ভাইয়ের জার্মানি যাওয়ার পরপরই বাবা আমার কাছে এল একদিন । আমাদের বাড়িটা প্রোমােটিং’এর জন্য দিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেটা জানাতে। সব ব্যবস্থা নাকি ভাইই করেছে ওর যে বন্ধু প্রােমােটিং করবে তার সঙ্গে কথা বলে। তিনটে ফ্ল্যাট পাব আমরা, এরকমই কথা হয়েছে। আমি বাবার সামনেই ফোন করে প্রোমােটারকে বললাম যে আমি ফ্ল্যাটের বদলে ক্যাশ নেব আর বাবাকে বললাম, আমার কিংবা ভাইয়ের বদলে প্রতিমাকে নমিনি করতে। শেষদিনগুলাে ওই দেখবে । বাবা আমার দিকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না ।
রণজয় আমার সিদ্ধান্ত শুনে অ্যাপ্রিশিয়েট করল আমায় । জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে আমি ওর ভিতরের সেই সভ্য, সুন্দর মানুষটাকে আবিষ্কার করলাম আবার। ফিরে এসে আমাদের রেজিস্ট্রির সার্টিফিকেটটা মাঝেমাঝেই উল্টেপাল্টে দেখতাম । দেখতে দেখতে মনে হত যা হয়ে গেছে, তা আবার নতুন করে খুঁচিযে। তােলার কি দরকার? ডায়েরিটা কি তবে আমার শত্রু? আমি তাহলে আজকে শেষবার লিখব আর তারপর মন থেকে সরিয়ে দেব ওই সমস্ত ঘটনাকে । কেন মনে রাখব? পৃথিবীতে যে বাঁচে তাকেই অনেক মৃত্যু অস্বীকার করে বাঁচতে হয় । হিটলার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে যে ইহুদিদের মেরে ফেলত তাদের সন্তানরা কি প্রতি মুহূর্তে গ্যাস চেম্বারের কথা মনে করে বাঁচছে? তারা তাে নিজেদের মতাে করে নিজেরা ইজরায়েলের মরুভূমিতে বাঁধাকপি ফলাচ্ছে বা অ্যামেরিকাতে গিয়ে চাকরি করছে । স্মৃতিতে নিশ্চয়ই আছে কিন্তু স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ফিকে হতে হতে যাচ্ছে। মানুষ যন্ত্রণাকে এত জাগ্রত করে বাঁচতে পারে না | বেঁচে থাকার জন্য জ্যান্ত আনন্দ দরকার। জীবন আর্ট ফিল্মের দুঃখ নয় । কমার্শিয়াল ফিল্মের মশলা | টগবগ করে না ফুটলে ধারণ করা যায় না ।
আমি ধারণ করতে চাই সে জীবন । ধারণ করব । বহুবছর ধরে এই যে ডায়েরিটা আমার সঙ্গী, যাতে কখনও তিন বছর কখনও দেড়মাস পরপর আমি কিছু লিখি, এই ডায়েরিটাই আমার অসুখ। ও আমার ফুলকি | আজকের পর আর ওর সঙ্গে কোনাে সম্পর্ক থাকবে না আমার । ডায়েরিটা আবিরার কাছে দিয়ে আসব । সঙ্গে দিয়ে আসব ওই চোদ্দটা বই যা কিনে এনেছিলাম একসঙ্গে, যা এখনাে তাকে সাজানাে আছে । যার দিকে তাকালেই রণজয় শিউরে ওঠে বারবার।
শুধু একটা বই নিজের কাছে রেখে দেব । তাও লুকিয়ে । যেরকম গুপ্তধন থাকে। যখন আমার বাচ্চা হেঁচকি তুলবে, তখন মনে পড়বে আরাে অনেক লােকের হেঁচকি তােলার কথা, মুখ দিয়ে রক্ত উথলে ওঠার কথা। কিন্তু ওর মুখ দিয়ে তাে রক্ত বেরােবে না, ওর মুখ দিয়ে আমার বুকের দুধটা একটু বেরােবে । সেটাই ওকে আবার খাইয়ে দেব আমি । নতুন জীবনে প্রবেশ করব । মৃত্যু থাকুক তবু নতুন করে বাঁচব । না ভুলতে পারাটা যদি আমার অসুখ হয়, সেই অসুখটা এবার সরানাের সময় এসে গেছে। কতগুলাে