মার্গে অনন্য সম্মান বুলা বিশ্বাস (সর্বোত্তম)
অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার
সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ১০৯
বিষয় – ফেবু লেখক
সেই চোখ
ঐশী এবার সত্যিই খুব ভয় পেয়েছে। মা কেন যে ওই লোকটাকে বাড়িতে আনে, ও বুঝে পায় না। মা বলে ঋজু নাকি মায়ের খুব ভাল বন্ধু। ঐশীর বাবা গত হবার পর ওর মা ফেসবুকে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আর সেখান থেকেই ওনার যত বন্ধুর আমদানি। বান্ধবী নয় কিন্তু। আর তন্মধ্যে এই মানুষটি কীভাবে যেন মায়ের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে। ঐশীর মা বলেছিলেন, ঋজু খুব বড় মাপের লেখক। ও নাকি ঈশিকাকে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। ঐশী চুপ করে থাকে।
প্রথমে বন্ধুত্বটা ফোনাফুনিতে সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু তারপর যে ঐশীর মায়ের কী হলো, মানুষটাকে একেবারে বাড়ির মধ্যে নিয়ে চলে এলেন। এসেই ঐশীর সাথে বন্ধুত্ব করার আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়েছিলো। ঐশী হায়, হ্যালোতেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কারণ লোকটার চোখ এবং মুখ এক বলতো না। ঐশী ওর চোখে আসন্ন এক সর্বনাশকে লক্ষ্য করেছিলো।
এই নিয়ে এগারো দিন ওই লোকটা ওদের বাড়িতে এসেছে। আর যতবারই ওদের বাড়িতে এসেছে, ঐশীর দিকে যখনই তাকিয়েছে, কেমন কুদৃষ্টি তাতে ও লক্ষ্য করতো। কেমন কুনজরে ঋজু ওকে আপাদমস্তক প্রদক্ষিণ করে।
ও ওর মা’কে অনেকবার বলেছে এসব কথা। কিন্তু ওর মা তা বিশ্বাসই করেন না। বলেন, ‘আসলে তুই আমার সুখ সহ্য করতে পারছিস না। সামনের মাসে আমাদের রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হবে। তোর যদি না পোষায়, তুই হস্টেলে থেকে পড়াশুনা কর। কিন্তু ওর নামে আমাকে একটা কথাও বলবি না।’
এরপর থেকে পনের বছরের ঐশী ঋজু সম্পর্কে আর একটা কিছু বলে না। ওর কান্না পায় এই ভেবে যে, দেড় বছরও হয় নি, ওর বাবা মারা গেছেন, তার মধ্যেই ওর মা কী করে এরকম একটা ডিসিশন নিতে পারে। এমন কি ওই বাজে লোকটার জন্য ওর মা ওকেও ছাড়তে পারে, এমনটাইতো আজকে ওকে শুনতে হলো।
ঐশী নিজের মত থাকে। পারতপক্ষে মায়ের সাথে ও কম কথাই বলে। লোকটা ডিভোর্সী। এটাও অবশ্য ওর মা’র কাছ থেকেই শোনা।
সেদিন লোকটার যে খুব বদ মতলব ছিল, সেটা ঐশী বুঝতেই পারে নি। ওরা দুজনে বাড়ি এসেছে। ঐশী ওর দোতলার ঘরে রয়েছে। ও ওর সব কথা ওর বয়ফ্রেন্ড সরোজকে বলে। সরোজ ওকে বলেছে, ‘কোন বিপদে পড়লে আমাকে ফোন করবি। ভয় পাস না। আমি আছি।’ ঐশী ফোনে সরোজের সাথে কথা বলছে।
হঠাৎই ও বাইরের দরজা বন্ধের আওয়াজ পেলো। ব্যালকনি থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখলো, মা ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়েছে।
ঐশী ভেবেছে, ঋজুও বোধ হয় বেরিয়ে পড়েছে। ঐশী নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে নীচে এসে দেখে, ঋজু কোণের চেয়ারটাতে চুপ করে বসে নিজের ফোনে কী সব করছে।
ও একটু আশ্চর্যই হলো। তাহলে ওর মা কোথায় গেলেন। ও নীচে নামতেই, ঋজু ওর দিকে কেমন একটা বিশ্রী দৃষ্টিতে তাকিয়েই, নিজের হাতের মুঠোটা মুষড়াতে লাগলো।
ঐশী একটু ভয় পেয়েই গেলো। যদিও ও ঋজুকে সেটা বুঝতে না দিয়ে, দোতলায় উঠে যাবার চেষ্টা করতেই, ঋজু ওকে পিছন থেকে জাপ্টে ধরে, মুখটা চেপে ধরে, ওর মায়ের বেডরুমে টানতে টানতে নিয়ে এসে, নিজের লোভ লালসার তৃপ্তি ঘটালো।
বাইরে কলিং বেল বেজে উঠতেই, ঋজু ওকে ছেড়ে দিয়ে, ভদ্রতার মুখোশ পড়ে, ওকে ছেড়ে দিয়ে, দরজা খুলে দিলো।
এদিকে ঈশিকার ঘরে তখন বিবস্ত্র অবস্থায়, ঐশী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
ঈশিকা ঋজুর অনুরোধে বাইরে থেকে রুটি আর মাংস কিনে নিয়ে এসেছে। টেবিলে সার্ভ করতে করতে, একবার ‘ঐশী, খেতে এসো,’ বলে ডাক দিয়ে ঋজুকে নিয়ে খেতে বসে গেল। ঐশী নিজেকে খানিকটা ঠিক করে নিয়ে, ধীরেপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে, দোতলায় যাবার জন্য যখন এগিয়েছে, ঈশিকা ঋজুকে জিজ্ঞেস করে, ‘ও আমার ঘরে, তুমি জানতে? আমাকে বলোনিতো?’
