ইতিহাস-নির্ভর গল্পে বাদল বিহারী চক্রবর্তী

পাণ্ডুলিপির প্রত্যাবর্তন

শশাঙ্ক সান্যাল, ‘মা অভয়া যাত্রা ‘ পার্টির একজন খ্যাতিমান পরিচালক। আশৈশব তিনি গান-বাজনা, যাত্রা, নাটক সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মেতে থাকেন। কিন্তু তাই বলে তার পড়াশুনায়ও কম নিবিষ্টতা ছিল না। দু’মেয়ের পর পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান বিধায় ছেলের ইচ্ছের বিরুদ্ধে তেমন কোন শাসন বা বাধার সৃষ্টি করেন না পিতা-মাতা। বাবা বৈকুণ্ঠ সান্যাল ছিলেন পেশায়। ডাক্তার। ব্রিটিশ পিরিয়ডে ডাক্তার বাবু পারুলিয়া গ্রাম নিবাসী বাবা-মা’র একমাত্র কন্যা শৈলবালার সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থেকে যান ঘরজামাই। পারুলিয়া ও আশে-পাশের গ্রামগুলােতে তখন কোন ডাক্তার কবিরাজ ছিল না। ফলে, বিনা চিকিৎসায় প্রতি বছর কেউ
কেউ যে কোন বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তাে। অনেকটা সে চিন্তা করেই শৈলবালার বাপের বাড়ির লােকজনও গাঁয়ের সাধারণ লােকদের অনুরােধে বৈকুণ্ঠ বাবু শেষাবধি পারুলিয়াতেই থেকে যান। শশাঙ্ক সান্যালের জন্ম মামার বাড়ি, পারুলিয়াতেই। তবু তার পৈত্রিক ভিটার প্রতি বরাবরই রয়েছে নাড়ির টান। শৈশবে বালক শশাঙ্ক প্রায়শই মাকে জিজ্ঞেস করতাে, ‘আচ্ছা মা, সবাই বলে, এটা নাকি আমাদের বাড়ি নয়, এটা মামার বাড়ি। আমাদের বাড়ি নাকি সিরাজগঞ্জে ?’ ছেলের কথায় শৈলবালা আক্ষেপ করে করে ছেলেকে বলতেন, তাের বাবা এখানে আসার পর তাের জেঠামশাই বললেন, দ্যাখাে ভাই, একান্নভুক্ত অবস্থায় থাকা কালীনই অনেক জমি বিক্রি হয়ে গেছে। তুমি শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছে, এখন জমি-জিরাত বেশি নেই। তােমাকে যতটুকু দেবাে, ততটুকুই নিতে হবে। তাছাড়া, তাের বাবা তাে ভাসুর ঠাকুর মশাইয়ের চেয়ে বয়সে অনেক ছােট ছিলেন, তাই মুখের পর কিছু বলতে পারেন নি কোনদিন, অবশেষে যেটুকু পেল, তারও আবার সিংহভাগ যমুনার ভাঙনে চলে গেল। – জানাে মা, এখানে আমার স্থায়ীভাবে থাকতে ইচ্ছে করে না । অনেকটা ফ্যাকাশে মুখে বলে শশাঙ্ক। – আমি বুঝি খােকা তাের মনের কষ্টটা। সবার ভাগ্যে হয়তাে বিধাতা সব কিছু দেন না। তবে, জন্ম হােক যথাতথা, কর্ম হােক ভাল। এ কথাটা মনে রেখে বংশের মুখ উজ্জ্বল করাে বাছা একদিন দেখবে- এ মামার বাড়িই তােমার আপন ভুবন হয়ে গেছে ‘। ছেলেকে আশার আলাে দেখান মা শৈলবালা। বালক শশাঙ্কের চোখে মনের অজান্তে কত স্বপ্ন যে ভেসে ওঠে, তার কে কতটুকু খোঁজ রাখে। না, কোন ধরণের আমলা কিংবা হােমরা-চোমরাও নয় ; তার ইচ্ছে, একজন সফল নাট্যকার তথা যাত্রাপালাকার হওয়ার। কিশাের বয়স থেকেই বাপের সাথে বিভিন্ন পৌরাণিক যাত্রা ও মঞ্চনাটকে অভিনয় করে এক রকম নেশা ধরেছে তার ; কি করে বড় হয়ে সে তার। মনােবাসনা