গল্পতে বানীব্রত

রাতের অতিথি

রনি বি এসসি ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। বাবা মার একটা মাত্র সন্তান। বনেদী পরিবার, আর্থিক সচ্ছলতায় পরিপূর্ণ সংসারে যেন লক্ষী দেবী বিরাজমান । বাবা অনিল সেন বড় ব্যবসায়ী আর মা রমা সেন সুগৃহিনী। রুপে গুনে যেন সাক্ষাৎ মা লক্ষী। যে দিন রমা এ বাড়িতে পা রেখেছে সে দিন থেকে অনিলদের বাড়ির প্রভুত উন্নতি হয়েছে। রনি জন্ম নেবার পর খুব আদরে বড় হয়েছে। কখনো কোনো জিনিস এর অভাব পর্যন্ত অনুভব করে নি।

ছোট বেলা থেকে রনি পড়াশোনা খেলাধুলাতে সমান পারদর্শী। রনি বেড়ে ওঠার সাথে সাথে ওর আগের জন্মের সব ঘটনা মনে পরে যায়। কাউকে কিছু বলতে পারে না। রাতের বিছানা টাই ওকে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়।

সলমা ও রনিদের স্কুলে পরে তবে এক ক্লাস নিচে। মা বাবা নেই, মাসির কাছে মানুষ। পড়াশুনায় খুব ভালো না হলেও একেবারে খারাপ না। স্কুলে আসার পর থেকে ওর চোখ দুটো খুঁজে বেড়ায় রনিকে। রনিও খোঁজে সলমা কে।

একদিন টিফিনের সময় রনি সলমাকে দেখতে পায় চিৎকার করে ডেকে ওঠে তমশা বলে। ডাকটা খুব চেনা মনে হল সলমার। ওর বন্ধুরা কিছু বোঝার আগে সলমা দৌড়ে গিয়ে রনির হাতটা ধরে। বলে ওঠে সরোজ তুমি এতো দিন কোথায় ছিলে আমি যে কতদিন ধরে খুজে চলেছি, জান তুমি। সরোজ বলে আমার মন বলছিল তোমাকে পাব একদিন, তবে এভাবে পাব ভাবিনি। তুমি কোন ক্লাসে ভর্তি হয়েছো? কথার জবাব দেবার আগেই সলমার বন্ধুরা ওদের সামনে চলে আসে। তাই কোন রকমে উত্তর দেয় ফার্স্ট ইয়ারে। রনি বলে ও তোমার ভালো নাম সলমা। আমার নাম রনি। ঠিক আছে পরে আবার দেখা হবে বলে রনি ক্লাসে চলে যায়। সলমা ওর সরজের যাওয়া লক্ষ্য করে। সলমার বন্ধুরা পিছনে লাগতে থাকে। তবুও কাউকে কিছু বলতে পারেনা ও। শুধু হাসির মাঝে যেন সব বুঝিয়ে দেয়।।

রনি ক্লাসে গিয়েও মন দিয়ে পড়াশুনা করতে পারেনা। মনে পরতে থাকে সলমা অর্থাৎ তমসার  কথা। সলমার ও ঠিক একই অবস্থা। কলেজ ছুটির একটু আগে রনি বেরিয়ে পরে। মেন গেটের বাইরে এসে দেখে সলমা ও দাড়িয়ে আছে। এরপর দুজনে চলে যায় দুরের এক নির্জন পার্কে যেখানে কেউ ওদের বাধা দেবে না।

শুরু হয় তমসা আর সরজের পুর্ব জীবনের না বলা গল্প।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। দুজনের দুজনকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, তবুও যেতে তো হবেই। তাই ওরা ঠিক করল রোজ কলেজের পরে এখানে দেখা করবে।আর ওদের কলেজে দেখা হবে । ওরা ঠিক করল কলেজে ওরা রনি সলমা নামেই চলবে। কাউকে বুঝতে দেবে না ওদের আগের জন্মের কিছু। সেই মতো ওরা চলতে থাকলো। এভাবে চলতে চলতে কবে যে রনির কলেজের পাঠ শেষ হয়ে গেছে তা খেয়াল ই নেই ওদের। ওরা ঠিক করল যতদিন না সলমার কলেজ শেষ হচ্ছে ততদিন ওরা কলেজের পরে এই পার্কটিতে দেখা করবে। এভাবেই ওদের দিন চলতে থাকে।

পূর্ব জন্মে তমসা আর সরজ ছিল অভিন্ন হৃদয় প্রেমিক প্রেমিকা। দুই বাড়ির অমত থাকার ফলে ওরা আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে ছিল। আর সে ভালোবাসার জেরে এ জীবনে আবার ফিরে পেয়েছে দুজন দুজনকে রনি আর সলমা হয়ে।

