কর্ণফুলির গল্প বলায় আনোয়ার রশীদ সাগর

সাধু
গাছের ছায়ায় মগ্ন থেকে থেকে হঠাৎ চোখ পড়ে, থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা আঙ্গুর ফলের দিকে। সাধু মনে মনে ভাবে কুলগাছে আঙ্গুর ধরে নাকি!- ধরতেও পারে ওপরওয়ালার ইচ্ছাশক্তিতে সবই হয়। এরকম অনুমান করে জুলমত সাধু। মনে মনে এও ভাবে, হয়তো তার বড়ো পীর এসেছে,জুলমত সাধুকে অবাস্তব কিছু দেখিয়ে আশ্চর্য করে দিয়েই আসে তিনি।
জুলমত সাধু পীর সাহেবকে এক নজর দেখে,পায়ে সালাম করে, চলে যায় নদীর ধারে বাঁশের মাচায় শুতে। মাচাটি বেশ মজবুত। আটটা খুঁটির উপর ঘনবাঁশের মাচাল। চারপাঁচ জন শুয়ে থাকা যায়। বাঁশের পিটগুলো বেশ তেলতেলে হয়ে গেছে। অনেকে নদীতে গোসল করতে আসার সময় সরিষার তেল মেখে আসে। গোসল করতে এসে, মাচায় বসে একটু আড্ডা অথবা জিড়িয়ে নেওয়ার সময় ওই তেল জড়িয়ে যায়। যেকারণে মাচাটি একটু বেশি পিচ্ছিল হয়ে গেছে।
যাহোক পীরসাহেব আসলে জুলমত সাধুর ঠিকানা হয় এ মাচায়। কারণ বাড়িতে একটায় ঘর। তাই নদীর ধারে মৃদু বাতাসে থাকা ও প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলায় হয় তার প্রধান কাজ। এ ভাঙা বাড়িটায় পীরসাহেব যতোদিন থাকে ততোদিন অথবা চব্বিশ ঘণ্টায় নদীর কিনারে নরম বাতাসে গাঁজা টানে আর চোখ লাল করে সবুজ পানির দিকে তাকিয়ে থাকে জলমত সাধু।দেখতে পায়, পানিতে ছোটো ছোটো চিংড়ি আর ডানকানা মাছ দাপাদাপি করে।
অন্যান্য দিনের মতো পীরসাহেব এসে জুলমত সাধুকে পেয়ে চিৎকার করে উচ্চারণ করে ‘হকমওলা,
নে নাকে দে। খেয়ে দ্যাক।
জুলমত সাধুকে একমুঠো ধুলো হাতে ধরিয়ে দেয় পীর সাহেব। জুলমত সাধু পীরের পায়ে হাত দিয়ে খাড়া হয়ে নিজ হাতে নেয় ধুলোগুলো। একধরনের স্নিগ্ধ সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে ধুলোগুলো থেকে। এবার পীর সাহেব তার ঝুলা থেকে অল্প কিছু মশলা বের করে, জুলমতসাধুর হাতের ধুলোর সাথে মিশিয়ে দিয়ে বলে,যা খেয়ে নিগা। আর ক্ষুধা লাগবে না মওলার রহমতে। জুলমত সাধু জিহ্বা বের করে হাতের ধুলোতে ঠেকায়। তারপর দু’চার বার শুকনো ধুলো খেয়ে নেয়। শুকনো ছাতু খাওয়ার মতো করে খেতে থাকে। গলায় বেধে যাওয়ার আগেই পীরসাহেব,তার ঝুলা থেকে মাটির ময়লা কালো পাত্র থেকে দূর্গন্ধময় পানি বের করে জুলমত সাধুর দিকে এগিয়ে দেয়। জুলমত সাধু নেশা জাতীয় এ তরল ঢকাঢক গিলে নেয়। তারপর চোখ লাল করে, পায়ের কাছে গড় হয়ে বসে,পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঘষতে ঘষতে চলে যায় নদীর দিকে।
বাড়ির ভিতর ‘ হকমওলা’ বলে ঢুকে যায় পীরসাহেব। একটা মাত্র চৌকির উপর চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে।তারপর জোরে জোরে নিঃশ্বাস নেয়।
