সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ১৯)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

তৃতীয়মানে একটা কেন্দ্র পরীক্ষা দিতে হয়, এভাবে বাড়িতে বসে পড়াশুনো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এইবার ইশকুলে যেতেই হবে ছুটিকে।
শৈবাল স্যারের কথা মনে হলে এখনও দারুণ ভয়। সেই বেতের বাড়ি, হাত দিয়ে টপ টপ করে রক্তপাত, তাজা রক্ত ফোঁটা ফোঁটা করে পড়ছে, উফফ ভয়ে আতঙ্কে বুক শুকিয়ে যায়। মোটেই যেতে ইচ্ছে হয় না ইশকুলে। বারবার বলে – বাবা, আমি একসাথে তোমার ইশকুলে যাবো।
সুধাময় বুঝিয়ে বলেন – সেন্টার পরীক্ষা তো দিতে হবে। ইশকুল না গেলে পরীক্ষায় বসতে পারবি না, পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে তারপর উইলসন ইশকুল, নাহলে যে বাড়িতেই বসে থাকতে হবে। এভাবে তো এরপর আর ভালো লাগবে না। তোমার সাথের যারা সবাই ইশকুল যাবে তোমার চোখের সামনে, উঁচু ক্লাসে উঠবে, তোমার ভালো লাগবে?
৷ অগত্যা, দ্বিতীয় মান -এই তাকে ভর্তি করা হলো। ছুটির ভয়ের ব্যাপারটা শৈবাল মাস্টারমশাই জানেন।বললেন -ঠিক আছে, নামটা লেখা রইল। মাঝে মাঝে এলেই চলবে।জোর করে রোজ ইশকুল পাঠানোর দরকার নেই।
৷ মাঝে মাঝে ইশকুলে যায় ছুটি, যেমনভাবে শৈবাল স্যার বলে দিয়েছেন তেমনই।
হঠাৎ একদিন গিয়ে দেখে ইশকুলের সামনে সব ছাত্র দাঁড়িয়ে। কেউ কেউ বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। মণি কাছে এসে বলে – মাস্টারমশাই এর খুব অসুখ, হাটখিরা বড় হাসপাতালে ভর্তি। তাই ইশকুল ছুটি হয়ে গেল।
৷ পর পর তিন/চারদিন আর ইশকুলে গেল না ছুটি। শৈবাল স্যারের কোয়ার্টার তাদের কোয়ার্টারের কাছাকাছি।
হাটখিরা হাসপাতাল বেশ বড়। অচিনপুর শহর থেকে রোগী আসে ভালো চিকিৎসার জন্যে। শৈবাল স্যার নাকি লিভারের কী একটা অসুখে হাটখিরা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
দুদিন পর মণিরা তাদের কোয়ার্টারে বেড়াতে এসেছে। মণি বলে – বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য ইশকুল চালাচ্ছেন।
ছুটি বলে – ওই যে দুর্গাপূজার সময় খুব সুন্দর আরতি করেন উনি?
– হ্যাঁ কাল ইশকুলে আসিস কিন্তু ছুটি।
-এই শৈবাল মাস্টারমশাই কবে ইশকুল আসবে রে?
– কেন? তুই তো খুব ভয় পাস। মণি হি হি হাসে। বিষ্ণুপদ মাস্টারমশাই খুব শান্ত, বেশি গোলমাল হলে শুধু একবার চেঁচিয়ে বলেন – এ্যাই! বেতটা পড়েই থাকে টেবিলে। তুই এত ভয় পাস, এজন্যই শৈবাল স্যারের অসুখ করেছে।
ছুটি অবাক হয়ে বলে -আমি ভয় পাই, তাই মাস্টারমশাইয়ের অসুখ হবে কেন?
-দূর মজা করছি। এ্যাই ছুটি তোদের বাতাবিলেবু গাছটায় বাতাবিলেবু ধরেছে অনেক। আর কত পাখি রে। সব ভুলে গিয়ে ছুটি ও মণি বাতাবিলেবু গাছের নীচে ছুটাছুটি করে।

ছুটি মাঝেমধ্যে ইশকুল যায়। সত্যি বিষ্ণুপদ মাস্টারমশাই খুব শান্ত মেজাজের। বেশি গোলমাল হলে শুধু লম্বা করে বলেন -এ্যা…..ই! পাশে বেতটা পড়েই থাকে।

