সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ২)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

দুই 
ইংরাজরা দেশ থেকে চলে যাওয়ার পরও চা বাগানের মালিকানা হস্তান্তর করতে করতে ষাটের দশক এসে গিয়েছিল। লালমুখো সাহেবদের দেখেছে ছুটি। একবার নিজেদের কোয়ার্টারের নীচে রাস্তা পেরিয়ে যেতে গিয়ে এক সাহেবের গাড়ির নীচে
 পড়তে পড়তে সে বেঁচে গিয়েছিল। রাস্তার ওপারে
 অনেকখানি খোলা জায়গায় তখন কচি কাঁচারা খেলছে।পড়ন্ত বিকেল তখন। সে একছুট দিয়ে রাস্তা পেরোতে গিয়েছিল। তীব্র গতিতে ছুটন্ত ছুটির পায়ের কাছে ঘ্যাঁচ করে চকচকে লাল লম্বা গাড়িটা আচমকা ব্রেক কষে থামল। সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এল দীর্ঘদেহী লালমুখো সাহেব। ইংরেজিতে কীসব জিজ্ঞেস করল কী যে বলল কেউ কিছু বুঝল না। সবার খেলা তখন বন্ধ,  সবাই তখন চুপ, সবাই তখন হতবাক, সাদা চামড়ার সাহেব! মাথায় হ্যাট, সামনে ফ্যাশানদুরস্ত গাড়ি, সে কিনা চোখের সামনে! সাহেব অতঃপর গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। পরে জানতে পেরেছিল ছুটি, সাহেবের নাম এন্ড্রুজ। এ্যাসিস্টান্ট ম্যানেজার ছিল। ঘটনা নিয়ে পরদিন শিশু কিশোর মহলে কত জল্পনা!
৷ তো সেই সাগরপারের সাহেবরা দেশীয় শিল্পপতিদের হাতে চাবাগান হস্তান্তর করে স্বদেশে ফিরল, এরপর চা বাগানে এদেশের শিল্পপতিরা লোকমুখে হয়ে গেল সাহেব। যে”সাহেব”শব্দটি শ্বেতাঙ্গদের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত তা এবার ক্ষমতাবান কিম্বা প্রভুদের উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে লাগল। তিনধাপে বিভক্ত চাবাগানগুলোতে সাহেব মানে ‘জো হুজুর’, চা বাগানের বিভিন্ন পদস্থ কর্মচারী মানে বাবু এবং শ্রমিক মজুর, তবে আরেকটি সূক্ষ্ম ধারাও পাশ দিয়ে বয়ে যেত,  সে ধারাটি হচ্ছে ইশকুল শিক্ষক ও চিকিৎসকের ধারা। এইসব মিলিয়ে চাবাগান। বড় প্রকট ছিল সামাজিক অবস্থানগত ফারাক। শুধু বৈপরীত্য ছিল প্রকৃতিতে। সে এত উদার, এত অনাবিল যেন পরীর ডানায় ভর করে মুঠো মুঠো স্বপ্ন ছড়িয়ে সে বলতে চাইত তোমরা সবাই এমনি উদার ও সুন্দর হয়ে ওঠো।
৷ ছুটিরা যে কোয়ার্টারে থাকতো তেমন কোয়ার্টার হয়ত আজকাল আর চোখে পড়ে না। শনের ছাওয়া, উঁচু ঘরের চাল, বাঁশ দিয়ে হালকা রেলিং টাইপের ফেন্সিং বুনে চৌচালা ঘরের ধারগুলোতে বসিয়ে তার দিয়ে বেঁধে বেঁধে চালকে মজবুত করে তোলা হতো। বড় বড় ঘর,  বড় বড় সব জানালা। কোথাও বাঁশের খুঁটি আবার কোথাও চওড়া চ্যাপ্টামত লোহার খুঁটি। কোনও জানালায় তারের জালির নেট লাগানো কোনটাতে নেই। তবে সামগ্রিকভাবে  দেখতে ভারি নান্দনিক।  ইংরাজদের তৈরি ম্যানেজারদের  বাংলোগুলিও শনে ছাওয়া ছিল। পিরামিড আকৃতির শনে ছাওয়া বাংলোবাড়ি। চমৎকার দেখতে।
