কর্ণফুলির গল্প বলায় আনোয়ার রাশিদ সাগর (প্রথম পর্ব)

একটি মুক্তিযোদ্ধার গল্প

ক্লান্তিহীন ট্রেনটা কী চিরতরে থেমে যাবে! যুদ্ধবাজ অন্ধসংস্কৃতির কাছে হেরে যাবে আলোর নিশান।
আলোআঁধারি, রাতের গভীরে উঁকি দেয়। কখনো জ্যোৎস্না, কখনো ঘনকালো মেঘ। এপাশ-ওপাশ করে রহিমুদ্দিন। কী হচ্ছে এ সব। পা খাড়া করে দাঁড়াতে গিয়ে ককিয়ে ওঠে,ও মাগো।
খানিক সময় চিৎকার ও চেঁচামেঁচি করে। কেউ কাছে আসে না। শুধু ছোট নাতি নাদিমুদ্দিন ধুচমুচ করে ঘুম থেকে উঠে এসে, দাদুর সামনে দাঁড়ায়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে, কী হলো দাদু,কষ্ট হচ্ছে?
দাদু তৃপ্তির সাথে জবাব দেয়,না দাদুভাই কিচ্ছু হয়নি।মিষ্টি করে হেসে আবার বলে,তুই-ই পারবি ভাই-তুই-পারবি যুদ্ধ করতে।
নাদিমুদ্দিন মনে মনে শক্ত হয়। শক্তিতে বুক খাড়া করে দাঁড়িয়ে বলিয়ান হতে চেষ্টা করে।
সূর্যসৈনিক মুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দিন। তার একমাত্র ছেলে করিমুদ্দিন। কলেজে পড়তে পড়তে যুদ্ধাপরাধী এলাহীবক্সের মেয়ে নাজমাকে প্রেমজ সম্পর্ক করে বিয়ে করে নব্বইয়ের দশকে। তখন জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতার আসনে ছিল। বাঘা বাঘা মুক্তিযোদ্ধারা এ দলে যোগ দিয়েছে। গঠন করেছে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল। চলতে থাকে নানান রকমের পালা বদল।
তখন ইউভার্সিটিতে ছাত্রদল আর ছাত্র শিবিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছিল। চলছিল হত্যা ও দখলের সংস্কৃতি। ছাত্রদলের ছেলেদের হাতে ছাত্র শিবিরের বেশ কিছু নেতা আগুনে ঝাপ দিয়ে পতঙ্গের মত ছটফট করতে করতে মারাও যায়।
বিভিন্ন আঞ্চলিক নির্বাচন ও সংসদের উপনির্বাচনে ভোট চুরির ঘটনাও ঘটতে থাকে। এই সুযোগে, বিরোধীদলের হাতে আন্দোলনের ইসু তৈরি হয়। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবীতে মাঠে নামে আওয়ামীলীগহ সকল সমমনা বিরোধীদল। আন্দোলনের সাথে যোগ দেয় স্বাধীনতা বিরোধী ও মৌলবাদী দল জামাতে ইসলামও। জাতীয়তাবাদী দল অনেকটা এক পেশে বা একা হয়ে যায়। তবুও দাঁড়িয়ে থাকে একপায়ে দাঁড়ানো, মাঠের মধ্যে খাঁড়া তালগাছের মত। ক্ষমতার স্বাধ!
তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জামাতে ইসলাম তিন’শ আসনেই নির্বাচনের জন্য প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দেয়। এটায় সুযোগ। আওয়ামীলীগের হাতে বড় সুযোগ। ভোটের মাঠে আনন্দউল্লাস চলতে থাকে।
পঁচিশ বছর পর তারা ক্ষমতায় এসে যায়। পূণর্জাগরণ শুরু হয়। মাঠে-ঘাটে বেড়ে ওঠে সবুজ ফসল, তার সাথে আগাছাও।
ঠিক এই সময় ছাত্রনেতা হিসেবে লুকাল কলেজে আত্মপ্রকাশ করে রহিমুদ্দিন পুত্র করিমুদ্দিন। করিমুদ্দিনের সাথে যোগ দেয় যুদ্ধাপরাধী কন্যা সুন্দরী নাজমাও। অগ্নিঝরা বক্তব্যও দিতে পারতো নাজমা। তারা বাম সংগঠনের সাথেই ছিল। কিন্তু মানুষের মন বলে কথা। পরিবর্তন হয়েও হয় না। আবার বৃষ্টির মত দড়বড়িয়ে বদলিয়ে যেতেও দেরি হয় না।
সুবিধাবাদী চরিত্রকে শক্ত করে ধরে রাখা বড় কঠিন কাজ। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে করিমুদ্দিন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে নিজের অবস্থান করে নেই বড়দলের বড় পদে। অপরদিকে নাজমা নৌকা মার্কা দেখলে নাক সিটকাতে থাকে। সেটা মনে মনেই।
বিয়ের সময় নাজমার বাবা চৌকুষ এলাহীবক্স বলেছিল,মেয়ের পছন্দ না হলে এ বিয়ে দিতাম না। আমার একমাত্র লক্ষীমেয়ে,ওর মনে কষ্ট দিতে পারবো না। তবে রহিমুদ্দিনকে দেখলেই তার মনে হতো বাবার হত্যাকারী এই অসহায় গরীব লোকটিই। অথচ মুখে বলেছিল,দেশের বীর সেনানী সূর্যসৈনিক স্বাধীনতার পতাকাবাহী রহিমুদ্দিনের ছেলের সাথে আমার নাজমার বিয়ে হচ্ছে।আমার সৌভাগ্য। আমার বেয়াই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমি গর্ব করি।
১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর বিকেল। হাটের উপর লোকে লোকে ভরা,হৈহুল্লোড় সমাগম। সকলেই হাটে এসেছে বাজার করতে। ব্যস্ততা সবারই।
এলাহীবক্সের বাবা পিচকমিটির চেয়ারম্যান বসেছিল নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। গাঢ় লাল আলো চারিদিকে ঝলমল করছে। সূর্যের নতুন আভা যেন। সবই রঙিন আলোয় আলোকিত। সেই সাথে মানুষের গুণগুণ শব্দ একহয়ে গমগম শব্দে রুপ নিয়েছে। এমন সময় একদল গেরিলা যোদ্ধা কাধে অস্ত্র নিয়ে বাজারের গলিপথ দিয়ে এলাহীবক্সের বাবার সামনে এসে বীরের বেশে দাঁড়ায়। তারপর ধমধম-দড়ামদড়াম শব্দে কয়েক রাউন্ডগুলি চালিয়ে দেয় বু্কের উপর। রহিমুদ্দিনই এ গুলি করেছিল,চলছিল জয় বাংলা-বাংলার জয় শ্লোগান।
কয়েক গজ দূরেই দাঁড়িয়েছিল এলাহীবক্স। হয়তো ওই সময় মুক্তিযোদ্ধারা তাকে দেখলেও মেরে ফেলতো। বাবার লাশ রেখেই হাটের লোকের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল এলাহী বক্স।
স্বাধীনতার পর,শৃগালের মত এদিকওদিক পালিয়ে থেকে থেকে কাটিয়ে দেয় দুটি বছর। এরই মধ্যে দেশে গঠিত হয় জাসদ ও তাদের গণবাহিনী। এলাহীবক্স যোগ দেয় গণবাহিনীতে। পেয়ে যায় অধিকার ও শক্তি। তারপর প্রতিশোধ নেওয়ার পালা শুরু হয়। কিন্তু সুযোগ হয়নি। রক্ষীবাহিনী মাঠে নেমে, নদীতে জাল পেতে ছাকনায় ছেঁকে গণবাহিনী ও তাদের অস্ত্র তোলার উদ্যোগ নেয়। শুরু হয় আর এক যুদ্ধ। মাঠেঘাটে,রাস্তায় বা ঝড়-জঞ্জলে পড়ে থাকে লাশের পর লাশ।