পূর্ণ করবে। জমিদার বাড়িতে প্রতি পূজোয় কলকাতা হতে যাত্রাপার্টি আসে। শশাঙ্ক পড়াশুনা কামাই করে প্রায় প্রতিটি যাত্রাপালার অভিনয় দেখে নিমগ্নচিত্তে। কী ভঙ্গিতে, কুশীলবদের মঞ্চে দাঁড়ানাে, কী স্টাইলে রাজা-বাদশাহগণ সিংহাসনে উপবেশন করেন, কখন কেমন পরিস্থিতিতে, কোন্ স্কেলে পাত্র-পাত্রীরা তাদের ডায়ালগ ওঠা-নামা করেন, ইত্যাদি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে লক্ষ্য করে শশাঙ্ক । মনে মনে ভাবে, আমাকেও যে পালাকার হতে হবে একদিন। আমিও একদিন রাজা, বাদশাহ কিংবা নবাবের ভূমিকায়। অভিনয় করবাে। লােকে আমার অভিনয় দেখে বলবে, ঐ তাে দিল্লীর সম্রাট যাচ্ছে । ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে চোখ বুজে আসে শশাঙ্কের। দিবাস্বপ্নের অতলে তলিয়ে নিজেকে দেখতে পায়, শ্রী রামচন্দ্র, ধৃতরাষ্ট্র, কর্ণ বা অর্জুনের মতাে পৌরাণিক বীরদের মধ্যে। আবার তার অক্ষিপটে কখনাে নিজেকে খোঁজে পায় সে সম্রাট আকবরের, কখনােও বা শাহজাহান বা নবাব সিরাজ-উদ্-দৌল্যার। ভূমিকায় অভিনয়ে বিভাের। তার সাথে রয়েছে সীতা, দ্রৌপদী, মহারাণী যােধাবাঈ কিংবা লুঙ্কা, আলেয়ার মতাে পাত্র-পাত্রী। ক্ষণপরেই যেন সম্বিত ফিরে পায় শশাঙ্ক। সন্ধ্যার আঁধার মেমে আসে। ভিন্ গাঁ থেকে রােগী দেখে ঘরে ঢুকেন বৈকুণ্ঠ সান্যাল। শৈলবালা ছেলেকে পড়তে বসার কথা বলে চলে। যান স্বামীর হাত-পা ধুয়ার জল এনে দিতে। শশাঙ্ক ইংরেজি ট্রান্সলেশান পড়তে থাকে, ডাক্তার আসিবার পূর্বে রােগীটি মারা গেল ; দ্যা প্যাসেন্ট হ্যাড ডাইড বিফোর দ্যা ডক্টর কেইম’। একটু চিন্তা করে শশাঙ্কের কৌতুহল বেড়ে যায়। বাবাকে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা। বাবা, তুমি কখনাে যাওয়ার আগে কোথাও কোন রােগী কি মারা গেছে ? ‘ ছেলের প্রশ্নে বৈকুণ্ঠবাবু কিছুটা ইতস্তত করে বলেন, সকল ডাক্তার নয়, কোন কোন ডাক্তারের বেলায় হয়তাে এমনটি কোন না কোনদিন হয়ে থাকে। সময় মতাে ডাক্তারকে ইনফরম না করলে কিংবা, রােগী যদি সকল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন রােগী মৃত্যু বরণ করে। অতঃপর বৈকুণ্ঠবাবু বারান্দার পৈতানে চলে যান হাত-পা-মুখমণ্ডল ধুইতে। বারান্দায় বসেই ডাঃ বৈকুণ্ঠ ভাবেন, ছেলে তাঁর ট্যালেন্ট আছে। বড় হলে গ্রাম্য ডাক্তার নয়, তাকে এম, বি, বি, এস, ডাক্তারই বানাবেন। কিন্তু পিতার চিন্তার সাথে পুত্র শশাঙ্কের ভাবনার ছিল বিস্তর ফারাক। দেখতে দেখতে আরও চারটি বছর পেরিয়ে গেছে। কৃতিত্বের সাথেই শশাঙ্ক দশম শ্রেণি হয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষারও প্রস্তুতি নিয়েছিল যথারীতি। কিন্তু হলে কি হবে, তার ভাগ্যের শিকা হয়তাে ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি সে বছর। এক নিদারুণ গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দেয়ার