জুলমত সাধুর বউ মমেনা খাতুন সরিষার তেলের বাটি হাতে করে ঘরের ভিতর প্রবেশ করে। মমেনাকে দেখে পীর সাহেব বেশ জোরে জোরে উচ্চারণ করে হকমওলা-হকমওলা। মমেনা গাল জড়িয়ে হেসে পীরসাহেবের পায়ের কাছে বসে,ভেজা বিড়ালের মতো। তারপর পায়ের পাতায় তেল মাখাতে থাকে,ঠিক বিড়াল যেমন জিহ্বায় কিছু না দিয়ে নিজের গোঁফ নিজে চাটে সেরকমই অবস্থা। পীর সাহেব খাড়া হয়ে বসে নিজের গা থেকে ময়লা পাঞ্জাবি টা খোলে এবং ঘর্মাক্ত পেটসহ শরীর বের করে মমেনার দিকে ঝুঁকে বসে বলে,মাখাও মা ভালো করে মাখাও। মমেনা তেল দেওয়া বন্ধ করে পীর সাহেবের চোখে নিজের নরম লজ্জাঘন চোখ রাখে। চোখাচোখিতে নীরব প্রেমের স্বীকৃতি মনে হয় মমেনার কাছে।,মুখ লাল হয়ে যায়। পীরসাহেব লুঙ্গির শেষ মাথাটা ধরে গুছিয়ে নেয় হাটুর উপরে। দাবনা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত নগ্ন হয়। শুকনো ঠ্যাঙ। পীরসাহেব অলস কণ্ঠে
বলে,আয় মা কাছে, ভালো করে তেলডা ডলে দে।
পায়ের শুকনো সাদা ফ্যাকাশে দাবনা থেকে তেল ডলতে ডলতে নিচের দিকে নরম হাতে নামাতে থাকে। পীরসাহেবের চোখ অলসতায় বুজে আসে। নিস্তেজ হতে থাকে শরীর। ঘুমানোর সমস্ত আয়োজন শরীর জুড়ে। তখনই মমেনা দাবনার গোড়ায় উরুর কাছাকাছি চাপ দিয়ে তেল মাখাতে মাখাতে হাত নিচের দিকে নামায়। উরুর কাছে নরম হাতটার চাপ পড়লে পীরসাহেব অতিধীরে চোখের পাতা খোলে। কিছু বলতে গিয়ে আর বলে না। আবার ঘুমিয়ে যেতে থাকে। তখনই আবার মমেনার আঙ্গুলগুলি পীরসাহেবের উরুর ভিতর মৃদু চাপ দেয়। ঠিক একইভাবে অলস চোখে, চোখের পাতা অর্ধেক খুলে আবার বুজে যায়। মমেনা পীরসাহেবের চোখের দিকে না তাকানোর ভাণ করে। এক সময় পীরসাহেব ঘুমিয়ে যায়। গড়গড় করে নাক ডাকে।
নাক ডাকার শব্দের কারণে,মমেনার মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। শীতের সময় দাদুর কাছে লেপের মধ্যে শুয়ে থাকলে, দাদা মমেনাকে কোলের মধ্যে নিয়ে ঘুমাতো,পাশেই ঘুমাতো খালাতো ভাই আমজেদ। পায়ের কাছে দাদুর পোষা বিড়ালটি লেপের উপর শুয়ে গড়গড় শব্দ করতো। পীরসাহেবের মতোই বিড়ালটি গড় গড় শব্দ করতো। তবে পীর সাহেবের নাকের শব্দটা একটু জোরে জোরে হচ্ছে।
ওদিকে দাদু ঘুমিয়ে গেলে ঠিক ওই এরকম সময়ই, খালাতো ভাই আমজেদ মমেনাকে টেনে কোলের মধ্যে নিতো। মমেনা ঘুমের ভাণ করে থাকতো। আমজেদ তার শরীরের সমস্ত উত্তেজনার আবেগটুকু মমেনার কিশোরী শরীরে ঢেলে দিয়ে ঘুমিয়ে যেতো। মমেনার ভালো লাগাটুকু কেউই জানতো না। আমজেদও না। বরং আমজেদ সারাটাদিন মমেনা থেকে ভয়ে ভয়ে দূরে দূুরে থাকতো। মমেনা নীরবে গোপনে আমজেদকে দেখতো আর মৃদু গাল জড়িয়ে হাসতো।