ক্ষোভ, আর যন্ত্রণার নামই তাে স্মৃতি । সেই স্মৃতিকে যদি ভােগ করতে পারি, ভুলে যেতে পারব না কেন ? ভিখিরিরা যেমন রাস্তায় থেকেও মূল জনস্রোতের অংশ নয়, আমিও সেভাবে জীবনের থেকে সরে সরে এতগুলাে দিন কাটিয়ে এসেছি; এবার আমাকে আমার সঙ্গে যােগাযােগহীন কোনাে দুর্ঘটনার নয়, আমারই জীবনের মূল স্রোতের অংশীদার হতে হবে । সুখ মানে তাে যখন আমরা পাশাপাশি বসে কোনাে গান শুনছি, বা একটা কোনাে মুভি দেখছি বা বাজার করছি। সেটাই সুখ। রণজয় ঠিকই বলে। সেই সুখের কথা লিখতে চাইছি এখানে কিন্তু মনে পড়ছে জুডাসের কথা । জুডাস তিরিশটা মাত্র রূপাের কয়েনের বিনিময়ে যিশুখ্রীষ্টকে ধরিয়ে দিয়েছিল। তিরিশটা রূপাের কয়েনের জন্য যিশুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা যায় তবে । রণজয় তাে তিরিশ লাখের ওপরে আরও তিরিশ লাখ, তার ওপরে আরও টাকা রােজগার করেছে। আর যারা মারা গেছে তারা তাে কেউ যিশু ছিল না। তাদের মরার সময় এসেছিল হতাে, শাস্ত্রে-টাস্ত্রে যেমন বলে ।
না, মৃত্যু নিয়ে ক্রমাগত ভেবে আমি আমার জীবনটাকে শেষ করে দিতে চাই না। বরং আমার শরীরটাকে জড়িয়ে নিতে চাই রণজয়ের সঙ্গে। দুটো হাত দিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে ধরতে চাই ওর গলা যেন শুধু আদর আছে পৃথিবীতে, কোনাে কথা নেই। শুধু গান আছে, গলায় জমে থাকা ব্যথা নেই । কাল থেকে যে নতুন জীবনে হেঁটে যাব সেখানে পার্ক থাকবে, রাস্তা থাকবে, কালবৈশাখীর মধ্যে গাড়িবারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ছাঁট উপভােগ করা থাকবে । ঘরে ফিরে এসে একটা গরম কফি কিংবা দু’পেগ করে হুইস্কি ভাগ করে নেওয়া থাকবে। জীবন থাকবে, তুচ্ছ বা মহান হােক, স্পষ্ট একটা জীবন থাকবে। মৃত্যু থাকবে না, মৃত্যুর কোনাে স্মৃতিও না । আর না ।
২৬শে ফেব্রুয়ারি: হাসপাতাল
আবিরার বাড়িতে যে ডায়েরিটা জমা দিয়ে এসেছিল সুলগ্নাদি, সেখানে এই পর্যন্ত লেখা। সে ক্ষেত্রে কীভাবে লাগল আগুন? কেমন করে হল বিস্ফোরণ? কেন মারা গেলেন রণজয় গুহ? সুলগ্নাদি মৃত্যুর কিনারে দাঁড়িয়ে কেন?
– আমি ডায়েরিটা পড়েছি । সুলগ্নাদির বেডের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম । সুলগ্নাদি ওই অবস্থাতেও মজা করল, হ্যাপি ওই ডায়েরিটা জমা দিয়ে আসার চারদিনের মাথায় আমাকে একদিন পেতে চাইল রণজয় । আমি সাড়া দিলাম । আদরে আদরে যেন রাত্রির গায়ে অসংখ্য তারা জ্বলে উঠল । ঠিক যেরকম তারা সেই তেসরা ডিসেম্বরের রাতে ভূপালে জ্বলে উঠেছিল । রণজয় আমার ওপরে উঠতে ভয় পাচ্ছিল। আমার প্রেগন্যান্সির জন্য । আমিই রণজয়ের ওপরে উঠেছিলাম তাই । চরম আনন্দের আগের মুহুর্তে ও আমাকে নরম করে চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করল, কী মনে হচ্ছে রে? কোথায় আছিস?
আমার বলতে ইচ্ছে করছিল, স্বর্গে আছি । মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ভূপালে আছি ।