ভাগ্য আর হল না শশাঙ্কের। তিন সপ্তাহের শয্যাশায়ী শশাঙ্কের চোখে মুখে হতাশার ভাব ছিল প্রথমদিকে। কিন্তু, অচিরেই কখনাে স্কুলে, কখনাে পৈতৃক গাঁয়ে, আবার কখনাে মামার বাড়ির গাঁয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে পুরােদমে জড়িয়ে ফেলে শশাঙ্ক। আজ এখানে কীর্তন, তাে কাল অন্য গাঁয়ে যাত্রাপালা কিংবা, নৌকা বিলাস; কখনাে বা দলবল নিয়ে ফাল্গুনের হােলি গানের প্রতিযােগিতায় মেতে থাকে এই বহুমুখী গুণবান যুবক শশাঙ্ক। এসবের মধ্যে সম্পূর্ণ ডুবে থাকার। ফলে পরবর্তী সময়ে আর এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি তার পক্ষে। তবে, এরই মধ্যে রামায়ণ অবলম্বনে ‘রাবণ। বন্ধ ‘ নামে একটি যাত্রাপালা লিখে ফেলল শশাঙ্ক। গাঁয়ের কিছু অনুসারীদের নিয়ে কয়েক রজনী মঞ্চস্থও হয়ে যায় বেশ আড়ম্বর ভাবেই।
ছেলেকে ডেকে মা শৈলবালা বলেন, তুই কি শুধু এই গান-বাজনা করেই বেড়াবি? তাের বাবার যে বড় আশা ছিল, তােকে বড় ডাক্তার বানাবে ?’ – মা, আমার ক্লাশের পড়াশুনার মধ্যে আর থাকতে ইচ্ছে করে না। তুমি কোন চিন্তা করাে না মা। দ্যাখাে, তােমার ছেলে একদিন ‘…..শশাঙ্কের কথা শেষ না হতেই শৈলবালা হেসে হেসে বলেন, ‘তাের সেই বাংলা বিহার উড়িষ্যার মহান অধিপতি হবি, এই তাে?’ – হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক ধরেছাে মা’। -পাগল ছেলে কোথাকার ‘- এই বলে শৈলবালা রান্নাঘরে চলে যান। তাঁর ছেলে যে সংস্কৃতির জগতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, তা মাতা শৈলবালার বুঝতে অসুবিধে হয়না। পাশাপাশি ছেলের ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে এক অনিশ্চিৎ শঙ্কা নিয়ে ছেলের অগােচরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস। ছাড়েন তিনি। আপাতত চলছে এই মতাে করেই। স্কুলের পড়াশুনার পাট এখন আর নেই শশাঙ্কের। আর- সিরাজগঞ্জে আগের মতাে ঘন ঘন যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। কিন্তু তাতে কি, জ্ঞানপিপাসু শশাঙ্ক চায় দুনিয়াটাকে হাতের মুঠোয় এনে দেখতে। পৌরাণিক গ্রন্থ থেকে শুরু করে আশে-পাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি থেকে দুর্লভ যত সাহিত্য, বিজ্ঞান ও এ্যাডভেঞ্চারাস বই শশাঙ্কের পড়ার এক দুর্নিবার নেশা। পাশাপাশি সুযােগ পেলেই পয়সা বাঁচিয়ে বই কেনার অভ্যাস তার। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত থেকে শুরু করে বিশ্ব পরিচয় আর বাংলা সাহিত্যের মধ্য ও আধুনিক যুগের প্রথিতযশা সকল কবি-সাহিত্যিক রচিত এমন কোন রচনা নেই যে । শশাঙ্কের অপঠিত। ছেলের এহেন বইয়ের বিপুল সম্ভার দেখে পিতা বৈকুণ্ঠ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন ঘরের তাকে রাখা পুস্তকাদির প্রতি। একদিন রাতের খাবারের পর পান চিবুতে চিবুতে বৈকুণ্ঠ শৈলবালাকে বলেন, ‘আমাদের শশাঙ্কের পাণ্ডুলিপিটা দেখেছাে ? ‘ প্রত্যোত্তরে শৈলবালা বলেন, আমি কি তা জানি ? তবে, ওর লেখা যাত্রাপালা- রাবণ বধ খুব ভাল লেগেছে আমার কাছে
