সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ২৭)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

ছুটি জলের এমন উচ্ছ্বাস কখনও দেখেনি। বাঁধ কী জিনিস সে জানে না। নদীর ভাঙন আশপাশের ঘরবাড়ি নিজের ভেতর টেনে নেয় সেটাও সে জানে না। নদী নিয়ে পড়াশোনা হয় ইশকুলে কিন্তু সে নদীর ভয়াল রূপ নিয়ে কখনও ভাবেনি তেমন করে। হাটখিরা চা বাগানে যেতে একটা ছোট নদী আছে বটে, সবাই ওই নদীকে বলে হাটখিরা গাঙ। ওটা নাকি বরবক্র নদীতে মিশেছে। ওপর পার হতে একটা ঝুলন্ত হাফপাকা সেতু আছে বটে, এবং সে মাঝেসাঝে ওটাকে নিয়ে হাবিজাবি স্বপ্ন দেখে। দেখে ওটা পেরোবার সময় মাঝখানের কাঠের পাটাতন সরানো, সে এগোবে কী করে এইসব। আতংকে ঘুম ভেঙে যায়।
৷ যাহোক সেটা নিয়ে একটা মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা করা যেতেই পারে। তবে এই মুহূর্তে এই প্রবল জলরাশি যা কিনা গোটা একটা শহরকে ভাসিয়ে ঢেউ তুলে তুলে চারপাশে আছড়ে আছড়ে চলছে নির্বিকারভাবে সমতলের দিকে,তাকে নিয়েই তো রাজ্যের যত ভাবনা।
নাহ্ এই বরবক্র নিয়ে আরও কিছু ভাবতে হয়। জানতে হয়।

হ্যাঁ তার একখানা বাজে খাতা আছে। সেখানে সে টুকিটাকি কিছু কিছু লিখে রাখে। ওখানে আজ সে কিছু লিখে রাখবে। যা মনে আসবে তাই লিখবে। ভাবতেই একটা শিহরণ হল। যা মনে আসে তাই লেখা। কেউ দেখল না কেউ শুনল না। বাজে খাতা জিনিসটা বেশ। খুব আপন। শুধু নিজের।
নদীবাঁধের ভাঙনের জায়গাটা সুধাময়ের দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু চা বাগানের জিপটা চলে গেলে অসুবিধে হতে পারে। আজ বাস ঠিকমতো চলছে না। সমস্ত নীচু এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। চারপাশে একটা জোলো হাওয়া বইছে।
৷ ডি আই অফিসের সামনে জিপ নিয়ে মনোহর অপেক্ষায়। এদিকে ঘড়িতে বারোটা পেরিয়ে গেছে। সুধাময় বললেন -তোমাকে দেরি করিয়ে দিলাম মনোহর।
-আজ বাস ছাড়ছেই না স্যার। তাছাড়া ছোট খুকি রয়েছে। বাস না পেলে ভারি অসুবিধেয় পড়বেন।
মনোহর ছুটির গাল টিপে আদর করে।
জিপ ছুটছে। চারপাশ নদী উপচানো জলের তোড়ে ভেসে গেছে। ভেসে গেছে দুপাশের ধানক্ষেত। মনোহর গাড়ি চালাতে চালাতে বলে – কী ক্ষতি যে হল স্যার। কত ধান নষ্ট হয়ে গেল। চাষির বড় কষ্ট। এই একটু আগে একটা লোক বলাবলি করছে ওর ধানের গোলায় নাকি জল ঢুকে গেছে, এদিকে ক্ষেতিও ভেসে গেছে। কী ক্ষতি! এবার কী হবে কে জানে! গরীবের বড় কষ্ট স্যার।

৷ রাতে পড়তে বসে বাজে খাতাটা খুলল ছুটি। কী লিখেছে সে?
লিখেছে, “জ্যোৎস্নারাতে একটা শেয়ালকে পেছনের সুড়ঙ্গ এর দিকে দৌড়ে যেতে দেখেছি।”
লিখেছে, ” গতকাল কলে যখন বিকেলে জল এসেছিল তখন লেবুতলায় দুটো নেকড়ে ছিল। ড্রাম বাজাতে হল। তারপর ছুটে চলে গেল। বুড়িমেনিটা ঘোরাঘুরি করছিল। যদি নেকড়ের শিকার হত? ”
তারপর – “মণির সঙ্গে আড়ি হয়ে গেল। আমার দিকে তাকায় না, আমিও না। ”
তারপর – “মোটা পা পুলিশটাকে দু’চক্ষে দেখতে পারি না। বাবা – মার সাথে বেরোলে পথ আগলে দাঁড়ায়। বলতেই থাকে – তোমার বাবা না, আমার বাবা।তোমার মা না, আমার মা। মনে হয় ঘুষি মেরে দিই লোকটাকে, কিন্তু আমার গায়ে জোর নেই। ওর গায়ে অনেক জোর, তায় পুলিশ। ”
তারপর -মণির সাথে আজ আড়ি ভেঙে গেল। খুব আনন্দ।

আজ লিখল ছুটি-

“নদী এই চা বাগানে নেই। জলাশয় বলতে মুহুরীবাবুর কোয়ার্টারের পেছনে একটা পুকুর, মা যখন মুহুরীবাবুর কোয়ার্টারে বেড়াতে যান তখন আমি ছুটে গিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। জলে মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ঢেউ, দু’একটা ছোট মাছের সাঁতার কাটা। খুব সুন্দর লাগে। পুকুরে ছায়া বিছানো গাছ, তার ছায়া জলে। আমি কখনও বন্যা দেখিনি। ভাবতে কেমন লাগে চারদিকে জল আর জল। এখানে তো বৃষ্টিতেও কাদা হয়না। আমাদের কোয়ার্টার তো টিলার ওপরে। সব জল ঝরে পড়ে যায়। হ্যাঁ ভুলে গেছি ধেয়ানি বস্তির একটু আগে জলাধার আছে। ওখান থেকেই কলে জল আসে। কিন্তু নদী কতবড়। ঘোলা জল এখন। মানুষের ঘরবাড়িতে জল ঢুকলে কেমন লাগে? আগামীকাল একবার ইশকুল থেকে ফেরার পর কলতলায় দেখে নেব। “

পরদিন আকাশের মুখ ভার। একটু পরেই অঝোরধারায় বৃষ্টি নামল। অচিনপুরে ভয়ঙ্কর বন্যা। সারা শহর নদীর ঘোলা জলে ভাসছে। সেই জলে কী নেই। সাপখোপ থেকে বর্জ্য পদার্থ ঘরদোর পথঘাট সব একাকার। কে একজন এসেছে নাকি অচিনপুর থেকে জল ভেঙে অনেক পথ হেঁটে, এইসব কথা বলেছে কালির চায়ের দোকানের আড্ডায়। বড়দাদা শুনে এসে বাড়িতে বলেছে।চারদিকে শুধু বন্যার খবর। ক্লাসে জগমোহন স্যার হোম ওয়ার্ক দিলেন “বরবক্র নদীর বন্যা ও অচিনপুর। ”
এরমধ্যে মণি বলল – ইসস এখানে যদি বন্যা হত খুব ভালো হত।
রাই বলে – আচ্ছা পাগল! বন্যা কেন হবে?
মণি বলে – জল ছপছপ করে জলের ওপর হাঁটব।
ছুটি বলে -আজ কলঘরে আমি বন্যা তৈরি করছি।
রাই অবাক হয়ে বলে – সে আবার কি?
রহস্য বজায় রেখে ছুটি বলে – আজ নয়, কাল বলব।

(ক্রমশ)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।