গল্পে বিশ্বরূপা ব্যানার্জী

আয়নামতি
[গল্পটি একটি সামাজিক অবক্ষয় এর গল্প। একটু অন্য রকম ভাবে লেখা, প্রাপ্ত বয়স্ক দের পড়ার যোগ্যতা রাখে।]
মেয়েটির নাম আয়নামতি। আয়নার মতো স্বচ্ছ গায়ের রং। যত্নহীন চেহারায় লাবণ্য বিদ্যমান। বাড়ির উপকূলীয় অঞ্চলে হওয়ায় ছোট থেকেই বাঘ আর কুমিরের সাথে ওঠা বসা। ঝড় বন্যা ও দারিদ্র নিত্য সঙ্গী।
মা ময়নামতি এত অভাব সত্ত্বেও মেয়েটিকে পড়াশোনা শিখিয়েছেন। আজকাল তো আবার স্কুল থেকেই মোবাইল দেয় ভালো রেজাল্ট করলে। সেই সুবাদে আয়না একটা মোবাইল পেয়েছিল।
বছর ১৬ এর আয়না বেশ ডাগর হয়েছে। ময়নামতি বুঝতে পারে মেয়েকে বেশিদিন ঘরে রাখা যাবেনা তাই সুযোগ খোঁজে ভালো পাত্রের।
গ্রামাঞ্চলে যা হয় আর কি! ৮০ বছরের বুড়োর সাথে বিয়ে হয়ে যায় আয়নার। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে দেখে বুড়োর চার ছেলে রয়েছে। এমনকি ছেলের বউ নাতি নাতনি।
আয়নার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সৎ ছেলেমেয়েরা কেউ আয়না কে পছন্দ করেনা।
বিয়ের পাঁচ দিন যেতেই বুড়ো মারা যায়। আয়নার মা ময়নামতি ও মেয়েকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করে। সাদা থান পরে বুড়োর কাজ করে আয়না বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
আয়না সমাজ বোঝেনা, আয়না পৃথিবী চেনে না। পাড়াতুতো কাকি তার ঘরে আশ্রয় দেয় আয়নামতীকে। এদিকে আয়না প্রতাপের সাথে একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। প্রায়সই প্রতাপ আয়না কে নির্জন এ ডাকতো। কখনো ভালো খাবার এর লোভ দেখিয়ে অথবা জিনিসপত্রের লোভ দেখিয়ে।
একদিন নেশা করে প্রতাপ বন্ধু দের দিয়ে আয়না কে ধর্ষণ করায়। আয়নার শেষ আশ্রয় টিও যায়। সে সমুদ্রের পাড়ে নোঙর করা একটা পুরোনো নৌকাতে নিজে বাসস্থল করে। সমুদ্রের পাড়ে অথবা ডাস্টবিনে ফেলে রাখা খাবার খেয়ে কোন মতে জীবন ধারণ করে। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে সমুদ্রের পরিযায়ী পাখিগুলোকে আপন করে নিয়েছে। নিজের জন্য ছাড়াও পাখিগুলোর জন্য খাবার যোগাড় করে তাদের খাওয়ায়।
ধীরে ধীরে শারীরিক পরিবর্তন জানান দেয় যে সে মা হতে চলেছে। যথারীতি সময়ে সে সন্তান জন্ম দেয়।
এখনো তার ঘর বলতে সেই নৌকাটি যাকে সে আজও ছাড়েনি।
অনেকে ভেবেছিল পাগলি মেয়েটি কি করে সন্তানকে মানুষ করবে বড় করবে বাঁচাবে। বাচ্চাটিকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে হয়তো বাচ্চাটি নতুন কোন বাবা-মা পেলেও পেতে পারে কিন্তু আয়নার কাছ থেকে বাচ্চাটিকে কোন মতে আলাদা করা যায়নি। তাই আশেপাশের লোক যতটুকু তাদের সামর্থ্য সাহায্য করে , খাবার দাবার পুরোনো জামাকাপড় দেয়।
বছর কাটতে থাকে। একটি এনজিও আয়নামতি এবং তার সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছে।
আয় দেখতে দেখতে আয়না মতির মেয়ে মাধ্যমিক দেবে। আশেপাশের লোকদের কাছ থেকে শুনেছে তার মায়ের সাথে কি হয়েছিল। তাই তার একটাই লক্ষ্য বড় হয়ে পুলিশ হয়ে মায়ের উপর যে অন্যায় হয়েছে তার শাস্তি দেবে।
এদিকে প্রতাপ এর ছেলে তার থেকে দু বছরের ছোট হলেও এক স্কুল এ পড়ায় ভালো সখ্যতা গড়ে উঠেছে।
কলেজে পড়তে পড়তে আয়নামতির মেয়ে পুলিশে চাকরি পেয়ে যায়। ট্রেনিং শেষে যোগ দেয় সেই প্রত্যন্ত গ্রামের থানাতেই। এত বছরের পুরনো কেস থানায় ওঠে।
ফাটল ধরে আয়না মতির মেয়ের সাথে প্রতাপ এর ছেলের সখ্যতার।
বেশিদিন লাগে না প্রত্যেককে আটক করতে এবং শাস্তি দিতে।
আয়না কে ভালো হসপিটালে চিকিৎসা করানো হয়। এখন সে অনেকটাই সুস্থ। এখন তারা আর এনজিও তে থাকে না। আয়না মতি মেয়ের সাথে পুলিশ কোয়ার্টারেই থাকে।
আয়নামতির জীবন থেকে অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেলেও মেয়ের দৌলতে গাড়ি বাড়ি থেকে শুরু করে এমন অনেক কিছু পেয়েছে যা কোনদিনও সে আশাও করেনি।