সে খালাতো ভাইও একদিন পর হয়ে যায়। মমেনার বাবার উঠানে সাধুসঙ্গ শুরু হলো। তিনদিনের ওই সাধুসঙ্গে প্রতিরাতেই গান গেয়ে দর্শক মাতাতো জুলমত সাধু। কিভাবে কখন জুলমত সাধুকে ভালোবেসে ফেলেছিল মমেনা নিজেও জানে না।
প্রচলিত প্রবাদ হচ্ছে,মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। মমেনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। শেষরাতের দিকে দুমুঠো খাবার দেওয়ার দায়িত্ব পড়তো মমেনার উপরই। খাবার দিতে দিতেই দুচার কথা হয়েছিল মমেনার সাথে জুলমত সাধুর।
তোমার হাতে খেতে বসে মনে হয় আরো খায়, জুলমত সাধু বলেছিল।
মমেনা হেসে হেসে, মুখে শাড়ির আঁচলটা দিয়ে বলেছিল,খেতে দিতে এসে মন চায় না তোমাকে ছেড়ে অন্য ঘরে যায়। মন কয়,তোমার কাছে শুইয়া শুইয়া গান শুনি।
এভাবেই তিনদিনের প্রেমে পড়ে যায় মমেনা।
সাধু সংঙ্গের দ্বিতীয় দিনের শেষরাতে জুলমত সাধু গড় হয়ে পড়ে মমেনার বাবার পায়ের কাছে এবং বিনয়ের সুরে বলে,বাবা আপনার মাইয়াডা আমারে দেন।
খুশিতে আত্মহারা মমেনার বাবাসহ বাড়ির সবাই। এতো বড়ো গায়ক হবে এ বাড়ির জামাই!- আর কী চায়! আনন্দের জোয়ার বইতে থাকে।
শুধু অখুশি ছিলো আমজেদ। কিন্তু আমজেদের দিকে কোনো নজর দেওয়ার সময় ছিলো না মমেনার।
সাধুসঙ্গের শেষের দিন বিয়ের পিড়িতে বসে মমেনা ও জুলমত সাধু।
বিয়ের পর পর মমেনা জুলমত সাধুর কাছে শুয়ে শুয়ে গান শুনতে থাকে। পুলকিত হয়, মন ও শরীর জুড়ে শিহরণ জাগে। মনে পড়ে, উঠানে দুপা একজায়গায় করে তবলা গলায় ঝুলিয়ে নেচে নেচে জুলমত সাধুর গানের কথা। বিছানায় শুয়ে আবেগে জুলমতের চওড়া বুকে মাথা রাখে। যেন ঘনঘন নিঃশ্বাসের মধ্যেও গান হতে থাকে। সে গানের সুর, মমেনার বুক থেকে নিচ পর্যন্ত মৃদু ঝংকারে তাল ওঠে। বাজতে থাকে তবলা ও ডুগডুগির মহামিলনের শব্দ, দমাদমদমদম ডুমডুম। আনন্দে আত্মহারা মমেনা নেচে নেচে ওঠে,দুলে দুলে দোলনায় চড়ে। বার বার দোল খেতে খেতে মৃদু ঝড়ের তাণ্ডব হতে থাকে। একি সুখ! মমেনা চুমকিয়ে ওঠে, যেন তবলার উপরের অংশ ফেটে গেছে। জুলমত সাধু স্বান্তনা দেয়,না কিছু না। তবলায় হাত দিয়ে দুমাদুম বাজিয়ে দেখায়, ঠিকই আছে। মমেনা লজ্জায় মুখ লুকায় জুলমত সাধুর বুকে।
আবেগে আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে মমেনা। যৌনতা তো প্রকৃতি স্বীকৃত এক মহামিলন,মহা উত্তেজনা ও মহা আবেগ। সে আবেগে জড়াজড়ি করে একে অপরকে ধরে ঝড়ের গতিতে দুলতে দলতে গতিহারাও হয় মাঝে মাঝে।
কখন ভোররাত চলে গিয়ে দুপুর বেলার জন্ম হয় টের পায় না দু’জনে। সে দুপুরে উঠে স্নান সেরে খেতে বসে। খেতে খেতে বউকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবে। হাসতে হাসতে বলে,বউ বাড়ি তো যেতে হবে?
