-মানে, প্রমােশন? বইযের ফিল্ডেও? অমারাত্রির চোখ বড় হয়ে গেল।
-অ্যাবসলিউটলি। ক্যান্ডিডেটের যেমন ইলেকশন এজেন্ট , লেখকেরও চাই সিলেকশন এজেন্ট! নইলে অত বইযের মধ্যে লােকে আপনারটা হাতে নেবে কেন? নেওয়ানাের জন্য বাজারে চারাপােনা ছেড়ে দিতে হবে। তারাই স্টলে স্টলে গিয়ে চেঁচাবে, ‘আচ্ছা কাল পিনাকপাণির যে বইটা হটকেকের মতাে বিক্রি হয়ে গেল সবকটা কপি , আজ আবার সেটা বাঁধাই হযে স্টলে এসেছে কি?
-উফফ, কান-মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে আমার। পিনাকপাণির মন সিগারেটের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।
সমরাদিত্যর উৎসাহ বেড়ে গেছে ততক্ষণে, এতেই ক্লান্ত হলে চলবে? এ তাে সবে গ্রাউন্ডওয়ার্ক! কিন্তু শুধু ডাের টু ডাের দিয়ে এখন কোনও যুদ্ধই জেতা যাবে না। এখনকার স্লোগান হচ্ছে, মােবাইল ফর মাের’। আগে যে কাজটা করত ভাইটি, সেটাই এখন করবে আইটি। প্রত্যেক প্রার্থীর মতাে, সব লেখকেরও নিজস্ব আইটি সেল থাকতেই হবে। ডে-নাইট, উইদিন দ্য হাউজ, অন দ্য রােড, ভারা করে যাবে শুধু আপলােড! -বইযের ছবি? অমারাত্রি জিজ্ঞেস করল।
-ধ্যাত! শুধু বই কেন? লেখকের বই, লেখকের সই, ভক্তবৃত্তে দাঁড়িয়ে হইচই! সবটাই ফেসবুকের ওয়ালে কাঁচা গােবরের মতাে অহােরাত্র সেঁটে যেতে হবে। আর প্লেগের চেযেও দ্রুতগতিতে সংক্রমণ ঘটাতে হবে সেইসব ছবির। খেয়ালে-বেখেয়ালে, দোলে-দোলে… -এই পলিসিটা আমাকেও অ্যাডপ্ট করতে হবে। অমারাত্রি বলে উঠল। -কেন? তুমিও বই লিখছ নাকি? পিনাকপাণি রিফ্লেক্সে বলে ফেললেন। -স্যার কীভাবে যেন সব বুঝে যান! একটা বড় পাবলিকেশন থেকে অ্যাপ্রোচ করেছে। অমারাত্রি লজা-লজ্জা গলায় জানাল।
-কিন্তু তুমি তাে একলাইন বাংলাও জানাে না!
-ভয় পাবেন না স্যার। আমি তাে শুধু ডিক্টেশন দেব। ইন ইংলিশ। বাকি কাজটা তাে করবে একটা রাইটার আর তারপর বিক্রির দায়িত্ব আমার ফ্যানরাই…
-ওই ওরাই আপনার সংগঠন অমা। ওদের ধরে থাকুন। -ওরা আমাকে ছাড়বে নাকি? শুধু মাঝেমাঝে ওড়না টেনে নেয়… -সংগঠন শক্ত করতে গেলে ওসব হ্যাজার্ডস একটু নিতে হয়। কেবল দেখতে হবে, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা আছে নাকি! মানে আপনার সংগঠন শুধু আপনার কথাই শুনছে তাে!
-আবার আপনি কঠিন, কঠিন…
-কঠিন নয়, অমা, সহজ। এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা ছিল বলেই পাঁচজন পাণ্ডব একশাে কৌরবের সঙ্গে যুদ্ধে জিতে গেল। কারণ, অর্জুনের ছুটকোটকা বাদ দিলে, ওরা পাঁচজন তাে কেবল দ্রৌপদীর কথাই শুনত; আর ওদের প্রতিপক্ষরা একশােটা বউযের কথা শুনতে গিযে…
পিনাকপাণির মনে হল, তিনি পাগল হয়ে যাবেন। আর তখনই দেখলেন, প্রকাশকের তেরােটা মিসডকল, মােবাইলে।
স্টুডিওর ভিতর থেকে ডাক এসে গিয়েছিল। পিনাকপাণি তবু এককোণে সরে গিয়ে ফোন লাগালেন নিজের প্রকাশককে। -আমি আসলে একটা টিভি প্রোগ্রামে…
-রাখুন প্রোগ্রাম। আপনি আমায় কী সমস্যায় ফেলেছেন, কল্পনাও করতে পারবেন না। প্রকাশক থামিয়ে দিলেন পিনাকপাণিকে।
-কী সমস্যায় ফেললাম আবার? -ওরে বাবা, আপনার বই বিক্রি যে হয় না, তা তাে নিজেই দেখে গেছেন। তাই সেদিনের পর ওই বই আর গুদাম থেকে আনিনি আমরা। যে দু’কপি ছিল তার একটা তাে আমার শালার ছেলেকে দিয়ে কেনালাম আর একটা, চুরি-ফুরি হয়ে গেছে বােধহয়।
-এসব আমাকে শােনানাের মানেটা কী?
