সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিজয়া দেব (পর্ব – ২)

অতিমারী
“মরমী, আমার বিদেশ যাওয়া স্থির হয়েছে। ইউ. কে তে যাচ্ছি। একটা কথা ভাবছি, আপাতত বিয়ের ব্যাপারে আমাদের কোনও সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। তুমি হয়ত অনেক স্বপ্ন দেখছ আমাদের আগত ভবিষ্যৎ নিয়ে, কিন্তু আমাকে আমার মাস্টার্স কোর্স কমপ্লিসনের ব্যাপারটিকে অগ্রাধিকার দিতেই হচ্ছে। আমরা বন্ধু আছি, বন্ধু থাকব। বন্ধু হিসেবে আমাকে চিরকাল পাশে পাবে।
ইতি অগ্নি। ৩১/৯/৯৭”
চিঠিটা এখনও আছে? আশ্চর্য! সে এটাকে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল নাকি? ছিঁড়ে ফেলবে? না থাক। যেমন ছিল তেমনই থাক। কোনও মূল্য নেই জেনেও কিছু কিছু জিনিস থেকেই যায়। ডা. 1অগ্নি বিদেশেই বিয়ে করল চিকিৎসক মহিলাকে। ডা. সেবিকা পানিগ্রাহী। তবে অগ্নি যোগাযোগ রেখেই গেছে বরাবর। বন্ধুভাবেই। যদিও মরমীর অগ্নির বন্ধুত্বে অনীহা ছিল তবু কেন কে জানে সে-ও যোগাযোগ ছিন্ন করেনি। বিয়েও করেনি। এমনি এমনি একটা সুতোর সংযোগ রয়েই গেল ঐ হলদে চিঠির মত। মানে নেই তবু আছে। ততক্ষণে মা আবার মুখ খুলেছে- বৃদ্ধাশ্রমের কোনও ব্যবস্থা হল?
-নাহ্।
-মানে?
-মানে আর কি? তোমার বাড়িতে তুমি থাকবে, এখানে আর কথা কি?
-তবে যে বললি বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি!
-নাহ্ এখন নতুন করে ভাবছি।
-আমার হয়েছে জ্বালা।
মা কাঁদতে শুরু করল আবার। মরমী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কান্না দেখছিল। মুক্তোবিন্দুর মত জল চোখ থেকে টপ টপ করে পড়ল দু’ফোঁটা মায়ের হাতের ওপর। দু’ফোঁটা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে ঠোঁটের কষ বেয়ে থুতনিতে পড়ল। নিশ্চয়ই খানিকটা জিভে গেছে। সে জিজ্ঞেস করল – নোনতা?
মা চমকে উত্তর দিল – কী নোনতা?
-চোখের জল? মনে হল খানিকটা জিভে গেছে।
-কী বলছিস!
-বলছি জিভে নোনতা স্বাদ?
মা কান্না থামিয়ে যেন পরখ করল সত্যিই চোখের জল জিভে গেল কী না। বয়েস মানুষকে এতটাই শিশু করে দেয়।
সুনয়না মানে মরমীর অশীতিপর মা কান্না ভুলে গিয়ে বলে – হ্যাঁ।
তারপর রেগে ওঠে – ইয়ার্কি হচ্ছে?
-ইয়ার্কি কেন হবে? তুমি কি জানো চোখের জলের কেন নোনতা স্বাদ হয়? বিজ্ঞান আছে বিজ্ঞান!
-ইয়ার্কি পেয়েছিস?
মরমী হি হি হাসে। যাইহোক, এতে মা-র কান্না বন্ধ হয়েছে। এখন মা-র রাগী চোখ জানালায়।
এইসময়ে ভাইঝি তোতা এসে উপস্থিত। এসে মরমীর গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল-শুনতে পাচ্ছ গন্ধ? অমলেট ভাজছে কেউ।
-হ্যাঁ পাচ্ছি। সাথে কেকের গন্ধ।
টের পাচ্ছিস?
তোতা এবার নাক তুলে গন্ধ শোঁকে। মা-র কান্না ও আনুষঙ্গিক মনোকষ্ট আপাতত স্তব্ধ। মরমীর চোখের সামনে ভাসছে একটি ঝুলকালিওলা রান্নাঘর – একটি কিশোরী পড়ার টেবিল থেকে উঠে রান্নাঘরে অ্যালুমিনিয়াম স্টোভের ধকধকে আগুনে অমলেট ভাজছে। একটা ডিম বাড়তি খরচ হয়ে গেল বলে মা গুম করে তার পিঠে একখানা কিল মেরেছিল। মা-র দোষ নেই, সংসারটা টানাটানির ছিল। তখন ঠাকুমা ঠাকুরদা বেঁচে, সেজপিসির বিয়ে হয়নি। বাবা পূর্তবিভাগের সাধারণ করণিক। তবু বাবা সব দায়িত্ব পালন করেছিল। কখনও বাবা দায়িত্বকে বোঝা মনে করে নি, সেজপিসির মোটামুটি ভালোই বিয়ে হয়েছিল।
-এই তোতা, অমলেট ভেজেছি, খাবি আয়-দরজায় বৃন্দা।
-কেক?
-হ্যাঁ কেক।
নিরাময় ও বৃন্দার একমাত্র মেয়ে তোতা। মায়ের সঙ্গে গেল, একটু পরেই ফিরে এল লাফাতে লাফাতে হাতে একটুকরো কেক ও ছোট্ট ছিন্ন একটুকরো অমলেট নিয়ে। ঠাম্মা ও পিসির মুখে ছোট ছোট টুকরো দিয়ে বলল – একটু চেখে দেখো তো, তারপর সে চলে গেল লাফাতে লাফাতে।
পার্লারটা খুলতে হবে এখন। তৈরি হচ্ছে মরমী।
-এখন কোথায় যাবি?
