এক মাসের গপ্পে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১)

এক অভিনেতার ডায়েরি এবং – ১
রবীন্দ্রনাথ আজ জন্মালে পরে খেতে পেতেন? রবীন্দ্রনাথের কথা তোলা বোধহয় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, তাই বলছি, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ যুগের হলে কতটা কী করতে পারতেন? জানি, এই প্রশ্নটা শুনলে পরে ডোরা তৎক্ষণাৎ জিজ্ঞেস করত, রবীন্দ্রনাথ থেকে একলাফে সৌমিত্র? উত্তরে আমি হয়তো বলতাম, টাইম মেশিনে তো পেট্রল লাগে না, অতএব যেখান থেকে, যখন খুশি, যেখানে খুশি চলে যাওয়া যায় | কিংবা কে জানে, হয়তো কিছুই বলতাম না | নিজেকে যতটা চিনি তাতে দ্বিতীয়টাই হত খুব সম্ভবত | আর আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ডোরা জিজ্ঞেস করত, কী হল, এয়ার নিচ্ছিস আমার ওপর নাকি সংলাপ মুখস্থ হচ্ছে?
ওই সংলাপই কাল হল আমার | ছোটবেলায় রজতবাবুর কাছে আবৃত্তি শিখতে যেতাম আর ছোটবেলা হলে যেটা হয়, যে কোনও জিনিস খুব গেঁথে যায় মনে | আমারও ওই গলা ওঠানো, গলা নামানো, ছোট ছোট খাঁজে অল্প অল্প ভাঁজ মানে, গোদা বাংলায় যাকে বলে ভয়েস মডুলেশন খুব পছন্দ হয়ে গেল | দিন নেই, রাত নেই, আমি গলায় শব্দ বসিয়ে খেলতে শুরু করলাম, আমার বয়সি বাচ্চারা যেভাবে হাতের পাতায় লাট্টু বসিয়ে খেলত | আর খেলাটা কখন যেন নেশায় বদলে গেল |
ওই নেশার ঘোরেই ছোট থেকে বড় হলাম আর হতে হতে বুঝলাম, আর সবকিছু ছাড়লেও নেশাটা ছাড়া যাবে না | কিন্তু আবৃত্তিকার হয়ে থাকতেও আমার মন চাইছিল না | কারণটা চুপি চুপি বলি, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়না বেশ একটা সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত আমার দিকে | তখন টিনএজার, আয়নার তারিফ আমার ভিতরের সব স্বপ্নের সলতে পাকানো শুরু করে দিল। আর আমি সেই জোয়ারে ভাসতে ভাসতে শোভাবাজার, আহিরিটোলা, বাগবাজার ঘাট পেরিয়ে কোথায় কত দূরে যে চলে যেতাম, বাস্তবের ভাটায় ফিরতে সময় লাগত অনেক | এইভাবে যাওয়া-আসা করতে করতে মনের মধ্যে বুজগুড়ি কাটত একটাই উচ্চাশা , নেশাটাকে পেশায় বদলে নেওয়া যায় না ? নিজের স্বপ্ন সফল করার চেষ্টায় সব মানুষই সাধ্যমতো করে, মুখে বলুক আর না বলুক | আমিও করা শুরু করলাম কিন্তু আমার ক্ষেত্রে অচিরাৎ ফল ফলল না |
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এর মতো আমার কোনও বন্ধু আমার জন্য ‘ব্রেক’ নিয়ে আসেনি, আপনা হাত জগন্নাথ, যে সমস্ত ফোটো (পাড়ার স্টুডিয়োতে তোলা) জমা দিয়ে এসেছিলাম টেকনিশিয়ান্স, ইন্দ্রপুরীতে – তাদের মধ্যেই একটা একদিন কোনও অ্যাসিস্টান্ট ডিরেক্টরের চোখে পড়ল, আর আমি একটা ফোন পেয়ে হাজির হলাম স্টুডিয়োপাড়ায় | রোলটা ছিল চার মিনিটের কিন্তু পার্ট-ফার্ট শেষ করে, নগদ আড়াইশো টাকা হাতে আর ঠোঁটে উইলস ফিল্টার নিয়ে যখন দাঁড়িয়ে আছি স্টুডিয়োর গেটের সামনে, তখনই ঘটনাটা ঘটল |