-শােনাচ্ছি কি সাধে? আজ একটা দিল্লির কোম্পানি এসেছিল, তাদের প্রাইজ দিতে। ওদের প্রাইজের নাম, ‘বেস্টসেলার। আর, ব্রহ্মময়ী ভারার কী খেলা দেখুন, সেই প্রাইজ পাচ্ছেন আপনি। নগদ তিনলাখ টাকা মশাই, ভাবা যায়!
-কিন্তু আমি কীভাবে?
– সেটাই তাে রহস্য। ওরা খুঁজে খুঁজে দেখছিল, এবছরই পাবলিশড অথচ র্যাকে এককপি নেই, এমন বই কোন স্টলে ক’টা আছে? ভা, ভানুমতীর খেল, আপনি ছাড়া তেমন আর কেউই ছিল না গােটা বইমেলায়।
-আমি তার মানে এতটাই হতভাগা?
-হতভাগা? এককপিও যদি রাখতাম তবে জুটত প্রাইজটা আপনার কপালে? রাখিনি বলেই তাে ওদের জিজ্ঞাসার উত্তরে অবলীলায় বলে দিলাম, ‘অল সােল্ড আউট’। ব্যস, দু’ঘণ্টার মধ্যে ঘােষণা। এবছর কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার, ‘বেস্টসেলার প্রাইজ পাচ্ছেন… ফিফটি পার্সেন্ট টাকা তাে আপনার আমাকে দেওয়া উচিৎ মশাই। পিনাকপাণির মনে হল, ওঁর হার্ট অ্যাটাক হবে, এক্ষুনি।
-ও মশাই টাকা চাইছি ভেবে চুপ করে গেলেন নাকি? শুনুন, অত চশমখাের নই। আপনার টাকা আপনারই। কিন্তু ইন্টারনেটে প্রাইজ ঘােষণার পর থেকে ভাে হুজুগে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছে আপনার ওই খাজা, সরি তাজা মালের জন্য। এখন আমি কী করি?
-বেচে দিন। চারশাে কপি তাে ডাঁই হযে আছেই আপনার গুদামে! সরি, তিনশাে আটানব্বই। – সে তাে বেচবই। কিন্তু ফাস্ট এডিশন অল সােল্ড আউট বলার পর, ওই বই ওভাবে বেচলে তাে জেলে যেতে হবে। এখন, প্রত্যেকটা বইয়ের প্রথম প্রকাশ’এর জায়গায়, দ্বিতীয় সংস্করণ সাঁটতে হবে। এবার সবাই বইমেলার জন্য উদ্যাস্ত মাঠে খাটছে; তাহলে কে কাটবে কাগজ? ‘দ্বিতীয় সংস্করণ’ লিখবে কে? গুদামে তাে একা রতনলাল, তা তারও চোখে ছানি… -কিন্তু এসবের আমি কী জানি? -অমন এড়িয়ে গেলে তাে চলবে না মশাই। আমার ছােট্ট সংগঠন। আর আপনিও তাে তার অংশ, বলুন? তাই আমি বলছিলাম কি যে আজকের রাতটা আপনি আমার গুদামেই থাকুন।
, একা নয়, আপনার বউকেও আমি রাজি করিয়ে ফেলছি… তিনলাখ শুনলে বউদি নিশ্চয়ই…
-মানে?
-মানে হাত হাত মিলিযে কাজটা দু’জনে নামিয়ে দিন। আমি টিভি স্টুডিওর সামনে আমার গাড়িটা পাঠিয়ে দিচ্ছি। বউদিকেও চলে আসতে বলছি ওখানে… -আপনি তার চেয়ে একটা গুলি করে মেরে ফেলুন না আমাকে! -বালাই ষাট! আমি এক্ষুনি রতনলালকে দিযে বিরিয়ানি আনাচ্ছি আপনাদের দুজনের জন্য। গুদামে একটা চৌকিও আছে। বিরিয়ানি থেযে, দুজন মিলে পেস্ট করতে করতে ভাবুন না, আজ আবার আপনাদের ফুলশয্যার দ্বিতীয় সংস্করণ! তবে সেই ছবি আবার ফেসবুকে আপলােড করবেন না যেন!