– আরে সেটার কথাই তাে বললাম ‘-কুৈণ্ঠবাবু বলেন। – ওর স্বপ্ন, বড় পালাকার হবে ও। বই আকারে ছাপাবে’। – তা কি আর সম্ভব হবে, যদি না প্রকাশক নিজের খরচায় না ছাপেন ?’ – জানিনা ওর জীবনের ভবিষ্যৎ ‘- শৈলবালার চিন্তিত কণ্ঠ। দিন যায় ক্রমশঃ। এমনি করে চলে যায় কয়েকটি বছর। ইতােমধ্যে দলবল নিয়ে শশাঙ্ক সিরাজগঞ্জের নিজ গাঁয়ে রাবণ বধ পালাটি মঞ্চস্থ করে। তাতে বই রামের ভূমিকায় অভিনয় করে আসছে শশাঙ্ক নিজেই। সৌভাগ্য বশত সে রজনীতে দর্শকের আসনে। উপবিষ্ট ছিলেন পাশের গাঁয়ের বনেদী তালুকদার, ভুপতি লাহিড়ি ; সাথে ছিল তাঁর সদ্য বিবাহিতা কন্যা- অন্নদা ও বিয়ের যােগ্যা কনিষ্ঠা কন্যা- হেমলতা(হেমা)। মঞ্চে রামের ভূমিকায় অভিনয় দেখে পিতা ও কন্যাদ্বয় এতােটাই মুগ্ধ হলেন যে পালা শেষ হওয়ার পরও হেমা অপলক গ্রীণরুমের দিকে আনমনা হয়ে তাকিয়ে রইল। কি রে, রামের প্রেমে ডুবে গেলি নাকি?’- ছােট বােনকে ধাক্কা দিয়ে অন্নদা বলল। হেমা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, সত্যি, সুন্দর। ‘ আবার পরক্ষণেই জানতে চায়, ছেলেটা কি ব্রাহ্মণ না কি রে দিদি?’ ‘ব্রাহ্মণইতাে বটে, নাম-শশাঙ্ক সান্যাল। কেন, তাের পছন্দ হল বুঝি?’- অন্নদার পাল্টা প্রশ্ন। -যাঃ , কী যে বলিস, হলেই বা কি ? ‘ – হলেই হবে, এবার চল ‘। সে রাতে দর্শকদের আসনে পিতার সাথে হেমলতাকে দেখে শশাঙ্কের মনেও কম রােমাঞ্চের দোলা লাগেনি। প্রকাশ্যে, আড়ালে আবডালে থেকে বারবার হেমার মনােরমা মুখখানি সে যেন স্থায়ীভাবে এঁকে নিচ্ছিল তার মনের মণিকোঠায়। ডাঃ বৈকুণ্ঠ ও শৈলবালা উভয়ের বয়স এখন মধ্য গগনে। গায়ে-গতরে তেমন শক্তিও নেই আর আগের মতাে। শশাঙ্ক চব্বিশে পা দিয়েছে। একজন বউ ঘরে আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। মা শৈলবালা ছেলেকে একান্তে ডেকে বােঝান, আমার এখন বয়েস হয়েছে। তুই এবার বিয়ে থা কর বাবা’। মায়ের কথায় শশাঙ্কের প্রশ্ন, বিয়ে করে কি খাওয়াবাে মা, আমি যে বেকার ? -এ নিয়ে তুই ভাবিস না বাবা। জমিদারি স্টেটে কাজ একটা হয়ে যাবে। তাের বাবাও তাই বলছেন ‘। -তা কোথায়, কে আমাকে বিয়ে করবে ? ‘শশাঙ্কের বুকটা এক অজানা ভাবনায় কেঁপে ওঠে, যদি হেমলতা না হয়। – আরে সে কথাই তাে বলছি। আমার শ্বশুর বাড়ির পাশের গাঁয়ের লাহিড়ি বাবুর ছােট মেয়ে দেখতে-শুনতে একেবারে নাকি লক্ষ্মী প্রতিমা। লাহিড়ি বাবু লােক পাঠিয়েছিলেন, আমাদের মতামত জানতে। মেয়েটাকে আমি কয়েক বছর আগে দেখেছি। কিন্তু কখনাে ভাবিনি যে এতাে ধনীর দুলালীকে কোনদিন বউ করে আনতে পারবাে কিনা ‘। – মায়ের মুখে