সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ৩৭)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

বাজে খাতা থেকে ভালো খাতায় সুন্দর করে তুলে সে সুধাময়কে দেখাল। সুধাময় বললেন, পড়ে শোনাও। ছুটি পড়তে লাগলো –   “অচিনপুর একটি উপত্যকা শহর।  তার তিনদিকে পাহাড়।  বড়াইল পাহাড়, খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড়,  লুসাই পাহাড়। অচিনপুর মাঝখানে সমতল ভূমিতে অবস্থিত। যাকে বলা হয় উপত্যকা।  অচিনপুর একটি উপত্যকা শহর। এইটি ভারতের উত্তর পুর্ব অংশে অবস্থিত। এর একদিকে উত্তর কাছাড় ও মিকির পাহাড়,  যার নাম বড়াইল পাহাড়,  একদিকে খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড় ওইদিকে পড়েছে শিলং পাহাড়, আর একদিকে পড়েছে লুসাই পাহাড় মানে লুসাই পার্বত্য জেলা। আর একদিকে পড়েছে সমতল, ঐদিকে কোথাও যাওয়া যায় না সহজে কারণ ঐদিকে পড়েছে পূর্ব পাকিস্তান। ঐদিকে রয়েছে সীমান্ত।রয়েছে  কাঁটাতারের বেড়া। ওপারে আরেকটা দেশ, পূর্ব পাকিস্তান।
স্বাধীনতার সময় বাংলাকে কেটে নতুন দেশ হয় পূর্ব পাকিস্তান।  ওইখানেই পড়েছে, শ্রীভূমি মানে শ্রীহট্ট। শ্রীহট্ট আগে বাংলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে বৃটিশরা নিজেদের শাসনের সুবিধের জন্যে শ্রীহট্টকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেয়। কিন্তু দেশভাগের সময় নানা গন্ডগোলে ওটা পুব পাকিস্তান নিয়ে নেয়।  অচিনপুরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বরবক্র নদীর শ্রীহট্টে নাম হয়েছে সুরমা নদী।  অচিনপুরের অধিকাংশ বাঙালি অধিবাসী শ্রীহট্টের।
অচিনপুর পূর্বে গ্রাম ছিল। কাছাড়ি রাজাদের রাজধানী খাসপুর এর কাছাকাছি অঞ্চল। মূলত চা বাগানকে কেন্দ্র করে অচিনপুর শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। বৃটিশরা এই অঞ্চলে প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে ক্যাপ্টেন ফিশারকে  পাঠায়, পরবর্তীকালে ইনি কাছাড় জেলার সুপারইন্টেন্ডেন্ট হিসাবে নিযুক্ত হন। তখন নদীপথে আসতে হত, অচিনপুরে,  তাই রেল যোগাযোগের প্রয়োজনিয়তা অনুভব করে ইংরেজরা মিটার গেজ লাইন তৈরি করে। পাহাড় কেটে অনেকগুলো সুড়ঙ্গ তৈরি করে করে এই রেললাইন পাতা হয় প্রথমে লামডিং পর্যন্ত এবং পরে গৌহাটি পর্যন্ত।
 মূলত চাবাগানকে কেন্দ্র করে অচিনপুর শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। এই এলাকায় উৎপাদিত প্রধান শস্য হলো ধান। মূলত চা শিল্পের জন্যে বিখ্যাত অচিনপুরে…….. ইত্যাদি ইত্যাদি। “
পরদিন ইশকুল গিয়ে জগবন্ধু স্যারকে খাতা দেখাল। স্যার “ভেরি গুড” লিখে দিলেন।  ক্লাস শেষে রতন এসে বলল – দেখি তোর খাতাটা।
-নাহ! – ছুটি খাতা সরিয়ে নেয়।
রতন বিজ্ঞের মত বলে – এটা ঠিক নয়। আমি তোকে খাতা দেখাইনি, তাই তুই খাতা দেখাবি না এটা ঠিক নয়।
ছুটি বলে – ও!  তা কোনটা ঠিক?
রতন বলে – এই যে প্রতিশোধ নেয়ার ইচ্ছে, এটা ঠিক নয়। কথা হলো তুমি অধম হইবে বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?  খাতাটা দেখা।
– আগে বল কে অধম কে উত্তম?
– তুই উত্তম হোসনি এখনও কিন্তু  হওয়া উচিত।  আমিই নাহয় অধম।
ছুটি হাসতে হাসতে  বলে – নে খাতা।
খুব মন দিয়ে পড়ে খাতা এনে বলে – হুম। লিখেছিস ভালো।  কিন্তু কেউ দেখিয়ে দিয়েছে না কি নিজে লিখেছিস?
