কর্ণফুলির গল্প বলায় আনোয়ার রশীদ সাগর

বারান্দার বাসিন্দা

আমি কী তোমাকে চিনি?
কোনো উত্তর আসে না। শুধুই একবার চোখের পলক উপরের দিকে উঠিয়ে,আমার দিকে রহস্য নজরে তাকিয়ে, ওর চোখ নিচের দিকে নামিয়ে নেয়। ঠিক এক ঝলক রৌদ্রছায়া উড়ে যাওয়ার মত মায়াবী চোখ ম্লান হয়ে যায়।
একটু বিরক্ত হয়ে বলি,তুমি কী আমাকে আগে থেকে চিনতে?
অবাকই হলাম,মেয়েটি কিছুই বলে না। শান্তজলের মতো থেমেই থাকে,কোনো ঢেউ উঠতে দেখি না। কোনো কিছুরই প্রতিক্রিয়াও দেখি না ওর চোখে-মুখে , না বডিল্যাংগুজে না শরীরের ভাঁজে ভাঁজে । যেন নীরব নীল আকাশ, হয়তোবা বুকে কতো রকমের পাখি উড়ে বেড়াতে পারে! মনে মনে ভাবি।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিই।

সেদিন দুপুরে হঠাৎ বারান্দায় এসে উঠে বসে যুবতী মেয়েটি। বেশ ডাগর চোখ। সুন্দর দেহের গঠন। শ্যাওলামাখা তেলতেলে সোনালি রঙ। আশ্চর্য ওর চোখের তারায় কোনো বিষাদের ছায়া দেখতে পাচ্ছি না। রৌদ্রময় আকাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বৃষ্টি পড়ছে।
ছোটোবেলায় এ রকম দিনে আমরা পাড়ার ছেলেমেয়েরা নেচে নেচে ছড়া বললাম “রোদ হচ্ছে বৃষ্টি হচ্ছে খ্যাক শিয়ালের বিয়ে হচ্ছে “। অথচ আমরা কোনো দিনই খ্যাক শিয়ালের বিয়ে দেখিনি। তবে খ্যাক শিয়ালের লুকোচুরি খেলা দেখেছি। শীতের সকালে মিষ্টি রোদে বেগুন অথবা ঝালের ক্ষেতের মাঝে মাঝে জোড়া খ্যাক শিয়াল দৌড়াদৌড়ি করতো। ঠিক আমরা যেমন পলানটুক খেলতাম সে রকম করে ঝুল ফাঁকি দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতো।
এমন এক মিশ্রণদিনে অষ্টাদশী মেয়েটি আমারই ঘরের বারান্দায় উঠে বসে আছে। আমার কোনো কথার উত্তরও দিচ্ছে না। আবার মনে হচ্ছে আমাকে সে গুরুত্বও দিচ্ছে না। নিজমনে নিজের ভিতর নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। এদিকে আমার মনের ভিতর আনচান শুরু হয়ে গেছে। এতো, এতো সুন্দর সুডোল মোমের মতো মেয়েটি, কে গো ?