আমার কলেজের বন্ধু মলয় রাস্তা ক্রস করতে গিয়ে আমায় দেখতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল | কীভাবে, কে জানে, ওর মনে ধারণা জন্মে গিয়েছিল যে স্টুডিয়োর বাইরের গেটে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছি মানেই আমার বিরাট স্টার হওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা | আমি ওকে অল্প কিছুক্ষণ বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলাম | কিন্তু মলয়ের অতিশয়োক্তি আর অঢেল প্রশংসা নিতে পারছিলাম না | তাই ওকে নিরস্ত করব বলেই স্টুডিয়োর ভিতর বসে পানপরাগ চিবোনো মাড়োয়ারি প্রোডিউসারকে নকল করে দেখাতে শুরু করলাম | মলয় দেখছিল কি দেখছিল না খেয়াল করিনি কিন্তু মিমিক্রি করতে করতেই টের পেলাম যে সামান্য দূর থেকে অন্য একজন আমায় খেয়াল করছেন | তখন এমন মাঝদরিয়ায় যে নিজেকে থামানোর উপায় নেই, এদিকে শিরশিরানি একটা ভয়ও উঠে আসছে মেরুদণ্ড বেয়ে | কিন্তু সেই ভয়ের পাশাপাশি ঠিকঠাক একটা জিনিস করতে পারার উত্তেজনাও সেই প্রথম টের পেয়েছিলাম | ওটাকেই কি শিল্পের সঙ্গে শিল্পীর সংযোগ বলে ? যাক গে, এসব ভারী ভারী কথা না বলাই শ্রেয়, যা হয়েছিল সেটাই বরং বলি | আমার নকলনবিশি শেষ হতেই আমি একটা হাততালির শব্দ শুনলাম এবং একটু আগে যিনি বন্ধুর সিরিয়ালে আমার অভিনয় দেখে, ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ কিছুই বলেননি, সেই পরিচালক শোভন সরখেল আমার সামনে এসে বললেন, তুমি তো ছুপা রুস্তম হে! পেটে পেটে এত ট্যালেন্ট লুকিয়ে রেখেছ, ডিক্লেয়ার না করলে ইনকাম ট্যাক্সের লোকরা এসে ধরবে তো।
কী বলব বুঝতে না পেরে তোতলাতে তোতলাতে বললাম, মানে এমনিই একটু এন্টারটেইন করব বলে…
শোভন সরখেল এক দাবড়ানি দিয়ে বললেন, তোতলাচ্ছ কেন, আমি কি তোমার ওই আড়াইশো টাকা কেড়ে নেব নাকি?
আমি আবার বললাম, না মানে …
– কোনও মানে-ফানে নেই | তোমায় আমি আমার নেক্সট টেলিফিল্মে নায়কের রোলটা দেব | করবে ?
হাতে চাঁদ দিয়ে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, নেব কি না, কী বলবে মানুষ তখন? এমন কিছু যে ঘটতে পারে, আমি কি এক মুহূর্ত আগেও আশা করেছি? এখন যখন ঘটছে তখন নার্ভাস লাগবে না?
চুপ করে আছি, শোভনদা আবার জিজ্ঞেস করলেন, করবে ?
মলয় বলে উঠল, আপনি চান্স দিচ্ছেন আর ও করবে না, এ কখনও হতে পারে ?
