সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিজয়া দেব (পর্ব – ৬)

অতিমারী

বেশ রাতে একটা ফোন এল। ইরামাসির নম্বর থেকে। ইরামাসি মরমীর একমাত্র মাসি। মুম্বইতে থাকে। এই মাস ছয়েক আগে এসেছিল মেশোকে নিয়ে। এসে মরমীর মাকে দেখে গেছে।
ফোনে ভয়ংকর দুঃসংবাদ। মেশো মারা গেছে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। জ্বর এসেছিল দুদিন আগে। খুব বেশি জ্বর ছিল। ফোনটা করেছে তাদের বাড়ির কাজের লোক।
বলল -মুম্বই এর অবস্থা খুব খারাপ। মাসিরও নাকি জ্বর।
ইরামাসির একমাত্র ছেলে ইউ কে তে থাকে। ওকে খবর দেওয়া হয়েছে।
মরমী ভাবছে খবরটা মাকে কী করে দেয়। এখন মা ঘুমিয়ে পড়েছে। আগামীকাল নিরাময় ও বৃন্দার সঙ্গে কথা বলতে হবে। কারণ মা-র শরীর একদম ভালো নয়। হুট করে খবরটা দেওয়া চলবে না।
ইরামাসির কী বিপদ! এই কাজের লোকটা এখনও আছে। ওদের ছেড়ে চলে যায়নি। ইরামাসি বলেছিল লোকটা বেশ বয়স্ক। সব দেখেশুনে রাখে। ইরামাসিরও জ্বর। ইরামাসিরও যদি ভালোমন্দ কিছু হয়ে যায়! একমাত্র ছেলে বিদেশে। যোগাযোগ বন্ধ। এরমধ্যেই সে বাবাকে হারাল। অথচ আসতেও পারবে না। কী দুর্যোগ এল! কী ভয়ানক—
অনেক ভেবেচিন্তে বেশ রাতে অগ্নিকে হোআটস অ্যাপে বার্তা পাঠাল মরমী – কেমন আছো?
অগ্নি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল – এখন কি ফোন করতে পারি?
বাড়ির সবাই এখন অগাধ ঘুমে। ঘড়িতে রাত আড়াইটে। মরমী ও তার মা সুনয়না একই ঘরে শোয়। একটা সুবিধে ঘরটির লাগোয়া বারান্দা। আলতো হাতে দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এল সে। মোবাইলকে সাইলেন্ট মুডে নিল।
তারপর লিখল-হ্যাঁ।
ফোনে অগ্নি বলছে– আমি হাসপাতালে। আপাতত ফ্রি, তাই ফোন করলাম। আগামীকাল সময় হবে কিনা কে জানে!
মরমী বলে – আমি জানি তুমি ভালো নেই। আমিও ভালো নেই। এইমাত্র খবর পেলাম আমার মেশো মারা গেছেন। মাসিরও জ্বর। একটা কাজের লোক আমায় ফোন করে জানাল।
অগ্নি- সেই যে মুম্বইতে থাকতেন?
মরমী – হ্যাঁ। ওদের একমাত্র ছেলে বিদেশে। তোমার মেয়ে সেঁজুতি কেমন আছে?
অগ্নি- ঠিক আছে। মায়ের জন্যে ফোনে কাঁদে। এছাড়া আর কী করার আছে! আচ্ছা মরমী, একদিন দেখা হতে পারে?
মরমী – এই সময়ে? কবে?
প্রশ্নটা করল বটে মরমী, হ্যাঁ, সে তো দেখা করতেই চাইছে। আকাশদের জন্যে যদি একটা ডোনেসন… অগ্নির এই অবস্থায় যদিও এধরণের ভাবনা সময়গতভাবে ভুল, তবু তাকে ভাবতেই হচ্ছে। অসহায় মানুষ কত কী ভাবে!