– দেখিয়ে দিয়েছে।
– হুম।  আমি নিজে লিখেছি। আমি আরও ইতিহাস টেনেছি। কাছাড়ি রাজাদের যুদ্ধবিগ্রহ থেকে শুরু করে। ক্যাপ্টেন ফিশার প্রথম এসেছিল কোথায় বলত?
– দুধপাতিল। তারপর নদী পেরিয়ে অচিনপুরে আসে।
– হ্যাঁ আমি ওসব লিখেছি। এবং নিজে লিখেছি। এখন তুই জিজ্ঞেস করবি আমি এত ইতিহাস জানলাম কি করে! জেনেছি আমার জিজ্ঞাসা থেকে। জিজ্ঞেস করে করে। কৌতূহল থেকে।
মণি হেসে বলে – তুই বুড়ো হয়ে গেছিস রতন। এটাই খুব খারাপ খবর।
ছুটি ও মণি খিলখিল করে হাসে।
রতন বলে – এ্যাই মণি,  গতদিন আমি জগবন্ধু স্যারকে বলেছি,  স্যার,  ছুটিকে আপনি খুব জোর মেরেছেন।  তুই বলেছিলি?
– এভাবে বলতে আমার ভয় করে।
– তুই তো নিজের চিন্তা করেছিস,  তাই না?  যদি স্যার আবার আমায় মেরে দেয়?  তাই না?  আমি তা করিনি। মারলে মারবে। কিন্তু  কথাটা বলা দরকার।
মণি আবার হেসে গড়িয়ে পড়ে। বলে – বুঝলাম জ্যাঠামশাই।
– এই, এইসব নাম দিবি না। তাহলে সবাই আমাকে এই নামে ডাকবে, আমার পেছনে পড়ে যাবে।
– বাবা, ওই ভয় তো আছে দেখছি।
মণিরা আরও একচোট হাসল।
এইসময় সুধাময়স্যার  এসে ক্লাশে ঢুকলেন।  অঙ্কএর ক্লাস।  সবাই অঙ্কের খাতা খুলে বসে গেল।
আগামীকাল ইশকুল বন্ধ। রথযাত্রা রয়েছে। শোভনাদের বাড়ি থেকে রথ বেরোবে। আরও একটা  রথ হাটখিরা চা বাগান থেকে আসে। বিকেল থেকে কী উত্তেজনা।  লুঠের বাতাসা কুড়োনোর কী হুড়োহুড়ি।  এইবার খুব মজা হবে। কারণ ইভান নেহা হীরা ওরা রয়েছে। শোভনা ওদের বাড়িতে রাধাকৃষ্ণ মন্দির আছে। খুব সুন্দর। একবার ঝুলনের সময় ওরা দল বেঁধে গেছিল। কী সুন্দর দেখতে রাধাকৃষ্ণ। চমৎকার দোল খাচ্ছিলেন রাধাকৃষ্ণ।  আগামীকাল রথে থাকবেন জগন্নাথ সুভদ্রা ও বলরাম।
ইশকুল থেকে ফিরে আজ ভারি হালকা ও আরামবোধ হচ্ছে। পড়াশোনা নিয়ে বেশি ঝামেলা কাঁহাতক ভালো লাগে। এত সুন্দর নীলাভ পাহাড়,  সবুজ চা গাছের সারি। অদূরে সুখলালের চা সিগ্রেট চকোলেট বিড়ি দেশলাইএর ছোট্ট  বাক্স দোকান। বিক্রিবাটা তেমন নেই। সারাদিন সে একবার উত্তরে একবার দক্ষিণে তাকায়। দুপুরে বাক্স গুটিয়ে মাথায় নিয়ে মাটির সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায় ঘরে। বিশ্রাম নিয়ে তারপর বিকেলে আবার দোকান খুলে বসে। মাথার চুলগুলো একেবারে সাদা ধবধবে হয়ে গেছে।
দিদি মাঝেমধ্যে ছড়া কাটে রবীন্দ্রনাথের “জীবনস্মৃতি”র নকলে –
 ” নিশিদিশি বসে আছো মাথায় নিয়ে পাকা চুলের রাশ,
৷ ছোট্ট ছুটিকে কি মনে পড়ে ওগো প্রাচীন সুখলাল।”
সেই ছোট্ট ছুটিকে সুখলাল নিয়ে এসেছিল হাত ধরে যেদিন সে প্রাইমারি ইশকুল থেকে না বলে একছুটে পালিয়েছিল।
ক্রমশ
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।