কবিতায় আকিব শিকদার

১। নির্যাতনের মতো স্নেহ
মায়ের কিছু আচরণ মারাত্মক
পীড়া দিতো আমায়। আমি এর নাম রেখেছিলাম
নির্যাতনের মতো স্নেহ।
ধরা যাক, বন্ধুবান্ধবে আড্ডা। ফোনে যন্ত্রণার ঝড় তুলে
মা জানতে চায়- শরীরটা ভালো কি না? খেয়েছি কি না সসময়ে?
বাড়িতে নিজ হাতে খাওয়াতো; আমার মোটেই
লাগতো না ভালো। অনার্স পড়ুয়া ছেলে
মায়ের হাতে ভাত খাচ্ছে- কী লজ্জা!
গোসলখানার দরজায় ঠক-ঠক। তোয়ালেতে সাবান মেখে
উপস্থিত মা। পিঠে কালি-ময়লার চর, ঘষেমেজে
তুলবে যখন, আমি সুরসুরি পেয়ে দলাই-মলাই।
হঠাৎ যদি অসুখ বাঁধতো, যেমন সামান্য জ্বর,
মা রাতজেগে ছেলের মাথায় ঢালতেন জল। ভেজা কাপড়ে
জুড়াতেন কপালের উত্তাপ। তার চোখভরা অশ্রু দেখে
রাগে তো আমার দাঁত কটমট।
কোথাও যাবার বেলায় মা উঠোন পেরিয়ে
রাস্তা অব্দি আসতো। ক্ষণে ক্ষণে বলতো- ‘সাবধানে থাকিস’।
আঁচলের গিঁট খুলে হাতে দিতো তুলে
খুচরো পয়সা কিছু- পথে পড়বে প্রয়োজন।
রিক্সাতে উঠে মায়ের উদ্বেগী মুখটায়
তাকাতেই খুব কষ্টে জমতো কান্না
চোখের কোণায়। মাঝে মাঝে নিঃশব্দে চলে আসতাম।
তার এক বদভ্যাস, যাত্রাকালে স্রষ্টার নামে
আমার কপালে দেবে অন্তত তিনটি ফুঁ…
এতে নাকি বিপদের ছায়া কাটে, কুগ্রহের কালগ্রাস থেকে
বাঁচবো আমি। ওসবে বিন্দুমাত্র ছিলো না বিশ্বাস, তবু
একদিন বেজেউঠা ফোন রিসিভ করতেই
শশ্বব্যস্ত মায়ের গলা- ‘রিক্সাটা
থামা বাবা, তোর মাথায় তো ফুঁ দেওয়া হয়নি’।
আবদার রাখতে প্রথম বাসটা মিস, দ্বিতীয়টায়
চড়ে বসলাম। বাস ছুটছিল
বাতাস কাটা বেগে; আচমকা কড়া ব্রেকের ঝাঁকুনিতে
যাত্রিরা থতোমতো। বাইরে ভীর, শহরগামী প্রথম গাড়িটা
পড়ে আছে ব্রিজের নিচে, আর প্রায় সব কয়
যাত্রীই নিহত। আহা… এতোক্ষণে হয়ে যেতাম ওপারের বাসিন্দা।
মায়ের মৃত্যুর পর আজই প্রথম
বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছি। এতোবার পিছু তাকালাম, মায়ের মুখটা
দেখতে পেলাম না; বড়ো উদ্বিগ্ন চিন্তাশঙ্কুল সেই মুখ
কোনদিন দেখা হবে না এই পৃথিবীতে।
মা… মা গো… তোমার সন্তানের ওপর থেকে
সকল বিপদের ছায়া, কুচক্রির কুনজর কি কেটে গেছে…!
একটি বার কেনো আসো না তবে
দিতে মঙ্গল ফুঁ…! কেন পিছু ডেকে বলো না-
‘এই নে খুচরো কয়টা টাকা, পথে কিছু কিনে খাস’।