চলতে থাকে প্লেনগতিতে জীবন ও জীবনের বাকবদল।
হঠাতই বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হয় কতিপয় বিপথগামী সেনাকর্মকর্তার হাতে। বদলিয়ে যায় প্রেক্ষাপট। তারপর মেজর জিয়া এলো এবং তিনিও হত্যা হলেন সেনাকর্মকর্তাদের হাতে।
তারপর এরশাদ এলো এবং নয় বছরের মাথায় তারও পতন হলো। শুরু হলো আর এক শাসণ। যার নাম গণতন্ত্র।
রাজা আসে রাজা যায়, ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। ভাগ্যের পরিবর্তন হয় এলাহীবক্সদের। রহিমুদ্দিনরা বেঁচে থাকে দুখে-দুখে,মহাদারিদ্রে। নীরবে নিভৃতে অন্ধকারে। গঠন হলো মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রালয়। শুরু হলো ভাতা দেওয়া। বিএনপির পতনের পর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে,ভাতা বাড়তে থাকে। সন্তানসহ নাতিপুতিদের চাকুরীর কোটা পদ্ধতি চালু করে আওয়ামীলীগ সরকার। রহিমুদ্দিনরা নিঃশ্বাস ফেলে, মুক্ত নিঃশ্বাস। এখন করিমুদ্দিন বড়নেতা। কিন্তু তাদের রক্ত দু’ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। করিমুদ্দিনের বড় ছেলে নাজিমুদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা হয়ে যায়। তার কথা, কোটা চায় না দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার চায়। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ভিতরে ভিতরে বিভীষণ আকার ধারন করে। ছোট ছেলে নাদিমুদ্দিন চেতনায় লক্ষণসেন। দাদার আদর্শের সৈনিক।
শুরু হয় দু’ভাইয়ের দুদিকে চলা। হঠাতই মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু হয়। কেউ কেউ চোখে অন্ধকার দেখে। আবার কেউ দিনেদুপুরে কোটিপতি হয়ে যায়। যে যখন বাছাই কমিটির সদস্য থাকে তার তখন কপাল খুলে যায়। ব্যাংকে জমা হয়ে যায় টাকার পাহাড়। গণবাহিনীর এক নেতার হাতে এসে যায়, মুক্তিযোদ্ধা বাছাই কমিটির দায়িত্ব। সুযোগ হয়ে যায় এলাহীবক্সের। ইতিপূর্বেই গণবাহিনীর ওই নেতা আওয়ামীলীগে যোগ দিয়ে, দলের পদধারী পদে চলে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের নেতা হয়ে যায়। এই এলাহীবক্স ওই নেতার সহযোদ্ধা ছিল গণবাহিনীর যুগে।
একসাথে গণবাহিনীতে থাকার সুযোগে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম এসে যায় এলাহীবক্সের। বাংলাদেশে টাকায় বাঘের দুধও পাওয়া যায়।
এদিকে করিমুদ্দিনও সুন্দরী বউয়ের চাপে শ্বশুরের পক্ষেই থাকে। বিপক্ষে মুখ খোলে না। বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ছোট নাতি নাদিমুদ্দিন। নানার সাথে শত্রুতা। কথা বলে না। মা নাজমার কথায় তার মন গলে না। তাই নাজমা কথায় কথায় বলে, আহা দাদার উত্তরসূরী।
নাদিমুদ্দিন মায়ের কথার উত্তর দেয় না। তার চোখ-মুখের চিহারায় মা বিষয়টা বুঝে নেয়। নাজমাও মনে মনে ভাবে ছেলেটির দেশ প্রেম রয়েছে। তবে কিছু করার ক্ষমতা তার নেই। অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে থেকে নীরব হয়ে যায়।
অথচ বড় নাতি নাজিমুদ্দিন এ সবের ধার ধারে না।

