বাড়ি থেকে মায়ের বকা খেয়ে রাগ করে চলে এসেছি। আসার সময় উত্তর-দক্ষিণ কোণে কালো অন্ধকার মেঘ জমেছিল। পথের মধ্যে ভীষণ বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। একটা টোং দোকানের ঝাপের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিকেল হয়ে যায়। অর্ধভেজা অবস্থায় স্টেশনে পৌছায়। স্টেশনটিতে বড় টিনের চালা রয়েছে। এর পাশেই ঠিক আমাদের বাড়ির পাশের আমগাছের মত একটি কাঁঠাল গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। মগডালের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা পাখির বাসা আছে।
তখন ঘনসন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই অবস্থা। মেঘের গুড়গুড় ডাক এখনো রয়েছে। ক্ষুধার্ত পেটে আর কতক্ষণ? খুব মায়ের কথা মনে হচ্ছে। আমরা এক ভাই এক বোন। বাবা থাকে দুবাই। মা’য় আমাদের বাবা এবং মা। খুব আদর করে নিজ হাতে খাওয়িয়ে দেয়। কষ্ট বাড়তে থাকে। আশ্চার্য হলাম, পাশের ওই কাঁঠাল গাছের পাখির বাসা থেকে, একটি বাচ্চা চিঁচিঁ করে, তার মায়ের ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে গিয়ে পড়ে গেলো। পড়ার সাথে সাথে কোথায় থেকে একটা বিড়াল এসে খপ করে ধরে নিয়ে দৌড় দিয়ে, পশ্চিম দিকের ঝড়ের মধ্যে চলে গেলো। শালিক পাখিটা তার দু’পাখা মেলে চ্যাঁচ্যাঁচ্যাঁ করে চিৎকার করতে লাগলো।
আমার খুব মাকে মনে পড়তে লাগলো। আমার মা’ও হয়তো দেওয়ালে হেলান দিয়ে কাঁদছে। মনে মনে কয়েক বার বললাম,ও মা,মা…।
ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটেছিল আমাদের বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আম গাছের মা পাখিটার।
কী যে কষ্ট শালিক পাখিটার ! ট্যা-ট্যা করে চিৎকার করছিল আর পাখা ঝাপটাচ্ছিল। দুটি ছানার একটি গাছ থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল।
তখনো সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল ক্রমেই। ভাগ্য ভালো আমাদের উঠানে পড়েছিল ছানাটি। বাড়ির হাঁস-মূরগীগুলো তাদের ঘরে উঠছিল।
আমার মা’ও তখন ওজু করে নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চারিদিকে ঘন ছায়া নেমে আসছিল। হঠাৎ মা চিৎকার করা শুরু করে দিয়েছিল, জসিম-জসিম ও জসিম, কোথায় গেলি বাবা?
দৌড়ে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছিলাম।
শালিকের বাচ্চাটা ধরে আম গাছের ডালে তুলে দে-তো বাবা।
আমি তো অবাক! – যে মা আমাকে গাছেই উঠতে দেইনা। সব সময় বলতো,এই খবরদার উঠবি না-পড়ে যাবি।
সেই মা, আমাকেই বলছে গাছে উঠ্।
ধীরে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে যাই গাছের গোড়ায়। তার আগে বাচ্চাটি ধরে হাতের মুঠোই নিই।
মা, নামাজ না পড়ে কাছে এসে বলেছিল,আমাকে দে। তুই গাছে ওঠ্,আমি নগার আগাতে বেঁধে তুলে দিচ্ছি।
আমি শালিক পাখির বাচ্চাটি মা’র হাতে দিয়ে হুড়হুড় করে গাছে উঠে গিয়েছিলাম। কিছুদূর যেতেই,মা বলেছিল,থাক-থাক। ওখানেই রেখে দে,ওর মা নিয়ে
যাবিন।
বাচ্চাটি নগার আগায় বেঁধে,আমার মা উপরে তুলে দিয়েছিল। আমি আস্তে করে ধরে বাচ্চাটিকে গাছের ডালের উপর রেখে দিয়েছিলাম।
মা শালিকটা তাকিয়েছিল। আমি গাছ থেকে নেমে এসে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেছিলাম।
সাথে সাথেই মা শালিকটা বাচ্চাটির কাছে এসেছিল।তারপর সত্যি সত্যি পাখা নাড়তে নাড়তে বাচ্চাটিকে নিয়ে গিয়ে তাদের বাসায় তুলেছিল। কিন্তু আমার কৈশোরের দুষ্ট বুদ্ধি! – মনে মনে ভেবেছিলাম,বাচ্চা দুটো ধরে এনে খাঁচায় পুরবো। আর পাখির ছানা দুটো খাঁচায় পুরা হয়নি।
ছানা দুটো বড় হয়ে তারা চারজন হয়েছে সংসারে।