শোভনদা গলা তুলে বললেন, আলবাত হতে পারে, একশোবার হতে পারে | শিল্পীর সম্মান তার জীবন কিংবা মৃত্যুর চাইতে বড় | শিল্পী কারও চাকর নয় যে বলামাত্র তাকে যে কোনও প্রস্তাবে রাজি হতে হবে |
– কিন্তু আপনি বলছেন … আমি বলে উঠলাম |
– আমি কে ? ফেলিনি না গোদার? নাকি ঋত্বিক ? শোভনদা একটা সিগারেট ধরালেন , আর যদি ওদের মতো কেউ হইও তবু তুমি তো তুমি | তোমার গ্রহণ-বর্জনের স্বাধীনতা থাকবে না ? পরশু দিন বেলা সাড়ে এগারোটায় এখানেই আমার সঙ্গে দেখা করবে আর তার আগে একদম ফোন করবে না |
আমি হেসে ফেললাম আর মলয় বলে উঠল, স্টার হয়ে গেলি, তুই আজ থেকে স্টার হয়ে গেলি |
শোভনদা এক পা এগিয়ে গিয়েছিলেন, কথাটা শুনে পিছিয়ে এসে আগুন চোখে মলয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, স্টার নয় শিল্পী | অভিনেতা | স্ক্রিপ্ট দেখে পছন্দ না হলে যার প্রত্যাখ্যান করবার হক আছে, ছুড়ে ফেলে দেবার অধিকার আছে |
সেদিন মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম শোভনদার কথা শুনে, ছাতি ফুলে উঠেছিল গর্বে | মনে হয়েছিল শিল্পের পথ মোড়ে মোড়ে তোরণ তৈরী করে স্বাগত জানাচ্ছে আমায়, আমি এগিয়ে গেলেই পুষ্পবৃষ্টি হবে আমার মাথার ওপর, চন্দনের সুগন্ধ সৃষ্টি হবে আমারই শরীর থেকে |
আচ্ছা, মদের গন্ধকে কি সুগন্ধ বলা চলে ? জানি না কিন্তু সেদিন মলয়ের প্রতি একটা অসম্ভব কৃতজ্ঞতা জন্ম নিয়েছিল।|বলে ওর প্রস্তাব আমি ফেলতে পারিনি। ওর সঙ্গে একটু নেশা করতে একটা বারে ঢুকে পড়েছিলাম। আর ঢুকতে ঢুকতে বলেছিলাম, কী মনে হচ্ছে জানিস, আমার সাফল্য যেন তুই হাতে করে বয়ে নিয়ে এসেছিস, আমার মাথায় মুকুটের মতো পরিয়ে দিবি বলে ।
উত্তরে অনেক কথা বলেছিল মলয় আর আমি প্রায় প্রত্যেকটাই বিশ্বাস করছিলাম। ইচ্ছে করছিল বিশ্বাস করতে। আরে শরীরে না থাক, মদে না থাক, বিশ্বাসের গায়ে যে সুগন্ধ আছে সে কথা কে না জানে ?
কিন্তু মাস দেড়েক পরে সত্যি সত্যিই যখন সেই টেলিফিল্মের শুটিং শুরু হল, আমার মনে হল আমি যেন সেরকম একটা শহরে ঢুকে পড়েছি যেখানে নিঃশ্বাস নেওয়ার মানে দিনে কুড়িটা করে সিগারেট খাওয়া | প্রথমেই দেখলাম যে আমার চরিত্রটা নায়কের নয় | আসলে ওটা এমনই একটা টেলিফিল্ম যেখানে গল্পই নায়ক | অন্যভাবে বলতে গেলে ওটা একটা নায়িকাপ্রধান কাহিনি | সে যাক গে, চার মিনিটের রোল থেকে যখন চল্লিশ মিনিটের রোলে এসে পৌঁছতে পেরেছি তখন ও সমস্ত নিয়ে না ভাবাই উচিত | আমিও ভাবনাচিন্তা মুলতুবি রেখে কনসেনট্রেট করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু শোভনদা অকারণে খারাপ ব্যবহার করছিলেন আমার সঙ্গে | ফ্লোরের একদিকে প্লাস্টিক চেয়ারে বসে থাকা এক ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে বললেন, একে আবার নকল-টকল করতে যেয়ো না যেন | মাঝপথেই শুটিং বন্ধ হয়ে যাবে | আমি থতমত খেয়ে চুপ করে রইলাম, বয়সের আগে বুড়িয়ে যাওয়া সেই ভদ্রমহিলাও কিছু বুঝতে না পারা চোখে তাকালেন এদিক-ওদিক | একটু পরেই জেনেছিলাম উনিই প্রযোজিকা এই টেলিফিল্মের | কিন্তু বুঝিনি কেন ওঁর সামনে শোভনদা মাঝেমধ্যেই আংসাং কথা বলছিলেন আমাকে | হতে পারে যে ওই রোলটা আমাকে দেওয়ার জন্য শোভনদাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল, এও হতে পারে যে একটা নতুন কিছু তৈরির সময় পরিচালকের মনে যে টেনশন থাকে, তার ছুটকো-ছাটকা এদিক-ওদিক উড়ে আসে | বললে, আত্মপ্রশংসার মতো শোনাবে কি না জানি না কিন্তু ঘটনা হল সেইসব উল্কা, ধূমকেতু আমি ভালই হ্যান্ডল করছিলাম | এবং অভিনয়টাও করার চেষ্টা করছিলাম মন, প্রাণ, শরীর, সবকিছু নিংড়ে | হাজার হোক, প্রথম সুযোগ, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, ওটা যে সুযোগ, ওটা যে আমি নাও পেতে পারতাম, দৈবাৎ পেয়ে গেছি, কাজ করতে করতে সে কথা মন থেকে মুছে গিয়েছিল একদম | মনে হচ্ছিল, এ তো আমার চরিত্র, আমার ভূমিকা, আমি ছাড়া আর কেউ সুবিচার করতে পারত না এই পার্টটার প্রতি | একেই কি ইগো বলে ? বলে, অহঙ্কার ? যা পতনের মূল ?
