এই টুসি, টুসি! কোথায় গেলি মা? আকাশ যে আঁধার হয়ে এল! কাপড়গুলো উঠোন থেকে তুলে আন দিকি।
ছোট্ট টুসি উঠানে পা দিয়েই দেখল আকাশে একটা হিংস্র মেঘ উঠেছে। খানিক বাদেই একটা এলোপাতাড়ি হাওয়া যেন খ্যাপা মোষের মতো তেড়ে এল। ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেল চারিদিক। ঝড় এসে হাজির হল গোঁ গোঁ আওয়াজ তুলে। দূর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। অসময়ে অন্ধকার নেমে আসতে ভয়ের চোটে খুঁটি উপড়ে দড়ি ছিঁড়ে গোরুগুলো পরিত্রাহি চেঁচাতে শুরু করেছে। এক অজানা আশঙ্কায় টুসির বুক কেঁপে উঠল। চোখের নিমেষে পাশের বাড়ির দাওয়াতে পাতা চাটাই আর ঘরের চাল উড়ে কোথায় চলে গেল।
সে যে কি করবে, কোথায় লুকোবে ভেবে পাচ্ছে না। মাকে জড়িয়ে ধরল মেয়ে। খানিকপরে পাশের বাড়ির মাটির দেয়ালটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। একটার পর একটা তাল আর নারকেল গাছ ঝড়ের দাপটে খেলনার মতো ভেঙে পড়তে লাগল। এর সাথেই শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। একদিকে ঝড়ের এই তাণ্ডব, অন্যদিকে বর্শার খোঁচার মতো এই বৃষ্টি, দুয়ে মিলে দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। এলোপাতাড়ি হাওয়ার দাপটে বাইরে দাঁড়ানো দায়। খড়ের কুটোও যেন গায়ে এসে পেরেকের মতো বেঁধে। তার উপর শনশন আওয়াজে কান পাতা যাচ্ছে না। নিজের খেলাঘরের মাটির পুতুলদুটিকে প্রাণপণে বুকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া আর কিইবা করার ছিল টুসির!
চক্ষের নিমেষে তাদের বাড়ির মাটির প্রাচীর আর রাস্তার ধারের বটগাছটা হুড়মুড়িয়ে একেবারে শুয়ে পড়ল মাটিতে। তখন টুসি মাকে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
মাটির এই ঘরটুকুতে প্রাণী বলতে এখন টুসি আর তার মা থাকে। আগে তারা থাকত বাংলাদেশে। এরকমই এক ঝড় জল আর নদী ফুঁসে ওঠার দাপটে যখন তাদের ভিটেবাড়ি আর খেত নদী গিলে নিল, তখন মেয়ে কোলে বৌয়ের হাত ধরে নিঃসম্বল জাফর রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে সীমান্তপারে ভারতের একটা গ্রামে এসে উঠল। প্রথমে গাছতলাই ছিল তাদের আশ্রয়।
কিছুদিন পর রেল লাইনের জমিতে ঝুপড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করল জাফর। লোকের জমিতে মজুর খেটে কোনোমতে পেটের ভাতটুকু যোগাড় করা। তাও রোজ কাজ জোটে না। কাজের সরঞ্জাম বলতেও কিছু নেই। মালিকের দেওয়া ঝুড়ি কোদাল নিয়ে কাজ করলে পুরো মজুরি মেলে না। বাড়তি কিছু পয়সার ধান্ধায় জাফর খবর পেয়েছিল শহরে পাকা রাস্তা তৈরির কাজে জুটে যাওয়া যায়। শতকষ্ট বুকে চেপে সে গিয়েছিল দূরে। এই ঝড়ের দিন এলেই বুক টুকবুক করে ওঠে জাফরের।
টুসির মা বিডিও অফিসে যায় শাড়ি জামার খোঁজে। বড়বাবু বলে ভোটের কার্ড না থাকলে কিছু পাবি না। বিডিও সাহেব বাচ্চাটার দিকে চেয়ে দশটা টাকা দেয়। তারপর তার বৌ এনে দেয় একটা শাড়ি। আর দুধের বোতল। একশো দিনের কাজের খোঁজে টুসির মা যায় পঞ্চায়েত প্রধানের অফিসে। কাজ জোটে না। পানের কষে তেঁতুল বিচির মতো দাঁত বের করে একজন বলে ভোটার কার্ড না হলে কিছুই হবেনা।