শশাঙ্ক নিজের প্রত্যাশিত হবু স্ত্রীর বিবরণ শােনে মনে মনে খুশিতে আটখানা হয়ে শেষে মা-কে বলে, তবে তােমরা যা ভাল বােঝ, তাই কর’। অতঃপর দিন ক্ষণ দেখে মাস খানেকের মধ্যেই হেমলতার সাথে শশাঙ্কের শুভ পরিণয় হয়ে গেল। সংসার ঘাড়ে পড়ায় জমিদারি স্টেটে তহসিলদার পদে একটা কাজের ব্যবস্থাও হয়ে গেল শশাঙ্কের। পারুলিয়া থেকে মাইল দশেক দূরবর্তী ভায়াবহ গাঁয়ের কাছারী বসেই খাজনা কালেকশন করতে হয় শশাঙ্কের। কৃতদার শশাঙ্ককে প্রতিদিন পারুলিয়া থেকেই কাছারীতে যেতে হয়। এমন সােনায় সােহাগা চাকরির খবর শােনে দলের অনুসারীগণও খুব খুশি তাদের প্রিয় পরিচালক, পালাকারকে পেয়ে। বিয়ের তিন বছরের মাথায় শশাঙ্কের জ্যেষ্ঠ পুত্র অরূপ এবং পাঁচ বছরের মাথায় কন্যা শর্মিলা জন্ম গ্রহণ করে। বেশ আনন্দ বিরাজ করছিল সংসারে তিন প্রজন্মের উপস্থিতিতে। কিন্তু এ অনাবিল আনন্দ বেশিদিন রইল না ; পরবর্তী সময়গুলাে ছিল শশাঙ্কের কাছে বটবৃক্ষহীন এক খােলা আকাশের মতাে। শর্মিলার জন্মের এক বছর পর এবং তিন বছর পর যথাক্রমে শশাঙ্কের বাবা ও মায়ের জীবনাবসান ঘটে যায় ; আর । মড়ার ওপর খরার ঘা হল- জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি । সঙ্গত কারণেই পুনরায় বেকার হয়ে যায় শশাঙ্ক। এই বেকারত্বের মধ্যেই শশাঙ্কের দ্বিতীয় ও কনিষ্ঠ পুত্র শৌনকের জন্ম হয় শর্মিলার জন্মের পাঁচ বছর পর। কিছু আবাদী জমির উপর ভরসা। এহেন নাজুক পরিস্থিতিতে
শশাঙ্ক বড় ছেলের সাথে একমাত্র মেয়েকে ভারতস্থিত বােনের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় তাদের ভাগ্যান্বেষণে। শােকাবহ দুর্দিনে শশাঙ্কের পাশে এসে দাঁড়ায় দলের সকল অভিনয়শিল্পীগণ। তারা আবার অনুপ্রেরণা দেয় আর একটি পালা রচনা করে অভিনয় জগতে ফিরে আসার । যেই কথা সেই কাজ ; এক মাসের মধ্যেই নতুন একটি যাত্রাপালার পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলল শশাঙ্ক। পাঁচ অঙ্কের ঐতিহাসিক যাত্রা, ‘মুক্তি সাধনায় বিধৃত উপজীব্য হয়েছে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হােসাইন শাহের আমলের সুশাসন আর মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের পতিত পাবন, মানব প্রেম ও কৃষ্ণপ্রেমের লীলাকীর্তন। এরই মধ্য দিয়ে ১৯৬০-এর গােড়ার দিকে পারুলিয়া ও দূর দূরান্তের যাত্রাশিল্পীদের নিয়ে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা আর সাধনায় শশাঙ্ক নিজ পরিচালনায় গড়ে তােলে সকলের কাঙ্খিত ‘মা অভয়া অপেরা যাত্রা পার্টি’। সাড়া জাগানাে এ যাত্রাপার্টির সুনাম অচিরেই পুরাে প্রদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। নিজের রচিত দু’টো সহ মােট ৭টি পালা পর্যায়ক্রমে অভিনীত হয়ে আসছিল কাছে ও দূরের বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু এখানেও ছিল বিড়ম্বনার এক শেষ। বছর তিনেকের মধ্যেই এক ধরণের ভুইফোর পেশিশক্তির অনুপ্রবেশের কারণে শশাঙ্কের পক্ষে অপেরার ঐক্য আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। অপেরার করুণ পরিণতিতে শশাঙ্কের বুকে এক ধরণের হাহাকার অনুভূত হয় নিরন্তর। একদিন বৈঠকখানার ঘরে নির্জন চেয়ারে বসে আছে শশাঙ্ক। সামনে টেবিলের ওপর রাবণ বধ ’ ও ‘মুক্তি সাধনা ‘ -র পাণ্ডুলিপিদ্বয়। অপলক দৃষ্টি তার স্বরচিত পাণ্ডুলিপির ওপর। অকস্মাৎ টপটপ করে তার মনের অজান্তেই চোখের জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। পাণ্ডুলিপিগুলাের ওপর। হয়তাে ভাবছিল, কি হবে এ পাণ্ডুলিপির ভবিষ্যৎ। আদৌ কি ছাপানাে বই আকারে পালা দুটো আলাের মুখ দেখবে। অশ্রু সংবরণ করতে পারছিল না শশাঙ্ক। নিজেকে সে প্রশ্ন করে, আদৌ কি আমি আমার সাধনার ফল দেখে যেতে পারবাে, নাকি অপূর্ণই থেকে যাবে আমার আশা ? ‘ শশাঙ্কের এ নিরব অশ্রুপাত নিঃশব্দে ঘরে আসা স্ত্রী হেমলতার চোখকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। কি গাে, একা একা কাঁদছাে কেন ? ‘-বিচলিত হেমলতার প্রশ্ন। মাথা তােলে শশাঙ্ক তার অযাচিত আশঙ্কা প্রকাশ করে, দ্যাখাে, আমার সবই তাে গেছে। এখন এ দু’টো পাণ্ডুলিপি কি কোনদিন প্রকাশ করার সৌভাগ্য হবে কি-না, তাই ভাবছি ‘। স্ত্রী স্বামীকে বােঝাতে চান যে একদিন না একদিন প্রকাশিত হবে। দিন কয়েক পরই শশাঙ্ক পাণ্ডুলিপি দুটো নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেখানে অন্নপূর্ণা প্রেসের মালিক তাকে আশ্বাস দেন যে, পড়ে ভাল লাগলে অবশ্যই প্রকাশিত হবে। সারা বাংলায় তখন ছিল সাধারণ নির্বাচনের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক উত্তাল। ১৯৭১ সাল। শুরু হল বাংলা জুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ। পাকি জান্তা বাংলার শহর,বন্দর জনপদের জানমাল সমস্ত কিছু নির্বিচারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রাণে বাঁচার জন্যে মানুষ দিশেহারা হয়ে পল্লীর নিভৃত স্থানে আশ্রয় নিতে মরিয়া। ১৪ বছরের কনিষ্ঠ পুত্র, শৌন্যককে নিয়ে সস্ত্রীক শশাঙ্কও হাতে প্রাণটা নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতাে এখানে সেখানে ছুটাছুটি করছে। ইতােমধ্যে পাকিস্তানি হায়েনা। আর রাজাকার বাহিনী এসে শশাঙ্কের বাড়িঘর ভষ্মীভূত করে দেয়। সেযাত্রায় পালাতে সক্ষম হয়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল। এভাবে আর সব গ্রামবাসীর মতাে দীর্ঘ আট মাস স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে শশাঙ্ক জলে, জঙ্গলে ও দুর্গম এলাকায় পালিয়ে আত্মরক্ষা করে আসছিল। মাতৃভূমির করুণ পরিস্থিতিতে শশাঙ্ক দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে। প্রায় বছর ঘুরে এল শশাঙ্ক তার