ডোরা প্রতিবাদ করে উঠত, এই জায়গাটায় | ডোরা আমার প্রথম টেলিফিল্মের সহকর্মী | কিন্তু তিন দিন শুটিং-এর পরই আমার মনে হয়েছিল ও কলিগ কম, বন্ধু বেশি | এই বন্ধুত্ব কি প্রেম ? মোটেও নয়, অন্তত তখনও নয় | তা হলে, আকর্ষণ ? ডোরাকে যাঁরা চেনেন তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন দেখলে পরেই প্রবলভাবে আকর্ষিত হওয়ার মতো চেহারা ডোরার নয় | মাঝারি উচ্চতা, শ্যামলা রং, গালে ব্রণর দাগ – আমি মেক-আপ ছাড়া প্রথম দিন ওকে দেখে হতাশ হয়েছিলাম | এই মেয়েটা নায়িকার রোল করবে ? মানাবে একে?
ক্যামেরার সামনে সেই ডোরাকে দেখেই চমকে গিয়েছিলাম | মনে হয়েছিল, অন্ধকার একটা গাছের ডালে-ডালে, পাতায়-পাতায় কে যেন টুনি বাল্ব লাগিয়ে দিয়ে গেছে | আর ‘অ্যাকশন’ শোনামাত্রই সবকটা টুনি জ্বলে উঠছে একসঙ্গে | গা ছমছমে পরিবেশটা মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে উৎসবের পরিবেশে | আমি একা নই, ফ্লোরে উপস্থিত সবাই টের পেত একটা বদল ঘটে যাচ্ছে ভিতরে ভিতরে; একটা সাধারণ চেহারার মেয়ে অসাধারণ হয়ে উঠেছে লাইট আর সাউন্ডকে হাতিয়ার করে | দখল নিয়ে নিয়েছে পুরো সিচুয়েশনটার | আর তার সঙ্গে যারা কাজ করছে তারা নেহাতই বোড়ে, কেউ কেউ ঘোড়া বা গজ | কিন্তু সে যেন মন্ত্রী | সোজাসুজি, কোনাকুনি যত ঘর ইচ্ছে, যতবার ইচ্ছে, অবাধে বিচরণ করতে পারে আর নিজেকে করে তুলতে পারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু |
আর এখান থেকেই ডোরার প্রতি একটা মুগ্ধতা তৈরি হল আমার | অথচ ডোরা সেই মুগ্ধতা ভাঙতে শুরু করল দ্বিতীয় বা তৃতীয় আলাপেই | আর তখনই আমার মনে হতে শুরু করল যে ডোরা হয়ত মাটির মানুষ | উল্টোদিকে আমি নিজেই একটা অহংকারের স্তূপ, একটা ইগোর বান্ডিল |
– মোটেই না, মোটেই না | বলে উঠত ডোরা |
– কিন্তু তুমি যেরকম সহজে মিলেমিশে যাও সবার সঙ্গে, আমি তো পারি না কই ? আমি জিজ্ঞেস করতাম |
– সেটা তুমি আমার মতো নও বলে | তুমি ইন্ট্রোভার্ট বলে |
– আর তুমি এক্সট্রোভার্ট ? আমি ডোরার দিকে অপলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতাম।
– আমি কিচ্ছু নই, কিচ্ছু না | সাপ নই, ব্যাং নই, নই আমি কিচ্ছু। ডোরা হো হো করে হেসে উঠল আমার কথার উত্তরে । তারপর চোখ নাচাল আমার দিকে তাকিয়ে।
– ধ্যাত, ইয়ার্কি মারছ তুমি |
– সত্যি বলছি, মা কসম | অভিনয় যে করে তার কিচ্ছু হতে নেই, কিচ্ছু হওয়া চলে না | সে এই সাধু তো এই লম্পট; এই পতিব্রতা তো ওই বেশ্যা; পলকে স্থিতি, পলকে লয় | মুহূর্তে ইয়েস, আবার মুহূর্তে , নো; তুমি বলো, অভিনেতা-অভিনেত্রীর কিছু হওয়া সাজে ? তাদের জলের মতো হয়ে থাকতে হয়, যখন যে পাত্র পাবে, তার আকার নেবে |