মার তির্যক দৃষ্টি।
-পার্লার খুলতে হবে না? তোমার আদরের খোকাটি আমাকে বসিয়ে খাওয়াবে?
“রূপটান” পার্লারটি চালায় মরমী। কথাকলিদের বাড়ির নিচে গ্যারাজের পাশে একটি ঘর ভাড়ায় নিয়ে সেটি চালিয়ে যাচ্ছে সে অনেক বছর হল। খুব যে লাভজনক ব্যবসা তা নয়। নিজের খরচটুকু চলে যায় এইটুকুই শুধু। মাঝেমাঝে মায়ের জন্যে কিছু ওষুধ কেনার খরচা। চলে যায় একরকম।
২
হাসপাতাল থেকে ফিরে ডা. সেবিকা পাণিগ্রাহী অনুভব করল গলার ভেতর হালকা খুশখুশে ব্যথা। প্রথমে গলার নিচের দিকটায় মনে হচ্ছিল কিছু একটা আটকে আছে। তারপর নাক বন্ধ, নাক দিয়ে তরল সর্দি গড়ানো এইসব উপসর্গ। অগ্নি আজ রাতে ফিরবে না। সিরিয়াস পেশেন্ট রয়েছে। ফোনে জানিয়েছে। এমনটা প্রায়ই হয়। হার্ট সার্জন অগ্নি খুব সিরিয়াস তার পেশেন্টদের নিয়ে।
সেবিকা জেনারেল ফিজিশিয়ান। মনে হল আজ একটি পেশেন্ট এসেছিল ফ্লু এর উপসর্গ নিয়ে। সে তো কমন কোল্ড এর ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছে। রাতের দিকে তুমুল গায়ে ব্যথা অনুভব করল সে। বিছানা ছেড়ে একটা প্যারাসিটামল খেল। এবার মনে হল টনসিল ফুলে উঠছে। গলায় নিদারুণ ব্যথা।
অগ্নি ভোরের দিকে ফিরল। সেবিকা গলাব্যথায় ঘুমোতে পারে নি। বারবার গার্গল করেও যেন ব্যথার হাত থেকে রেহাই নেই। এমন তীব্র গলাব্যথা আর কখনও হয়েছে বলে মনে পড়ে না।
অগ্নি খুব ক্লান্ত, বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
সেবিকা কাউকে কিছু না বলেই গেস্টরুমে আশ্রয় নিয়েছে। অগ্নির পাশে না শোয়া ভালো। নিজেকে সরিয়ে রাখতে হবে বাড়ির সবার থেকে নিরাপদ দূরত্বে। তাহলে কি এটা ঐ মারণ ভাইরাসের আক্রমণ? সার্স কোভিড টু (সিভিয়ার অ্যাকুইট রেসপিরেটরি সিনড্রোম 2)করোনা ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটেছে তার দেহে? ঐ পেশেন্টটি কি এই মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল? কী সর্বনাশ! এমনটা হলে তো গোটা হাসপাতালে রোগটা ছড়িয়ে পড়বে! এখনও তো ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধের জন্যে কোনও প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। বিদেশে অনেকগুলো দেশের বিশেষ করে ইতালির অবস্থা ভয়াবহ।
অগ্নির ঘুম ভাঙ্গল বেলা এগারটা তখন। দুটো নাগাদ তাকে হাসপাতালে যেতে হবে। ঘরটা নিশ্চুপ। দুটো পাখি বন্ধ কাঁচের জানালায় ঠোক্কর দিচ্ছে। সেবিকা কোথায়? দুবার ডাকল, সাড়া পাওয়া গেল না। ঘর থেকে বেরিয়ে সে বাথরুমে ঢুকল। কিচেন থেকে হালকা আওয়াজ আসছে। ওখানে তো রান্নার মাসিই থাকে বেশিরভাগ সময়-মাঝে মাঝে সেবিকা ঢোকে। কিচেনে উঁকি দিয়ে দেখল মাসি টুকটাক কাজ করছে। তাহলে সেবিকা কি হাসপাতালে গেল? এরকম প্রায় হয়েই থাকে। সেবিকা এককাপ চা নিজের হাতেই করে নেয়। তারপর বেরিয়ে যায়।
-মাসি, সেবিকা বেরিয়ে গেছে?
-মনে হচ্ছে। দেখতে তো পাচ্ছি না।
দুটো গাড়ি রয়েছে, একটি অগ্নির, একটি সেবিকার। দুজনের ডিউটির সময় আলাদা, কে কখন বেরোয় কে কখন ফেরে ঠিক নেই। সেবিকাকে ফোন করল অগ্নি, অফ আছে, অতঃপর সেবিকার ড্রাইভারকে ফোন করল। উহুঁ, সেবিকা বেরোয়নি। তাহলে? অগ্নি চিন্তায় পড়ল এবার। মাসিকে নিয়ে সব ঘরগুলো দেখতে দেখতে মনে হল গেস্টরুমের দরজাটা যেন ভেতর থেকে বন্ধ। এই দরজাটা বেশিরভাগ সময় ভেজানো থাকে। আলতো চাপ দিয়ে দেখা গেল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। এবার নক করল, প্রথমে খুলল না, এরপর ধাক্কা, দরজা খুলল।
সেবিকা, দরজা খুলে সে সরে দাঁড়িয়েছে। খুব কষ্ট করেই বলল – খুব গলাব্যথা। জ্বরও আছে, ওষুধ খেয়েছি। – অগ্নি লক্ষ করল তার চোখমুখ লালচে।
-কিন্তু তুমি এখানে কেন? নিজের ঘর ছেড়ে?