মমেনা নীরব থেকে নীরব সম্মতিই দেয়।
আবার বিনয়ের সাথে জুলমত সাধু বলে,আমার তো বাড়িঘর নেই। এতিম আমি। বাবামায়ের খোঁজ জানিনা। গুরুই আমাকে মানুষ করেছে। তিনিও দেশে দেশে গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাঁর ভক্তরা তাঁকে পীর সাহেব বলে ডাকে। আমি বাবা বলেই ডাকি। বড়ো কামেল পীর তিনি। আসার আগে অলৌকিক কোনো ঘটনা ঘটিয়ে বাড়ি আসে। বাড়ি বলতে ওই নদীর ধারে মহনগাঁয়ে একটি মাত্র ঘর। সে ঘরে তার কাছে আমার গান শেখা ও তালিম নেওয়া। তিনিই আমার বাবা, তিনিই আমার গুরু।
মমেনা বলে,আমার বাবা তো সবই জেনেই বিয়ে দিয়েছে। আর আমি তো শুধু তোমাকেই বিয়ে করেছি,ঘরবাড়িকে নয়।
জুলমত সাধু হাসতে হাসতে বলে,আমি তো এগাঁয়ে-ওগাঁয়ে গান গেয়ে বেড়াই।
মমেনা বলে,আমিও তোমার সাথে সাথে ঘুরে বেড়াবো।
ছোটো বেলায় তো বাবার সাথে কতো মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়িয়েছি। কতো কতো সাধুসঙ্গে গিয়ে, সেখানেই রাতদিন কাটিয়েছি।
জুলমত সাধু বলে,তাহলে তো কোনো সমস্যায় থাকলো না।
জুলমত সাধু মমেনাকে সঙ্গে নিয়ে একটা ঘোড়ার গাড়িতে উঠে খটখট শব্দ করতে করতে নিজগাঁয়ে নিজ বাড়িতে ওঠে। বাড়িতে তার বাবা অর্থাৎ পীরসাহেব নেই। প্রতিবেশী বলতে তেমন কেউ নেই। এ মাঠের মধ্যে খাস জমিতে দু’ঘর মানুষ বসবাস করে। তাদের উল্লেখযোগ্য সামাজিক রীতি নীতি নেই। পাশের বাড়িতে শুধু শুকুর সাধুর এক ছেলে থাকে। গাঁজা খেয়ে খেয়ে নেশায় ঘোর হয়ে থাকে। শরীরে মাংস বলে কিছু নেই। ক’খানা হাড় দেখায় যায়।
দাড়ি-গোঁফে মুখ ভর্তি। খাওয়া ঠিক নেই,স্নান ঠিক নেই। এ এক আজব ও নীরিহ-নিরোত্তাপ জীবন।
অনেক দিন আগে শুকুর সাধু গান করতে গিয়েছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার নবীনগর গ্রামে। সেখানে তরুণ মৌলবাদীদের উল্থান হয়েছিল মাত্র। সেই তরুণ মৌলবাদীরা শুকুর সাধুকে ধরে চুলদাড়ি কেটে দিয়েছিল। মিছিলসহ শ্লোগান দিতে দিতে এসে শুকুর সাধুকে ধরে পীঠমোড়া করে বেধে রেখেছিল। শুকুর সাধু শুধু বলেছিল, তোদের যা ভালো হয় কর্ বাবা, আমাকে ছেড়ে দে আমি বসে থাকছি।
শেষ-মেষ বাগানের ভিতর বসে মিটিং করে চুলদাড়ি কেটে ফেলে, মাথায় ঘোল ঢেলে বিদায় করে দেয় শুকুর সাধুকে। শুকুর সাধু পাশের দীঘিতে স্নান করে ভেজা কাপড়ে একতারা হাতে দেশান্তরি হয়। আর বাড়ি ফেরে আসে না।
বেশ কিছুদিন পর শুকুর সাধুর বউটাও কোনো এক ভক্তের হাত ধরে চলে যায়। সেই শুকুর সাধুরই এতিম ছেলেটি একা এ বাড়িতে থাকে । খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে রয়েছে। তবে গাঁজা তার নিত্যদিনের খাবার। উঠানের এক কোণে ক’টা গাঁজা গাছও রয়েছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো আনাগোনাও নেই। কারো কিছু হারানোর ভয়ও নেই। বেশি টাকাপয়সার অভাব হলে ছেলেটি দুমুঠো গাঁজার পাতা শরীরে পরা লুঙ্গির উপরের অংশে মাজায় গুঁজে নিয়ে যায় কোনো মাজারে অথবা আস্তানায়। তারপর সে গাঁজা বিক্রি করে টাকার অভাব মেটায়। এটায় তার আয়ের উৎস।
মাঠের মধ্যে নদীর কিনার থেকে এক কিলোমিটার দূরে
একা নির্জনে নতুন বাড়িতে উঠে আনন্দই পায় মমেনা। মনে মনে বলে,শুধু আমি আর সাধু। জুলমত সাধুকে জড়িয়ে ধরে গলা ছেড়ে চিৎকার করে ওঠে মমেনা,ও মিলন হবে কতোদিনে আমার মনের মানুষেরও…..। স্বাধীন জীবনের সাধ এখানেই,এ দিনের মতো চান্দের আন্ধারও আলোয় আলোয় ভরা।
জুলমত সাধুও কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে ওঠে একই গান।
গোধূলির রঙ ধরেছে পশ্চিম আকাশে। সূর্য পশ্চিমের গাছপালা ছুঁই ছুঁই করছে। বিদায়ের ঘণ্টা বাজবে মসজিদের আযানের ধ্বনি দিয়ে অথবা কোনো হিন্দুবাড়ির শাঁখের ধ্বনির সুরে সুরে।
এ সময়ই দরাজ গলায় গেঁয়ে ওঠে পীর সাহেব….