– যখন যেমন রোল পাব সেই রোলে আমার আমিকে মিশিয়ে দেব, তাই তো ? আমি যেন ডোরাকে মাস্টার পেয়েছি, এভাবে জানতে চাইলাম।
– মিশিয়ে দেবে না, মিশিয়ে দিলে তো তুমি থেকে গেলে চরিত্রটার ভিতরে | তুমি নিজেকে বিসর্জন দেবে |
– তা কী করে হয় ? আমিই তো করছি অভিনয়টা ?
– তুমিই করবে | কিন্তু কীভাবে করতে হবে বলো তো ? খোসা যেভাবে ফলটাকে ধরে রাখে ঠিক সেভাবে তোমার চেহারা, এক্সপ্রেশন, ডায়ালগ থ্রোয়িং — ক্যারেক্টারটাকে ধরে রাখবে | যখন লোকে তোমার অভিনয়ের রস আস্বাদন করবে তখন ‘তুমি’ লোকটাকে খোসার মতো ছুড়ে ফেলে দেবে বাইরে, কোথায় পড়ল তাকিয়েও দেখবে না |
– স্ট্রেঞ্জ ! এভাবে ভেবে দেখিনি তো কখনও |
– ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো |’ ঋত্বিক বেঁচে থাকলে বলতেন | ডোরা আবারও হেসে উঠল |
আমি ওর হাসিতে যোগ না দিয়ে চুপ করে রইলাম | মাথার মধ্যে তখন অনেকগুলো ভাবনা একটা মিক্সির ভিতরে ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে।
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ডোরা বলল, অত ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, ব্যাপারটা আদতে সহজ | তুমিই ভাবো না, ‘পথের পাঁচালি’ কিংবা ‘রশোমন’-এর অভিনেতাদের নাম আমরা মনে রাখি ? আমরা মনে রাখি অভিনীত চরিত্রদের | কিন্তু টলিউডে এরকম কটা উদাহরণ তুমি পাবে হে ? আর তা ছাড়া উদাহরণ দেখলেই যে তা ফলো করতে হবে, এমন কোনও কথা নেই কারণ শেষ অবধি এই রাস্তাটা সাকসেসের রাস্তা নয় |
– এটা আবার কী বলছ ? মন্ত্রমুগ্ধ ছাত্র থেকে কনফিউজড শ্রোতায় রূপান্তরিত হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
– ঠিকই বলছি | সাকসেস তখন আসে যখন নায়ক রিক্সাওয়ালার পার্ট করলেও সে নায়ক আর নায়িকা বাসন মাজলেও সে নায়িকা | চরিত্রের চেয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রী বড় না হলে সাফল্য আসবে কী করে ? অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, মাধুরী – সব একই ইতিহাস | এমনকি উত্তমকুমারের বেলাতেও এই কথাটা সত্যি। ওদের টানে যে লোকগুলো হলে ছুটে গেছে বা যায় তারা ওদের দেখতেই যায়। ওদের অভিনীত চরিত্রগুলো সেখানে গৌণ।
– উফ, আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে তোমার উল্টো কথা শুনে |
– উল্টো কথাটাই তো কথা | সোজা কথা তো জাস্ট আ স্টেটমেন্ট। ডোরা হেসে উঠল আবার।
ওর কথার মধ্যেই শোভনদা আমাদের সামনে চলে এসে তুমুল বকা লাগালেন, এটা কী হচ্ছে ডোরা? নতুন ছেলেটার মাথা খাচ্ছ কেন তোমার তত্ত্বকথা শুনিয়ে ? এরপর ও ক্যামেরার সামনে সবকিছু গুলিয়ে ফেলবে তখন প্রোডিউসারের জুতো-লাথি কে খাবে শুনি ? তুমি ?
