সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১১)

গ্যাস চেম্বার

পর্ব – ১১

১লা অক্টোবর
পশ্চিমঘাট থেকে ফিরে আসার পরও রণজয়দা তীব্রভাবে পেতে চাইত না আমাকে। আমি জড়িয়ে ধরলে জড়িয়ে ধরত, কখনাে কখনাে নিজে থেকেও আদর করত, কিন্তু সেই যে একটা প্রবল চাওয়া, সেটা দেখতাম না । আমি এক-দু’বার জিজ্ঞাসাও করেছিলাম । – তুই কি কোথাও ইনসিকিওর ফিল করছিস যে তাের মতাে সুন্দরীকে দেখেও কেন আমি ওয়াইল্ড হয়ে যাচ্ছি না? আমি উত্তর না দিয়ে মারতে শুরু করতাম রণজয়দাকে । গুমগুম কিল চড় । ওই মার খেতে খেতেই রণজযদা একটা মারাত্মক কথা বলল একদিন, শরীরের ধর্মই তাে আকর্ষণ থেকে মায়া । যত না ডিজায়ার করব, তার থেকে বেশি আঁকড়ে থাকব । হয়তাে সেরকমই কিছু হচ্ছে তাের আর আমার মধ্যে । কথাটা শুনে চমকে গেলেও আশ্বস্ত হতে পারলাম না। আগে আকর্ষণ তারপর তাে মায়া। ডিজায়ার যদি হাত-পা না মেলল তবে মায়া জন্মাবে কী করে? ভালােবাসা কীভাবে সম্পূর্ণতার পথে যাবে? মাথায় ওইসব ঘুরছে তখনই একদিন মেট্রোয় শৌনকের বন্ধু অমিত আমার দিকে এগিয়ে এল । দু-চারটে কথার পরই জিজ্ঞেস করল, রণজয়দা তােমাকে খুব ভালােবাসে তাই না? – ভালােবাসে কি না জানি না তবে তােমার মতাে পরে ফোন করব বলে নাম্বারটা ব্লক করে দেয় না ।আমি জবাব দিলাম । – আমি ব্লক করিনি, ফোন হারিয়ে গিয়েছিল,
– কেন তুমি জানাে না? সেটলমেন্ট করেছে রণজয়দা শৌনকের সঙ্গে। পাঁচ-ছ লাখ টাকা তাে লেগেইছে। ওরা তােমার প্রত্যেকটা স্ট্যাবের জন্য তিনলাখ টাকা করে ধরেছে, আমি যা শুনলাম । অমিত ওই ট্রেনের কামরাতেই আমায় জানিয়ে দিল যে আমি কাউকে স্ট্যাব করেছি। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আমি বাড়ি ফিরে রণজয়দাকে চেপে ধরলাম । – টাকা দিয়েছ কেন শৌনককে আমার জন্য? আমি তােমার কে হই? – কে বলল তােকে এসব? – যেই বলুক । তুমি আমাকে বলােনি কেন?
বলার প্রয়ােজন মনে করিনি । – কোথায় পেলে এত টাকা? তুমি তাে কিছুই করাে না প্রায়। তারপরও কোথায় পেলে? – ব্যাঙ্ক ডাকাতি করেছি তাে । টিভিতে দেখিসনি? – ইয়ার্কি না রণজয়দা। কেন এত খরচ করলে? – করলাম কারণ তাহলে আমরা অনেকটা শান্তি পাব । আর ঝামেলা হবে না । – তাই বলে এতােগুলাে টাকা? – হ্যাঁ। একবারে চুকিয়ে ফেললাম । যখন ছােটবেলায় সাঁতার শিখতে যেতাম তখন দেখতাম কোমরে দড়ি বেঁধে কারাে কারাে মা দাঁড়িয়ে আছে ঘাটে আর বাচ্চাটা সাঁতার শেখার চেষ্টা করছে। যতদিন মায়ের কোমরে দড়ি বাঁধা থাকত ততদিন সেই বাচ্চা সাঁতার শিখত না । দড়িটা খুলে দিলে প্রাণ বাঁচানাের জন্য আপনা আপনি সাঁতার শিখে যেত । কোনাে ইনসিডেন্টও তেমনি অর্ধেক পাতায় আর অর্ধেক ডালে রেখে সলভ করা যায় না। ওরা টাকা চাইছিল । ওদের মনে হয়েছে ওদের ক্ষতি হয়েছে। আর তার জন্য ওরা তাের থেকে কমপেনসেশন ডিজার্ভ করে। সেই টাকা ওরা পেয়েছে। তাই ওরা আর আমাদের জীবনে নাক গলাতে আসবে না । এটা ভালাে হয়নি তুই বল? | কযেকদিন ধরে রণজয়দার সঙ্গেই ঘুমােচ্ছিলাম কিন্তু আজ মনে হল, এই লােকটাকে আর ছাড়া যাবে না। আমি রণজয়দাকে অলমােস্ট জাপটে ধরে বললাম, তুমি তাে আমাকে কিনে এত টাকা দিয়ে, আজ আমার সঙ্গে সব কিছু করতে হবে তােমায় । – আহা, কী সুন্দর মুখের ভাষা। রণজয়দা আলতাে একটা চাঁটি মারল আমার মাথায় । – ভুল কী বললাম? আমি তােমায় শব্দের অধিকারে পেয়েছি আর তুমি আমায় টাকার অধিকারে… – এইসব বললে পরে বের করে দেব। রণজয়দা আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল ।