“দিন ফুরাইল হরি হরি বল
মানব জনম তোর গেল ফুরাইয়া-রে
কি কাজ করিতে আইলি
এ ভব সংসারের মাঝে
ও মন মন-রে….”
রাত গভীর হয়। একটি মাত্র চৌকির উপর শুয়ে রয়েছে পীর সাহেব। নিচে পাটি বিছায়ে শুয়ে ছিলো মমেনা। রাত যতো গভীর হয় ততো পীরসাহেবের কণ্ঠে গানের সুর ওঠে। মাঝে মাঝে একতারাটা রেখে হকমওলা শব্দ করে। তারপর খানিকটা সময় ঘরের মটকার দিকে চেয়ে থাকে। রাতে তার ঘুম নেই। কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে বিছানায়। অর্ধেকটা শরীর উঁচু বালিশের সাথে আর পেট থেকে পা পর্যন্ত বিছানা সোজা করে রেখে ঘুমানো অবস্থায় সময় পার করে।
রাত যতো গভীর হয় ততোই গোঁসাই বা পীরসাহেব ভরাট কণ্ঠে গেয়ে ওঠে-
অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণ নিধি
তাঁর কি আছে কভূ গোষ্ঠখেলা
ব্রহ্মরুপে যে অটলে বসে
লীলাকারী তাঁর অংশকলা।
মমেনা গানে গানে আবেগে আপ্লুত হয়ে নিজ বিছানা ছেড়ে উপরে চৌকিতে পীরের বিছানায় যায় এবং পায়ের কাছে বসে। তালে তালে গানে গানে ধীরে ধীরে পীরের মুখের কাছে চলে যায়। মুগ্ধ হয়ে আঁধারের মাঝে চেয়ে থাকে মুখের দিকে। বাইরে চাঁদ-জ্যোৎস্না ঝলমল করে আলো ছড়িয়ে রেখেছে উঠানময়। মায়া-মমতার একছত্র আঁধার যেন।
পীরসাহেব মমেনার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে গুনগুন করে গেয়ে যায়-
তোমারি এই বসন-ভূসণ কার লাগিয়া করো
দেহটারে ছাইড়া মায়া অন্তরারে ধরো,ও মন…
এদিকে মমেনা পীরের মুখের কাছে মুখ দিয়ে বুকের সাথে বুক রেখে লেপ্টে যায়। শরীর-মন শিহরিত হতে হতে নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হয়।
পীরসাহেব মমেনার মাথার চুলের ভিতর আঙ্গুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে বলে,মা-রে, আমি সাধু মানুষ। তোর সাধ-আহ্লাদ মিটাতে পারবো না। তুই বাইরে যা,আকাশের দিকে চেয়ে থাকিস,তোর আশা পূর্ণ হবে। যা,মা -যা।
মমেনা হতাশ হয়ে, ধীরপায়ে উঠে দরজার দিকে তাকিয়ে পা ফেলতে থাকে। দু’পা এগিয়েই দেখতে পারে নগ্নবুকে একজন সুপুরুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে দরজার ওপারে। মমেনা ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ভরাটবুকে মাথা রাখে।
জুলমত সাধু মমেনাকে জড়িয়ে ধরে উঁচু করে কোলে তুলে নেয়। তারপর উঠানে ছায়া হয়ে থাকা লাউমাচার নিচে চাঁদনিরাতে শক্তমাটিতে দুজনে শুয়ে পড়ে।