আমার বাড়ি ঝিনেদহ শহর থেকে ৫০০ মিটার দূরে। না শহর না গ্রাম। এক সময় আমাদের পাড়াটিকে বস্তি বলা হতো। কারো কারো এক আধটু অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হয়ে যাওয়ায় কাঁচাপাকা ঘরবাড়ি তৈরি করেছে অনেকেই। যে কারণে বেশ কিছু লোক এ পাড়াটির নাম দেয় নতুন পাড়া । ছোটো ইটপাড়া বা হেরিং করা রাস্তার ধারে আমাদের বাড়ি। বাবা-মা ও তিন বোন এবং এক ভাই আমাকে নিয়ে টানাপোড়েনের সংসার। বাবা সারাদিন শহরে মুটের কাজ করে রাতে বাড়ি ফিরে। পিটানো শরীর ছিল। অনেকেই বলতো বাবার মালগাইটি শরীর। একাই তিন মন জিনিশ ঘাড়ে করে ট্রাকে তুলে ফেলতে পারে।
একদিন সন্ধ্যায় বাবার সাথে কোর্টপ্যান্ট টাই পরা কিছু লোক আমাদের বাড়ি আসে। সেদিনই জানতে পেরেছিলাম দেশে ন্যাশনাল এলাইয়েন্স নামে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল রয়েছে। ওই দলের নেতারা এসেছে। তার মধ্যে আনোয়ার জাহিদ,ফারুক রহমান, আব্দুর রশীদ,মেজর হুদা ও ডালিমের নাম মনে আছে। সবচেয়ে বেশি মনে আছে কর্ণেল ফারুকের নাম। কারণ হাতির মতো বড়ো বড়ো দুটি কান,মোটা মোটা চোখ,ফর্সা ধবধবে বিশাল লম্বা লোকটি আমার কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল।
আমি যখন এসএসসি পাশ করি তখন বাংলাদেশে এই ন্যাশনাল এলাইন্সের দাপট চলছিল। ওদের সাথে বাবার সখ্যতার কারণে আমি সাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়ায় যেতে সক্ষম হয়েছিলাম। অল্প বয়সে লিবিয়ায় গিয়ে, মরুভূমির দেশ থেকে বাড়িতে মাসে মাসে টাকা পাঠাতে পারতাম। তবে আনন্দের চেয়ে কষ্ট বেশি ছিল প্রথম প্রথম। ধীরে ধীরে সব মায়ামমতা কাটিয়ে বিদেশে নিজেকে খাপখাওয়াতে পেরেছিলাম। গাদ্দাফির দেশের জনগণের অনেক সুখ। ধূ-ধূ বালির দেশে লোক সংখ্যা একদমই কম। ওই দেশের মানুষদের তেমন কোনো পরিশ্রম করতে হতো না,চিন্তাভাবনা ছিলো না সন্তানাদি মানুষ করার। আমি এবং কিছু বাঙালি ছেলেরা ত্রিপলি থেকে অনেক দূরে থাকতাম।
দশ-এগারো বছর হয়ে গেছে। আমি বাড়ি / দেশে আসবো ভাবছিলাম। বাবার মৃত্যু সংবাদ আমাকে কেউ না জানালেও অনুমান করতাম,আমার বাবা হয়তো সৃষ্টি কর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছে। কারণ যে বাবার মোবাইলে প্রতি দু,তিনদিন পরপর কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতো সে বাবার মোবাইলে কণ্ঠ শুনি না। মায়ের কণ্ঠ শুনি।
মা প্রায়শই বলতো, বাবা বাড়ি আইসু। অত টাকাপয়সা আমাগের দরকার নি।
তারপর মা’র কণ্ঠ জড়িয়ে আসতো। মা আমার কাঁদতো। মনে মনে ভাবতাম,আমার মা তার আঁচলে চোখ মুছছে। তখন আমার প্রাণের ভিতর হুহু করতো,চোখের জল টলটল করতো।
আমি দূর দেশ থেকে মায়ের ভেজা কণ্ঠ শুনে কখনো কখনো হাউমাউ করে কাঁদতাম। সহকর্মীরা আমাকে ধরে স্বান্ত্বণা দিতে দিতে ঘরে নিয়ে যেতো। শেষমেশ বাড়ি আসার জন্য সিদ্ধান্ত নিই। গোছাতে থাকি নিজেকে।
