সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ২৪)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
সুধাময় ভাবছেন, ইশকুলটা যদি সত্যিই উঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে কী কী হতে পারে। অনেকটা দিন হয়ে গেল তিনি উইলসন ইশকুলে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। শিকড় উন্মূল অবস্থা কী হতে পারে তা তো নিজের চোখে দেখেছেন। যদিও তিনি ব্যক্তিগতভাবে সেটার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন না। তিনি তখন অচিনপুরে এক ভাড়াবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছেন। কিন্তু দেশভাগের ফলে শিকড় উন্মূল মানুষের ঢল দেখেছেন। পুনর্বাসিত হওয়ার নিদারুণ যুদ্ধ দেখেছেন। এখন কি তাঁকে এই ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে? বৃটিশরা অনেক অত্যাচার করে দেশ ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু এরা শিক্ষাবিস্তারের কাজ করে গেছে। এরা অনেক মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে কুলিমজুরদের এনেছে চা বাগানে, কিন্তু প্রতিটি চা বাগানে প্রাথমিক ইশকুল স্থাপন করেছে। মি: উইলসন একটা মিডল ইংলিশ স্কুল স্থাপন করেছে। যদিও সবাই বলে যে স্টাফবাবুদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুবিধের জন্যে করেছে, কিন্তু এমন নিষেধাজ্ঞা তো জারি করে যায়নি যে শ্রমিকরা এই ইশকুলে পড়তে পারবে না। পাহাড়ঘেরা অচিনপুরে যোগাযোগের সুবিধার জন্যে পাহাড় কেটে রেললাইন বসিয়েছে। হয়ত সবকিছুই নিজেদের শাসন চালিয়ে যাবার সুবিধের জন্যে, কিন্তু তার সুফল তো পাচ্ছে দেশের মানুষ। অথচ স্বাধীনতার পর এই দেশের মানুষ চিন্তা ভাবনার ধারা যে দিকে এগোচ্ছে তা তো একটা নিদারুণ হতাশার ছবি। হয়তো যুদ্ধ করে এটাকে আটকানো সম্ভব। যুদ্ধ তো করতেই হবে। চাবাগানের কিছু স্টাফ তাদের ছেলেমেয়েদের তুলে নিয়ে রতনপুর ইশকুলে ভর্তি করে দিয়েছে একেবারে তড়িঘড়ি। এটা অদ্ভুত নয়?
৷ ছুটি দেখল, মণির আর আগের মত ক্লাসে মন নেই। শুধু বলে -আমিও চলে যাব। বাবা বলছে। কিন্তু মা বলছে আরও কিছুদিন দেখো। এতটা পথ হেঁটে যাওয়া। কী কষ্ট হবে এই ছোট্ট মেয়েটার ভেবে দেখেছ?
শোভনা পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট এর মেয়ে। প্রাথমিক ইশকুলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিল, যদিও ছুটি দেখেনি, কারণ সে তো তেমন করে প্রাথমিক ইশকুলে যায় নি। একটু ডাকাবুকো। সে কথাটা শুনে বলল – কেন যাবি? এই ইশকুল উঠবেক লাই। বাপ বইলেছে হামদের ইশকুল হামরা রাইখবই রাইখব। মণি, তুই ঘরে বইলবি এই কথা।
সেদিন বিকেল থেকে আলোচনা চলছে ছুটিদের কোয়ার্টারে। হেডমাস্টারমশাই, জগমোহন স্যার, পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট, পঞ্চায়েত সেক্রেটারি, হাটখিরা চা বাগানের বড় হাসপাতালের ক’জন স্টাফ। পঞ্চায়েত সেক্রেটারি ও প্রেসিডেন্ট তো জোরদার সরব, কিছুতেই উইলসন ইশকুল উঠিয়ে দেওয়া যাবে না। স্থির হলো একটা জোরদার আবেদনপত্র লেখা হোক চা বাগানের সুপারইন্টেন্ডেন্টকে।
লেখাটা খুব জোরদার হতে হবে, আর এই আবেদনপত্রে অভিভাবকদের সই সংগ্রহ করতে হবে। অন্য চাবাগান থেকেও অনেকেই এই ইশকুলে পড়তে আসে। সুতরাং অন্য চাবাগানেও যেতে হবে।
পরদিন সকালেই তিন/ চার জন ধেয়ানি উপজাতির লোক, আর ডিমাছা (কাছাড়ি) উপজাতির লোক চার/পাঁচজন এসে জানিয়ে গেল ইশকুল তারা কিছুতেই বন্ধ করে দিতে দেবে না। তারজন্যে যা যা করতে হয় তারা করবে।
৷ তারপর থেকে প্রায় রোজ ইশকুল সেরে সুধাময় বেরিয়ে যান। হাটখিরা বড় হাসপাতালের ডাক্তার থেকে স্টাফ সবাই পাশে আছে। কয়েকজন তো নেমে পড়েছে কাজে। পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি দিনরাত এক করে দিচ্ছে।
৷ একটা সাংঘাতিক মানসিক চাপ চলছে সবাইয়ের মনের ওপর দিয়ে। ছুটি কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে। যেমন ইশকুলে তেমনি বাড়িতে। মণির সাথেও তেমন আনন্দে ছুটোছুটি তার কমে গেছে। সব কিছু কেমন যেন পালটে গেছে। এই সবুজের বিস্তার, এই নীলাভ পাহাড়, এই বিস্তারিত মাঠ সব কেমন স্থির, স্তিমিত, আশঙ্কিত। কী যেন বলতে চাইছে। ছুটি বাড়ি ফেরে। তার খুব প্রিয় হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেট তাকে আর আগের মত উজ্জীবিত করে না। কিছু ভালো লাগে না। একদিন মাকে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করে – মা, যদি ইশকুল উঠে যায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? মা বকে দিলেন – তুই এসব নিয়ে ভাবছিস কেন? যা খেলতে যা, কে বলেছে এসব? এরকম কিছু হবে না।কিন্তু মনটা কেন এমন করে? দিদিরা গম্ভীর মুখে বই পড়ে। মা যন্ত্রের মত ঘরের কাজগুলো রুটিন মাফিক করে যান। বাবা ইশকুল থেকে ফিরে বেরিয়ে পড়েন। মাঝেমধ্যে হেডমাস্টারমশাই আসেন, জগমোহন স্যার আসেন। কাজ চলছে। অন্য চাবাগানগুলোতেও যেতে হচ্ছে, কাছাকাছি যে চাবাগান গুলো রয়েছে।খেতে বসে সেদিন বড়দাদা বাবার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলছে, ছুটি সব কিছু বুঝতে পারে না।
শুধু খাবার পরিবেশন করতে করতে মা বলে ওঠেন – ” মানুষ কেন যে মানুষের প্রতি/ ধরিয়াছে হেন যমের মূরতি…”