– বের করে দিলেই আমি বেরােব কেন? আমি তােমার কাছেই থাকব । – থাক । কে বারণ করেছে? – আচ্ছা একটা ভর যুবতী মেয়ে, হলই না হয় পাগল, শুধু খাওয়া-পরা পেলেই থাকতে পারে? আমাকে আদর করাে । রণজয়দা ঘুমিয়ে পড়ল কথাগুলাে শুনেও । কিন্তু আমি সেদিন ঘুমােনাের অবস্থায় ছিলাম না । ঘুমন্ত রণজয়দাকে আদর করতে শুরু করলাম তাই। ওর চোখে, কপালে, ঠোঁটে, বুকে, চুমু খেতে লাগলাম। আর তখনই বৃষ্টি নামল । বৃষ্টি এসে কড়া নাড়তে শুরু করল দরজায়। জীবন যেন অনেকগুলাে শূন্য বাটি হয়ে পড়ে ছিল টেবিলে । সবগুলাে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল । চুমু খাচ্ছিলাম রণজয়দাকে আর মনে হচ্ছিল, প্রেম সেই তাজা টমেটো যা প্রত্যেকবার খাওয়ার পর নুন মাখিয়ে নিতে হয় । রণজয়দা জেগে উঠল । আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল কী চাস? আমি বললাম, তােমাকে । রণজয়দা সময়-বয়স-দূরত্ব ভুলে আমার ওপর স্থিত হল। ভেতরে আসতে লাগল । ওর ভালবাসা, ওর পরিশ্রমের ঘামে আমার মুখ ভিজে গেল । আমি চোখ না খুলেই বললাম, তুমি যে ওই ঈশ্বরের কথা বলাে, আমার ভেতরে কি এখন সেই ঈশ্বর, রণজয়? ঈশ্বর কি এই ব্যথাটা? এই আনন্দটা? ঈশ্বর কি এই ব্যথা আর আনন্দের ককটেল?
আর এরপর অনেক সহজে আমি একটা নতুন সংসারে প্রবেশ করলাম। একটা আত্মবিশ্বাসকে দেখলাম আয়নায়। অনুভব করলাম, এই সংসারটাকে গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার, আনন্দের উৎসবে পরিণত করার দায়িত্বও আমার । আমরা পরস্পরের কাছে আসতে থাকলাম । রণজয় বয়সের কথা মনে রাখল না
আমার অসুখের কথা মনে থাকল না। শুধু মনে থাকল ওই বৃষ্টি আর বন্ধ দরজার খুলে যাওয়া।
কয়েক মাস পরে শরীরের মধ্যে নানান পরিবর্তন টের পেয়ে রণজয়ের সঙ্গে ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানলাম যে আমি কনসিভ করেছি । ফেরার পথে কাঁদতে শুরু করলাম । – আমি ভাবতাম তুই বােধহয় প্রােটেকশন নিয়েছিস । রণজয় কেমন একটা অপরাধীর গলায় বলল । – প্রােটেকশন নেব কেন? আমি তাে মা হতে চাই । চাইতাম বরাবর। কিন্তু আমার অসুখটা যদি ওর ভেতর চারিয়ে যায়? ও যদি আবার কাউকে স্ট্যাব করতে যায় আর ওর স্ট্যাবের বিনিময়ে তােমার মতাে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতাে কাউকে না পায়?
– তুই এরকম ভাবছিস কেন? আকাশে বাতাসে কত বিষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার কতােটুকু আমরা ইনহেরিট করছি? তাের রূপটা পাবে না, গুণগুলাে পাবে না, শুধু তাের অসুখটা নিয়ে জন্মাবে? এরকম ভাবিস না। দ্যাখ, আমার যা বয়স তাতে আমি বাবা হবার কথা ভাবিনি আর । কিন্তু এখন যখন একটা নতুন প্রাণ আসছে আমাদের মধ্যে তখন আমরা কীভাবে তাকে ওয়েলকাম করতে পারি, সেটাই ভাবতে হবে । তুই দ্যাখ, তুই, আমি, আমাদের বাচ্চা সবাই খুব সুন্দরভাবে বাঁচব। প্লিজ, এখন কোনাে নেগেটিভিটিকে প্রশ্রয় দিস না । দাঁড়া তােকে আবার চ্যাণ্টিং ক্লাসে নিয়ে যাব আমি ।
সত্যি সত্যিই আবার একদিন গিয়ে বসলাম ওই ঘরের ভেতরে । একটানা একটা আওয়াজ, সত্যিই অনেক-অনেক লােক হাজার বছর ধরে একই শব্দ বলে চলেছে । এবার অদ্ভুত একটা শান্তি পেলাম। নাস্তিকতা শব্দের মানে যদি ‘না’ হয়, আমি ওই ‘না’ এর বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়ালাম। নতুন কারাে প্রত্যাশা করতে লাগলাম, যে আমার আর রণজয়ের ভেতরে এসে দাঁড়াবে ।
কিন্তু অন্য একটা দুশ্চিন্তা শুরু হল । কীভাবে চলবে আমাদের! রণজয় তাে কোনাে চাকরি করে না। আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। নতুন যে আসছে তার কী হবে! আমি রােজ রণজয়ের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগলাম ।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।