ছুটিদের কোয়ার্টারের ভেতরটা ছিল ঠান্ডা, কারণ শন রোদের তাপে তেমন গরম হতে পারে না। ঘরগুলো বড় বড়, ছড়ানো উঠোন, একপাশে বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে সবজিক্ষেত,  এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা ফল ও ফুলের গাছ..আম কাঁঠাল,  বাতাবিলেবু,  পেয়ারা, আতা, হরেক প্রজাতির লেবুর ঝাড়, কাঠগোলাপ,  বেলি, জুঁই,  জবা, টগর, সন্ধ্যামালতী, করবী।
শনের চাষ কি এখন হয়?  পাহাড়ি শন শুকিয়ে গেলে তার আঁশ দিয়ে ঘর ছাওয়া হতো। শনে ছাওয়া ঘর এখন আর তেমন দেখা যায় না। বছর বছর শীতের মরসুমে কোয়ার্টারের চালকে নতুন করে ছাওয়া হতো ঐ শন দিয়ে, বর্ষায় শন পচে যেত তাই। কিছু পচা শন ফেলে দিয়ে নতুন শন লাগানো হতো।ঐ সময়টাতে একটা বনজ প্রাকৃতিক গন্ধে চারপাশ ভরে থাকত। সেই বিশেষ বনজ গন্ধ কোথায় কবে যে হারিয়ে গেছে শত খুঁজলেও হয়তো এখন আর পাওয়া যাবে না। কারণ সেই গন্ধ ছিল একান্তভাবেই পুরনো ও নতুন শনের গন্ধ। হঠাৎ কোনও একদিন ছুটি ইশকুল থেকে ফিরে দেখত বড় বড় শনের আঁটি এনে উঠোনের  একপাশে ফেলা হচ্ছে, পাশে বাঁশের আঁটি, বেতের আঁটি। কিছুদিন আগে থেকেই কোয়ার্টারের উল্টোদিকে বিশাল ফ্যাক্টরির চত্বরের রূপোরঙা ইয়া মাথা উঁচু ঝকঝকে জলের ট্যাঙ্কের গায়ে বাঁশের বোঝা এনে ফেলা হতো। সেই বাঁশ ফেলার শব্দ ভেসে আসতো ছুটিদের কোয়ার্টারে– ঝুপ ঝুপ ঝুপ ঝুপ একেবারে নির্দিষ্ট বিরতিতে বাঁশের বোঝা ফেলা হতো হেমন্তের মিঠেল দিনগুলোতে, দিনগুলো ক্রমশ ছোট হতে থাকতো, মাঠের ধান ক্রমে সোনালি হয়ে উঠতো।তারপর শুরু হতো কামলাদের কিচিরমিচির। ‘কাঁহা গেলি’ ‘হেই পার্বতী ‘ ‘হেই শুকরা ‘ ‘এটা দে ওটা দে’ কাজের মাঝে মাঝে ওদের গল্পগুজব হাসিঠাট্টা সবই চলত। তারপর যখন কাজ শেষ হয়ে যেত তখন কোয়ার্টার একেবারে শান্ত চুপচাপ আর এর সাথে মিলেমিশে যেত নতুন শনের, বাঁশবেতের গন্ধ। তখন আসতো সাফাই কামলা। গোটা কোয়ার্টার সাফাই করতো। তারপর ঝকঝকে পরিষ্কার কোয়ার্টারে নতুন বাঁশ ও নতুন শনের গন্ধ মিলেমিশে নতুন আরেক গন্ধ উঠতো আবার সময়ের সাথে সাথে তা মিলিয়েও যেত।
  উইলসন ইন্সটিটিউট, চা বাগানের এক মধ্যবঙ্গ বাংলা মাধ্যম ইশকুল। চা বাগানের সুপারিনটেনডেন্ট রিচার্ড সাহেব তার বাবার নামে এই ইশকুলটি খোলে।সেটা সম্ভবত ১৯৪৫ কিংবা ১৯৪৬ সাল হবে। তখনও দেশভাগ হয়নি। পূর্ববাংলার শ্রীহট্ট অঞ্চল থেকে তিনজন শিক্ষক এসে উইলসন ইন্সটিটিউটে যোগদান করলেন। রিচার্ড সাহেবের ইশকুল প্রতিষ্ঠা করার পেছনে কারণ কি ছিল? সম্ভবত চা বাগানের কেরানি তৈরি করা। স্টাফ যারা আছে তাদের সন্তানদের শিক্ষার সুবিধার জন্যেই ইশকুল খুলেছিল হয়তো। বংশানুক্রমিকতায় চা বাগানে চাকুরির সুবিধা খুলে দেওয়ার একটা কারণও খুব সম্ভবত ছিল। যাই হোক, এসব আনুমানিক।