অগ্নি বলল– এটা ঠিক, এসময়ে তো সবাই দূরত্ব বজায় রাখছে, আর আমি বলছি তোমাকে দেখা করতে। এটা ঠিক নয়। মানুষ খুব একা হয়ে যাচ্ছে, মরমী। খুব দ্রুত।
মরমী বলছে – ঠিক আছে। আমি আসব। কখন তুমি সময় পাবে আমাকে বলো। যখন যেখানে আসতে বলবে সেখানেই আসব। আমি তো তোমার মত ব্যস্ত নই। পার্লারও বন্ধ।
অগ্নি বলে – তোমার তো তাহলে খুব অসুবিধে হচ্ছে।
মরমী বলে-নাহ্ নাহ্ অসুবিধে কীসের? তবে সময় কাটতে চাইছে না।
অগ্নি বলে – তাহলে আমরা দেখা করছি। কখন কোথায় আমি জানাচ্ছি তোমায়। এখন তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়েছে।
দেখা হবে অতঃপর। অগ্নির বাড়িতে। এছাড়া তো উপায় নেই। সব বন্ধ। অগ্নি গাড়ি পাঠাল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুদূর এসে অপেক্ষা করছিল মরমী। কারণ বাড়ি থেকে গাড়িটা যদি তাকে তুলে আনত তাহলে মা, নিরাময় ও বৃন্দার হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে প্রাণান্ত হতে হত তাকে।
এভাবে একা সে অগ্নির বহুদিন হল দেখা করেনি। সেসব কত আগের কথা, অগ্নি তখন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। তারপর ওর বিদেশ যাওয়া, ওখানেই সেবিকাকে বিয়ে করা, দেশে ফেরার পর একটা বিয়ের পার্টি দেওয়া হয়েছিল অগ্নির বাড়ি থেকে। নিমন্ত্রণপত্র এসেছিল, অগ্নি ফোনে তাকে যেতে বলেছিল। আবার কীসব অনুতাপের কথাও খরচ করেছিল। এটুকুই। অগ্নিকে “প্রত্যয়” এর অন্যতম উপদেষ্টা করা হয়েছে। ভালো ডোনেসন দেয় অগ্নি। সবসময় এন জি ও – র ছেলেমেয়েদের সঙ্গেই আসে মরমী। ফোনে সে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রেখে গেছে বরাবর। সেটা হয়ত করেছে এন জি ও – র স্বার্থে। মোটা টাকার অর্থসাহায্য পেয়েওছে। এটা ঠিক, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মরমী বিয়ে করেনি। অগ্নির সাথে তার সম্পর্ক হয়েছিল। তার সাধারণ চেহারা পরিবারের সাধারণ আর্থিক অবস্থা আর তার অতি সাধারণ গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি হয়ত তাকে অগ্নির সমকক্ষ করে তোলেনি, আর অতটা প্রেমও অগ্নির মনে জন্ম নেয়নি, যাকগে ওসব পুরনো কথা। অগ্নি নিশ্চয়ই এখন বন্ধু শুধু। ঐসব পুরনো প্রসঙ্গ অগ্নির ঐ হলুদ চিঠির মতই আলমারিতে তুলে রাখা বইএর ভেতর লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে গেছে। কৌশলে কী আকাশদের বর্তমান অবস্থাটা তুলে ধরতে পারবে সে? হয়ত প্রসঙ্গটা অগ্নি নিজেই তুলতে পারে। দেখা যাক কী হয়।
মা-র শরীরটা ভালো নয়। মেশোর মৃত্যুর খবরটা দেওয়া হয়েছে। নিরাময় দিয়েছে। মাসির শরীর খুব খারাপ। ঐ খবরটা মা-কে দেওয়া হয়নি। এতটা নেতিবাচক খবর মা নিতে পারবে না। হ্যাঁ, ফোনে মাসির সঙ্গে কথা বলতে চাইছিল মা। অনেক অনেক মিথ্যে বলে ব্যাপারটা কোনওমতে সামাল দেওয়া হয়েছে। ইরামাসিকে কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জীবন – মৃত্যুর এই যুদ্ধে দেখা যাক কে জেতে!
যখন সে পৌঁছল অগ্নির বাড়িতে তখন বিকেল। ড্রাইভার তাকে নামিয়ে দিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মাঝবয়েসি লোককে বলল – ম্যাডামকে বসাও। ডক্টরসাবকে খবর দিও।
লোকটি তাকে দেখল। তারপর ড্রয়িংরুমে এনে বসাল। এই বাড়িতে সে কোনদিন আসেনি। বেশিরভাগ সময় তারা অর্থাৎ এন জি ও – র ছেলেমেয়েরা অগ্নির ব্যক্তিগত চেম্বারে দেখা করেছে। এবার একটু অস্বস্তি অনুভব করল সে। এখন এই পরিস্থিতিতে কেউ কারো বাড়িতে যায় না। অগ্নি ডাক্তার হয়ে তাকে বাড়িতে ডাকল?