৷ কিছুদিন পর জানা গেল শৈবাল মাস্টারমশাই হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন। শৈবাল মাস্টারমশাইয়ের দুটি ছেলে। ফুটফুটে সুন্দর, ঋতম ও ছোট্টু। ওদের মা -ও দেখতে খুব ভালো।
ছুটি যখন আরও ছোট ছিল তখন ওদের কোয়ার্টারে গিয়ে খেলেছিল কাঠুরিয়া ও জলদেবতা। উঠোনটা কল্প- নদী। ছুটি জলদেবতা, ঋতম কাঠুরে আর ছোট্টূ গাছ। সেদিন শৈবাল স্যার দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখছিলেন আর বলছিলেন -হয়নি, আরও সুন্দর করে বলো। হ্যাঁ, এইবার হয়েছে। মাস্টারমশাই হাততালি দিচ্ছিলেন, বাহ বাহ করছিলেন। তখন তো মাস্টারমশাইকে খুব হাসিখুশি মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। ঐ ইশকুলে ভর্তি হওয়ার পর তার ভয়টা হয়েছে। হে ভগবান, মাস্টারমশাই সুস্থ হয়ে যাক, ঋতম আর ছোট্টুর কত কষ্ট, ইশস।
৷ দু’চারদিন পরই শোনা গেল মাষ্টারমশাইকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অবস্থা নাকি একদম ভালো নয়।
৷ পরের দিন বিকেলের দিকে খবর এলো মাস্টারমশাই আর নেই, এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।
এই প্রথম ছুটির চেতনায় ‘মৃত্যু’ নামক শব্দটি ঘা মারল। ছুটির খুব পরিচিত মানুষের মৃত্যু সে প্রথম শুনল। এটা শোনার পর থেকে উঠোনের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা ভূতূড়ে মাথার গাছগুলোকে ভয়ানক স্থির, হাওয়াহীন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল, অন্ধকার আরও গাঢ় হতে দেখল।দেখল সামনের সব্জিক্ষেতটা ঝাপসা হতে হতে গাঢ় অন্ধকারের ভেতর স্থির হয়ে আছে। পাশের কোয়ার্টারে মিটমিটে আলোর আভাস অন্ধকারকে আরও ঘন করে তুলেছে। বইয়ে পড়েছে সে এই পৃথিবীটা একটা গোলক, সে ভাসছে শূন্যে। তাই কি অঙ্কে শূন্য থেকে সংখ্যা শুরু?
এই শূন্যে শৈবাল মাস্টারমশাই মিলিয়ে গেছেন। ছুটি বিছানায় শুয়ে শুয়ে শূন্যে হাত নেড়ে দেখে। এখানে, এখানেই তো শৈবাল স্যার থাকতে পারেন। এখন ত শূন্যে। ভাসছেন। মণি কেন বলল- মাস্টারমশাইকে সে ভয় পেত বলে স্যারের অসুখ করল। সে ভয় না করলে বুঝি তাঁর অসুখ করত না? তাতে তিনি বুঝি থাকতেন? ইশকুল যেতেন। ঋতম ছোট্টু তাদের বাবাকে হারাতো না! ছুটি গালে হাত দিয়ে দেখল তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মাস্টারমশাই এর বেতের ভয়ে সে তো আর ইশকুলেই গেল না আর। আর যেই সে যেতে শুরু করল মাস্টারমশাই শূন্যে মিলিয়ে গেলেন।
৷ তাদের কোয়ার্টারের সামনে রাস্তা পেরিয়ে যে চওড়া জায়গা যেখানে শনি মঙ্গলবার হাট বসে সেখানেই গাড়িগুলো ঘোরানো হয়। সবাই এখন সদর গেটের সামনে। হাসপাতালের গাড়িতে মাস্টারমশাই এর দেহ আসছে। ছুটিকে বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি। একটা গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে। নীরবতা খানখান করে একটা জান্তব আওয়াজ যেন ভেসে আসছে। বাড়ির সামনে গাড়ি ঘোরানো হলো। মাস্টারমশাইএর কোয়ার্টার তাদের কোয়ার্টার পেরিয়ে এই টিলার ওপরেই প্রায় শেষ প্রান্তে। তারপর গাড়ির শব্দটা ক্ষীণ হয়ে এল, নিস্তব্ধ চা বাগানে পেছনের কারখানার মেশিনের ঘর্ঘর শব্দের ভেতর শববাহী গাড়ির আওয়াজ ক্রমশ ডুবে গেল।

কেউ শিখিয়ে দেয়নি, তবু ছুটি দু’হাত জড়ো করে নমস্কার করল। মনে মনে উচ্চারণ করল – আমায় ক্ষমা করুন মাস্টারমশাই, ইচ্ছে করে নয়, আমার ভয়টা এসে গেছিল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।