ্টা করনা বাবা
কেরিয়ারের সিড়ি থেকে আমি কেন খসে পড়ি
আর নয় বাবা
তোমাদের স্বপ্পের উচ্চতা থেকে
খসে পড়তে চাই না
তোমার ইচ্ছার উচ্চতা থেকে
নিচে নেমে যেতে চাইনা মা
আমাকে ক্ষমা কর
এই পৃথিবীর জন্য আমি উপযুক্ত ছিলাম না
একটুকরো কাঠ একটা পাথর
বাবা
মা
এখন আমি যে উচ্চতায় ঝুলে থাকব
নিথর হয়ে
সেখান থেকে আমাকে নামিয়ে এনো না
আমি তোমাদের স্বপ্নের সমান উঁচু হতে চাই।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।