পাণ্ডুলিপির কোন খবর পায় না। একদিন গাঁয়েরই এক গেরিলা মুক্তিযােদ্ধার মাধ্যমে জানতে পারে, প্রকাশনার মালিক নাকি সপরিবারে ভারতে পাড়ি দিয়েছেন আর পাকি সেনারা নাকি প্রকাশনাটি পুড়িয়ে দেয়। এ খবর শােনে শশাঙ্ক আরও ভেঙে পড়ে। বেচারা প্রায়শই স্ত্রী-পুত্রকে বলতাে, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে আমি না থাকলেও তােমরা আমার পাণ্ডুলিপি দু’টোর খোজ নিও। ছাপা হােক বা না হােক, আমার স্মৃতিচিহ্নটুকু অন্ততঃ থাক’। পারুলিয়া গায়ে মুক্তিযােদ্ধার ঘাটি ছিল বিধায় এ গাঁয়ে ন’ মাসে পাঁচবার পাকি সেনারা বর্বরােচিত হামলা করেছিল। সেসময় প্রায় প্রতিদিন পাক বাহিনী এসেছে ‘ এমন ভুয়া খবরে বাড়ি ছেড়ে দূরবর্তী। স্থান অভিমুখে দৌড়াতে হতাে গাঁয়ের বাসিন্দাদের। সেরকম শশাঙ্কের পরিবারেও দুশ্চিন্তা আর কষ্টের সীমা ছিল না। কিন্তু, তাতেও শেষ রক্ষা হল না। বাংলা শকবলমুক্ত হওয়ার দিন পনেরাে আগে পাকিস্তানি হায়েনা আর রাজাকার বাহিনী হানা দেয় পারুলিয়ায়। সেদিন জনা চল্লিশেক শহীদের সাথে শশাঙ্ক সান্যালও সপুত্রক নিহত হয়। এক জঙ্গলের ধারে পড়ে রইল একসময়কার ‘মা অভয়া অপেরা যাত্রাপার্টির পুরােধা বাবু শশাঙ্ক সান্যাল। স্ত্রী তার অর্ধ পাগলিনী প্রায়। উপায় ছিল না বিধায় সেদিন জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল শহীদদের সমাধিস্থ করা হয়। ন’টি মাস ছিল যােগাযােগ বিচ্ছিন্ন। অবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশে শহীদ পিতা ও ভ্রাতার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভারত থেকে আগত জ্যেষ্ঠ পুত্র অরূপ সান্যাল ও সদ্য বিবাহিতা তনয়া শর্মিলা চ্যাটার্জী(সান্যাল)। কাঁধে ঝুলানাে ব্যাগ থেকে শশাঙ্ক রচিত ‘মুক্তি সাধনা ‘ যাত্রাপালার প্রকাশিত বইখানা শশাঙ্কের সমাধির পাদদেশ স্পর্শ করিয়ে মাথায় তােলে নেয় পুত্র অরূপ। বাবা, তুমি অনন্তলােক হতে তাকিয়ে দ্যাখাে, তােমার পাণ্ডুলিপি আজ বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে ‘- বলতে বলতে অঝােরে কেঁদে ফেলে অরূপ। আর এটা সম্ভব হয়েছে যখন- পাশের গাঁয়ের জনৈক সাহিত্যানুরাগী শরণার্থীর মুখে পিতার লেখা পাণ্ডুলিপির খবর শােনে বহু খোঁজ করে। কলকাতায় ‘ নিউ অন্নপূর্ণা ‘ প্রকাশনে গিয়ে উদ্বাস্তু সেই প্রকাশকের কাছ থেকেই ছাপানাে যাত্রাপালাটি উদ্ধার করে আনতে সক্ষম হয়। অরূপ- তখনই। সাথে পিতার বড় সাধের ফসল, পাণ্ডুলিপি দু’টোরও প্রত্যাবর্তন ঘটে শশাঙ্কবিহীন শােক সন্তপ্ত পরিবারে। সমাধির চারপাশ ভিড় করা শুভার্থী জনতাও তখন পুষ্পক-শ্রদ্ধা জানায় শশাঙ্কের বিদেহী আত্মার প্রতি, আর দু’হাত তােলা মুখে ছিল তাদের প্রার্থনা-স্লোগান- শশাঙ্ক, তুমি অমর হও; তােমার কীর্তি অক্ষয় হােক।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।