মিনিটখানেকের ভেতর অগ্নি এল। মুখ মাস্ক ও চশমায় ঢাকা। বেশ প্রশস্ত ড্রইংরুমে দূরত্ব বজায় রেখেই সে বসল। অতঃপর মাস্কটা খুলে একটু হেসে বলল – অসুবিধে না থাকলে তুমিও একটু খোলা শ্বাস নিতে পারো।
মরমী বুঝল অগ্নি নিজের মুখটা মরমীকে দেখাতে চাইছে ও মরমীর মুখটাও দেখতে চাইছে। এটাই স্বাভাবিক। মাস্কটা সে-ও চিবুকে নামিয়ে আনল। অগ্নিকে খুব রোগা ও ক্লান্ত লাগছে। হয়ত এখন সে বিশ্রাম নিতে পারত। এই কথাটাই বলল সে –
-তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে অগ্নি। এখন তো বিশ্রাম নিতে পারতে।
-হ্যাঁ। কালরাতে ডিউটি দিয়েছি। কিন্তু বিশ্রাম আমার হয় না। কতসব ছায়া আমার চারপাশে ঘুরতে থাকে। মনে হয় চব্বিশ ঘণ্টা কাজে থাকতে পারলেই ভালো হত। আমি তোমার প্রতি খুব অন্যায় করেছি মরমী।
-ওসব নিয়েও ভাবো নাকি আজকাল? আমার মনে হয় খুব বাস্তবসম্মত ছিল তোমার কাজ। অন্যায় কী না জানি না। ওভাবে কখনও ভাবিনি। ওসব প্রসঙ্গ থাক অগ্নি। তাছাড়া তোমরা তো সুখী দম্পতি ছিলে। দুজনের পেশা এক, শিক্ষায় সমকক্ষ… সব তো ঠিকই ছিল। এই কোবিড না এলে তো সব ঠিকঠাক চলত। আমি জানি তোমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মত আমার কাছে কোনও ভাষা নেই। তবে তুমি তো ডাক্তার, তোমার মেয়েও আছে। কষ্টটাকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে তোমায়। এছাড়া উপায় কী বলো! আর আমার প্রতি অন্যায় করেছ বলে এমনটা হয়েছে এভাবে ভাববার কোনও মানে নেই।
-তুমি বিয়ে করনি কেন? আমাকে নিরাময় বলেছে তুমি নাকি তাদেরকে বিয়ের চেষ্টা করতেও দাও নি।
-তোমাকে না পেয়ে আর বিয়ে করিনি এমনটা নয়। আমাদের আর্থিক অবস্থা তো তেমন ছিল না। আর আমি একটা স্বাধীন জীবন যাপন করতে চেয়েছিলাম। আমি যা চেয়েছি তা পেয়েছি অগ্নি।
অগ্নির চেহারা, আচরণ বলছে তার ভেতরে এক অন্তর্লীন বিপর্যয় চলছে। মরমী এ অবস্থায় আকাশদের কথা কি তুলতে পারে? অগ্নির সাহায্য পেলে অসহায় শিশুগুলো বেঁচে যেত হয়ত। এই ঘোর বিপদে এইটুকু সাহায্য পেলে কী যে ভালো হত!
-কী অত ভাবছ! মনে হচ্ছে কোনও অসুবিধেতে আছো! তুমি খোলা মনে বলতে পারো! আমরা তো বন্ধু মরমী! বাড়িতে কোনও সমস্যা? এন জি ও- তে?
মরমী তো তো করে – না তেমন কিছু নয়। আর এখন সমস্যা তো কারোর আলাদা করে কিছু নেই। সবাই ভুগছে।
-তোমাদের কথাকলি স্বপ্নিল ওরা সবাই কেমন?
-কথা তো দিল্লিতে গিয়ে আটকে গেল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।