সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ২০)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
“জীবনস্মৃতি ” টা খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছি। প্রীতমকে কথা দিয়েছিলাম। তারপর রবীন্দ্রজয়ন্তী শেষ হলো। ছেলেটা দারুণ অভিনয় করেছে “বিনি পয়সার ভোজ “। দু’দিন জীবনস্মৃতির খোঁজ করে গেছে।
খুঁজতে খুঁজতে পুরনো ডাইরিটা আলমারির তাক থেকে নীচে পড়ল। ডাইরিটা তুলে রাখতে গিয়ে একবার খুলে দেখলাম।
লিখেছি – “মা আজ আই সি ইউ এ ভর্তি। সাউথ অচিনপুর নার্সিংহোম। মা কি সবাইকে চিনতে পারছেন? চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছে কিছুটা পারছেন কিছুটা পারছেন না। বোধ ও বোধের জগতের বাইরে একটা দোলাচল অবস্থার মাঝে রয়েছেন। নার্স দুজন বড্ড ভালো। বিশেষ করে রাই নামের নার্সটি তো সবসময় মা-কে ‘মা’ ‘মা’ বলে ডাকছে। মার কথা জড়িয়ে গেছে। একদিন বলেছেন -রাই, তুই আমার আরেক মেয়ে।
রাই কথাটা বারবার করে আমাদের বলছে। ওর চোখে জল।
হঠাৎই মা সেদিন সকালে স্ট্রোক এ আক্রান্ত হলেন। বাড়ি থেকে ফোন এল। ছুটে গেলাম। তারপর ডাক্তার এম্বুলেন্স আই সি ইউ।
৷ মা-কি আর থাকবেন না? আমি আমার কথা কাকে বলব? ইশকুল থেকে বেরিয়ে মার পাশে ঘুমিয়ে নিজের কথা মায়ের কথার প্রিয় বুদবুদগুলি হারিয়ে যাবে একেবারে? ” – ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০১১।
বিমর্ষ মনে হাত পা ছড়িয়ে বসে রয়েছি। আজ রবিবার।
আরেক পৃষ্ঠায় লিখেছি -” টুকাইকে তনয় দেখে রাখে। টুকাইএর জন্যে তনয়ের যা বাড়তি নজরদারি করতে হয় প্রায় একা হাতে তা তো ভাষায় প্রকাশ্য নয়। সব বাবা এমনি করে করতে পারে কিনা জানি না। কিন্তু কষ্ট স্বীকার করে নেওয়াটা একা হাতে, আর তার জন্যে কোনও মুহূর্তে কোনও বিরক্তি প্রকাশ না করা, কোনও অভিযোগ না করা তাকে কী ভাষায় প্রকাশ করি? না, ভাষা মাঝে মাঝে নীরব হয় বৈকি। কোনও কোনও দিন হেল্পার ছেলেটা বাড়ি চলে যায়। তনয় টুকাইকে ইশকুল পাঠিয়ে তারপর নিজে অফিস যায়, অফিসের লাঞ্চব্রেকে অনেকটা দূরত্বে টুকাইকে ইশকুল থেকে সোজা অফিসে নিয়ে চলে আসে। টুকাই বসে থাকে সেই রাত অবদি। এদিকে ভয় ভাবনা দেহে মনে জড়িয়ে থাকে। “- ৯ই জুলাই, ২০১২।”
শেষ পর্যন্ত খুঁজতে খুঁজতে “জীবনস্মৃতি ” বেরোল। রবীন্দ্রজয়ন্তীতে প্রীতম যা অভিনয় করেছে সত্যি তা আর বলার নয়। শিক্ষকরা তো বলছে মাধ্যমিকে দারুণ রেজাল্ট করবে। পরপর দুদিন এসে “জীবনস্মৃতি” খুঁজে গেছে। যাই হোক পেয়ে গেছি। বইটা ইশকুল লাইব্রেরিতেও খুঁজে পাওয়া গেল না।সব গুছিয়ে তুললাম।
৷ এই ফ্ল্যাটবাড়ির চারদিকে উঁচু উঁচু বাড়ি, গাছপালার তেমন বালাই নেই। শুধু আমার ব্যালকনির গা ছুঁয়ে প্রতিবেশীর একটি নারকেল গাছ দাঁড়িয়ে। ওখানে কাক বাসা বেঁধেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি, আমার রান্না করে দেয় মেয়েটি আমাকে ডেকে দেখায় কাক ডিম পেড়েছে। একেবারে কুচকুচে কালো। ওটা কাকের ডিম না কি কোকিলের ডিম কে জানে! কোকিল কাকের বাসায় ডিম পাড়ে বলে শুনেছি। ঐ পাশের বাড়ির ছাদে দুটো বেড়াল দারুণ ঝগড়া করছে। বেড়ালের ঝগড়া সত্যি দেখার মতো। কী যে সব রাজকীয় ভঙ্গিমা!
