T3 || স্তুতি || শারদ বিশেষ সংখ্যায় বিমান বিশ্বাস

বিবর্তনের বাঁকে দুর্গা পূজা

সময়কে বাঁধতে যেমন পারা যায় না তেমনি বিষয়টি হাওয়ার সমুদ্রে সেতু নির্মাণের মতোই পরাধীন। তবুও তাকে মনের চৌকস ভাবনায় বাঁধতে চাওয়া, যা কখনো সম্ভব নয়। বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের মানসিক আত্মিক উদ্দীপনা সৃষ্টিশীল, মননশীল মনের আমুল পরিবর্তন এসেছে। দুর্গা পুজোর প্রচলন কবে থেকে সে বিতর্কে না গিয়ে শুধু বলি সনাতন ধর্মমতে ক্রেতাযুগে সীতাকে উদ্ধারের জন্য পুরুষোত্তম রাম শক্তির আরাধনা স্বরূপ মা দুর্গার পূজা করেছিলেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই সেই থেকে পুজোর আরম্ভ তাহলে বলবো তা ছিল অকাল বোধন। কারণ সত্যিকার অর্থে দুর্গা পূজা বলতে চৈত্র মাসের বাসন্তী মায়ের পুজোকেই প্রধানত ধরা হয়ে থাকে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিশ্বাসী মানুষ অকাল বোধনকেই দুর্গা পুজো তথা শক্তির আরাধনা করে এসেছে। হতে পারে বসন্তের দাবদাহ, ঝড় প্রকৃতির রোষানল থেকে উৎসবকে সুন্দর করে পালনের স্বার্থে শরতের সাদা মেঘ, স্নিগ্ধ শোভন আকাশের আঁকিবুঁকি, শীতল বাতাসের ছায়া মানুষকে, তার ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে এই অকাল বোধন। তাই মনে হয় যুগের পরিবর্তনের সাথে শক্তির আরাধনা ঢাকা পড়ে গেছে সুবিধার আয়োজনে।

দিন বদলেছে, ভক্তি শ্রদ্ধার জায়গায় আসন পেতেছে রকমারি থিমের ছড়াছড়ি‌। আগেকার দিনে আরাধ্য দেবীকে চোখের জলে বিদায় জানিয়েছে, তাকে সমাদরে গ্ৰহন করেছে মনের মতো করে ভক্তি ভরে। সাবেকি বাড়ির পুজোতে বর্তমানে তার কিছু অবশিষ্ট আছে, বাকি থিমের আড়ালে শুধুই ছলনা আর হুল্লোড়ের নাকানিচুবানি। বারোয়ারী পুজো আজ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুনিপুণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। মানুষ আর রাত জেগে মহিষাসুরমর্দিনী শোনে না, শোনে ডিজে। নির্জলা উপোষের বদলে রকমারি খাবারের স্বাদ পেতে মরিয়া হয়ে ছোটে ভিড়ের মিছিলে।দেখনদারির কারসাজি, আতসবাজির রমরমা, পরিবেশ দূষণ যেমন ঘটাচ্ছে তেমনি আমাদের সনাতনী ইতিহাস, ঐতিহ্য সংস্কৃতি আজ ধুলায় লুন্ঠিত।

তখনকার দিনে পুজো মানেই ছিল ভক্তির পাঠ, আজ তা দেখা যায় কোথায়?রাস্তা ঘাটে প্রাণহীন মাথার ভিড়ে শুধুই ঘামের গন্ধ। ভক্তি হারিয়ে ভোগ বাসা বেঁধেছে রসুই ঘরে, পথের বাঁকে বাঁকে বিরিয়ানি আর রঙিন পানীয়ের রঙিন স্বপ্নে। সনাতনী ইতিহাসে চোখ গুঁজলে আমরা কিন্তু বর্তমানের সাথে কিছুটা মিল পাই। তথাকথিত সুশীল শিক্ষিত ব্রাক্ষণেরা ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতো তাদের সুবিধে মতো, আজও তার ব্যতিক্রম নয়। আধুনিক চিন্তা শক্তির অন্ধ গলিতে হারিয়ে কিছুটা আশার আলো দেখতে পাওয়া গেলেও তা পরিমিত নয়।

তবে যা ঘটছে বা ঘটে চলেছে তার পুরোটাই যে খারাপ তেমনটি কিন্তু নয়। থিম পুজোর প্রচলনে মানুষের কর্ম সংস্থানের পরিধি কিছুটা বেড়েছে। সাথে পুজোর সাথে জড়িত অন্যান্য মাধ্যমও তার সুফল পাচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে মন্ডপে,তার সাজসজ্জায়, মায়ের এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের। ফলত আর্থিক উন্নতির সাথে মানুষের চিন্তা চেতনার উন্মেষ ঘটেছে যেমন, তেমনি বিকার মানসিকতা, আন্তরিকতার অভাব তথা শক্তির আরাধনার চেয়ে দেখনদারী হৃদয় গোচর করেছে চেতনাহীন জড় মানুষের।

শেষে বলি এর থেকে কি মুক্তির উপায় নেই। আমি বলবো নিশ্চয়ই আছে।তার জন্য চাই সঠিক দিশায় নিজেকে বাঁধতে শেখা। আধুনিকতার জোয়ারে ভেসে না গিয়ে সাবেকিয়ানাকে আঁকড়ে (ভীরুতাকে নয়)ধরে সঠিক পথের সন্ধান করা। অতীত এবং বর্তমানের সঠিক মেলবন্ধন ঘটানো যাতে করে সমাজের সামনে দৃশ্যমান হয় অতীত সংস্কৃতিকে আজও ধরে রেখেছে শ্যাওলা পড়া মনের উঠোন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।