রহিমুদ্দিনের সময় ফুরিয়ে আসতে দেরি নেই। এই বুঝি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে সে। এই বুঝি পৃথিবী ছেড়ে যাবে। এমন সময়ই ছোট নাতি নাদিমুদ্দিন সারাক্ষণ দাদুর পাশে পাশে থাকে। কিন্তু বড় নাতি নাজিমুদ্দিন ব্যস্ত থাকে কোটাসংস্কার আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে।
এমপির কাছাকাছি থাকে ওদের বাবা করিমুদ্দিন। ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হতে চায়। এতদিনে এমপি সাহেবেরেও দলের প্রতি সেই টান আর নেই। তার চায় টাকা। এই সময় দুইদলেই শুরু হয়ে যায় নমিনেশন বেচাকেনা।
শ্বশুর এলাহীবক্সের টাকার জোরে নমিনেশন বেচাকেনার দৌড়ে যেমন এগিয়ে থাকে করিমুদ্দিন, তেমনিভাবে রাজাকার শ্বশুর মশাইয়ের নামও এসে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক তালিকায় । আর চেয়ারম্যান হলে আপত্তি জানাবে, এমন বুকের পাটা কার রয়েছে ? হাজার হলেও করিমুদ্দিন চেয়ারম্যানের সহধর্মিনী নাজমার বাবা এলাহীবক্স। নাজমার শরীরে সারাক্ষণ জড়ানো থাকে কলাপাতা রঙের শাড়ি এবং টুকটুকে লাল ব্লাউজে ভরাবুক। কানে স্বর্ণের দুল ঝোলে। ভোটের মাঠে যুবতীর আনন্দউচ্ছাস ও দেশ প্রেমের পোষাক ঝলমল করে।
কেইবা ভোট দেবে না? পুলিশ সরকারি বেতন খায়। সরকারি দলের প্রার্থী করিমুদ্দিন। ভয়-সংশয়ে জনগণের মুখেই শুরু হয়ে যায় জয়-জয়াকার। এদিকে দুদিকেই স্বর্ণময় পরিচয় হতে থাকে। মন্দ কী?
বীরমুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দিনের সুযোগ্য সন্তান করিমুদ্দিন, যার শ্বশুর এলাহীবক্সও বীর মুক্তিযোদ্ধা। গ্রামের খেটে-খাওয়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা বিরোধীপক্ষ নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তাদের বরং ভয়ই হয়, যদি মুক্তিযোদ্ধা ভাতাটা বন্ধ হয়ে যায়?- কে দেবে মাসিক টাকাটা? তারপর ছেলেমেয়ের চাকুরীরও একটা সুযোগ রয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না মুক্তিযোদ্ধারা। রহিমুদ্দিনও বড় মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।তারও রয়েছে অনেক সহযোদ্ধা ও বন্ধু। তারা মনে মনে যায় বলুক, চায়ের দোকানে বা প্রকাশ্যে, সকলেই বলে, রহিম ভাইয়ের ছেলে-বেয়াইয়ের বিরুদ্ধে বলাটা ঠিক হবে না।
তারপরও লুকাল এমপির সমর্থন তো রয়েছে।
মৃত্যু শয্যায় থেকেও রহিমুদ্দিনের কানে বিষয়টি পৌছিয়ে যায়। অস্থিরতা বেড়ে যায় রহিমুদ্দিনের। লাফ দিয়ে উঠতে গিয়ে শরীরের সক্ষম অংশটাও অচল হয়ে যায়।
অচল হয়ে যায় চেতনতা। ঝরঝর করে ঝরে পড়ে গাছের হলুদ পাতা। পচতে থাকে ঝরে পড়া পাতার কাঁচা অংশ। বের হয়ে যায় জালের মত কঙ্কাল। ছোট নাতি নাদিমুদ্দিন বাগানের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে কাঁঠাল পাতার হাড়হাড্ডিগুলো দেখতে দেখতে কুড়াতে থাকে দু’হাতে। শুকানোর জন্য, অপেক্ষায় থাকে প্রখর রৌদ্রের। চুলায় জ্বালানোর স্বপ্ন দেখতে দেখতে কেঁদে ওঠে আলো-বাতাস। নিঃশ্বাসহীন বিছানায় পড়ে থাকে রহিমুদ্দিন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।