ডোরা একটা অদ্ভুত মুখভঙ্গি করল তারপর শান্ত মেয়ের মতো, আমার সামনে থেকে উঠে চলে গেল, শোভনদার কথা শেষ হতেই। সেই উঠে যাওয়ার ভঙ্গিতে আমি একসঙ্গে সোজা আর উল্টো দুটো দিকই দেখতে পেলাম | ভাবটা এমন হতে পারে যে ‘ক্ষমা করে দিন শোভনদা, আমিই সব কিছুর জন্য দায়ী |’ আবার ভাবটা এমনও হতে পারে যে, ‘আমি তো আমার কথা বলবই, যার ইচ্ছে করবে না শুনবে না; কিন্তু কেউ যদি শোনে তো আমি কী করব ?’
শুটিং চলছিল, চলতে থাকল, একসময় শেষও হল | যদিও টেলিফিল্ম আজ দেখালে লোকে কাল ভুলে যায় তবু আমার প্রথম টেলিফিল্মের খ্যাতি হল, চ্যানেলে অনেক দর্শকের অনুরোধ আসায় রিপিট টেলিকাস্টও হল বার দুয়েক | আর সবচেয়ে বড় কথা , অভিনেতা হিসেবে অল্পস্বল্প নাম হল | আমি স্টার হয়ে গেলাম না কিন্তু আমার অজান্তেই একটা পরিচিতি তৈরি হল আমার | জোকা, পৈলান পেরিয়ে বিষ্ণুপুরের আমতলার বাড়ি ছেড়ে আমি কুঁদঘাটের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে ভাড়া চলে এলাম | নানুবাবুর বাজারে রিক্সা থেকে নামলে বা অটোয় উঠলে লোকে টুকটাক চিনতে শুরু করল আর তখনই উত্তমকুমারের সেই অমোঘ উপদেশের কথা বারবার করে মনে পড়তে লাগল , অভিনেতাকে ওভার এক্সপোজড হতে নেই | যদিও মহানায়ক সেই কথা বলেছিলেন , শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে নিজের গাড়িতে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পেট্রোল ভরাতে দেখে, তবু আমার কেন জানি মনে হতে লাগল সে কথাটা আমার ক্ষেত্রেও খাটে | শুভেন্দু সেই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক আর আমি নেহাত চুনোপুঁটি; টেলিফিল্ম আর সিরিয়ালে কাজ করছি, তাও কেন যে মনে হতে লাগল, গাড়ি দরকার, আমারও একটা গাড়ি দরকার …
রবীন্দ্রনাথ এখন কী করতে পারতেন, সৌমিত্র হিরো হতে পারতেন কি না, এই জাতীয় বেয়াড়া প্রশ্নের উত্তর না দিক, জীবনের সঙ্গে জড়িত প্রশ্নের উত্তর মন ঠিকই দেয় | আর দেয় বলেই আমি জানলাম যে আমার মাথার মধ্যে ওই উল্টো-সোজার কারসাজি যার জন্য শুরু হয়েছে, তার নাম ডোরা | সে পলকে বলবে, আত্মবিলোপ করো, হয়ে ওঠো নিজের অভিনীত চরিত্রটাই; পরমুহূর্তেই বলবে, এখানে এসব করে কী লাভ ? তার চেয়ে নিজের কিছু ম্যানারিজম তৈরি করো যাতে লোকে ছোট বা বড় পর্দায় তোমাকে দেখলেই চিনতে পারে |
– কেন কন্ট্রাডিক্ট করো নিজেকে ? আমি জিজ্ঞেস করলাম ।
– কেন রাম বললে রাবণটাও বলি, যুক্তি দিলে পরক্ষণেই হাজির করি তার পাল্টা যুক্তি ? কেন ? ডোরা পালটা প্রশ্ন করল।
সেদিন আমরা বসেছিলাম একটা নির্জন রেস্তরাঁয় | বিরাট হাই-ফাই কিছু নয় কিন্তু ভীষণ আরামদায়ক | এলিয়ে বসার মতো সোফা, দেওয়ালে আলো-আঁধারির কাটাকুটি, ব্যাকগ্রাউন্ডে লাইট ক্লাসিকাল, মনটাকে চুরমুরের মতো দেখে একটা অন্যরকম কিছু করছিল |
স্যুপে ফুঁ দিয়ে ঠিক তখনই ডোরা আমায় ‘তুই’ বলে বলল, আমায় ট্রিট দিচ্ছিস কেন ?
