ধারাবাহিক গল্পে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১)

বেস্টসেলার

লাইভ টক শো’ শুরু হওয়ার ঠিক আগে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সমরাদিত্য বটব্যাল বলে উঠলেন, হাওয়া ওঠে, হাওয়া নেমেও যায়। তাতে এক-আধটা জায়গায় পাশা পাল্টাতে পারে কিন্তু হাওয়ার জোরে কিস্তিমাত হয় না। তার জন্য অন্য জিনিষ চাই।
– আপনার লিপ-বাম লাগবে? ছোট্ট আয়নাটা ভ্যানিটি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে সিরিয়ালের ব্যস্ত নায়িকা অমারাত্রি জিজ্ঞেস করল।
প্রশ্নটা কাকে ঠিক বুঝতে না পারলেও সমরাদিত্য হাত বাড়িয়ে বললেন, শীতের মরসুমে ঠোঁট তো ফাটেই, কিন্তু মনে রাখবেন, কপাল ফাটে সংগঠন না থাকলে।
– সংগঠন মানে? অমারাত্রি জানতে চাইল।
ক্ষুব্ধ লেখক পিনাকপাণি সেনগুপ্ত অসম্ভব ধিক্কারের সঙ্গে স্মরণ করলেন যে দুবছর আগে এই মেয়েটিই তাঁর কোচিঙে ছাত্রী ছিল। ভাগ্যিস এখন একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার সমাজসেবী হওয়ার স্বপ্ন দেখে ফেলায় তিনি পাতার পর পাতা বক্তৃতা লেখার কাজ পেয়েছেন নয়তো এইসব মাথামোটাদের শিক্ষক হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়ায় লজ্জার।
– ও স্যার আপনিই বলে দিন না। অমারাত্রি পিনাকপাণির দিকে ফিরল।
– সংগঠন মানে সেই আঁকশি যা দিয়ে আপনি গাছ থেকে ফলটা পেড়ে খেতে পারেন। এবার গাছে আম আছে এবং আপনার খাওয়ার ইচ্ছেও আছে কিন্তু হাতে আঁকশি না থাকলে কী করবেন আপনি? সমরাদিত্য চোখ নাচালেন।
– কী আবার করব, গাছে চড়ে বসব! আমি কিন্তু পারি! অমারাত্রি হেসে উঠল।
– তোমার মত বাঁদরের ওই কাজটা না-পারাটাই অস্বাভাবিক হত। মুখ ফসকে বলে ফেললেন পিনাকপাণি।
অমারাত্রি একটুও রাগ করল না, স্যার যে কি বলেন!
– ভুলভাল কথা না বললে, আজ ওনার এই অবস্থা হবে কেন? সমরাদিত্য বিরক্তি আর করুণা মেশানো একটা গলায় বললেন।
– আমার অবস্থা আপনি কিভাবে জানেন?পিনাকপাণি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন।
– আমি একা কেন, সবাই জানে; তিনদিন আগেই বইমেলায় মুস্তাফি অ্যান্ড গ্র‍্যান্ডসন্স’এর দোকানে কী ঘটেছিল সেটা মনে আছে না ভুলে মেরে দিয়েছেন?
– আমাদের প্রোগ্রামটা কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাব, সে বিষয়ে কথা বলা জরুরি ছিল…..
– আরে তার সময় আছে, পিনাকবাবু। কিন্তু সেদিনের কথা যা বলছিলাম…. স্টলের ভিতর হঠাৎ করে ঘোষণা, ‘লেখক পিনাকপাণি সেনগুপ্ত আমাদের মধ্যে উপস্থিত,আপনারা যারা লেখকের অটোগ্রাফ পেতে চান তারা ওঁর বই কিনে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়ান।’
– বাব্বা, ওই অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য ভিড় কীরকম হামলে পড়ে আমার জানা আছে। সেবার বগুলায় অটোগ্রাফ না পেয়ে আমার ওড়নাটা টান দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, কারা যেন। পরে শুনেছিলাম, সেটার অনেক টুকরো হয়েছে। সব ফ্যান একটা করে টুকরো নিয়ে গেছে।
– কিন্তু পিনাকবাবুর বই একটি টুকরোও হয়নি, অমা। কোনও হুড়োহুড়ি তো দূর, একটা লোকও বই নিয়ে এগিয়ে আসেনি সই করাতে।
– কী আজেবাজে বকছেন? সেই যে সৌম্যকান্তি বালকটি….
– আরে সে তো প্রকাশকের শালার ছেলে, ক্লাস এইটে পড়ে; একজনও বই কিনল না দেখে, প্রকাশক চক্ষুলজ্জার খাতিরে ওই বাচ্চাটাকে দিয়েই এককপি…. কিন্তু পরেরবার আপনার বই আর ওরা করবেন না।
– আপনি এতসব জানলেন কি করে?
– আহা, ওরা যে আমার ‘ভোটের লাট্টু;জাল্লিকাট্টু’ ছাপছে, এই পয়লা বৈশাখেই।
– আচ্ছা, দেখব সেই বই ক’খানা কাটে।
– কাটবে মানে? বেস্টসেলার হবে পিনাকবাবু। মিলিয়ে নেবেন।
– কিন্তু স্যার কি এতই খাজা লেখেন নাকি? আমাকে সেই ক্লাস ইলেভেনে কী সুন্দর করে লিখিয়ে দিয়েছিলেন, ‘যৌন-সভ্যতা বিজ্ঞানের অভিশাপ না আশীর্বাদ’।
– কী লিখিয়েছিলাম? পিনাকপাণি গর্জে উঠলেন।
– ওহ, সরি-সরি। ‘যন্ত্রসভ্যতা’ হবে। আসলে দুটোই এত কঠিন শব্দ…
– সহজ হোক বা কঠিন, দুটোই খুব কাছাকাছি শব্দ, অমা। দুটো ব্যবহার করেই মানুষ নিজের কামনা চরিতার্থ করে, মানে বাংলায় যাকে বলে ‘ডিজায়ার ফুলফিল করে’।
– বই বিক্রির সঙ্গে তার কী সম্পর্ক? পিনাকপাণি খচে গেলেন।
– আছে মশাই, আছে। নাটবল্টু মজবুত না হলে যন্ত্র চলে না, সংগঠন পোক্ত না হলে বইও চলে না। আপনার সংগঠন কোথায় যে বই বিক্রি হবে?
– ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে কিন্তু। অমারাত্রি হাই তুলল একটা।
– কিছুই বুঝতে পারছি না। পিনাকপাণি মুখ ঘুরিয়ে হাঁচলেন একটা।
– দেখুন, ভোট থাকলেই যেমন হয় না, সেই ভোটকে বুথ অবধি, মায় ইভিএম’এর বোতাম অবধি নিয়ে যেতে হয় প্রার্থীকে, পাঠক থাকলেই তেমন হয় না, সেই পাঠককে ক্যাশ-কাউন্টার অবধি নিয়ে যেতে হয় লেখককেই। সমরাদিত্য মুচকি হাসলেন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।