৷ কাজের সহায়িকা মেয়েটি দু’তিন দিন পর আমাকে ডেকে দেখায়, দেখুন দিদি, কী বিচ্ছিরি দেখতে কাকের ছানা, ছি:! ডিম ফুটে বাচ্ছা বেরিয়েছে। সত্যিই তো একেবারেই কদাকার দেখতে। তবু ছানা তো, আমি তাকিয়েই থাকি। কাকের মানুষের প্রতি ভয় বিলকুল নেই দেখেছি। আমি দাঁড়িয়ে আছি। উড়ে গেল না, চোখে চোখে তাকাল দিব্যি। ঘাড় কাত করে এদিক ওদিক দেখেই চলেছে। খুব পর্যবেক্ষণ শক্তি! হুম!
৷ কিন্তু ছানাগুলি বড়ো হতে দেখার সুযোগ মিলল না। হঠাৎ দা কুড়ুল এনে ক’টা লোক নারকেল গাছটা কেটে ফেলল। এল ইঁট বালি সিমেন্ট। আমার আর কাক কিম্বা কোকিলের ছানা বড় হয়ে ওঠা দেখা হল না।
৷ ইশকুলে আজ একজন মহিলা অভিভাবক এসে হাজির, তার ছেলেটাকে একটু বিশেষভাবে বা আলাদাভাবে নজর দেওয়া যায় কিনা অনুরোধ রাখল।
জিজ্ঞেস করলাম -কেন?
সে একটা কাগজ বের করে দেখাল। অচিনপুর মেডিকেল কলেজের একটা সার্টিফিকেট। ছেলেটি একটি বিশেষভাবে সক্ষম বা বাধাগ্রস্ত কিশোর। এদের জন্যে সরকারি নির্দেশনামা আছে যে এদেরকে যেন পড়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং বিশেষভাবে যত্ন নেওয়া হয়। কিন্তু শুধু নির্দেশনামাটাই আছে। বিশেষভাবে সক্ষম শিশুর জন্যে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষক ইশকুলে একজনও নেই। ছেলেটি ক্লাশ সেভেনে পড়ে। রিমা ক্লাস সেভেনের ক্লাস টিচার। রিমাকে ডেকে জিজ্ঞেস বললাম ছেলেটার কথা। ছেলেটার নাম কুশল।
রিমা বলল – এমনিতে ও বিশেষ ঝামেলা করে না। খুব চুপচাপ। কিন্তু উল্টো করে কিছু কিছু alfabet লেখে। আর কেখা বেশ জড়ানো।
-মানে?
– যেমন ধরো r d এগুলো বেশ ঝামেলার ওর কাছে।
আমাকে একটা কাগজ দেবে? আমি দেখিয়ে দিচ্ছি সে কেমন করে লেখে।
বলে রিমা লিখে দেখাল। r হচ্ছে উল্টো r, আর d হয়ে যাচ্ছে b.
-এরকম আরও কিছু কিছু। আর কথাটা বলে একটু টেনে টেনে খুব ধীরে ধীরে।
-একটু নিয়ে এসো তো।
ছেলেটাকে নিয়ে এল রিমা। জিজ্ঞেস করলাম ওর নাম, বাবার নাম মায়ের নাম বাড়ি কোথায়। উত্তর দিল ঠিকঠাক। কিন্তু খুব টেনে টেনে। একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বললাম – তোমার নাম ও ঠিকানা এখানে লিখে দাও। সে লিখল। নামটা সঠিক লিখল। কিন্তু ঠিকানাটা পড়ে ঠিক বোঝা গেল না। রিমা ঠিকানাটা খুঁজে খুঁজে বেশ কিছু উল্টো alfabet দেখাল।
ছেলেটির কয়েকরকম সমস্যা। ও slow learner শুধু নয়, আরও কিছু সমস্যা আছে। উল্টো alfabet লেখার সমস্যাটা শুনেছি। কিন্তু এগুলো থেকে বের করে আনার পদ্ধতি এখানে কারো জানা নেই। আদৌ কোনও পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে কিনা সেটাও একটা প্রশ্ন।
মনে পড়ল টুকাইকে দক্ষিণে দেখাতে গিয়ে প্রায় মাসখানেক সেসনে বসেছি মনোবিশ্লেষক এক গবেষকের সাথে। এক একটা সেসনের পর ডাক্তারের টিমের সাথে বসতে হত।
একদিন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম -অনেক কিছু তো জানলাম , শুধু আমাকে বলুন কীভাবে ওর মনোসংযোগ বাড়ানো যায়। লক্ষ করলাম ডাক্তার আমার এই কথার উত্তর এড়িয়ে গেলেন।
পরে গবেষক মেয়েটি আমাকে কাউন্সেলিং করতে করতে এক ফাঁকে বলল – সেদিন আপনি ডাক্তারের মন খারাপ করে দিয়েছেন।
অবাক হয়ে বললাম – কেন?
– উনি বললেন যে প্রশ্নটা উনি করেছেন সেটাই তো মূল প্রশ্ন। তার কোনও উত্তর তো দিতে পারলাম না। উত্তরটা তো এখনও আমাদের কাছে নেই। একজন ডাক্তার হয়ে বড্ড অসহায় লাগে। হয়তো কোনও একদিন উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে। হোপ ফর দ্য বেস্ট।
ক্রমশ…