ঋজু যেন কিচ্ছুটি জানে না। ও তির্যক ভঙ্গীতে বলে, ‘তোমার মেয়ে তোমার ঘরে কখন এসেছে, কেন এসেছে, সেটা আমি জানবো কী করে? তুমি নেই, হয়তো সেই সুযোগে ওর বয়ফ্রেণ্ডকে নিয়ে ও ফূর্তি করেছে।’
ঐশীর চোখ থেকে তখন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। ও সোজা নীচে আসতেই, ঋজু হাত ধুয়ে প্রায় পালানোর ভঙ্গীতে মেনগেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। ঐশী ওর মা’কে বলে, ‘এরপরেও তুমি ওই লোকটাকে ভালো বলবে? এই দেখো, ও আমার কত বড় সর্বনাশ করেছে।’ যতটুকু দেখানো যায়, খুবলানো, খিমচানো অংশ মা’কে ও দেখাতে থাকে। ঐশী বলে, ‘ এখনওতো বলবে, ও খুব ভালো লোক। ঠিক আছে, আমার জন্য তোমার সুখ নষ্ট কোরো না। আমারটা আমাকে বুঝতে দাও। আমি ওকে ছাড়বো না। আমি থানায় যাবো। আরকোনোদিন ওকে আমি এ বাড়িতে আসতে দেবো না। তোমার ওকে নিয়ে নষ্টামি করতে ইচ্ছে করে, তুমি অন্য কোথাও চলে যাও। আমার বাবার বাড়িতে আমি এসব করতে দেব না।’
ঈশিকা সব বুঝতে পারে। মেয়ের জেদ সম্পর্কে ও বেশ অবহিত। বিষয়টিকে স্বাভাবিক করার জন্য ওর মা ওকে ঠাণ্ডা হতে বলেন। বলেন, ‘তোকে কিছু করতে হবে না। আমি ওর বিরুদ্ধে যা করার করবো।’ ঐশী ওর মা’কে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু ওর মায়ের ওটা যে কথার কথা সেটা তখন ও বুঝতে পারলো, যখন ওর মা ওর হস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
রাতে ঈশিকা মেয়েকে ডেকে বলেন, ‘তোমার জন্য হস্টেল ঠিক করেছি। তুমি ওখানে থেকেই পড়াশুনা করবে। যখন যা দরকার পড়বে, আমায় ফোন কোরো, আমি পৌঁছে দেব। আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকাল আটটায় গাড়ি আসবে। বারুইপুরে যে স্কুলে তুমি পড়বে, সেই হস্টেলেই তুমি থাকবে। খুব ভালো জায়গা, তোমার খুব ভালো লাগবে।’ বলে ঈশিকা নিজের ঘরে চলে গেল।
ঐশী বেশ খানিকটা কেঁদে, সরোজকে সব জানিয়ে, চুপচাপ খাটের উপর কিছুক্ষণ বসে, মনটাকে বেশ শক্ত করে নিল। নিজের মনেই নিজে বললো, ‘এ পৃথিবীতে ও একদম একা। ও আর কাউকে চায় না। এটা বেশ ভালো হলো।’
পরের দিন ঐশী ওর চেনা পরিচিতি জগৎ ছেড়ে হস্টেলে চলে গেল। একবারও ফিরে তাকালো না।