আকাশের বুকে কোনো সীমান্ত আঁকা নেই। মেঘেরা নির্বিবাদে বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে ঘুম ভেঙে উঠে এসে ভারতের বুকের উপর দিয়ে বাংলাদেশের কোণে চলে যায়। তারপর দস্যুবৃত্তি শুরু করে। বাঘ আর কুমিরও সীমান্ত মানে না। সীমান্তের যত হিসেব গরিব মেয়ের উপর।
আলতাফ হোসেন বুড়ো মানুষ। সারাদিন খকখক করে কাশে। ঘোলাটে চোখে টুসির মায়ের দিকে তাকায়। অ রাবেয়া, মা আমার, বুকে পিঠে একটু সেঁক দিয়ে দে না মা।
রাবেয়া ছিল ওর মেয়ে। কবে কার হাত ধরে সে কোথায় চলে গেছে কেউ জানে না। ঘোলা চোখে হাতড়ে হাতড়ে মেয়েকে খোঁজে বুড়ো আলতাফ। নধর পুঁইডাঁটা ডগা বের করে আলতাফকে দেখে। টুসির মা বুড়োর রেশন তুলে এনে দেয়। ব্যাঙ্কের কাগজে কিছুতেই সই মেলে না বুড়োর। বার্ধক্য ভাতা তুলতে প্রতিবার কষ্ট। যেদিন বুড়োর কষ্ট বেশি হয়, সেদিন টুসিকে নিজের কোলে ঘুম পাড়িয়ে বুড়ো আলতাফের জন্য রাত জাগে টুসির মা। কষ্ট কমলে আলতাফ আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, আমি মরে গেলে এই ঘরটুকুতে টুসি, তোরা থাকবি।
জাফর কখনো কখনো ফিরে আসলে হাসে। চাচা, এমন মেয়ের যত্ন পাচ্ছ বুড়ো বয়সে। তোমার কপাল খুব ভাল। গরম গরম গেঁড়ির ঝোল মুখের কাছে ধরে টুসির মা। বলে, খাও বাপজান।
সেই ঘর চাপা পড়ে তার বৌ মেয়ের লাশ টেনে বের করতে হবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি জাফর। কয়েক ঘণ্টার ঝড় বৃষ্টির তাণ্ডব জাফরকে নতুন করে সর্বহারা করে দিল। বৌটাকে চেনা যাচ্ছিল না। ঘরের চাল চাপা পড়ে লাশ ফুলে ঢোল। মেঠো ইঁদুরের দল খুবলে খেয়েছে চোখ আর নাক। উনান গেছে ভেঙে। মাটির হাঁড়ি গড়াগড়ি খাচ্ছে। বৌয়ের সাথে গিয়ে মেলা থেকে কিনে এনেছিল মাটির হাঁড়িটা। হাঁড়িটুকু সঙ্গে নিয়ে আনমনা জাফর ঘুরে বেড়ায়। আর সবাইকে ডেকে ডেকে জিজ্ঞাসা করে, এমন হল কেন?
বিডিও অফিসের উদ্যোগে এবার বিরাট ফ্লাড রিলিফ সেন্টার হচ্ছে। অনেক উঁচু করে থামের উপর পাকাপোক্ত বাড়ি। নদীর জল ফুঁসে উঠেও নাগাল পাবে না। টিনের ঘর বানিয়ে মিস্ত্রির দল থাকে। বড় হাঁড়িতে রান্না হয় দুবেলা। জাফর মাটির হাঁড়িটা আঁকড়ে ধরে ঘুরে বেড়ায়। লোকে তাকে বলে হাঁড়ি পাগলা। কলেজের সামনে একটা বড় পুকুর। পুকুরে জেলেদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী মাছ চাষ করে। বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি করে মাছের চারা ফেলা হচ্ছে পুকুরে। বিডিও সাহেব এসেছেন উদ্বোধন করতে। কলেজের দারোয়ান দোকান থেকে আজই জাফরকে একটা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি কিনে দিয়েছে। সেই হাঁড়িটা মাথায় নিয়ে করুণ চোখে জাফর তাকিয়ে আছে মঞ্চের দিকে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন