সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ১১)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
আয়নায় নিজেকে দেখি।যেন পিকাসোর কিউবিক ছবি। এক নারীর মুখ, ভেঙে যাওয়া, অনেক বিভঙ্গ তার মুখে দেহে হাতে, হাতে ধরা ম্যান্ডলিনে।
কিন্তু যখন ছুটি এসে কাছে দাঁড়ায় তখন ভ্যান গ্যগের সূর্যমুখীকে দেখি। তরতাজা, কোথা থেকে অজস্র বিচ্ছুরিত আলো এসে পড়ে! একটি সম্পূর্ণাঙ্গ ছবি। তাই বলে কোথাও অন্ধকারের লেশমাত্র নেই তা তো নয়। প্রস্ফুটিত সূর্যমুখীর কোণে, পেছনে আঁধার আছে। আলো আঁধারির যুগলবন্দী।
আমি ক্রমাগত ভাঙি, ভেঙে যাই। ভেঙে দেয় এই ভাঙ্গাচোরা পথ, খানাখন্দ, সবুজের হাহাকার, ইশকুলে যাবার বিসর্পিল পথ, কত কথা মাথার চারপাশে ভিড় করে বারবার কিন্তু অব্যক্ত থেকে যায়, বুকের ভেতর বাসা বাঁধে নিরন্তর, সেই সব কথাগুলো সাজিয়ে রাখি মগজের কোষে যা থেকে জন্ম হয় ভিন্ন এক পৃথিবীর, যে পৃথিবীর আলো মোটেও স্ফুট নয়, যে আলো পেলব মেদুর অভিঘাতময়।
হয়ত তাই ছুটি আমায় বড্ড পিছু টানে। তার হাত ধরে চলে যাই সেই মায়াময় ছায়াঘেরা পথে।
আজ বিকেলে কালো গাই ফেরেনি। বাগাল ( গরু রাখাল) সকাল দশটায় নিয়ে গেছিল। লাল গাই ও বাছুরগুলো গোয়ালে ঢুকিয়ে বেঁধে রেখে গেছে।এখন বিকেল চারটে গড়িয়ে গেল। সুধাময় বার বার ঘরবার করছেন। পেছনের মানে দক্ষিণের জানালায় তাকালে ফ্যাক্টরির কোল ঘেঁষে গরুর খোঁয়াড় চোখে পড়ে। এখান থেকে দেখা যায় গরুগুলোকে। না, কালো গাই ওখানে নেই। তাহলে কি ধানে পড়েছে? এইটা বড় ভাবনার। ধানজমিতে গরু ঢুকে গেলে ধান মালিকের
ভারি ক্ষতি। আর সেই ধান মালিক কে? চা বাগানের শ্রমিক। জমি আর কি! একটুকরো মাটিতে ধান রোপানো। এমন ঘটনা কালেভদ্রে ঘটে, জমিমালিক নিজেই গরু ফিরিয়ে দিয়ে গেছে আগে। তবে সববারই যে এমন ঘটনা ঘটবে তা তো না-ও হতে পারে। সেটাই চিন্তার। তবে ছুটি দেখেছে ওরা
গরু ফিরিয়ে দিতে আসে যখন তখন চোখ গোল করে চেঁচিয়ে অনেক কথা বলে। প্রথমে বলবে – এটা কার গরু? ছুটি এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক ভাবে। আচ্ছা, লোকটা তো জানেই যে গরুটা তাদের, তাহলে এই প্রশ্ন কেন করে, ভারি আশ্চর্য! নাহলে তাদের কোয়ার্টারেই নিয়ে এল কেন? তারপর মাঝখানে গড়গড় করে কীসব বলে গাড়ি যেমন হঠাৎ হঠাৎ খুব স্পিড বাড়িয়ে দেয় তেমনই। কিছুই বোঝা যায় না। আর সবশেষে বলে – মাস্টারবাবুর গরু, তাই বাইন্ধে রাখলম না, নাইলে বাইন্ধে রাখতম।
ছুটি তো জানে না সুধাময় কীভাবে একটা গোটা পরিবারকে স্বাচ্ছন্দ্য দেবার জন্যে কতটা নিজেকে নিঙড়ে দেন। খোঁয়াড়ে গরু ঢোকা মানে সুধাময়ের অযথা কিছু অর্থদন্ড দিয়ে গরু ছাড়িয়ে আনা। তেমনই এক হতদরিদ্র মানুষের একটুকরো ধানজমিতে গরু পড়া মানে তার সমূহ ক্ষতি। সুধাময় তাই চিন্তিত। বাগালকে রাগ করে বকে দিয়েছেন আজ। সে আর কী করে! সে নাকি বড়প্রকৃতির ডাকে মাঠ করতে গিয়েছিল। গরুগুলো তখন চরাই করছিল। ফিরে এসে দেখে কালোগাই নেই।