এরই মধ্যে মরুভূমির দেশে শকুনের ছায়া পড়ে। চারিদিক থেকে শুনতে পারছি আমেরিকা লিবিয়াকে গিলছে,অশান্তি বাধাচ্ছে। হঠাৎ একদিন সকালে শুনলাম মুমাম্মার গাদ্দাফীকে মেরে ফেলা হয়েছে। সব এলোমেলো হয়ে যায় সব। কে কোথায় যায় তার কোনো ঠিকানা নেই। চলছে গৃহযুদ্ধ। আমরা কোনো কুল কিনার পাচ্ছি না। এতো বছর আয় করে যা কাছে রেখেছি তা দেশে পাঠানোর কোনো পথই পাচ্ছি না। নিজের বাঁচা-মরার কথা ছেড়েই দিয়েছি।
মা-বোনদের কোনো খোঁজখবর নিতে পারি না। পৃথিবীতে বেঁচে থেকেও যেন মরে গেছি, মনে হচ্ছে। মানব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কতো দিনই বা বসবাস করা যায়। অচেনা কতো মরুভূমির পথ হেঁটে হেঁটে চলেছি একটু ঠিকানা খোঁজার জন্য। প্রায় পনের-বিশ দিন পর, যে কোম্পানিতে কাজ করতাম সেই কোম্পানির দুজন লোক আমাদের নিয়ে যায় এক অচেনা ঘরে। সেখানেই দীর্ঘদিন খেয়ে না খেয়ে থাকতে লাগলাম। কাছে যা ছিলো সেগুলো ওই কোম্পানির লোকেরা নিয়ে নেয়। নিঃস্ব হয়ে একঘরে আটদশ জন শুধুই আল্লাহ আল্লাহ করতাম। এরও দু’মাস পর আমাদের নিয়ে যায় এক সাগরের কিনারে। সেখানে প্রতিদিন আমাদের কাজ করিয়ে নিতো। কোনো রকমে কিছু খেতে দিতো,টাকাপয়সা দিতো না। এভাবে আরো তিনমাস থাকার পর আমরা দেশে আসার সুযোগ পেয়ে যায়। খালি হাতে দেশে আসি। বহুকষ্টে বাড়ি পৌঁছিয়ে দেখি,শুন্য বাড়ি।কেউই এ বাড়িতে বসবাস করে না। মা জননীও শোক-দুঃখে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমি কার কাছে এলাম,কাকে মা বলে ডাকবো?- উচ্চস্বরে কান্নাকাটি করতে থাকি। পাড়াপ্রতিবেশি এসে স্বান্ত্বনা দেয়। খবর পেয়ে বোন তিনটি শ্বশুর বাড়ি থেকে আসে। তারাও আমাকে ধরে কান্নাকাটি করতে থাকে। আমিই তাদের আদরের ছোটো ভাই।
সময়ের ব্যবধানে শোক মুছে যেতে থাকে।
খাখা বাড়ি একা একা থাকি। বোন-ভগ্নিপতিরা যার যার মতো বাড়ি চলে যায়। আমি অসহায় থাকি,বাবা মায়ের কবরের কাছে গিয়ে হা-হুতাশ করি,চোখ মুছি। বড়ো একা লাগে নিজেকে। এখন ভাদ্র মাসের দিন।
বাবা একটা একতলা ছাদের ঘর করে রেখে গেছে।বাইরের বারান্দা সংলগ্ন একটা বেলের গাছ বেশ বড়ো হয়েছে। গাছটির ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে। এই বারান্দার রেলিঙের ভিতর বসে আছি। খোলা ছিলো রেলিঙের বাইরের দরজা। এ দরজাটা খোলা পেয়ে মেয়েটি দড়বড়ানি ছাগল তাড়ানো বৃষ্টির শব্দে বারান্দায় উঠে বসেছে। এমন সুন্দরী যুবতী কাছে পেয়ে ওর মুখ থেকে কিছু জানার জন্য উসখুস করছে মনের জানালায়। যেন বা প্রজাপতিগুলো মনের দরজা দিয়ে বেরানোর জন্য ছুটাছুটি করছে। মেয়েটির বিভিন্ন আকর্ষণীয় অঙ্গে আঘাত খেতে খেতে কতো প্রজাপতির রঙিন পাখা আহত হয়ে যাচ্ছে, তা তো মেয়েটি টের পাচ্ছে না।

আমি নীরবে নিভৃতে এ বারান্দায় প্রায় বসে থাকি। অভিসারে হেঁটে যায় অজানা অচেনা পথে। কিছুক্ষণ পরেই সচেতন হই,সবই তো আমার চেনা পথ। অভিসার বলে কোনো কিছুই দেখি না। দুপুরে যেমন চন্দ্রালো ছড়াই না তেমন মানুষের মাঝে থাকলে অভিসারী হয় না বিবাগী মন। মনের জানালা আর ঘরের বারান্দা একাকার হয়ে যায়। যখন বাস্তবেই দড়বড় করে বৃষ্টি নামে, তখন রাস্তার চলমান পথিক দৌড়ে এসে কাছে বসে।
মনে মনে প্রশ্ন জাগে ও পাড়ার ডাগর মেয়েটি কী এসেছিল এ বারান্দায়, বসেছিল সম্মুখে?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।