– কারণটা তুমি, মানে তুই জানিস, আমি একটা বড় ব্যানারের সিনেমায় সেকেন্ড লিড করার চান্স পেয়েছি | যে রোলটা পাওয়ার জন্য অনেকে অনেক কসরত করছিল, একেবারে কিচ্ছু না করে, আই মিন, কোনও পি আর না করে সেই রোলটা আমি পেয়েছি | আর পেয়েছি বলেই …
– তোর মনে হচ্ছে যে এই রোলটা পাওয়ার পিছনে নিশ্চয়ই ডোরার হাত আছে কারণ ডোরা নিজেও এই ছবিটায় আছে; তাই তোর কৃতজ্ঞতাবোধ তোকে বলছে যে ডোরাকে একটা ট্রিট দেওয়া উচিত | ব্যাপারটা এই তো? ডোরা স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল।
আমার কী মনে হল আমি বলতে পারব না, শুধু বলতে পারি মাথার ভিতর রক্ত এমন ঝনরঝন নেচে উঠল যে আমি অগ্রপশ্চাৎ, সোজা-উল্টো সব ভুলে গিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা ডোরার মুখটা ওর ঘাড়ের পিছনে হাত দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়ে একটা চুমু খেলাম ওর ঠোঁটে | তারপর আবার একটা | একটু বেশি সময় ধরে | আমাদের টেবিলটা রেস্তরাঁর একটু কোণের দিকে বলে কেউ খেয়াল করল না ব্যাপারটা | কিংবা হয়তো করল | কে জানে ! আমার মাথায়, মনে তখন ডোরা ছাড়া আর কিছু নেই |
ডোরা কথা পড়তে না পড়তেই জবাব দেওয়ার স্বভাবটা ভুলে চুপ করে বসে ছিল মাথা নামিয়ে | একজন ওয়েটার অর্ডার নিতে এসে, কে জানে কী মনে করে, কোনও কথা না বলে সামনে থেকে চলে গেল | আমি উত্তেজনা আর আনন্দে ছটফট করতে করতে হঠাৎ করে শান্ত হয়ে গেলাম | দিনের আলোয় কিচিরমিচির করতে থাকা পাখিরা যেরকম সূর্য ডুবে গেলে হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়…
– কেন এরকম করলি ? ডোরা মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল বেশ কিছুক্ষণ পর।
– আমি জানি না ডোরা, বলতে পারব না |
– তোকে বলতেই হবে |
– তা হলে এটুকু বলতে পারি, তোকে আমি ভালোবাসি | আমি সারেন্ডার করলাম |
– খুব ক্লিশে , খুব একঘেয়ে শোনাচ্ছে।
– শোনাক, আমি তো রবীন্দ্রনাথ নই |
– তুই সৌমিত্রও নোস | কিন্তু নিজেকে ভাবিস বোধহয়? ডোরা হালকা হাসল |
– মোটেই ভাবি না | আমি সাধারণ, তুচ্ছ কিন্তু …
– অত অ্যাডজেকটিভ দিতে হবে না | তার চেয়ে যে এক্সপ্রেশনটা দিচ্ছিস এখন সেটা মনে করে রাখ, এটাই ক্যামেরার সামনে দিতে হবে |
– কেন ? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম |
– এই সিনেমাটায় আমার আর তোর একটা বেডসিন আছে জানিস না ? ডোরা জোরে হেসে উঠল |
আমি থতমত খেয়ে গরম স্যুপ ফুঁ না দিয়েই মুখে দিলাম |
জিভ পুড়ল |