৷ এরকম বিকেলগুলো ভয় ভয় করে ছুটির। তাদের সদরগেটের সামনের দিগন্তছোঁয়া খোলা মাঠের দিকে তাকিয়ে মনে হয় একটি কালো দেহ আসছে ওই দূর দিগন্তের দিক থেকে, হাতে পুরনো মরা গাছের সরু ডাল, হেই হেই করতে করতে কালো গাইকে তাড়িয়ে নিয়ে আসছে, তাদের কোয়ার্টারে ঢুকবে, ঢুকে বলবে-এটা কার গরু? ছুটির বুক ঢিবঢিব করবে। তারপরই লোকটা রেলগাড়ি ছোটাবে জোর গতিতে…
এমনটা ঘটল অতঃপর। একটি বুড়োমতন লোক, একটু কোলকুঁজো,সামনে কালোগাই, হাতে মরা শুকনো বেতগাছের ডাল, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলে ছিংলা, এলো। একটা কল্পচোখে দেখা ছবি এখন চোখের সামনে হাত পা নাড়ছে। লোকটার চোখদুটো লাল। ছুটি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে। দেখল লোকটা কথা না বলে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। একে একে মা বাবা ভাই দিদি, শুধু তার দিকে দেখলই না। একটা পিনপতন নীরবতা। যেন বোমা বিস্ফোরণের প্রাক মুহূর্ত। ছুটির এদিকে উদগ্রীব অপেক্ষা “এটা কার গরু” শোনার জন্যে। এমন দমবন্ধ অবস্থায় কালো গাইও চুপ করে দাঁড়িয়ে। ব্যস বোমা ফাটল – “এটা কার গরু?” ছুটি নিজের অজান্তেই সাথে সাথে ছোট্ট একটা লাফ দিল। এরপর শুরু হয়ে গেছে, গড়গড় করে ছুটছে রেলগাড়ি। শুধু প্রতিটি দুরন্ত ও অবোধ্য বাক্যের শেষে একটি শব্দ ধোঁয়ার মত উপরের দিকে উঠছে – “ধান”। মা অতঃপর এই দুরন্ত গতির মাঝপথেই জিজ্ঞেস করলেন -গরুটা তোমার ধানে পড়েছে তাই তো? লোকটা চোখ আরও লাল করে পালটা প্রশ্ন করল – নাইলে আমি পাইলম কোথা গরুটাকে ঠাকরান? হমম ঝুট নাই বলছি।
ছুটি দেখল বাবা কিছু জিজ্ঞেস না করেই ঘরের ভেতর চলে গেলেন। একটু পরেই দুটো টাকা লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন – এইটা রাখো।
লোকটা বলে উঠল – নাই লিব টাকা। মাস্টারবাবুর কাছ থিক্যে টাকা লিতে নাই পারব।
মা এবার বললেন -তাহলে আটা নাও। চাইলে চা পাতিও নিতে পারো।
লোকটা এবার এগিয়ে এসে বারান্দার এককোণে বসে পড়ল।
ছুটি দেখল মার হাত থেকে রোগা কুঁজো লোকটা আটা ও চা পাতা নিল। তারপর একটা নমস্কার জানিয়ে বলল – দুধ দিছে গাইটা এখন?
মা বললেন – না। এখন দেয় না।
লোকটা বলল – ক্যামনে দিবেক? অইটা গাভীন আছে। বাচ্ছা দিবেক। তবেই হামি ছিংলা উঁয়ার গায়ে নাই ছোঁয়ালম। ঠাকরান, দুধ লাইগবেক এখন?
মা বললেন – দিতে পারো।
লোকটা খুশি হয়ে বলল – দু’ পোয়ার বেশি নাই হব্যেক।
মা বললেন – বেশ তাই হবে।
-কাইলকে এইরকম সময় দুধ লিয়ে আইসব।
লোকটা বেরিয়ে গেলে সুধাময় বললেন -কী যে বলল এতক্ষণ কিছুই বুঝতে পারলাম না। শুধু “ধান” ছাড়া।
সবাই হাসছে।
মা বললেন – যাক দুধের একটা হিল্লে হল।
সন্ধ্যা নেমেছে। দলবেঁধে পাখিরা ঘরে ফিরছে।
সুধাময় একটা শ্বাস ফেলে বলেন-কত সহজেই এদের ক্ষোভ নিরসন হয়।
ক্রমশ