সলমার ও কলেজ শেষ এবার প্রেমিক যুগল পড়েছে মহা বিপাকে। এর মধ্যে রনি একটা চাকরি ও পেয়েছে। ওদের যে টুকু কথা হয় ফোনে। দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ। রনি ঠিক করল রোজ রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ওরা দেখা করবে। সেইমত সলমাকেও বলল। দুজনে রাজিও হয়ে গেল। দেখা করবে সলমার বাড়ির কাছে কোন খানে। যা রনির বাড়ির থেকেও খুব দূরে নয়। আসলে রনির বাড়িতে সলমাকে মেনে নেবেনা কারন ও মুসলিম বলে।যে কারনে রনি বাড়িতে বলতে পারেনি ওদের সম্পর্কের ব্যাপারটা।

এরপর শুরু হলো রাতের আধারে ওদের মিলন পর্ব। বেশ কিছুদিন এভাবে চলার পর একদিন দুজনেই ধরা পড়ে যায় বাড়িতে। কয়েকদিন ধরে সন্দেহ হচ্ছিল রনির বাবার। এর আগেও দুদিন রাতে বাড়িতে ঘরে ঢুকতে দেখেছে রনিকে সেখান থেকেই সন্দেহের সুত্রপাত। সলমার বাড়িতে কিছু জানতে না পারলেও আজ ধরা পড়েছে দুজনেই।

রনি যখন বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে তখন যে ওর বাবা পিছু নিয়েছে তা জানতে ও পারেনি রনি। রনি ওদের নির্দিষ্ট জায়েগাতে এসে দাড়িয়েছে। রনির বাবা অন্ধকারের মধ্যে থেকে ওকে অনুসরণ করে চলেছে তখন রাত প্রায় তিনটে। এদিকে সালমা যখন বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে সে সময় ওর মাসতুতো দাদাও উঠেছিলো যা সলমা বুঝতে পারেনি। ওর বাড়ির লন দিয়ে হেটে গিয়ে যখন গেট খুলে বাইরে গেল তখন গেটের আওয়াজে ওর দাদার মনে হোলো যেন সালমা বাইরে বেড়িয়েছে। সালমার দাদা, তার বাবাকে ডেকে নিয়ে সলমার পিছু নেয়। অন্ধকারের আলো আধারিতে ওরা দেখতে পায় কিছুটা যাবার পর সলমা দৌড়তে থাকে। সলমার দাদাও দৌড়ে পিছু নিয়ে দেখে কিছুটা দূরে একটি ছেলে দাড়িয়ে আছে আর সলমা দৌড়ে গিয়ে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে। রনির বাবাও ছেলের কান্ডকারখানা দেখতে থাকে। যখন ওরা নিজেদের মধ্যে মসগুল সে সময় দু বাড়ির লোকজন ওদের কথা শুনতে থাকে। ওরা পূর্ব জন্মের কথা ও বলছিল কথার মাঝে। যা শুনে
দু বাড়ির লোকজনই ঘাবরে যায়। এরা এবার ঘিরে ফেলে ওদের। সালমাকে ওর মেসো মারতে উঠলে রনি সামনে এসে দাঁড়ায় আর পূর্ব জন্মের ঘটনা সব বলে। ওদের কথা শুনে প্রথমে সবাই বিশ্বাস না করলেও পরে মানতে বাধ্য হয়। রনি ওর বাবাকে বলে সালমা মুসলিম বলে তোমরা আমাদের বিয়ে তে রাজি হতে না। তাই আমরা দুজন দুজনকে পাবার পর থেকেই ঠিক করেছিলাম আর আমরা আমাদের ভালোবাসা কে হারাতে দেবনা। আগে সালমা ছিল বড়লোক বাবার এক মাত্র মেয়ে আর আমি ছিলাম গরীব রিক্সাওয়ালার ছেলে তাই আমাদের বিয়েটা মেনে নেয়নি কেউ,অগত্যা  আমাদের রাস্তা ছিল আত্মহনন। তোমরা যদি আমাদের কথা বিশ্বাস না কর আমরা তোমাদেরকে নিয়ে যেতে পাড়ি। আমাদের আদিবাস ছিল আসামের শিবসাগরে।সব শোনার পর দুই বাড়ির অভিভাবকরা তমসা আর সরোজের বিয়ে মেনে নেয়। সরোজ মানে রনি বাড়ির অনুমতি নিয়ে সালমা অর্থাৎ তমসাকে নিয়ে পরদিন অন্য বাড়িতে ভাড়া নিয়ে চলে যায়। জয় হয় ভালোবাসার।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।