৷  ছুটির বাবা সুধাময় দত্ত এই ইশকুলে হেডপণ্ডিত হিসেবে যোগ দেন দেশভাগের আগেই। এসব কথা ছুটি শুনেছে। তার জন্ম তার পরের এক দশক পেরিয়ে। সে যখন ইশকুলে পড়ে তখন শিক্ষক ছিলেন তিনজন। একজন হেডস্যার, একজন ছুটির বাবা,  আরেকজন অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়েসী স্যার। তিনটি ক্লাস – চতুর্থ পঞ্চম ও ষষ্ঠ। হেডস্যার ইংরেজি পড়াতেন, ড্রয়িংক্লাসটাও হেডস্যার নিতেন। সুধাময় দত্ত মানে ছুটির বাবা পড়াতেন অংক বিজ্ঞান ভূগোল,বাংলা,  হরিশস্যারও ক্লাসবিশেষে সেই সেই বিষয়গুলি পড়াতেন।  মানে সব স্যারকে সব বিষয় পড়াতে হত। এছাড়া কোনও উপায় ছিল না। মাত্র তিনজন শিক্ষক, এঁদের সারাদিন মানে প্রথম থেকে সপ্তম পিরিয়ড অব্দি ক্লাস নিতেই হত। ইশকুলে খুব সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল। ওখান থেকেই তো পড়েছে ছুটি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের “মেবার পতন”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “মালঞ্চ”,রক্তকরবী”, গিরীশচন্দ্র ঘোষের “প্রফুল্ল”,  এছাড়া সোনার জলে লেখা হালকা নীল রঙা শক্তপোক্ত বাঁধাই এর দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার সংকলিত  ” ঠাকুমার ঝুলি” “ঠানদিদির থলে”, রূপকথার হাত ধরে সেই তো সাতসমুদ্দুর তেরোনদী পেরোনো।
৷৷ খুব বৃষ্টি হচ্ছে ক’দিন ধরে। লেখার টেবিল হালকা নড়ে উঠল। ডাইরিটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা একটু ঘুরে গেল। সিলিং এর দিকে মুখ তুলে তাকাতেই মনে হল সিলিং ফ্যানটা দুলছে। তারপরই চেঁচামেচি শোনা গেল, কোথাও উলুধ্বনি হল। বুঝতে পারলাম ভূমিকম্প হচ্ছে। আচমকা একটা জোর ঝাঁকুনি। তারপর শান্ত। কিন্তু তারপরও আফটার শকের ভয়ে কাঠ হয়ে থাকি। এই উপত্যকা শহরটি বন্যা ও ভূমিকম্পপ্রবণ। এ আমার অতি প্রিয় শহর অচিনপুর।
৷ যাই হোক আফটার শক এলো না। যা এলো তা একটি অদ্ভুত ফোন। এক কোমল নারীকণ্ঠ।
-হ্যালো ম্যাম, আমি প্রবালের মা। প্রবাল আপনার ইশকুলে পড়ে।  ক্লাস এইটের ছাত্র।
ইশকুলের কাজ ইশকুলেই সেরে আসা আমার অভ্যেস, যাই হোক, বললাম – বলুন।
-ম্যাম, সামনেই তো ষান্মাসিক পরীক্ষা।
-হ্যাঁ।
ফোনের ওপাশটা খানিক চুপ। বললাম – কি বলতে চাইছেন বলুন।
-পরীক্ষা মাসখানেক পিছোনো  কি সম্ভব ম্যাম?
-না। কেন বলুন তো?
-ম্যাম আপনি ইচ্ছে করলে সব পারেন।
– না পারি না।
-ম্যাম, আপনি তো মেয়ে,  মেয়েদের কষ্ট বুঝতে পারবেন।
চুপ করে রইলাম। কারণ যাই হোক না কেন, এব্যাপারে সাহায্য করা সম্ভব নয়।
-ম্যাম আমি মা হতে চলেছি।ওর বাবা তো গাড়িতে কাজ করে। অনেকসময় বাইরে যেতে হয়। প্রবালের পড়াশোনা দেখভাল করা সবই আমি করি। ঠিক পরীক্ষার সময়টাতে আমার ডেলিভারি ডেট পড়েছে। তারপর খানিক চুপ থেকে সে আমার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইল হয়ত।
– কিছু বলছেন না ম্যাম, ঠিক আছে ম্যাম আগামীকাল আমি ইশকুলে আসব। একটু দেখবেন ম্যাম।
ফোনটা রেখে আমি হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে রইলাম।
(ক্রমশ)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।