আর্ষরা ভারতের একটি বহিরাগত জাতি, বেদ “চাষার গাণ” “বালকোচিত উন্মত্ত প্রলাপ এইসব অপপ্রচারের মূল প্রাণপুরুষ প্রবক্তা হলেন মিশনারি মক্ষ্মুলার সাহেব।
খ্রিষ্টান মিশনারিদের দানে পুষ্ট মক্ষ্মুলার সাহেবের প্রচেষ্টা ছিল অসামান্য, অলিক, অবান্তর ও অপদার্থতার চরম প্রতিরূপ। কিন্তু তার নির্লজ্জতার সীমাপরিসীমা ছিলনা তাই আজীবন তিনি পৃথিবীর সুপ্রাচীন ইতিহাস কে বিকৃত করে গেছেন এবং নিজের রক্তবীজ ভারতে বপন করে গেছেন।
আর্যদের বৈদেশিক প্রমাণের জন্য মক্ষ্মুলার সাহেব যেসমস্ত বেদর বিকৃত করে তার তত্ত্বকে সত্য প্রমানের চেষ্টা করেছিলেন, সেইসমস্ত মন্ত্র ভাষ্য দেখলেই বোঝা যায় তিনি উৎকৃষ্ট শ্রেণীর অর্বাচীন ছাড়া আর কিছুনা।
এই মন্ত্রের ভাষ্য করতে গিয়ে মক্ষ্মুলার বিষ্ণুকে একজন মানুষ বলে মনন করেন (The sacred books of east, vol xxxii, vedic hymns translated by Max Muller) এবং তিনি বলেন বিষ্ণু একজন ব্যক্তি যিনি মধ্য এশিয়া থেকে দলবল সহ এ দেশে (ভারতে) এসেছিলেন, তখন পথে তিন স্থানে বিশ্রাম করেছিলেন এবং তাঁর চরণধূলিতে জগৎ পরিব্যাপ্ত হয়েছিল।তাই প্রমাণ হয়যে আর্যরা বর্হিরাগত।
এই কথা শ্রবণ মাত্রই তৎকালীন রাজানুগ্রেহে পুষ্ট ভারতীয় বিজ্ঞজনেরা নিজেদের বগল বাজিয়ে রাজানুগ্রহের আনুগত্য প্রদর্শন করেছিলেন, যা এখন চলছে।
আসলে মক্ষ্মুলারের অপকর্মের প্রেরণা বেদের সায়ণ ভাষ্য।
মধ্যযুগের ভাষ্যকার সায়নাচার্য্য পুরাণের কিংবদন্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যে শব্দগত বেদ ভাষ্য করে গেছেন তাতেই মূল বিপত্তি।উনি ঐ ঋকে ” ত্রেধা বিচক্রমে, পদং নিদধে পাংসুরে সমূঢ়ং এই বাক্য তিনটির প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি না করেই শব্দগত অর্থ করে অনর্থ ঘটিয়ে পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের বিকৃতি করবার সুযোগ দিয়ে গেছেন।
ত্রেধা শব্দে তিনবার, বিচক্রমে শব্দে ভ্রমণ, পদং শব্দে পা, পাংসুরে শব্দে ধূলিকণা এবং সমূঢ়ং পদে সমাবৃত করবার ফলে উনি সর্বত্র ব্যাপক পরমাত্মা সূচক বিষ্ণু শব্দ কে দেবতা বুঝিয়েছেন, তেমনি সায়নের পথ ধরেই মোক্ষ্মুলার বিষ্ণুকে একটি মধ্য এশিয়ার ব্যক্তি বানিয়ে ছেড়েছেন।
এইবার দেখাযাক সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে বেদ মন্ত্র কে অনুধাবন করা যাক ব্যাকরণগত ভাবে।
বিষ্ণু, শব্দে সর্বব্যাপী পরমেশ্বর, বিচক্রমে (বিশিষ্টভাবেন ব্যাপ্ত সর্বত্রগ ইত্যর্থ), ত্রেধা, অতীত, অনাগত, বর্তমান— এই তিনকালকে বোঝায় অর্থাৎ তিনকালে তাঁর বিদ্যামানতা সমানভাবে প্রকাশ পায়, স্থূল, সূক্ষ্ম কারণ প্রকাশরহিত পৃথিবীরূপ,অন্তরীক্ষ সূক্ষ্ম পরমাণুরূপ এবং প্রকাশময় সূর্যরূপ, জগতের এই তিনরূপ বোঝাচ্ছে।
আবার পদং শব্দে সায়ন পা বুঝিয়েছেন, বাস্তবে এটা পা নয়( তাহলে পরমপদ অর্থে মোটা পা বা বড় পা ধরতে হয়)। পদং অর্থে আধিপত্য, ঐশ্বর্য, জ্যোতিঃ এইসব বোঝায়।আর পাংসুরে শব্দের ধূলি নয়, সূক্ষ্মভাব অর্থাৎ অণু পরমাণুময় জ্ঞান স্বরূপে তিনি চির বিদ্যমান।
এই ঋকের ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়–” সর্বব্যাপী পরমাত্মা (বিষ্ণু) এই সমগ্র জগৎকে বিশেষ ভাবে ব্যাপিয়া আছেন। অতীত অনাগত বর্তমান, তিনকালেই তাঁহার ঐশ্বর্য মহিমা, জ্যোতিতে প্রকাশ নিরন্তর ধৃত রহিয়াছে, কিংবা স্থূল সূক্ষ্ম কারণ জগৎ তাঁহার জ্যোতিঃ মহিমায় বিধৃত, নিখিল জগৎ সম্যকভাবে তাঁহাতেই অবস্থিত।
হ্যাঁ এই ভাষ্য দয়ানন্দ কৃত নয় ☺ আচার্য্য দুর্গাদাস লাহিড়ী কৃত।
সায়ণ পুরাণের বামন অবতার কে সিদ্ধতা দিয়ে ছিল আর মোক্ষ্মুলার সেই বিষ্ণুকে মধ্য এশিয়ার মানুষ বানিয়ে সূক্ষ্ম বেদ মন্ত্রকে বিকৃত করে আর্যরা বহিরাগত প্রমাণ করেছিল।